Home Blog

কোন দিকে যাচ্ছে সেন্টমার্টিনের পর্যটন?

জাপান থেকে আনা বিলাসবহুল জাহাজ পৌঁছে গেছে বাংলাদেশে, এ খবর এখন পুরণোই। বাংলাদেশে এ ধরণের জাহাজ চলবে এ খবরে উচ্ছোসিত পর্যটকরা। এছাড়া কক্সবাজার থেকে সরাসরি সেন্টমার্টিন যাওয়ার বিষয়টাও এবছর চালু হয়েছে কর্ণফুলী এক্সপ্রেসের হাত ধরে। ভাড়া নিয়ে আপত্তি থাকলেও ভালোই চলছে জাহাজটি। এ অসময়েও সেন্টমার্টিন যাওয়া যাচ্ছে এই জাহাজে বিষয়টা অনেক পর্যটকের জন্য আনন্দের। কিন্তু আমার মাথায় সম্পূর্ণ ভিন্ন চিন্তা এসেছে, কোন দিকে যাচ্ছে সেন্টমার্টিনের পর্যটন?

২৪ সেপ্টেম্বর ‘প্রথম আলো’ পত্রিকায় সেন্টমার্টিনের প্রবালের আশংকাজনক হ্রাস নিয়ে একটি প্রতিবেদন এসেছে। প্রতিবেদনে বলা হচ্ছে প্রবাল শূণ্য হতে যাচ্ছে এ দ্বীপ। এ আশংকা প্রকাশ করেছেন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের দুজন গবেষক। প্রতিবেদনে বলা হচ্ছে দ্বীপটির প্রবাল আচ্ছাদন ১.৩২ বর্গকিমি থেকে নেমে এখন ০.৩৯ বর্গকিমি আছে। কাগজে কলমে দ্বীপের আয়তন ১৩ বর্গকিমি বলা হলেও এখনকার আয়তন ৯ বর্গকিমি। ছোট্ট এ দ্বীপে প্রতিবছর প্রায় দেড়লাখ পর্যটক যায়।

অসম্ভব সুন্দর এ প্রবাল দ্বীপ। ছবি: লেখক

প্রবাল পাথর, চোখ ধাধানো নীল সমুদ্রের পানি আর নারিকেলের সারি নিয়ে এ দ্বীপটি ভ্রমণপ্রিয় মানুষের পছন্দের শীর্ষে আছে। প্রতিবছর আবহাওয়া অনুকূলে থাকলে অক্টোবর থেকে শুরু করে মার্চ-এপ্রিল পর্যন্ত পর্যটকরা ভিড় করে এই দ্বীপে। একদিনে দশ হাজার লোকেরও সমাগম ঘটে এখানে। তিন দিনের বন্ধ আর ডিসেম্বরের শেষ দিকে পর্যটকদের ভিড়ে নুয়ে থাকে এ দ্বীপ। পর্যটন মৌসুমে ৫-৬ টি জাহাজ ও ট্রলারে করেও পর্যটকরা যায় এ দ্বীপে। এবছর সেই সাথে যুক্ত হয়েছে কক্সবাজার থেকে যাওয়ার কর্ণফুলী এক্সপ্রেস। আবার জাপান থেকে আনার জাহাজও চালু হবার কথা সামনের মাসেই।

অথচ গত কয়েকবছর ধরে এ দ্বীপটি অন্তত তিনবছরের জন্য পর্যটকদের জন্য বন্ধ করে দেবার কথা ছিলো। প্রতিবারই এ ধরণের কথা উঠে এবং শেষ পর্যন্ত এ মৌসুমেই শেষবার যাবে পর্যটকরা এ হুজুগ তুলে আরো ভিড় বাড়িয়ে দেয়। সেন্টমার্টিনে কোন পাকা স্থাপণা করা যাবেনা, পরিবেশ অধিদপ্তরের এ ধরণের নির্দেশনা থাকলেও তার বাস্তবায়ন হয়নি। বরং গড়ে উঠেছে ১৩০ টি হোটেল ও রিসোর্ট। প্রতিবছর তাদের স্থাপনা সরিয়ে নিতে বলে দায়সারা একটি চিঠি দিয়েই কর্তব্য শেষ করা হয়।

পাকা স্থাপণা নয় বরং তাঁবু, বাঁশ-কাঠের কটেজই হওয়া উচিত এ দ্বীপের আবাসন। ছবি: লেখক

অপসারণ তো পরের কথা নতুন নতুন হোটেল রিসোর্ট গড়ে উঠছে সেখানে। একই সাথে প্রবাল দ্বীপটি ভার বহন করতে না পারার যুক্তিতে পাকা স্থাপণা করার উপর নিষেধাজ্ঞা থাকলেও সেখানে গড়ে উঠছে ২/৩ তলা ভবনও। সামুদ্রিক কচ্ছপের ডিম পাড়ার সুবিধার্থে দ্বীপে রাত ১১ টার পর জেনারেটর বন্ধ রাখার কথা বলা হয়েছিলো, এখনতো বেশিরভাগ হোটেলেই সারারাত বিদ্যুৎ থাকে। আর আমাদের পর্যটকদের পরিবেশ বিষয়ক জ্ঞানের কথা নাইবা বললাম।

গত বছর ৫৫০ কেজি বর্জ্য অপসারণ করে টিওবি। ছবি: টিওবির ফেইসবুক পেইজ থেকে

এ দ্বীপে স্বভাবতই বর্জ্য নিষ্কাশনের সঠিক ব্যবস্থা গড়ে উঠেনি। প্রতি বছর পর্যটকরা ইচ্ছেমতো বর্জ্য ফেলে যায় এ দ্বীপে, যার মধ্যে সবচেয়ে ভয়ংকর হচ্ছে প্লাস্টিকের বর্জ্য। অন্য কোন দেশ হলে এ ধরণের দ্বীপে ত্রিসীমানায় কাউকে প্লাস্টিকের কোন কিছু নিয়ে ঢুকতে দিতোনা। পর্যটক আর দুষণের ফলে মরতে শুরু করেছে প্রবাল। আজ থেকে ১০ বছর আগেও সেন্টমার্টিনের আশেপাশে ঢুব দিলে কিছু জীবিত প্রবাল দেখা যেতো, এখন সেগুলোর অস্তিত্ব নেই। মরে যাচ্ছে আমাদের অমূল্য দ্বীপটা, এটা বোঝার জন্য পরিবেশ বিজ্ঞানী হবারও দরকার নেই।

জীবিত প্রবাল পাথরের দেখা পাওয়াই কঠিন এখন। ভিডিও: লেখক

কিছুদিন আগে বলা হয়েছিলো রাতে পর্যটকরা যাতে না থাকতে পারে সেটার ব্যবস্থা করা হবে। তারপর বলা হয়েছিলো প্রতিদিন কতজন যেতে পারবে সেটার একটা কোটা নির্ধারণ করা হবে, সেই অনুসারেই পর্যটকরা যেতে পারবে সেখানে, জানিনা এ সমস্ত পরিকল্পণা কোথায় আছে এখন, আদৌ আছে কিনা আর। বরং প্রতিবছরই সেন্টমার্টিনের জন্য নতুন নতুন জাহাজ যুক্ত হচ্ছে। সে সমস্ত জাহাজে অবশ্য পরিবেশ বিষয়ক অনেক জ্ঞান দেয়া হয় পর্যটকদের, কিন্তু তারা সেটা কীরকম পালন করে সেটা গাংচিলকে চিপস খাইয়ে চিপসের প্যাকেট পানিতে ছুড়ে মারা দেখেই বোঝা যায়।

সেন্টমার্টিন দ্বীপের ভিত্তিই হচ্ছে প্রবাল পাথর। গবেষকরা আশংকা করছেন এভাবে চললে ২০৪৫ সালের মধ্যে পুরোপুরি প্রবালশূণ্য হয়ে যাবে দ্বীপটি। আর প্রবাল না থাকলে সমুদ্রের বুকে চিরতরে হারিয়ে যেতে পারে দেশের একমাত্র প্রবাল দ্বীপটি। ধ্বংসের হাত থেকে এ দ্বীপকে বাঁচানোর একমাত্র উপায় এক্ষুণি অনিয়ন্ত্রিত পর্যটনের লাগাম টেনে ধরা। প্রতিবছর যে গুঞ্জণ উঠানো হয় তিন বছরের জন্য পর্যটকদের জন্য বন্ধ করা হবে দ্বীপটি, প্রথম কাজই হচ্ছে এটা বাস্তবায়ন করা।

দরকার পরিবেশ বান্ধব পর্যটন। ছবি :লেখক

তিনবছর বন্ধ থাকা অবস্থায় সত্যিকারের অবস্থা নিরুপণ করে প্রতিদিন কতজন পর্যটক যেতে পারবে সেটা নির্ধারণ করে দেয়া। রাতে থাকার ব্যবস্থা হওয়া উচিত তাঁবু, বাঁশ কিংবা কাঠের কটেজে, কোন অবস্থাতেই কোন ধরণের পাকা স্থাপণা থাকা যাবেনা। যারা ডে-ট্রিপে যাবে জন্য যাবেন তাদের জন্য পৃথক ব্যবস্থা করা। সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় যে পর্যটকরা দ্বীপে যাওয়ার সুযোগ পাবে তাদের পরিবেশ জ্ঞানের উপর পরীক্ষা নেয়া, যদি সেটাতে উত্তীর্ণ হয় তবে যেতে পারবে দ্বীপে।

অথবা এমন বড় অংকের জরিমানার ব্যবস্থা রাখা যাতে পরিবেশ দূষণের কথা চিন্তাও করতে না পারে। প্লাস্টিক বন্ধ করতে হবে জাহাজে উঠার আগেই। সেন্টমার্টিনগামী জাহাজে উঠার সময়ই নিশ্চিত করতে হবে কারো কাছে কোন প্লাস্টিকের কিছু নেই। এধরণের ব্যবস্থা নেবার আগেই এ দ্বীপে গণ-পর্যটন চালু রাখার মানে হচ্ছে এই দ্বীপকে নিশ্চিহ্ন করার ব্যবস্থা করা। আমার মনে হয় এখনো সময় আছে, এখনো চাইলেই করা সম্ভব, কিন্তু সে ধরণের পদক্ষেপ নেয়ার ইচ্ছা, সক্ষমতা বা পরিকল্পণা আমাদের আছে কি?

ফিচার ছবি: লেখক

দূরন্ত সাঙ্গু নদীতে দুর্ধর্ষ ১০২ কিলোমিটার কায়াকিং

মূল পরিকল্পণা ছিলো ২২০ কিলোমিটার চালিয়ে বর্ষায় ফুলে ফেঁপে ওঠা খরস্রোতা সাঙ্গু নদীর তিন্দু বাজার থেকে শুরু করে শেষ করা হবে বঙ্গোপসাগরে। নানা প্রতিকূলতায় ১০২ কিলোমিটার চালিয়ে শেষ পর্যন্ত বান্দরবানে ইতি টানতে হয়েছে এবারের The Great Sangu Expedition এর। শেষ করতে না পারলেও দুঃসাহসিক এ অভিযানকে প্রশংসার দৃষ্টিতেই দেখছে দেশের অ্যাডভেঞ্চার প্রিয় মানুষেরা। তাইতো ফেইসবুকে, অভিনন্দন, শুভেচ্ছাবাণী জোয়ারে ভাসছেন অভিযাত্রীরা। ভ্রমণের পুরো গল্প/ছবি/ভিডিও দেখতে মুখিয়ে আছেন সবাই।

তিন্দু থেকে অভিযান শুরুর সময় অভিযাত্রীরা। ছবি: ফজলে রাব্বি

কিছুদিন আগেই ঘোষণা দিয়েছিলো BD Kayakers এর প্রতিষ্ঠাতা দুই সদস্য ফজলে রাব্বি ও ইমরুল খান। কায়াক (হাতে চালিত নৌকা বিশেষ) চালিয়ে ২২০ কিলোমিটার পাড়ি দিয়ে সাঙ্গু নদী ধরে তিন্দু থেকে কায়াক চালিয়ে পৌঁছাতে চান তারা গহিরার কাছে বঙ্গোপসাগর পর্যন্ত। সেই লক্ষ্যে ১৭ই সেপ্টেম্বর ২০২০ মোট ২১ জন সদস্যের এই দল রওনা দেন তিন্দুর পথে। মোট ১১টি কায়াক চালিয়েছেন ১৮ জন অভিযাত্রী। সঙ্গে ছিলো দুটি সাপোর্ট ও রেসকিউ বোটে আরো তিনজন।

তিন্দু থেকে শুরু করার কিছুক্ষণের মধ্যেই প্রথম র‌্যাপিডে (নদীর খরস্রোতা অগভীর অংশ, যেখানে পাথরের উপর দিয়ে তীব্র বেগে পানি ছুটে যাচ্ছে) উল্টে যায় বেশ কয়েকটি কায়াকে। প্রচণ্ড রোদে পানি শেষ হবার পর ঝিরি খুঁজে নিয়ে পানি খেতে হয়েছে অনেককে। থানচি পর্যন্ত অনেকগেুলো র‌্যাপিড পার হয়ে তূলনামূলক শান্ত নদী পাওয়া যায়। প্রতিদিনই নদী মোটমুটি ৩০ কিমি চালিয়ে নদী তীরেই ক্যাম্প করে আস্তে আস্তে লক্ষ্যের দিকে এগুচ্ছিলেন তাঁরা।

রাতের ফ্ল্যাশ ফ্লাড়ে ভেসে যাওয়া ক্যাম্পসােইট। ছবি: ফজলে রাব্বি

তৃতীয় রাতে তাঁদের ক্যাম্পসাইট হড়কাবানে (ফ্ল্যাশ ফ্লাড) ভেসে যায়। বাংলা চ্যানেল সাঁতরে পার হওয়া দলের অভিজ্ঞ সাঁতারু সোহাগ বিশ্বাস জীবনের ঝুকি নিয়ে উদ্ধার করেন ছুটে যাওয়া কায়াক। তুমুল বৃষ্টির মধ্যে ভয়ংকরভাবে বেড়ে যাওয়া নদীর পানির মধ্যেই চলছিলো কায়াকিং। পরের দিন ক্যাম্প স্থাপন করা হয়েছিলো রিজুক ঝর্ণার কাছে। তবে সামরিক বাহীনির অনুরোধে অভিযাত্রীরা রুমা বাজার হোটেলে চলে আসেন। পরের দিন রুমা থেকে আবার শুরু করা হয় অভিযান।

আবহাওয়া পূর্বাভাসে আগে থেকেই জানা গিয়েছিলো তুমুল বৃষ্টি থাকবে এ কয়েকদিন, হয়েছেও তাই। তবে ক্লান্তি, হড়কাবান বা নদীর স্রোত নয়, বরং নদীপথে এ ধরণের অভিযানে পদে পদে বাঁধা হয়ে দাঁড়িয়েছিলো নিরাপত্তা জনিত উদ্বেগ ও প্রাশাসনিক জটিলতা। তাই ১০২ কিলোমিটারেই থামতে হলো পুরো দলকে। বান্দরবানের পৌঁছে শেষ পর্যন্ত অভিযানের এবারের মতো ইতি টানার ঘোষণা দেন দলনেতা ফজলে রাব্বি।

তুমুল বৃষ্টিতে রিজুক ঝর্ণায় । ক্যাম্পিং ছবি: রাকা

অভিযান অসমাপ্ত রেখে বান্দরবন থেকে ফিরে আসেন সবাই গত ২৩ সেপ্টেম্বর। সব ঠিকভাবে চললে ২৫ সেপ্টেম্বর গহিরা পৌঁছে যেতে পারতো দলটি। গতকাল অভিযানের সংক্ষিপ্ত ভিডিও প্রকাশের পর ফেইসবুকে ভাইরাল হয়ে যায় সে ভিডিওটি। ২৪ ঘণ্টায় ৩৫,০০০ এর বেশি লোক এই ভিডিও দেখে। দেশের মধ্যে তীব্র খরস্রোতা নদীতে দূর্দান্ত কায়াকিং দেখে অভিভূত অ্যাডভেঞ্চার প্রিয় ব্যক্তিরা। শেষ করতে না পারার চেয়ে অভিযাত্রীরা হার না মানা মনোভাব আর সাহসিকতার প্রশংসায় পঞ্চমুখ সবাই।

sneak peek - The Great SANGU EXPEDITION

Posted by Intrepid journey on Wednesday, September 23, 2020
ফেইসবুকে ভাইরাল হওয়া অভিযানের ভিডিও

এ অভিযানে বিডি কায়াকার্সের সাথে আয়োজনে সঙ্গী হয়েছিলো ভ্রমণ বিষয়ক ওয়েবসাই ভ্রমণগুরু.কম, আউটডোর এডুকেশন নিয়ে কাজ করা রোপ ফোর, ঢাকার কেরাণীগঞ্জের ক্যাম্পসাইট ধলেশ্বরী ক্যাম্পিং ও কায়াকিং, অ্যাডভেঞ্চার গিয়ারর শপ “পিক সিক্সটি নাইন অ্যাডভেঞ্চার শপ”, অর্নামেন্টাল ফিশ শপ “নেচার একুয়াটিক্স” সহ বেশ কয়েকটি প্রতিষ্ঠান। এবার বান্দরবানে শেষ হলেও ভবিষ্যতে বড় ধরণের ইভেন্ট আয়োজনের প্রত্যয় ব্যক্ত করেছেন বিডি কায়াকার্স। বাংলাদেশে “ওয়াটার স্পোর্টস” এর প্রসার নিয়ে কাজ করা এ সংগঠনটি অচিরেই আরো কিছু ইভেন্ট আয়োজন করবে বলে জানিয়েছেন।

ফিচার ছবি: ফজলে রাব্বি

কক্সবাজার থেকে কুমিরের খামারে একদিন

কক্সবাজারের কাছে এ কুমিরের খামারে যাওয়ার ইচ্ছা ছিলো আমার। কিন্তু বাকিরা সৈকতেই থাকতে চায়। এর নের্তৃত্ব দিচ্ছে আমার ছেলে। তার বয়স তিন বছর, কিন্তু সে পানিতে অন্তত ৩/৪ ঘন্টা কাটিয়ে দেয়। তারপরও তাকে জোর করে তুলে আনতে হয়। অন্য কোন উৎসাহি দর্শক না পেয়ে একাই যাওয়ার সিদ্ধান্ত নিলাম।

সকাল বেলা আমার দুই ভাতিজা-ভাতিজীও আমার সাথে রওনা দিলো। কলাতলী মোড় থেকে আমরা উখিয়ার একটা সিএনজি নিলাম। লোকেশন বুঝিয়ে বলে আসা-যাওয়া আর ১ ঘন্টা থাকার জন্য ১,২০০ টাকায় চুক্তি করলাম। তখন কী আর জানতাম আমরা ৪ ঘন্টা থাকবো!মেরিন ড্রাইভ ধরে এগিয়ে উখিয়া হয়ে কুতুপালং টিভি টাওয়ারের কাছ থেকে বান্দরবানের রাস্তায় উঠলাম আমরা।

খামারে রয়েছে সব বয়সী কুমির ছবি লেখক

আকিজের রপ্তানীমুখী এ কুমিরের খামার আসলে বান্দরবানের শেষ প্রান্ত নাইক্ষ্যংছড়িতে। তবে যাতায়াত কক্সবাজার থেকেই সুবিধা। দেড় ঘন্টায় পৌছে গেলাম সেখানে।প্রবেশ ফি রাখা হয়েছে ৫০ টাকা করে। তবে সারা বছর খোলা থাকেনা। কুমিরের প্রজনন কালীন সময়ে এপ্রিল থেকে জুলাই মাস বন্ধ থাকে দর্শনার্থীদের জন্য। খোলা থাকে প্রতিদিন সকাল ৯টা থেকে বিকেল ৫ টা পর্যন্ত।

একেবারে বাচ্চা থেকে শুরু করে প্রাপ্ত বয়স্ক প্রায় ১,০০০ কুমির আছে এর মধ্যে। একদিনের বাচ্চাও চাইলে কামড় দিয়ে মানুষের হাতের আংগুল কেটে ফেলতে পারে। প্রাপ্ত বয়স্ক পুরুষ কুমির ১৬ ফিটের বেশি লম্বা আর ওজনে ১,০০০ কেজিরও বেশি হয়। বিভিন্ন বয়সী কুমির বিভিন্ন ব্লকে রাখা হয়েছে। দেখে মনে হয় ম্যানিকুইন চ্যালেঞ্জ খেলছে কুমিরগুলো এমনভাবে স্থির হয়ে থাকে। তবে নড়াচড়া টের পেলেই তেড়ে আসে হা করে, ভয়ংকর দেখতে।

পূর্ণ বয়স্ক কুমির লম্বায় ১৬ ফিট ও ওজনে ১,০০০ কেজির বেশি হতে পারে ছবি লেখক

সবচেয়ে দর্শনীয় জায়গা হচ্ছে খোল একটা জলা জায়গা আছে। সেখানে ৫০ টি প্রাপ্ত বয়স্ক কুমির ছাড়া আছে। দূর্ভাগ্য আমাদের, বৃষ্টির কারণে সব কুমির পানির নিচে যেয়ে বসে আছে। এর মধ্যে আমরা আড্ডা দিচ্ছি এখান দায়িত্বপ্রাপ্ত কর্মকর্তা আদনান ভাইয়ের সাথে। ভদ্রলোক বন্যপ্রাণী বিশেষজ্ঞ ও স্নেক রিসকিউয়ার। আগে থেকেই ফেইসবুকে উনার সাথে পরিচয় ছিলো। তবে বৃষ্টির মধ্যে উনার ডেরায় বসে বন্যপ্রাণী নিয়ে অনেক নতুন কিছু শিখে ফেললাম আমরা। বিশেষ করে বাচ্চার খুব খুশি, ডিসকভারি চ্যানেল লাইভ দেখছে তারা।

হঠাৎ করেই দৃশ্যটা চোখে পড়লো আমার। একটা কুমির অন্যটাকে মাথা দিয়ে প্রচন্ডভাবে সাইড কিক দিলো। তারপর আবার দূরে সরে যেতো লাগলো। আদনান ভাই ব্যখ্যা করলো আধিপত্য বিস্তার নিয়ে লড়াই চলছে। একবার শুরু হলে চলতে পারে তিনদিনও। একজনের মৃত্য বা হাল ছেড়ে দেয়া ছাড়া চলে এ লড়াই। অবশ্য তিনবার মার খেয়ে এক কুমির হাল ছেড়ে দিয়ে দূরে সরে গেলো।

সংগ্রহ করা কুমিরের ডিম হাতে বন্য প্রাণী বিশেষজ্ঞ আদনান আজাদ আসিফ ছবি লেখক

এর মধ্যে অসময়ে ডিম পেড়েছে একটা কুমির। তাই সেই ডিমগুলো এখন উদ্ধার করতে হবে। হ্যাচারী ছাড়া এখানে ডিম ফুটে বাচ্চা বের হবেনা। আমাকেও সঙ্গে নিয়ে গেলেন দেখার জন্য। ভয়ংকর দৃশ্য, সেই মা কুমির পাহারা দিচ্ছে ডিম। একজন কাছে যেতেই তাকে হা করে কামড় দিতে ছুটে আসলো। সামান্য দুটো বাঁশ দিয়েই কুমিরকে অসাধারণ দক্ষতায় সরিয়ে দিয়ে ডিম সংগ্রহ করা হলো। ভিডিও দেখতে পারেন পুরো দৃশ্যের ইউটিউবে: 

সাধারণত কুমির ৬০ টি পর্যন্ত ডিম পাড়ে। তবে এই কুমিরটি থেকে মাত্র ১৬ টা ডিম উদ্ধার করা সম্ভব হয়েছে। ব্যাখ্যা করে বুঝালেন আদনান ভাই। ঢালু জায়গায় ডিম পাড়াতে অধিকাংশ ডিম গড়িয়ে পড়ে গেছে, যেগুলো উদ্ধার করা সম্ভব না, এছাড়া কুমিরে উঠানামা ও ডিম সংগ্রহ করার সময়কার যুদ্ধে আরো কিছু ডিম ভেংগে গেছে।

খামারের পরিবেশে নোনা পানির কুমিরের ডিম ফুটে বাচ্চা বের হবেনা, সেকাজ হ্যাচারিতেই করতে হবে। কুমিরের ডিমের একেকটির দাম ধরা হয় এক লক্ষ টাকা। এর মধ্যে তিনটা ডিম দেখলাম যেগুলো হাল্কা ভেংগেছে আর ফুটবেনা, সেগুলো ভাজি করা শুরু করলো। অবাক হয়ে জানতে পারলাম এ ডিম ভাজি সবাই খেয়ে ফেলবে, আমাকে সাধলো খাবার জন্য।

পানিতে নি:শব্দে চলাফেরায় অভ্যস্ত মৃত্যদূত ছবি লেখক

এর মধ্যে পার হয়ে গেছে পুরো চারঘন্টা। তাই এ বেলা আদনান ভাইয়ের কাছে বিদায় নিয়ে রওনা দিলাম কক্সবাজার। দেড় ঘন্টায় আবার পৌছে গেলাম সুগন্ধা সৈকতে। তিন ঘন্টা বেশি থাকায় সিএনজিকে আরো তিনশ টাকা দিলাম।সতর্কতা: কুমিরের খামারে কুমিরকে কোন ধরণের উত্যক্ত করা যাবেনা। বোতল ছুড়লে বা কোন কিছু দিয়ে আঘাত করলে ১০,০০০ টাকা জরিমানা ধার্য করে রাখা আছে। এতে ভালোই কাজ হচ্ছে মনে হয়, একটা বোতলও দেখলামনা কুমিরের ডেরায়। প্লাস্টিক বোতল নিয়ে প্রবেশেই এ খামারে নিষিদ্ধ।

অনেকে লোকেশন বুঝতে পারছেন না, তাদের জন্য লোকেশন ম্যাপের লিংক দিলাম: https://goo.gl/maps/gzYDf8pHxetuS6CW8

যাতায়াত: কক্সবাজার শহর থেকে গাড়ি ভাড়া করে যেতে পারেন কুমিরের খামার। ঠিকমতো না চিনলে ড্রাইভারকে বলবেন কুতুপালং টিভি টাওয়ার থেকে বাম দিকে কয়েক কিলো যেতে হবে। গাড়ি ভাড়া পড়বে ২,০০০-৩,০০০ টাকা। মানুষ কম হলে সিএনজি রিজার্ভ করে নিতে পারেন, সেক্ষেত্রে খরচ পড়বে ১,২০০-১,৫০০ টাকা। এছাড়া ভেংগে ভেংগে যেতে পারেন। কলাতলী মোড় থেকে সিএনজি জনপ্রতি ১৫০ টাকায় উখিয়া পর্যন্ত যাবে। সেখান থেকে আলাদা সিএনজিতে কুমিরের খামারে আসা-যাওয়া অপেক্ষা সহ ২০০ টাকা নিবে। খামারে প্রবেশ ফি ৫০ টাকা। আশেপাশে কোন দোকান-পাট নেই, তাই দুপুরে খেতে হলে উখিয়া আসতে হবে।

ফিচার ছবি: লেখক

কক্সবাজার সেন্টমার্টিন সরাসরি জাহাজ চালু হচ্ছে ১১ তারিখ

কক্সবাজার থেকে সরাসরি সেন্টমার্টিন চলাচল করা একমাত্র জাহাজ কর্ণফুলী এক্সপ্রেস আবার যাত্রা শুরু করতে যাচ্ছে আগামী ১১ সেপ্টেম্বর শুক্রবার থেকেই। প্রতিবছর সাধারণত অক্টোবরের মাঝামাঝি বা শেষের দিক আবহাওয়া অনুকূলে থাকা সাপেক্ষে টেকনাফ থেকে সেন্টমার্টিনগামী জাহাজ চলাচলের অনুমতি দেয়া হয়। মার্চের শেষে বা এপ্রিলের মাঝামাঝি এসে বন্ধ রাখা হয় জাহাজ চলাচল। অবশ্য টেকনাফ থেকে সেন্টমার্টিন সারা বছরই ট্রলার চলাচল করে।

এবছর মার্চের প্রথম সপ্তাহে বাংলাদেশে প্রথম করোনা রোগী শনাক্ত হবার কিছুদিন পরে ১৯ই মার্চ বন্ধ ঘোষণা করা হয় সেন্টমার্টিন থেকে টেকনাফ ও কক্সবাজারগামী সব জাহাজ। ১৯ ই মার্চ জাহাজ দ্বীপে অবস্থানরত সমস্ত পর্যটকদের ফিরিয়ে নিয়ে আসে। এরপর থেকেই পাঁচ মাসেরও বেশি সময় বন্ধ থাকে সব ধরণের জাহাজ চলাচল। ট্রলার চললেও সেখানে কড়াকড়িভাবে নিয়ন্ত্রণ করা হয় পর্যটক বা অন্য কারো আসা-যাওয়া।

কর্ণফুলী এক্সপ্রেস জাহাজ চলে সরাসরি কক্সবাজার থেকে সেন্টমার্টিন

এসমস্ত ব্যবস্থার কারণে সারা দেশে করোনা ছড়িয়ে পড়লেও প্রথম তিন মাসে সেন্টমার্টিন দ্বীপে কোন করোনার রোগীর সন্ধান পাওয়া যায়নি। অগাস্ট মাসের মাঝামাঝি থেকেই পর্যটন খাতে জড়িত জনশক্তি ও ব্যবসা প্রতিষ্ঠানের ক্ষতি কমানোর পদক্ষেপ হিসেবে স্বাস্থ্যবিধি নিয়ে খুলে দেয়া হয় দেশের সব পর্যটন গন্তব্য। একমাত্র সেন্টমার্টিন ও সুন্দরবন এতদিন এ তালিকার বাইরে ছিল। সুন্দরবনের পর্যটনও শুরু হচ্ছে খুব তাড়াতাড়ি।

তবে সেন্টমার্টিনের জাহাজ চলাচল শুরুর বিষয়টা অপ্রত্যাশিতই বটে। সাধারণত অন্যান্য বছরে আবহাওয়া অনুকূলে না আসা পর্যন্ত জাহাজ চলাচলের অনুমতি দেয়া হয়না। কক্সবাজার থেকে সরাসরি সেন্টমার্টিন যাওয়ার পর্যটকদের দাবী ছিলো দীর্ঘদিনের। এবছরের শুরুতে এসে আলোর মুখ দেখে কর্ণফুলী এক্সপ্রেসের যাত্রা শুরু হওয়ার মাধ্যমে। তবে ভাড়া বেশি ও পুরণো জাহাজ মেরামত করে নতুনভাবে সাজিয়ে নামানোর কারণে অনেক পর্যটকই হতাশ হয়েছেন।

জাহাজের অভিজ্ঞতার ভিডিওটি নাফিজ হোসেইন করেছেন

২৭ জানুয়ারী ২০২০ এ চালু হওয়ার পর কর্ণফুলী এক্সপ্রেস প্রপেলার সংক্রান্ত জটিলতায় কিছুদিন বন্ধও ছিলো। এরপর ২০ ফেব্রুয়ারী থেকে নিয়মিতই চলাচল শুরু করে। টেকনাফ থেকে সেন্টমার্টিন চলাচল করা অন্য জাহাজের সাথে সেন্টমার্টিন এক্সপ্রেসের বড় ধরণের পার্থক্য রয়েছে। ফলে প্রথম থেকেই সারাবছর চালানোর লক্ষ্য নিয়েই নেমেছিলো জাহাজটি। করোনার কারণে বন্ধ থাকায় সেটা সম্ভব হয়নি।

বর্তমানে জাহাজটির কক্সবাজার থেকে আসা যাওয়ার জন্য নূন্যতম ভাড়া ধার্য করা আছে ২,০০০ টাকা। কক্সবাজারে নুনিয়ার ছড় বিআইডব্লিউটিসি ঘাট থেকে সকাল ৬:০০ টায় ছেড়ে মোটামুটি ৫ ঘন্টা সময়ে সেন্টমার্টিন পৌছায় এ জাহাজটি। একইভাবে বিকেল ৩ টায় ছেড়ে রাত ৮ টার দিকে কক্সবাজার পৌছায়। তবে জোয়ার-ভাটার পরিস্থিতি বিবেচনা করে এ সময়সূচীর পরিবর্তন হতে পারে। বিস্তারিত তাদের ফেইসবুক পেইজে পাবেন: https://www.facebook.com/karnafulyexpress/

Dhaka Office
+8801771575489, +880255040813, +8801870732596
Chittagong Office
+8801870732597, +8801870 732591, +8801870732599
Cox's Bazar Office
+8801870732590 , +8801870732592

ছবি ফেইসবুক পেইজ থেকে

কায়াকে করে ২২০ কিমি পাড়ি দেবার মহাপরিকল্পণা



নৌকা সদৃশ বাহন কায়াক। ব্যতিক্রম হচ্ছে কায়াকে যে কয়জন থাকবে তাদের নিজেকেই বৈঠা বেয়ে চালিয়ে নিয়ে যেতে হয়। সারা বিশ্বেই কায়াকিং একটি জনপ্রিয় পানির খেলা (ওয়াটার স্পোর্টস)। বাংলাদেশেও ধীরে ধীরে জনপ্রিয় হয়ে উঠেছে কায়াকিং। কাপ্তাই কায়াক ক্লাব, ধলেশ্বরী ক্যাম্পিং ও কায়াকিং, মহামায়া লেক কায়াকিং, সারি ঘাট কায়াকিং, রাতারগুল কায়াকিং সহ এখন কায়াকিং করা যায় অনেক জায়গায়। তবে এখনো একেবারেই নতুন বলা যায় এ অ্যাডভেঞ্চার স্পোর্টসকে।


সাধারণত ঘন্টা হিসেবে কায়াকিং করা হয়। এতে সাধারণ গতিতে চালালে ৫-৭ কিমি যাওয়া যায়। তবে এবার কায়াকে করে ২০০ কিমি পাড়ি দেবার মহাপরিকল্পণা করেছেন একদল অ্যাডভেঞ্চার প্রিয় মানুষ। বান্দরবানের থানচি উপজেলার দূর্গম তিন্দু ইউনিয়ন থেকে শুরু বর্ষায় বিক্ষুদ্ধ সাঙ্গুর অববাহিকা ধরে বঙ্গোপোসাগর পৌছানোর লক্ষ্য নিয়ে এ অভিযানের নাম দেয়া হয়েছে “The Great Sangu Expedition-Tindu to Bay of Bengal on Kayak"!

এরকম কায়াকে করেই পাড়ি সাঙ্গু পাড়ি দেবার পরিকল্পণা ছবি ভ্রমণগুরু

বর্ষায় সাঙ্গুর রুপ থাকে ভয়াবহ। শীতের সময় অসম্ভব শান্ত এ নদীতে জায়গায় জায়গায় হাটুজলও থাকেনা। তবে বর্ষার এ চেহারা পুরোপুরি পরিবর্তন হয়ে যায়। বৃষ্টির পানিতে নেমে আসা ঢলে ক্ষণে ক্ষণে রূপ পরিবর্তন করে প্রমত্তা খরস্রোতা এ নদী। সাধাণভাবে পার হতেই বর্ষাকালে বেগ পেতে হয় পর্যটকদের। আর এর স্রোতে ভেসে যেয়ে মৃত্যুর ঘটনাও কম নয়। হঠাৎ করেই হড়কা বানে নদীর পানি দ্রুত বেড়ে যায়, ছাপিয়ে যায় দুকূল। এমন ভয়ংকর খরস্রোতা পাহাড়ি নদীতে প্রতিদিন ৩০-৪০ কিলোমিটারের বেশি চালিয়ে যাওয়া সত্যিকার অর্থেই মারাত্মক চ্যালেঞ্জিং ব্যপার।

পথে পথে নদীর ধারেই হবে ক্যাম্পিং ছবি রাব্বি ভাই

সাঙ্গু ধরে বঙ্গোপোসাগর পৌছাতে বান্দরবান ও চট্টগ্রাম জেলা অতিক্রম করতে হবে। মোট ২২০ কিলোমিটার পাড়ি দিতে সময় লাগতে পারে ৬/৭ দিন। নদী পথে এ অভিযানে মোট ৭ টি দল (একটি সিংগেল কায়াক, বাকিগুলো ডাবল কায়াক) অংশগ্রহণ করবে। তাদের নিরাপত্তা ও উদ্ধারের কাজে নিয়োজিত থাকবে দুটি ইঞ্জিনচালিত নৌকা। এ অভিযানে সহযোগীতা করবে পিক ৬৯ অ্যাডভেঞ্চার শপ, রোপ ফোর, ধলেশ্বরী ক্যাম্পিং ও কায়াকিং, নেচার একুয়াটিকস এবং ভ্রমণগুরু

নিরাপত্তা ও উদ্ধার অভিযানে থাকবে এ ধরণের নৌকা

আগামী ১৮ ই সেপ্টেম্বর তিন্দু পৌছানোর মাধ্যমে অভিযানের শুরু হবে। সব কিছু ঠিকঠাক মতো চললে ২৪/২৫ সেপ্টেম্বর চট্টগ্রামে গহিরাতে এ অভিযান শেষ হবে। প্রতিদিন কায়াকিং শেষ করে সাঙ্গুর ধারে কোথাও ক্যাম্পিং করবে কায়াকিং দল ও তাদের সহযোগীরা। এ দলের সদস্যদের মধ্যে রয়েছেন হানিয়ুম মারিয়া রাকা ও সায়মন হোসেন। ২০১৯ সালে কায়াক চালিয়ে বাংলা চ্যানেল পাড়ি দিয়ে তারা পৌছে ছিলেন সেন্টমার্টিন। এছাড়া ফজলে রাব্বি ও হানিয়ুম মারিয়া রাকা দম্পতি তাদের বন্ধু আশরাফ সিদ্দীকিকে সাথে নিয়ে ঢাকা থেকে ভোলার চর কুকড়ি মুকড়ি ইনফ্ল্যাটেবল বোটে (হাওয়া ভরা নৌকায়) করে মাস খানেক আগে পাড়ি দিয়েছেন ৮০০ কিমি

ছবি ভ্রমণগুরু টিম



কিলিমানজারো ট্রেকিং তথ্য

0

শরৎচন্দ্রের “চাঁদের পাহাড়” বইটি কি কখনোও পড়েছিলেন? অথবা জনপ্রিয় এমিনেশ মুভি “মাদাগাস্কার ২: এসকেপ টু আফ্রিকা? সিম্বা কার্টুনটি দেখেছিলেন? সবুজে ঘেরা বনের উপর সাদা পর্বতের চূড়া দেখা যাওয়া পর্বতটির নামই চাঁদের পাহাড় খ্যাত ”মাউন্ট কিলিমানজারো”।

তানজানিয়ার পূর্ব প্রান্তে কিলিমানজারো পর্বতের অবস্থান। মূলত একটি অগ্নেয়গিরি কিলিমানজারো, যার মোট তিনটি কোন রয়েছে। এগুলো হচ্ছে কিবো, শিরা ও মাউনজি। এর মধ্যে কিবো সবচেয়ে বেশি উচু। আরও একটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হচ্ছে একমাত্র কিবোই এখনও বেঁচে আছে, কিন্তু সুপ্ত অবস্থায় আছে। শিরা ও মাউনজি দুটোই মৃত। ধারণা করা হয় এ অঞ্চলে সর্বশেষ অগ্নুৎপাত হয় ১.৫-২ মিলয়ন বছর আগে। শিরার উচ্চতা ৪,০০৫ মিটার (১৩,১৪০ ফুট) আর মাউনজির উচ্চতা ৫,১৪৯ ফুট (১৬,৮৯৩ ফুট)। মাউনজির সাথে কিবোর দূরত্বটা দেখার মত, প্রায় ১১ কিমি। ভূমিক্ষয়ের কারণে এদুটোকে আলাদা পর্বত বলে মনে হয়। মাউনজি পুরোটায় পাথুরে, যার নবীনতম পাথরের বয়সও ৪৫০,০০০ লক্ষ বছরের বেশি। পাথরের এই প্রান্তটায় সাধরণত কেউ উঠেনা। দূর থেকে দেখে আমার কাছে মনে হয়েছে মাউনজি হতে পারে রক ক্লাইম্বারদের স্বপ্নের গন্তব্য। শিরার মাথা ভেংগে এটার উচ্চতা কমার কারণে এখন আর আকর্ষণ নেই। আর দূর্গম পাথুরে মাউনজিতেও আজকাল কেউ আর উঠতে যায়না। তাই সব আকর্ষণের কেন্দ্রবিন্দু কিবো।

কিলিমানজারো পর্বতটি বিভিন্ন কারণে বিখ্যাত ও পর্বতারোহীদের স্বপ্নের গন্তব্য। প্রথমত, কিলিমানজারো আফ্রিকার সর্বোচ্চ পর্বত। কিবোর চূড়া উহুরু পিক এর উচ্চতা ৫,৮৯৫ মিটার বা ১৯,৩৪১ ফিট। এটিকে আফ্রিকার ছাদও বলা হয়ে থাকে। এছাড়া এ পর্বতটি একাকি দাঁড়িয়ে থাকা পর্বতগুলোর মধ্যে সর্বোচ্চ পর্বত। সাত মহাদেশের সাত টি সর্বোচ্চ পর্বতের মধ্যে আফ্রিকা মহাদেশের প্রতিনিধি কিলিমানজারো। যারা ”সেভেন সামিট” সম্পন্ন করেন তাদের জন্য এ পর্বতে না যেয়ে উপায় নেই। সেভেন সামিট মানে সাত মহাদেশের সাত সর্বোচ্চ পর্বতে আরোহণ। একমাত্র বাংলাদেশি হিসেবে এই দু:সাধ্য কাজটি সম্পন্ন করেছেন ওয়াসফিয়া নাজরীন।

সৌন্দর্যও টা অনেক গুরুত্বপূর্ণ বিষয়। প্রথমে বন দিয়ে শুরু এই পর্বতের পরতে পরতে সৌন্দর্য ছড়িয়ে ছিটিয়ে আছে। প্রতি দুই হাজার মিটার পর পর এর প্রকৃতিও অনেক পরিবর্তন হতে থাকে। ম্যাটন বনের পর আসে মুরল্যান্ড, তারপর পার্বত্য মরুভূমি এবং সবশেষে আর্কটিক জোন। সবুজ বনের উপর মাথা ‍উঁচু করে দাঁড়িয়ে থাকা পর্বতের এ চূড়া যে কোন পর্বতপ্রেমীকে চম্বুকের মত টানে। আর সে কারণেই সারা বিশ্ব থেকে ছুটে আসে পর্যটকেরা। প্রতিবছর অন্তত ৩৫,০০০ পর্যটক কিলিমানজারো পর্বতে উঠার জন্য আসে, যার অর্ধেকেই সামিট করতে পারেনা। তাই পর্যাপ্ত প্রস্তুতি নিয়ে তবেই আসবেন। তানজানিয়া সরকারের অন্যতম লাভজনক জাতীয় ‍উদ্যান “কিলিমানজারো ন্যাশনাল পার্ক”, যেটা থেকে আয় হয় ৫০ মিলিয়ন ডলার। টাকার অংকে সেটা ৪০০ কোটি টাকা। তানজানিয়ার মাত্র একটি জাতীয় উদ্যানের আয় এর চেয়ে বেশি।

কিলিমানজারো ট্রেক করা কিন্তু বেশ খরচের ব্যপার। এর প্রধান কারণ হচ্ছে তানজানিয়া সরকারের আরোপিত ন্যাশনাল পার্ক ফি ও গাইড না নিয়ে ঢুকতে না পারা। ৫/৬ দিনের ট্রেকের জন্য ন্যাশনাল পার্ক কর্তৃপক্ষকে ফি দিতে ৮০০ ডলার (প্রায় ৭০,০০০ হাজার টাকা)। গাইড, কুক, পোর্টার সহ এ খরচ চলে যায় ২,০০০ ডলারের কাছাকাছি। এ ছাড়া বাংলাদেশ থেকে গেলে বিমান ভাড়া পরে প্রায় ২,০০০ ডলারের মতই। খরচ কমাতে তাই বিমান ভাড়ার ছাড়ের অপেক্ষা করা ছাড়া সহজ কোন পথ নেই। মোটামুটি বাংলাদেশি টাকায় সব মিলে খরচ পড়বে চার লাখ টাকার মত।  বাংলাদেশ থেকে প্রথম এ পর্বত সামিট করতে সক্ষম হন মুসা ইব্রাহিম ও নিয়াজ মোর্শেদ পাটোয়ারি ২০১১ সালে। আমার জানামতে এ পর্যন্ত ৬ জন বাংলাদেশি এ পর্বত সফলভাবে সামিট করতে সক্ষম হয়েছেন। এছাড়া রেশমা নাহার রত্না এ পর্বত জয়ের লক্ষ্যে এ সপ্তাহে বাংলাদেশ ছেড়েছেন। তিনি মাউন্ট কেনিয়া ও মাউন্ট কিলমানজারো সামিট করবেন।

বেশ কয়েকটি রাউট ধরে কিলিমানজারোতে উঠা যায়। তার মধ্যে রয়েছে রংগাই রাউট, মাসামে রাউট, লেমোশো রাউট, শিরা রাউট ও নর্দান সার্কিট রাউট। এছাড়া মেউকা রাউট নামে আরেকটি রাউট আছে যেটা মূলত পর্বত থেকে নামার কাজে ব্যবহার করা হয়। এ রাউটগুলোর মধ্যে সবচেয়ে সহজ হচ্ছে রংগাই রাউট যেটা ৭ বা ৮ দিনে শেষ করা যায়। এজন্য এটাকে কোকাকোলা রাউট বলে। আর সবচেয়ে সুন্দর রাউট বলা হয় মাসামে রাউটকে। তুলনামূলক ভাবে কঠিন হওয়াতে একে হুইস্কি রাউটও বলে। সময় লাগে ৬/৭ দিন। অধিকাংশ পর্বতারোহী বেছে নেন মাসামে রাউটকেই।

অধিকাংশ রাউটে প্রতিদিন নির্ধারিত ১০-১১ কিমি ট্রেক করে পরবর্তী ক্যাম্পে পৌছাতে হয়। এছাড়া এমনভাবে রাউটগুলো তৈরী করা হয়েছে যাতে একজন পর্বতারোহী সঠিক ভাবে এক্লিমাইটাজেশন করে নিজের শরীরকে পর্বতে উচ্চতার সাথে খাপ খাইয়ে নিতে পারে। তবে মনে রাখতে হবে ৩,০০০ মিটারের কোন পর্বতে না যেয়ে এধরণের পর্বতে উঠার ঝুকি নেয়া ঠিক হবেনা। এক্ষেত্রে কিলিমানজারো যাওয়ার আগে অন্তত ভারতের সান্দাকফু ঘুরে এসে দেখতে পারেন পর্বতে আপনার উচ্চতা জনিত কোন সমস্যা দেখা দেয় কিনা। শতকরা ৫০ ভাগেরও বেশি লোক এ পর্বতে কোন না কোন উচ্চতা জনিত অসুস্থতায় ভোগে।

হাই অল্টিচিউড পর্বতের প্রায় সব গিয়ারই এ পর্বতে লাগে। বিশাল লম্বা তালিকা, যার অনেকগুলোই পর্বতারোহীদের থাকে। না থাকলেও কোন সমস্যা নেই, ১৫০ ডলারের বিনিময়ে সবকিছুই সেখানে ভাড়া পাওয়া যায়। তবে তাঁবু নিতে হবেনা, যে এজেন্সীর সাথে যাবেন তাঁবু ও খাবারের ব্যবস্থা তারাই করবে। মোটামুটি দুটো ব্যাগ নিবেন যার একটি ডে প্যাক হতে হবে (২০-২৫ লিটারের)। আর ডাফল ব্যাগের বাকি সরঞ্জাম পোর্টার বহন করবে।

বাংলাদেশে তানজানিয়ার দূতাবাস না থাকায় ভিসা পাওয়াটাই একটি বড় সমস্যা। এক্ষেত্রে ভারতে দিল্লীতে অবস্থিত তানজানিয়ান দূতাবাস থেকে ভিসা সংগ্রহ করতে পারেন। এছাড়া কেনিয়াতে বাংলাদেশি পাসপোর্টে অন এরাইভাল ভিসা পাওয়া যায়, সেখানে নেমে বাইরোডে তানজানিয়ার বর্ডারে আসলে কিলিমানজারো বা সাফারি বুকিং থাকলে তারা অন এরাইভাল ভিসা দিয়ে দেয়।

আমি ট্রেকিং করেছিলাম ট্রেকিং ও সাফারি অ্যাডভেঞ্চার নামের একটা এজেন্সীর সাথে। আর কোন তথ্য জানার দরকার থাকলে বা যেতে চাইলে তাদের সাথে যোগাযোগ করতে পারেন:

Trekking and Safari Adventure

Cell : +255 672 475 320

Email : info@trekkingandsafariadventures.com

Address : Po Box 1884 Moshi, Tanzania.

মসজিদের শহর খলিফাতাবাদ: খান জাহান আলীর মাজার

ভোর হল দোর খোল খুকুমনি উঠোরে। খুকুমনিরা উঠে গেলেও ঘুম ভাঙ্গে না ওয়াফি মনির। সেই সাতটা থেকে গুতিয়ে যাচ্ছি জগৎ পিতা, সে কি কোন মিতার স্বপ্ন দেখেই শেষ পর্যন্ত উঠলো। যাই হক ওয়াফি মনি উঠার পর ফ্রেশ হয়ে সকালের নাস্তা সেরে রওনা হলাম খলিফাতাবাদ শহরের প্রথম নিদর্শনের খোঁজে। বাগেরহাট বাস স্ট্যান্ডের সামনে থেকেই উঠে বসলাম অটোতে। সেই অটো নামিয়ে দিবে আমাদের খান জাহান আলীর মাজারের সামনে।

অটো ছুটে চলছে প্রাচীনের খোঁজে নতুনের মাঝে। সেই পথে ছুটার মাঝেই যে কত মায়া লুকিয়ে আছে তা ধরা দেয় পরিব্রাজকের পাখির চোখে। পথ দেখায় পথের প্রেম। দেখা যায় কত অদ্ভূতুড়ে লোক, এ পথেই যে জ্ঞান, এ পথেই আশা পরিব্রাজকের ভালোবাসা। তাই কি পরিব্রাজকের ললাটে নেই মায়াবতির প্রেম। সকাল সকাল সেন্টুর সাগরে ভেসে খান জাহান আলীর গেটে মামা আমাদের নামিয়ে দিল হেসে হেসে।

গেটের সামনে দাঁড়িয়ে দুই পথিক। ছবি: লেখক

গেট দিয়ে ভিতরে ঢুকে দেখতে পেলাম সাধক পুরুষের শেষ ঠিকানা। এখানেই চির নিদ্রায় আচ্ছন্ন আছেন খলিফাতাবাদের স্বপ্নদ্রষ্টা। গৌড়ের সুলতান নাসিরউদ্দিন মাহমুদ শাহ ঘনিষ্ট বন্ধু ছিলেন খান জাহান আলী। আর সেই বন্ধুর উপর বিশ্বাস রেখেই তো খলিফাতাবাদের ভিত্তি স্থাপনে সায় দেন। সেই স্বপ্নদ্রষ্টার হাত ধরেই সৃষ্টি হয় নগর খলিফাতাবাদ। ৩৬০ জন আউলিয়ার আগমনের সংখ্যার সাথে মিলে রেখে এ শহরে ৩৬০টি মসজিদ ও ২৬০ দীঘি খনন করা হয়।

কালের পরিক্রমায় সবই ভূগর্ভ গ্রাস করেছে। টিকে আছে গুটি কয়েক। আর সেই ঠাকুর দিঘীর পাশেই সমাধিত হয়েছে সাধক পুরুষ। কিংবদন্তি বলে এই ঠাকুর দিঘীতেই এক কালে কালা পাহাড় ও ধলা পাহাড়ের বাস ছিল। এই দুই কুমির ছিল খান জাহান আলীর সময়ের। তবে এর কোন ঐতিহাসিক ভিত্তি পাওয়া যায়নি।

ঠাকুর দীঘির সামনে মানুষের ভিড়। ছবি: লেখক

এক ঝলক পিছে তাকিয়ে মাজারটা দেখতে লাগলাম। বর্গাকৃতি সমাধিসৌধটি খননের সময় উত্তলিত পদার্থ দিয়ে পাড় তৈরি করে তার উপর সমাধি সৌধটি তৈরি করা হয়েছে। সমাধিটি এক গম্বুজ বিশিষ্ট এবং এর প্রাচীর ফুট উঁচু। ১৮৮৬ সালের নথিভুক্ত সূত্র থেকে জানা যায় যে এই সমাধির মেঝে নীল, সাদা, হলুদ ছাড়াও বিভিন্ন রঙের ষড়ভুজাকৃতির টালি দ্বারা আচ্ছাদিত ছিল।

কাল পাথরের তিন ধাপে সাজিয়ে কবর তৈরি করা হয়েছে। পবিত্র কোরআন শরীফের আয়াত পার্সিয়ান ও আরবি ভাষায় কবরের আশেপাশে লেখা রয়েছে। ধর্ম কর্ম প্রচারের থেকে অবসরের পর এখানেই তার বাকি জীবন কাটে তাই ১৪৫৯ সালের ২৫ অক্টোবর মৃত্যুবরণের পর এখানেই তাঁকে সমাহিত করা হয়। খান জাহান আলীর মাজারের পাশেই আছে পীর আলীর মাজার। যিনি ছিলেন খান জাহান আলীর একান্ত সহযোগী।

মেলার সময় মাজার প্রাঙ্গন। ছবি: লেখক

ওয়াফি আহমেদের ছবি তোলার নেশা জাগিলো, সিন্দাবাদের ভূতের মত সেই নেশা একেবারে লালদিয়া বন থেকে তাড়া করে আসছে। যাই হক দেখার শেষ নেই ছবি তোলার ও শেষ নেই। আমার মাজার প্রাঙ্গন থেকে এসে পড়লাম ঠাকুর দীঘি। প্রায় ২০০ বিঘা জুড়ে বিশাল দীঘি। চারপাশে গাছপালার মাঝে বিশুদ্ধ অক্সিজেনে নির্যাস চাষ হয়। তারই হীম শীতল বাতাসে স্পর্শে ভুলিয়ে দেয় যেন পথের ক্লান্তি। দীঘির শান্ত জল রেখে যায় কত ইতিহাস।

গ্রাম্য মেলা। ছবি: লেখক

দীঘির নাম ঠাকুর দীঘি কিভাবে হল। এই নাম নিয়েও আছে কিংবদন্তি। কিংবদন্তি কোন ইতিহাস নয়। তবে যেন ইতিহাসের পাশাপাশি এক হাত ধরেই চলে। এক বুজুর্গের কাছে শুনতে পেলাম হিন্দু ঠাকুরের মূর্তি এই দীঘির তলদেশ থেকে উপরে উঠে এসেছিল একদা, তা দেখে নামকরণ হয় ঠাকুর দীঘি। আবার আর একজনের মুখে শুনলাম খান জাহান আলীকে সনাতনীরা শ্রদ্ধা ভরে ঠাকুর বলে ডাকতো। খান জাহান আলীর বিশেষ তত্ত্বাবধানে এ দীঘি খনন করা হয় বলে দেশীয় হিন্দুরা ভক্তি দেখিয়ে এই দীঘিকে ঠাকুর দীঘি বলতো। আমরা ৫০০ বছর আগে হিন্দু মুসলিমদের যে ভাতৃত্ব দেখেছি এই আধুনিক সমাজে দিন দিন যেন তা উবে যাচ্ছে।

স্টলে ব্যস্ত গ্রাহক। ছবি: লেখক

কিংবদন্তি এখানে শেষ হয়ে গেলেও কথা ছিল। তবে কিংবদন্তি যেন আজ আমাদের শুনাতে চায় তার দুঃখ। অন্য সূত্রে থেকে জানা যায় পীর আলী মোহাম্মদ তাহের ছিলেন খান জাহানের প্রিয়তম বন্ধু। তিনি পূর্বে ব্রাহ্মণ ছিলেন। ইসলামের ছায়াতলে আসার আগে শ্রী গোবিন্দ লাল রায় নামে পরিচিত ছিলেন। খান জাহান আলী তাঁকে আদর করে ঠাকুর বলে ডাকতেন। তাঁর স্মৃতি রক্ষার্থে তিনি এ দীঘির নাম দেন ঠাকুর দীঘি। মরণের পর দুই বন্ধু শায়িত আছে একই আঙ্গিনায়।

হরেক রকম মিষ্টি। ছবি: লেখক

কিংবদন্তির জগৎ থেকে এবার বাস্তবে ফিরার পালা। এই শান্ত সকালের দীঘির পাড়ে মানুষের ভিড়। কপোত-কপোতিরা ধর্মীয় কুসংস্কারের ভিড়ে যেন লাগিয়েছে অধর্মের আগুন। পৌড় দম্পত্তির গজ গজ করে অভিশাপ দেওয়াই যেন হাওয়ায় হাওয়ায় যুগ বদলের বার্তা পৌঁছে দেয়। কালা পাহাড় ধলা পাহাড় নেই তবে ভণ্ড মাজার ব্যবসা তো বন্ধ নেই। এসেছে নতুন কুমির। আর সেই কুমিরের উদ্দেশ্য হাঁস, মুরগি, ভেড়া, খাসিসহ নানা ধরনের মানতের পশু উৎসর্গ করছে ভীরু ধার্মিক। ভীরুই বটে না হয়ে কিভাবে এই কুসংস্কার একবিংশ শতাব্দিতে এসেও রটে। তাই তো ধর্ম ভীরু থেকে ভীরু ধার্মিকের সংখ্যাই এখানে বেশি।

ঠাকুর দীঘি। ছবি: লেখক

আর তাদের মাঝে পাপের উত্তাপ ছড়াতে হাজির হয় আশেপাশের স্কুল কলেজ পড়ুয়া মেয়ে ছেলের দল। আহা একই প্রাঙ্গনে কত ধরনের মানুষ। দীঘির প্রধান ঘাটটা বেশ প্রশস্ত ও সুন্দর। বেগানা নারীদের জন্য আবার আলাদা ঘাট আছে। এর মধ্যে বাবা টাইপের কাউকে বলতে শুনলাম এই দীঘির পানি পান করলে রোগ নিরাময় হয়। এ যেন ভণ্ড মজিদের প্রতিচ্ছবি। আহা লাল সালু এভাবেই কি যুগে যুগে ফিরে আসে আমাদের মাঝে। রোদের তাপ বাড়ছে আমরা আগালাম নতুন গন্তব্যের উদ্দেশে।

আমার পুরানো ভ্রমণ গল্পগুলো পড়তে চাইলে নিচের লিংকে চলে যান:
https://www.vromonguru.com/author/ashik/

আমার গল্প, কবিতা, প্রবন্ধ পড়তে চাইলে ঘুরে আসতে পারেন আমার ফেসবুক পেজ থেকে:
https://www.facebook.com/sarwar.ashik786

এর বাহিরেও আমাদের নিজস্ব ভ্রমণ গ্রুপ শেকড় সন্ধানীর মাধ্যমে নিয়মিত এ রকম বাংলার পথে ভ্রমণের আয়োজন করা হয়। ইচ্ছা থাকলে পাঠক আপনিও হতে পারেন আমাদের পরবর্তী ভ্রমণের সঙ্গী। আমাদের সাথে যোগাযোগের বিস্তারিত নিচে দেয়া হলো।

Roots Finder – শেকড় গ্রুপের সাথে থাকুন:
https://www.facebook.com/groups/459880764416865/

Roots Finder – শেকড় পেজ লিঙ্ক:
https://www.facebook.com/rootsfinder.bd/

শেকড় সন্ধানী দলের এডমিনদের নাম্বার:
ঈসমাইল হোসেন – ০১৭৫৬১৭১৫৭০
আশিক সারওয়ার – ০১৮৬৬৬৬৩৪২৩
শরীফ জামান – ০১৫৩৫৪৫৩৯৭৭

ঘুরেন দেশের পথে, খুঁজে ফিরুন নিজের শেকড়।

মসজিদের শহর খলিফাতাবাদ: ঐতিহ্যের শহর

রায়েরকাঠি জমিদার বাড়ি দেখে আমরা পিরোজপুর বাস স্ট্যান্ডে দাঁড়িয়ে আছি। বরিশাল বিভাগ থেকে এবার প্রবেশ করবো খুলনা বিভাগে। আর প্রাচীন শহর খলিফাতাবাদ আমাদের জন্য অপেক্ষায় বসে আছে। খান জাহান আলীর শহর, ইউনেস্কো বিশ্ব ঐতিহ্যে যার নাম জ্বলজ্বল করছে। সেই শহরের হাতছানি কে উহ্য রাখি। শহর সঙ্গী সদা অস্থির ওয়াফি আহমেদ যেন মালাই চায়ের মাঝের ঐতিহ্যের সর খুঁজে বেড়াচ্ছে। এর মধ্যেই বাগেরহাটের বাস এসে গেল। আমরা এক মুহূর্ত দেরি না করে উঠে পড়লাম বাসে।

দীঘির ধারে ওয়াফি। ছবি: লেখক

বাসে ছুটে চলছে তার আপন গতিতে পিছে পিরোজপুরের মায়া ছেড়ে। হেডফোনে বাজছে আর্টসেলের আমার পথ চলা গান। যেন বেলা শেষে আকাশ কার মোহে দেখিয়েছিল নতুন দিনের স্বপ্ন। বাসটা কানায় কানায় পরিপূর্ণ। নেই শ্বাস ফেলার জায়গা। ভ্যাপসা গরমের মাঝেও মানুষ কিভাবে নাক ডেকে ঘুমায় পাশে ওয়াফি আহমেদ না থাকলে হয়তো জানতেই পারতাম না। আমি চলে গেলাম আধো তন্দ্রা, আধো ঘুমু ঘুমু জাগরনের জগতে। বাসের সামনে সিটে জেন জন মরিসন বসে আছে আমাকে রাইডার অফ স্ট্রর্ম শুনাতে। একি মোর কল্পনা, নাকি অন্য ভুবনে বিচরণ।  

খলিফাতাবাদের কিছু নিদর্শণ। ছবি: লেখক

এক ঘণ্টার পথ পারি দিয়ে যখন বাগেরহাট পৌঁছালো আমাদের বাস তখন রাতের লেনদেন নিয়ে বসে ছিল বনলতা সেন। বাগেরহাটে এসে বনলতাকে খুঁজা তো অলীক স্বপ্ন। তবে বাংলাদেশের আগুন সুন্দরিদের বাস যে খুলনায় তা এই রাতের আধারেও টের পাচ্ছি, এবার হ্যালুসেনেশন নয়। কোমড় ছুই ছুই চুল, কাজল চোখের মেয়ে শেষ আমি কবে দেখেছি। তবে আমার সব ভাবালুতা মাঠে মারা যায় বেরশিক ওয়াফির কারণে। আশিক চলেন মালাই চা খাই।

চা পর্ব শেষে সেই চিরাচরিত হোটেল আলামিনেই ঠাই হল আমাদের। এর আগে তিন চার বার আসা পড়েছে বাগেরহাট বিভিন্ন কারণে, শেষ এসেছি মার্চ মাসে। সে সময় উঠা পড়েছিল হোটেল আলামিনে। দেরি না করে সাময়িক বাসস্থানে এসে গা এলিয়ে দিলাম। সারাদিনের ক্লান্তি জাকিয়ে বসেছে দেহে। ধীরে ধীরে লম্বা শাওয়ার সেরে দুজন নামলাম রাতের শহরে।

মাটির ফলক। ছবি: লেখক

এই তো খান জাহান আলীর বাগেরহাট, হারিয়ে যাওয়া ঐতিহ্যের শহর নগর খলিফাতাবাদ। বিলুপ্ত শহরের খুঁজতে এসেছি আজ ইতিহাসের শিকড়। তৎকালীন সময় বাগেরহাটের পশ্চিমে একটি অংশ জুড়েই ছিল নগর খলিফাতাবাদ। শাহী বাংলায় এই শহর পুদিনার শহর হিসাবেই বেশ পরিচিত। তবে এর সাথে পুদিনা গাছের কোন সম্পর্ক আছে কি না জানা যায়নি। তুর্কি সেনাপতি একাধারে ধর্ম প্রচারক খান-ই-জাহান ১৫ শতকের শুরুর দিকে গড়ে তুলে এই ঐতিহ্যের শহর। ফোর্বস ম্যাগাজিনের হারিয়ে যাওয়া ১৫টি শহরের লিস্টে ছিল এই নগর খলিফাতাবাদ।

এক সময় সুন্দরবনের অংশ ছিল এই শহর। এখন গঙ্গা এবং ব্রহ্মপুত্র নদীর মিলনস্থানে এই শহরের অবস্থান। উপকূল থেকে ৬০ কিলোমিটার দূরে। নদীর গতিপথ পরিবর্তন হয়ে বর্তমান খলিফাতাবাদ আজ বহুদূরে হলেও শহরটি তো আর টিকে নেই। তবে টিকে আছে খান জাহান আলীর তৈরি শেষ নির্দশণ। যা সাক্ষ্য দেয় এক সমৃদ্ধ জনপথের। ষাট গম্বুজ মসজিদ, খান জাহান আলীর মাজারসহ আছে সিংগার, রনবিজয়পুর, বেবী বেগনিসহ আর কিছুই স্থাপত্যশৈল্য। ঘন জঙ্গল আর বাঘের কথা মাথা রেখে অসাধারণ কাঠামোয় গড়ে তুলেছিল এই শহর। কালের বির্বতনে জঙ্গলে হারিয়েছে পামগাছে ঘেরা কৃষিজমির মাঝে।

নান্দনিক নকশা। ছবি: লেখক

তখন দিল্লীর সালতানাতে আসন জাকিয়া বসেছিলেন সুলতান নাসির আলদীন মাহমুদ শাহ। ১৫শ শতাব্দিতে সুলতানের একজন প্রশাসক উলুঘ খান জাহান হাত ধরে প্রতিষ্ঠিত হয় এই শহর। খান জাহান আলী এ শহরের রাস্তা, সেতু এবং পানি সরবরাহের ব্যবস্থা করেন। ঘোড়াদিঘী ও দারগাদিঘী নামক দুটি বিশাল পুকুর এই পরিকল্পিত শহরের অংশ ছিল। অনেকগুলো মসজিদ, মাজার, প্রাসাদ তার দক্ষ শাসন আমলেই নির্মিত হয়।

নির্দশণ। ছবি: লেখক

রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক কারণে দিল্লীর সালতানাত ভারতবর্ষ থেকে সুদূর এই বঙ্গে প্রচার করতে চেয়েছিলেন ইসলাম ধর্ম। এই দুঃসাধ্য কাজের জন্য উলুঘ খান জাহানকে বঙ্গদেশে প্রেরণ করা হয়। দক্ষিণ বাংলায় প্রশাসক হিসাবে অসাধারণ দক্ষতায় এই অঞ্চলের মানুষদের নিয়ে আসেন ইসলামের ছায়াতলে। তার প্রশাসনিক অঞ্চল তৎকালীন ঝিনাইদহ, সাতক্ষীরা, পটুয়াখালি এবং বরিশাল নিয়েই গড়ে উঠেছিল। তিনি ছিলেন একাধারে পীর, সাধক পুরুষ, দক্ষ প্রশাসক ও ধর্ম প্রচারক। তবে বাংলার জনগণের সাথে এভাবে তিনি মিশে গিয়েছিলেন মনে হয়নি তিনি এখানে কোন রাজ কর্মচারি হিসাবে এসেছেন তাই তো এত বছর পর খান-ই-জাহানের নাম শ্রদ্ধার সাথে উচ্চারণ হয়। 

ঐতিহ্য। ছবি: লেখক

স্থাপত্য বিষয়ে তার জ্ঞানের জন্যও তিনি ছিলেন সমাধিক পরিচিত। তার স্থাপত্য রীতিতে এই খলিফাতাবাদ শহর গড়ে উঠেছিল। খলিফাতাবাদের পরিকল্পনায় ইসলামিক স্থাপত্য রীতির প্রভাব তীব্রভাবে লক্ষ্য করা যায়; বিশেষ করে মসজিদের কারুকার্যে মুঘল এবং তুর্কী স্থাপত্যরীতির ছাপ আর্কষিত করে পর্যটকদের। এই শহরে ছিল ৩৬০টি মসজিদ, সরকারি ভবন, গোরস্থানসহ যোগাযোগের জন্য ছিল সেতু ও সড়ক। সুপেয় পানি পান করার জন্য ছিলা জলাধার।

এই সেই কালা পাহাড়। ছবি: লেখক

বিশেষ করে মসজিদগুলোর অধিকাংশের নকশা ছিল সম্পূর্ণ ভিন্নধর্মী ও স্বতন্ত্র। ১৮৯৫ সালে এলাকাটি পরীক্ষা নিরিক্ষা করে ব্রিটিশ রাজ এরপর ১৯০৩-০৪ সালের দিকে ষাট গম্বুজ মসজিদ পুনরুদ্ধার কাজ দৃশ্যমান হয়। ১৯০৮ সালে ছাদের এবং ২৮টি গম্বুজ পুনরুদ্ধার করা হয়। ১৯৮৩ সালে খলিফাতাবাদের নাম উঠে যায় বিশ্ব ঐতিহ্যে। আর এই ষাট গম্বুজের খ্যাতি ছড়িয়ে যায় বিশ্বব্যাপী। সিটি অফ মস্ক, খান জাহান আলীর শহর পরিণত হয় ঐতিহ্য অন্বেষণকারীর জন্য স্বর্গরাজ্য। শুধু কি ষাট গম্বুজ আশেপাশে আবিষ্কৃত হয় আরও দশটি মসজিদ। যা বেশির ভাগ খান জাহান আলীর সময়ের। কিছু মসজিদ তাঁর মৃত্যুর পর স্থাপত্যরীতি অনুযায়ি তৈরি করা হয়।

দুই পীরের মাজার। ছবি: লেখক

রাতের বাগেরহাট মনে হয় এই শহরের কাব্য শুনাতেই বসে ছিল। কাব্যের গদ্য যে আকাশের চাদের মতই ঝলসানো রুটি হয়ে গেছে। ছুছো দৌড়াচ্ছে পেটে। দেরি না করে চলে এলাম মুসলিম হোটেলে। যা বাস স্ট্যান্ডের আশেপাশে সব থেকে ভাল খাবার হোটেল। এর আগেরবার বাগেরহাটে এসে ভয়াবহ অভিজ্ঞতা হয়েছিল খাওয়া নিয়ে। তা না হয় উহ্য থাকুক। 

আমার পুরানো ভ্রমণ গল্পগুলো পড়তে চাইলে নিচের লিংকে চলে যান:
https://www.vromonguru.com/author/ashik/

আমার গল্প, কবিতা, প্রবন্ধ পড়তে চাইলে ঘুরে আসতে পারেন আমার ফেসবুক পেজ থেকে:
https://www.facebook.com/sarwar.ashik786

এর বাহিরেও আমাদের নিজস্ব ভ্রমণ গ্রুপ শেকড় সন্ধানীর মাধ্যমে নিয়মিত এ রকম বাংলার পথে ভ্রমণের আয়োজন করা হয়। ইচ্ছা থাকলে পাঠক আপনিও হতে পারেন আমাদের পরবর্তী ভ্রমণের সঙ্গী। আমাদের সাথে যোগাযোগের বিস্তারিত নিচে দেয়া হলো।

Roots Finder – শেকড় গ্রুপের সাথে থাকুন:
https://www.facebook.com/groups/459880764416865/

Roots Finder – শেকড় পেজ লিঙ্ক:
https://www.facebook.com/rootsfinder.bd/

শেকড় সন্ধানী দলের এডমিনদের নাম্বার:
ঈসমাইল হোসেন – ০১৭৫৬১৭১৫৭০
আশিক সারওয়ার – ০১৮৬৬৬৬৩৪২৩
শরীফ জামান – ০১৫৩৫৪৫৩৯৭৭

ঘুরেন দেশের পথে, খুঁজে ফিরুন নিজের শেকড়।

ফিচার ইমেজঃ বাবলি চাকমা।

মারায়নতং চূড়ায় অতৃপ্ত সূর্যোদয়: চান্নি পসর রাইতে প্রস্থান

সারাদিন মেঘ বৃষ্টির লুকোচুরির পরে এখন বৃষ্টি কিছুটা থেমেছে। এখনো ক্ষণে ক্ষণে মেঘের উড়াউড়ি চলছে। তবে বৃষ্টি নেই অনেক সময় হলো। হঠাৎ মেঘ কেটে গিয়ে আকাশ অনেকটা পরিষ্কার মনে হলো। ফুরফুরে হাওয়া বইছে দক্ষিণ দিক থেকে। সন্ধ্যে এখনো নামেনি। তবে সূয্যি মামা অস্ত গেছেন কিন্তু তার সোনালী আভা এখনো ছড়িয়ে রয়েছে দিক থেকে দিগন্তে।

মায়াময় গোধুলী। ছবি: লেখক

গোধুলি লগ্নের শেষ বিকেলে তাঁবুর দড়জায় বসে প্রিয় বইটা হাতে নিয়ে নাড়াচাড়া করছিলাম। বাতাসের সোদা ঘ্রাণ তখনো মুছে যায়নি। বৃষ্টিস্নাত পাহাড়, গাছপালা সোনালী আলো মেখে এক মায়াবী রুপ ধারণ করেছে। হঠাৎ করেই মনে ভেসে উঠলো শ্রীকান্ত আচার্যের ভরাট গলায়--

‘আমার সারাটা দিন,মেঘলা আকাশ
বৃষ্টি তোমাকে দিলাম
শুধু শ্রাবণ সন্ধ্যাটুকু তোমার কাছে চেয়ে নিলাম।’

সবুজের রাজ্যে মেঘের উড়াউড়ি। ছবি: তাহান ভাই

কিন্তু চারপাশে হৈচৈ আর কোলাহল শুনে ঘোর কাটলো। আমরা যখন দুপুরে চূড়ায় উঠেছিলাম তখন এসে মাত্র দুইজন লোক দেখেছিলাম। তারপর আমরা সাথে নিয়ে আসা দুপুরের খাবার খেয়ে তাঁবু সেট করলাম একপাশে গাছতলায়। শরীরকে কিছুটা চনমনে ভাব আনার জন্য চা তৈরি করে পান করলাম সবুজের মিশেলে। তখনো পর্যন্ত দুয়েকটা তাঁবু সেট করা হয়েছিলো। কিন্তু সন্ধ্যায় যখন তাঁবু থেকে বের হলাম আশেপাশে দেখেই তাজ্জব বনে গেলাম।

মেঘে ডুবে যাওয়া সবুজ। ছবি: লেখক

চারিদিকে লোকে লোকারণ্য, কোলাহল হৈচৈ। নির্জন নিরিবিলি একটা জায়গা মুহূর্তেই কোলাহলপূর্ণ হয়ে গেলো। এমনকি ক্যাম্পিং সম্পর্কে যাদের কোনো পূর্ব প্রস্তুতি নেই এমন লোকসংখ্যাও কম নয়। অনেকের কাছ থেকেই শুনতে পেলাম এখানে আসা সম্পূর্ণ অযৌক্তিক হয়েছে। কে কোথায় ঘুরতে যাবে বা কোথায় গিয়ে শান্তি পাবে এটা অনেক গুরুত্বপূর্ণ বিষয় মনে হয় আমার কাছে। সবার মন সব জায়গায় গিয়ে শান্তি পায়না। আবার এরকম জায়গায় আরামপ্রিয় পর্যটকরা গিয়েও যন্ত্রণা ভোগ করেন। তাই কোথায় যাবেন, কেনো যাবেন এই প্রশ্ন নিজেকে করা উচিৎ ভ্রমণ পরিকল্পনা করার পূর্বে।

আমাদের রান্নাঘর। ছবি: লেখক

কোলাহলে আহত হয়ে জাদির পাশে চলে গেলাম যেখানে কোনো তাঁবু সেট করা হয়নি। মেঘেদের লুকোচুরি, উড়াউড়ি চলছিলো পুরোদমে। একদল মেঘ উড়ে আসে আবার তাদের পিছু পিছু আরেকদল মেঘ উড়ে আসে। এরকম ভাবে চমৎকার সব দৃশ্য দেখছিলাম আর মুগ্ধ হচ্ছিলাম। এর আগে অনেক জায়গায় মেঘ দেখেছি, কিন্তু মেঘের ছোয়া কোথাও পাইনি যেটা মারায়নতং চূড়ায় পেয়েছি। আমরা দাঁড়িয়ে আছি হঠাৎ করে মেঘ এসে ঢেকে দিলো আমাদের পরক্ষণেই আবার উড়ে চলে গেলো। এরকম বিচিত্র সব অনুভূতি অর্জন করলাম আলীকদমের এই পাহাড়ে। 

সবুজে মাখানো চা। ছবি: লেখক

সন্ধ্যা বেশ জাকিয়ে নেমেছে, হাল্কা এক পশলা বৃষ্টি এসে আবহাওয়ার পূর্বাভাসকে শতভাগ সঠিক প্রমান করার চেষ্টা করলো। আমরাও accuweather.com এর প্রতি বিশ্বস্ত হলাম পূর্বাভাস মিলে যাওয়াতে। সন্ধ্যার পরপর আকাশে মেঘের ছিটেফোঁটা আর রইলো না, আকাশ বেশ পরিষ্কার। প্রভারনা পূর্নিমার প্রকাণ্ড চাদটা আস্তে আস্তে দৃশ্যমান হলো রাতের আকাশে। অন্ধকার ভেদ করে গগনবিদারী ঝলমলে আলোয় ভাসিয়ে দেওয়া শুরু করলো সমস্ত পাহাড়, গাছপালা আমাদের ক্যাম্পসাইট। তখনো কিছু কিছু লোকজন চূড়ায় পদার্পণ করছে, তাঁবু সেট করা চলছে। আমরা চাদের আলোয় ভিজে ভিজে পাহাড়ের হিমশীতল বাতাসে উষ্ণ হওয়ার জন্য তুফান বাতাসেও আগুন জ্বালানোর চেষ্টা করছিলাম।

সন্ধ্যে নামার মুখে। ছবি: লেখক

রাত ৮ টা বাজে, দক্ষিণ পাশটাতে কোনো তাঁবু নেই, তাই আগুন জ্বালানোর জন্য এটাই উপযুক্ত জায়গা কিন্তু এই পাশটাতেই বাতাস সবচেয়ে বেশি। শরীফ ভাইয়ের কাছ থেকে নিয়ে আসা পেনি স্টোভের জ্বালানীটা বিকেলে চা বানানোর পরেও অর্ধেকের বেশি রয়ে গেছে। রাতের ডিনার হবে কাপ নুডলসে, সেটার জন্য গরম পানি করবো আর ডিম সিদ্ধ হবে। ক্যাম্প-ফায়ারের আগুন জ্বালানো হলে পেনি স্টোভ লাগবেনা তাই স্প্রিরিট দিয়েই চেষ্টা করা হচ্ছে ভেজা কাঠে তুফান বাতাসে আগুন জালানোর। অনেক সময় চেষ্টা করেও যখন স্প্রিরিট শেষ প্রায় তখন অন্য ক্যাম্পারদের চুলা থেকে আগুন নিয়ে এসে মাত্র আমাদের আগুনটা জ্বলে উঠলো তখন রাজন ভাইয়ের চেহারা ছিলো যুদ্ধজয়ী সেনাপতির মতো। এই আগুন জ্বালানোর জন্য বেচারার কতো কষ্ট।

ক্যাম্প-ফায়ারে উষ্ণতা। ছবি: তাহান ভাই

এরমধ্যে তাহান ভাইকে তাঁবুতে পাঠানো হলো ডিম নিয়ে আসার জন্য, ঠিক এই সময়ে পটকা বা ফাকা গুলির শব্দ পাওয়া গেলো। আমরা ভেবেছিলাম ক্যাম্পারদের মধ্যে কেউ হয়তো বাজি ফুটাচ্ছে। কাপ নুডলসে মাত্র গরম পানি ঢেলে দেওয়া হয়েছে  কয়েক সেকেন্ডের মধ্যেই তাহান ভাই দৌড়ে আসলো এবং বললো সেনাবাহিনী আসছে তারা মিস ফায়ার করতেছে তাঁবু গোটানোর জন্য পাঁচ মিনিট সময় দিয়েছে। কয়েকটা তাঁবুতে বন্দুক দিয়ে আঘাতও করেছে। আমি বুঝতে পারলাম এবং তাঁবুর দিকে দৌড় দিবো কিন্তু রাজন ভাই মনে করলো তাহান মজা করতেছে। যখন আমি দৌড় দিলাম তখন সেও দৌড় দিলো। আমি গিয়ে দেখি আমাদের ক্যাম্প সাইটের চারপাশে ঘিরে রেখেছে বাংলাদেশ সেনাবাহিনীর পদাদিক ডিভিশনের সদস্যরা, ঠিক আমার আগের তাঁবুর পাশে দাঁড়িয়ে আছে একজন তার কাছে সিনিয়রের খোঁজ নিলাম, তিনি একজন সিনিয়র ওয়ারেন্ট অফিসারকে দেখিয়ে দিলেন। তার সাথে কথা বলে জানলাম নিরাপত্তা ইস্যুতে এখানে কাউকে থাকতে দেওয়া হয়না, কিন্তু লোকাল গাইডরা ক্যাম্প ফাঁকি দিয়ে লোকজনকে নিয়ে আসে। আজকে সর্বমোট ১০২ জন আসছে অবস্থান করার জন্য যা অস্বাভাবিক। 

মাথার উপরে চাদ রেখে সারি সারি নেমে আসছে প্রকৃতিপুত্ররা

তারাহুরো করে তাঁবু গোছানো হলো, কার ব্যাগে কি ঢুকেছে এতটুকু বুঝে উঠার সময় ছিলোনা। দশ মিনিটের মধ্যে  ব্যাগ গোছানো হলো, সবার নামের তালিকা তৈরি করা হলো এবং সবাইকে ডেকে ব্রিফিং করা হলো। প্রথমে আমাদেরকে নিয়ে যাওয়া হবে আলীকদম ক্যাম্পে। রাত ৯ টায় সবাই যাত্রা শুরু করলাম। যখন আমরা নেমে আসা শুরু করলাম পিছনে ফেলে আসলাম তেজোদ্দীপ্ত চাদটাকে। আমাদেরকে অন্ধকারে পথ খুঁজে নিতে সহায়তা করার জন্যই হয়তো বিলিয়ে দিচ্ছিলো সর্বশক্তি দিয়ে আলো। এরকম চাদের আলো খুব কম সময়ই দেখা যায়।

হুমায়ুন আহমেদের ভাষায়-

সেইটা ছেল চান্নি-পসর রাইত। আহারে কি চান্নি। আসমান যেনো ফাইট্টা টুকরা টুকরা হইয়া গেছে। শইলের লোম দেহা যায় এমন চান্দের তেজ।

এরকম এক রাতে আমরা নেমে আসলাম মারায়নতং চূড়া থেকে, দুই ঘণ্টার মহা যন্ত্রণাদায়ক এক যাত্রায় পিছলে পড়া, আছাড় খাওয়া, হাত পা কাটা, স্লাইয় খেয়ে কয়েকফুট চলে যাওয়া খুব সাধারণ বিষয় হয়ে গেলো। রাত ১১ টায় নেমে আসলাম আবাসিক বাজার সেখানে থেকে সবাইকে ক্যাম্পে নেওয়া হয়নি যার যেখানে চলে যাওয়া বা রাতে থাকা সম্ভব সেখানেই ব্যবস্থা করে দিচ্ছিলো সেনাবাহিনীর সদস্যরা। আবাসিক বাজারেই এক বাসায় আমাদের থাকার ব্যবস্থা হলো। রাত কাটালাম চরম ক্লান্তি নিয়ে। কিন্তু অপূর্ণ এক আকাঙ্কা রয়ে গেলো মনে মারায়নতং চূড়া থেকে সূর্যোদয় দেখা। (সমাপ্ত)

ভ্রমণকালীন সময়ে আমাদের ব্যবহৃত কোনো প্লাস্টিক বা অপচনশীল পণ্য আমরা ফেলি আসিনি, বয়ে নিয়ে এসেছি নির্দিষ্ট জায়গা পর্যন্ত। সবাই সচেতন হলেই রক্ষা পাবে পরিবেশ।

ভ্রমণগুরুতে প্রকাশিত আমার সব পোস্ট দেখুন এই লিঙ্কে:
https://www.vromonguru.com/author/jewel/

মারায়নতং চূড়ায় অতৃপ্ত সূর্যোদয়: চূড়ায় পদার্পণ

বেশ ছোট একটা পাড়া, এখানে মুরংদের বসবাস। ঘরগুলো টং ঘরের মতো। প্রত্যেকটা ঘরের নিচেই ফাকা জায়গা রয়েছে যেখানে শুকনো কাঠ জ্বালানি হিসেবে ব্যবহার করার জন্য সংরক্ষণ করা হয় এবং গবাদিপশু রাখা হয়। গরু, শুকর, ছাগল দেখলাম আশেপাশে চড়ে বেড়াচ্ছে। পাড়া থেকে উপরের দিকে উঠে যাওয়া শুরু করতেই আকাশের রঙ পরিবর্তন হয়ে গেলো। অল্প সময়ের মধ্যেই মেঘের আড়ালে হারিয়ে গেলো প্রকাণ্ড সূর্যটা, সূর্যের তাপও কমে গেলো সাথে সাথেই। বৃষ্টির সম্ভাবনা যে অমূলক ছিলোনা সেটা ধারনা করতে পেরেই জোড় কদম হাঁটা শুরু করলাম, কিন্তু পিঠে ওজনের ব্যাগ নিয়ে প্রচণ্ড রকমের খাড়া একটা বাক উঠতে বেশ বেগ পেতেই হলো। বট গাছের নিচ পর্যন্ত পৌঁছানোর আগেই ঝমঝম করে নেমে পড়লো বৃষ্টি। বৃষ্টির একেকটা ফোটা তীক্ষ্ণ, ধারালো তীরের ফলার মতো গায়ে এসে বিধতে লাগলো। দৌড়ে বটগাছের নিচে গিয়ে আশ্রয় নিলাম।   

বৃষ্টিতে আশ্রয় বটগাছের নিচে। ছবি: লেখক

এখানেই দেখা হলো এক গাইডের সাথে যিনি বস্তায় ভর্তি করে ২৭ জনের এক গ্রুপের তাঁবু নিয়ে উপরে উঠছিলেন। গাইডের সাথে বিভিন্ন বিষয় নিয়ে টুকিটাকি গল্প করতে করতে বৃষ্টির পরিমান আরো বেড়ে গেলো, আমরা কাকভেজা হয়ে গেলাম। অনেকটা সময় বিশ্রাম নিয়ে বৃষ্টি থামার সাথে সাথেই রওনা দিলাম আবার মারায়নতং চূড়ার উদ্দেশ্যে। রাজন ভাই এখনো আগে আগে যাচ্ছে, বৃষ্টি হওয়ার ফলে ইট বিছানো রাস্তা কিছুটা পিচ্ছিল হয়েছে হাটতে কিছুটা সমস্যা হচ্ছে। তবে বৃষ্টির পরপরই আশেপাশের পাহাড়ের দৃশ্য চকচকে সবুজ লাগছিলো। 

মেঘ সবুজের পথে। ছবি: লেখক

পাড়াটা মোটামুটি মাঝামাঝি উচ্চতায়, আমাদের এখনো অর্ধেক পথ বাকী। তবে এখন তাপমাত্রা কম, রোদ নেই তাই গরম কম লাগছিলো। একটা সময় আমি এগিয়ে গেলাম এবং কিছুটা সমতল জায়গা পেলাম কয়েক মিনিটের জন্য। সমতল জায়গা পেয়ে হাঁটার গতি বেড়ে গেলো যার ফলে অন্য দুইজন থেকে কিছুটা দূরত্ব তৈরি হলো। সমতল জায়গাটাতে একটা বাগানের মতো, আম গাছ এবং আরো বেশ কিছু ফল গাছ দেখলাম। পাহাড়ি আম নাকি খুব সুস্বাদু যদিও আমার কখনো খাওয়া হয়নি। 

সর্পিল মাতামুহুরি। ছবি: লেখক

বাগান থেকে বের হয়েই বুঝতে পারলাম চূড়ার খুব কাছাকাছি চলে এসেছি, বাশের চাটাই দিয়ে ছোট্ট একটা গেইট বানানো এবং সেখান থেকে জুমঘরের দেখা মিলছে দেখা যাচ্ছে আকাঙ্ক্ষিত মারায়নতং চূড়া। এখন শুধু ছুয়ে দেয়ার অপেক্ষায়। এখানে এসে ইট বিছানো রাস্তার কিছুটা ভগ্নদশা চোখে পড়লো, অতি বৃষ্টিতে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। একাই একাই উঠে গেলাম উপরের দিকে, পিছনের দুইজনের এখনো দেখা পাওয়া যাচ্ছেনা। বেশ কিছুটা উঠে আসার পরে থামতে হলো, ঘামে চিটচিটে হয়ে গেছে গায়ের টি-শার্টটা। ব্যাকপ্যাকটা রেখে টি-শার্ট চিপে ঘাম ফেললান তারপর একটা স্যালাইন ঢেলে দিলাম পানির পটে। ব্যাগ থেকে বের করলাম খেজুর। এই ধরনের ট্রেকিং যেখানে প্রচণ্ডভাবে ক্লান্ত হয়ে যেতে হয় এবং একইসাথে ব্যাগের ওজন কমানো প্রয়োজন সেখানে খেজুর খুবি উপকারী। এক দুইটা খেজুর খেয়ে পানি পান করলে কিছুটা শক্তি পাওয়া যায় শরীরে তাই ভ্রমণে খেজুর আমার পছন্দের তালিকায় প্রথমেই থাকে।  

মিরিঞ্জা রেঞ্জের সবুজ দেখি। ছবি: তাহান ভাই

খেজুর খেয়ে আর স্যালাইন পান করে বিশ্রাম নিতে নিতে দূর থেকে দেখা মিললো ভ্রমণসঙ্গীদের। প্রথমেই উঠে এলো তাহান ভাই, তার কিছুক্ষণ পরে পাগলা রাজন ভাই। পিঠে ব্যাগপ্যাক আর হাতে কাঠের জ্বালানী নিয়ে। এসেই দুজনে হাপাতে হাপাতে বসে পরলো। তারাও খেজুর খেয়ে স্যালাইন  পান করে বিশ্রাম নিলো। আমরা চূড়া থেকে অল্প দূরত্বে অবস্থান করছিলাম যার ফলে মিরিঞ্জা রেঞ্জের সৌন্দর্য চোখের সামনে একে একে হাজির হতে শুরু করলো। যেদিকেই চোখ যায় সবুজ, সবুজ আর সবুজ। চোখ ধাধানো সবুজে শীতল হচ্ছে দৃষ্টি। রোদ আর মেঘের লুকোচুরি চলছিলো তখন জোরেসোরে।  আবার যাত্রা শুরু হলো। 

হেটে চলা নিরন্তর। ছবি: লেখক

এবার আর বেশিক্ষণ যাওয়া লাগলো না দশ মিনিটের মধ্যেই আমরা দ্বিতীয় চূড়ায় উঠে গেলাম। দ্বিতীয় চূড়া থেকে প্রথম চূড়ার গাছ এবং জাদি বা বৌদ্ধ মূর্তিগুলো দেখা যাচ্ছে। দ্বিতীয় চূড়ার জায়গাটাও খুব সুন্দর কিছুটা সমতল জায়গা আছে এখানে। এখানে থেকে তিন দিকের চমৎকার দৃশ্য দেখা যাচ্ছে। কাছে দূরে ছড়ানো ছিটানো জুমঘর। জুম চাষের ফসলে বাতাস দোলা দিচ্ছে আর ঢেউ খেলানো এক সৌন্দর্য ছড়াচ্ছে। তবে এতো প্রাণখোলা সৌন্দর্যের মাঝে পীড়া দিলো এই চূড়ায় পূর্বে যারা ক্যাম্পিং করেছিলো অথবা ঘুরে গেছে তাদের ফেলে যাওয়া আবর্জনাগুলো। ব্যবহৃত প্লাস্টিক, বিস্কুটের প্যাকেট, চিপসের প্যাকেট, বারবিকিউর কয়লাসহ বিভিন্ন আবর্জনা ছড়ানো ছিটানো। 

ঐ দেখা যায় মারায়নতং চূড়া। ছবি: লেখক

এখানে এক পশলা বৃষ্টি দিয়েই আমাদের স্বাগত জানালো জাদি। কিছুক্ষণ সৌন্দর্য উপভোগ করে আবার হাঁটা শুরু করলাম প্রথম চূড়ার দিকে। আসল সৌন্দর্য এখনো বাকী। জানিনা কি অপেক্ষা করছে আমাদের জন্য। মাতামুহুরি নদীর পাশে চির ধ্যানরত জাদির কাছে আজকের সৌন্দর্যের আকুতি। দশ মিনিটের মধ্যেই পৌঁছে গেলাম মূল চূড়ায়। চূড়ায় উঠতেই রোদটা কোথায় যেনো লুকিয়ে গেলো, কিছুক্ষণের মধ্যেই মেঘের ঝাপটা এসে ছুয়ে দিয়ে গেলো আমাদের। জাদি আমাদের স্বাগত জানালো মেঘমালা দিয়ে। দুইটি জাদি বা বৌদ্ধ মন্দির রয়েছে চূড়াতে, কয়েকটি গাছ আর একটি মাচাং ঘর যার সংস্কার কাজ চলছিলো।                        

মেঘে ঢাকা জাদি। ছবি: লেখক

এখান থেকে ৩৬০ ডিগ্রী একটা ভিউ পাওয়া যাচ্ছে, এক পাশ দিয়ে বয়ে চলেছে আন্তর্জাতিক নদী মাতামুহুরি। চারপাশে মিরিঞ্জা রেঞ্জের উঁচু উঁচু সব চূড়া যার মধ্যে উপচে পরছে সবুজের অবগাহন। বৃষ্টি ফোটা চাকচিক্যময় করে তুলেছে সকল উদ্ভিদগুলোকে। যেদিকেই চোখ যায় সবুজ পাহাড়ের উপচে পড়া ঢেউ খেলানো সৌন্দর্য। আমরা মাচাং ঘরে ব্যাগ রাখতে না রাখতেই ঝুম বৃষ্টি শুরু হয়ে গেলো। গোসল করা হবেনা এরকম মানসিক প্রস্তুতি নিয়েই এসেছিলাম আমরা কিন্তু আচমকা স্বাগত বৃষ্টিতে না ভিজার মতো বেরসিক কেউ হতে পারলাম না। ঘামে ভেজা ক্লান্ত দেহকে ভাসিয়ে দিলাম বৃষ্টি ফোটার নিচে। সাথে সাথে যেনো শরীরের সব ক্লান্তি, ঘাম উবে গেলো কর্পূরের মতো। নির্ঘুম চোখ পেলো প্রশান্তির ছোয়া। মনে ভেসে উঠলো কবিগুরুর ‘বর্ষা যাপন’ কবিতার পঙক্তি- 

অবারিত সবুজের পঙক্তিমালা। ছবিঃ লেখক

বাড়িছে বৃষ্টির বেগ থেকে থেকে ডাকি মেঘ
ঝিল্লীরব পৃথিবী ব্যাপিয়া
এমন ঘন ঘোর নিশি দিবসে জাগরনে মিশি
না জানি কেমন করে হিয়া

(চলবে...)

ভ্রমণগুরুতে প্রকাশিত আমার সব পোস্ট দেখুন এই লিঙ্কে: https://www.vromonguru.com/author/jewel/

Popular Posts

My Favorites

পানকৌড়ি ক্যাফে: হারিয়ে যাওয়া নির্জন গ্রামে

2
শহুরে যান্ত্রিক জীবনে হাজারো কোলাহলের মাঝে নিত্য পিষ্ট হচ্ছি আমরা। কোথাও বসে আয়েশ করে সকাল কিংবা সন্ধ্যা রাতের খাবার গ্রহনের সাথে নিশ্চুপ...