কেটুতে হারানো পাঁচ নক্ষত্র

পর্বতারোহণের সাথে জড়িয়ে থাকে মৃত্যুর হাতছানি। তবে এবছর কেটু যে মৃত্যু দেখলো ২০০৮ সালের পরে আর কখনো দেখেনি। সেবার পাহাড় ধ্বসে প্রাণ হারিয়েছিলো একসাথে ১১ জন পর্বতারোহী।  আর এবছর শীতাকালীন অভিযান দুজনের মৃত্যু ও তিনজনের নিখোঁজের মাধ্যমে শেষ হলো।

পৃথিবীর ২য় সর্বোচ্চ পর্বত পাকিস্তান চীন সীমান্তের কারাকোরাম অঞ্চলে অবস্থিত ৮,৬১১ মিটার (২৮,২৫০ ফিট) উচ্চতার কেটু। উচ্চতায় ২য় হলেও মৃত্যুর রেকর্ডের কারণে এ পর্বতকে কিলার মাউন্টেইন বলা হয়। শুধুমাত্র অভিজ্ঞ ও ঝানু পর্বতারোহীরাই চেষ্টা করে এ পর্বতে উঠতে।

এতবছর পর্যন্ত শীতকালে এ পর্বতে কেউ উঠতে না পারলেও এ বছরের ১৬ ই জানুয়ারী প্রথমবারের মতো নির্মল পূর্জা ও নেপালী শেরপাদের দশ সদস্যের দল প্রথমবারের মতো শীতকালে এ চূড়ায় পা রাখতে পারেন। ঐতিহাসিক এ অভিযান যতটা স্মরণীয় হয়ে থাকবে ঠিক সেভাবেই স্মরণীয় হয়ে থাকবে হারিয়ে যাওয়া পাঁচ নক্ষত্রের নামও।

গত এক মাসেই এ পর্বতে প্রাণ হারিয়েছেন সার্গেই মিনগোটে ও আতানাস স্কাতভ। নিঁখোজ আছেন জন স্নোরি, আলী সারাপা ও হুয়ান পাবলো মোর। শুক্রবার থেকে নিঁখোজ এ তিনজনকে মৃত বলেই ধরে নিতে হচ্ছে। বর্তমান আবহাওয়ার কারণে তিন দিন পর থেকে বন্ধ হয়ে আছে উদ্ধার অভিযানও।

শীতকালীন কেটু অভিযানে আসা এ পাঁচ জনই বর্তমান সময়ের আলোচিত পর্বতারোহী।  তাদের অভিজ্ঞতার ঝুলি দেখলেই ধারণা করতে পারবেন কী মাপের পর্বতারোহী ছিলেন তাঁরা।

সার্গেই মিনগোটে: 

স্পেনের সার্গেই মিনগোটেকে বলা হতো সাম্প্রতিক সময়ের সেরা পরতারোহীদের একজন। তাঁর লক্ষ্য ছিলো মাত্র ১০০০ দিনের পৃথিবীর সর্বোচ্চ ১৪ টি পর্বত অক্সিজেন ছাড়া সামিট করার। এর মধ্যে সাতটি সামিট করেও ফেলেছিলেন। এগুলো হচ্ছে মানাস্লু, কেটু, নাঙ্গা পর্বত, লোৎসে, ধউলাগিরি, গাশেরব্রাম ২ ও ব্রড পিক। এছাড়া ২০০১ ও ২০০৩ সালে উঠেছিলেন পৃথিবীর সর্বোচ্চ চূড়া এভারেস্টেও।

বহু প্রতিভার অধিকারী মিনগোটে ছিলেন আয়রনম্যান, আল্ট্রাম্যান, সাঁতরে পার হয়েছিলেন জিব্রাল্টার প্রণালী। পার হয়েছিলেন সাহারা ও গোবে মরুভূমিও। ইউরোপ জুড়ে ৭,০০০ কিমি সাইকেলও চালিয়েছেন। ৪৯ বছর বয়সী মিনগোটে ১৬ই জানুয়ারী ক্যাম্প ১ থেকে বেইজক্যাম্পে ফেরার পথে আইস র‌্যাম্পে পড়ে মারা যান।

আতানাস স্কাতভ:

সদা হাস্যোজ্বল বুলগেরিয়ান এই পর্বতারোহী ৫ই ফেব্রুয়ারী ক্যাম্প থ্রি এর কাছে পড়ে গিয়ে মারা যান। ধারণা করা হয় রোপ পরিবর্তন করে অন্য রোপে লাগানোর সময় এ ঘটনা ঘটেছে। প্রতিভাবান এ পর্বতারোহীর ১১ বার ৮,০০০ মিটার পর্বত সামিট করেছিলেন। এগুলো হচ্ছে এভারেস্ট (দুবার), গাশেরব্রাম ১ ও ২, মানাস্লু, ধউলাগিরি, নাঙ্গা পর্বত, অন্নপূর্ণা ১, কাঞ্জনজঙ্ঘা, চো ইয়ু, মাকালু।

এর মধ্যে তিনটি ৮,০০০ মিটার চো ইয়ু, গাশেরব্রাম ১ ও ২ সামিট করেছেন কোন শেরপার সাহায্য ছাড়া। সাত মহাদেশের সাতটি সর্বোচ্চ চূড়ায়ও পা রাখতে পেরেছিলেন তিনি, তার মধ্যে ডেনালিতে আলপাইন স্টাইলে সামিট করেছেন। এছাড়া অন্নপূর্ণা ১ থেকে নেমে রেকর্ড সময়ে উঠেছিলেন মাকালুতেও।

আলী সাপারা:

গত শুক্রবার থেকে অন্য দুজনের সাথে নিঁখোজ আছেন পাকিস্তানের পর্বতারোহী আলী সাপারা। ছেলে সাজিদ সাপারা একরকম মেনেই নিয়েছেন তার পিতাকে জীবিত খুঁজে পাওয়ার সম্ভাবনা আর নেই। এ পাঁচ জনের মধ্যে সবচেয়ে বিখ্যাত আলী বর্তমান সময়ে অন্যতম শক্তিশালী পর্বতারোহী ছিলেন।

৪৬ বছর বয়সী আলী সাপারা এক সময় কেটু, গাশেরব্রাম ও ব্রড পিকে পোর্টারের কাজ করতেন। ২০০৬ সালে পোর্টারের কাজ ছেড়ে দিয়ে পর্বতারোহণের মনোযোগ দেন তিনি। ২০০৬-২০১৫ এর মধ্যে সামিট করেন নাঙ্গা পর্বত, গাশেরব্রাম ১ ও ২ এবং স্পাতনিক। ২০১৬ সালে নাঙ্গা পর্বতে প্রথমবারের মতো শীতকালীন অভিযানে সফল হওয়া দলে ছিলেন আলী। বলা হয়ে থাকে সামিটের কয়েক মিটার আগে এসে মোরোর জন্য অপেক্ষা করেন তিনি, যাতে তারা দুজন একাষে সামিট করতে পারেন।

মোরো ইতিহাস গড়া এই অভিযানের পর বলেছিলেন তেনজিং নোরগে এভারেস্টে যেমন, আলী নাঙ্গা পর্বতে তেমনই। মোট চার বার নাঙ্গা পর্বত সামিট করা আলী উঠেছিলেন কেটু, ব্রড পিক, মাকালু, মানাস্লুতেও। এবছর জন স্নোরির ছোট্ট দলে ছেলে সাজিদ সাপারাকে সাথে নিয়ে শীতকালীন সামিটের চেষ্টায় ছিলেন তারা।

প্রথম প্রচেষ্টা ব্যর্থ হওয়া হবার পর ২য় প্রচেষ্টায় চূড়ার খুব কাছে ৮,৪০০ মিটার উচ্চতায় সর্বশেষ তাকে দেখেছিলেন সাজিদ। অক্সিজেন রেগুলেটর কাজ না করায় একাই ক্যাম্প ৩ এ ফিরে আসেন সাজিদ আর এভাবেই বেঁচে যান তিনি। সাজিদের ধারণা সামিট শেষে ফিরে আসার সময় হয়তো কোন দূর্ঘটনায় পড়েছেন এ তিনজন, যার কারণে আর ফিরে আসতে পারেননি।

হুয়ান পাবলো মোর:

৩৩ বছর বয়সী চিলি জেপি মোরও নিঁখোজ আছেন আলী ও স্নোরির সাথে। ১৭ বছর বয়স থেকে ক্লাইম্বিং শুরু করা মোর ২০১৭ সালে অন্নপূর্ণায় উঠেন। এরপর ২০১৮ ও ২০১৯ সালে মানাস্লুতে উঠেন। মাত্র ৬ দিনে এভারেস্ট ও লোৎসে অক্সিজেন ছাড়া সামিট করে রেকর্ড গড়েন তিনি। এছাড়া ধউলাগিরিতে অক্সিজেন ও শেরপা সাপোর্ট ছাড়া আরোহণ করেন তিনি।

জন স্নোরি:

আইসল্যালেন্ডর ৪৭ বছর বয়সী জন স্নোরি শীতকালীন অভিযানে নিজের ছোট্ট দলের নের্তৃত্ব দিচ্ছিলেন। আমা দাবলাম, এলব্রুস, লোৎসে, কেটু, ব্রড পিক সামিট করা স্নেরির কাছে শীতকালের কেটুও নতুন নয়। গতবছরই মিংমা জি এর সাথে ব্যর্থ শীতকালীন সামিটে ছিলেন স্নোরিও।

প্রথম প্রচেষ্টা ব্যর্থ হবার পরও হাল ছাড়েননি তারা। সাজিদ ও আলীকে নিয়ে ৫ ফেব্রুয়ারী রাত একটায় সামিটের উদ্দেশ্যে রওনা দেন তাঁরা। আলী ও স্নোরির পরিকল্পণা ছিলো অক্সিজেন ছাড়াই সামিট করবেন তারা। কিন্তু বটলনেকে শেষবার দেখা যাওয়ার পর পেরিয়ে গেছে চার দিন। তাদেরকে জীবিত খুঁজে পাওয়ার আশা আর নেই বললেই চলে।

কিলার মাউন্টেন কেটুতে এভাবেই পাঁচ নক্ষত্রের পতন দিয়ে শেষ হলো শীতকালীন কেটু অভিযান। বর্তমান আবহাওয়া পরিস্থিতিতে আগামী এক সপ্তাহেও হয়তো নতুন করে উদ্ধার অভিযান সম্ভব হবেনা।

ছবি: এপি

About Muhammad Hossain Shobuj

Check Also

পায়ে হেঁটে রংপুর বিভাগ ঘুরে দেখা – ৪র্থ দিন।

ট্যাক্সের হাট (বদরগঞ্জ) – পার্বতীপুর – চিরিরবন্দর – দিনাজপুর – বীরগঞ্জ ( ৪১.৫৪ + ২৭.৩২) …

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *