ভারতের ভিসা আবেদনের ক্ষেত্রে সামান্য কিছু পরিবর্তন এসেছে, বেশির ভাগই অপরিবর্তীত আছে। বলা যায় আগের কিছু নিয়ম ফিরিয়ে আনা হয়েছে। একসময় ভারতের ভিসার জন্য ই-টোকেন (অনলাইন এপয়ন্টমেন্ট ডেইট) নেয়া লাগতো। এখন নতুন করে আবার সেই নিয়মে ফিরে এসেছে। এক্ষেত্রে ভিসার আবেদন ফি জমা দেবার সময় জমা তারিখ ও সময় নিতে হবে এবং সে অনুসারেই জমা দিতে হবে। ভারতীয় ভিসা আবেদনের সব ধাপগুলো নিচে আলোচনা করা হলো।
প্রথম ধাপ: অনলাইনে ভারতের ভিসার আবেদন পত্র পূরণ:
ভারতীয় ভিসার প্রথম ধাপ হচ্ছে অনলাইনে ভিসার জন্য আবেদন পত্রটি জমা দেয়া। এ কাজটি যখন করবেন হাতে সময় নিয়ে মনোযোগ সহকারে করবেন, যাতে আবেদন পত্রে কোন ধরণের ভুল না থাকে। বেশির ভাগ ভিসার আবেদনপত্রেই প্রত্যাখান হয় আবেদন পত্রটি ঠিকভাবে পূরণ করতে না পারার কারণে। অনেকে আবার দোকান থেকে বা অন্য কাউকে দিয়ে ফরমটি পূরণ করান, এতে ভুল সম্ভাবনা আরও বেশি থাকে। ভালো হয় আপনি আপনার আবেদন পত্রটি নিজে নিজে পূরণ করলে।
আবেদনপত্র পূরণ করার সময় আপনার কাছে কয়েকটি জিনিস প্রস্তুত থাকা লাগবে। এগুলো হাতের কাছে না থাকলে আবেদন পত্র সেইভ করে রেখে পরে এগুলো নিয়ে আবার বসতে হবে। এগুলো হচ্ছে:
১. পাসপোর্ট (অন্তত ৬ মাস মেয়াদ বাকি থাকতে হবে)
২. ছবির সফট কপি (একই ছবি ২ বাই ২ ইঞ্চি সাইজ আবেদন পত্রের সাথে জমা দিতে হবে)
৩. ভারতের কোন একটি হোটেলের ঠিকানা ও ফোন নাম্বার
আবেদন পত্রটি সঠিকভাবে পূরণ করতে আপনার প্রায় এক ঘণ্টা সময় লাগতে পারে। তাই সেভাবে প্রস্তুতি নিয়ে বসবেন। এই লিংকে যেয়ে আবেদন পত্রটি পূরণ করবেন। যে সমস্ত তথ্যাদি চাইবে সেগুলো সঠিকভাবে পূরণ করবেন। যেমন, পুরো নাম, পিতা/মাতার নাম, বর্তমান-স্থায়ী ঠিকানা, অফিস/শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের তথ্য এসব। কিভাবে আবেদনপত্রটি পূরণ করতে হবে সেটি এই লিংক থেকে দেখে নিতে পারেন।
ভারতে আপনার গন্তব্য অনুসারে কোন পোর্ট দিয়ে যাবেন সেটা নির্বাচন করবেন। বর্তমানে ভারত সবগুলো স্থল বন্দর, আকাশ পথ ও রেলপথের ভিসা দিচ্ছে। উল্লেখযোগ্য পোর্টগুলো হচ্ছে: ১. হরিদাশপুর (বাংলাদেশ অংশে বেনাপোল) ২. ডাউকি (বাংলাদেশ অংশে তামাবিল), ৩. চেংড়াবান্দা (বাংলাদেশ অংশে বুড়িমারী) ৪. বাই ট্রেন গেদে (বাংলাদেশ অংশে দর্শনা) ৫. ফুলবাড়ী (বাংলাদেশ অংশে বাংলাবান্দা) ৬. বাই ট্রেন নিউ জলপাইগুড়ি।
অনলাইন আবেদনপত্র পূরণে সাধারণত একটি জায়গায় এসে মানুষ সমস্যায় পরে সেটা হচ্ছে রেফারেন্স কি দেবেন। বাংলাদেশর রেফারেন্স দিবেন এমন কারো নাম ও ফোন নাম্বার যে আপনার সাথে ভারত যাওয়ার সম্ভাবনা কম, এতে করে ভারতে আপনি কোন সমস্যায় পড়লে আপনার বাসায় যোগাযোগ করা সম্ভব হবে। আর ভারতের রেফারেন্স হিসেবে দিবেন যে হোটেলে থাকতে চাচ্ছেন তার নাম, ঠিকানা ও ফোন নাম্বার। এছাড়া একেবারে শেষের দিকে ভারতের কোন জায়গায় কোন হোটেলে থাকবেন সে তথ্যও যোগ করতে হয়।
এছাড়া আপনার পিতা/মাতা, দাদা-দাদীর নাগরিকত্ব কি ছিলো, এই প্রশ্নের উত্তরে লিখবেন বাংলাদেশ। আবেদন পত্রটি সফলভাবে সাবমিট করতে পারলে আপনি সেটা প্রিন্ট নিবেন। আবেনদপত্রের নির্ধারিত দুটি স্থানে (ছবির নিচে ও শেষ পৃষ্ঠায়) স্বাক্ষর করবেন। আপনার স্বাক্ষরটি পাসপোর্টে দেয়া আপনার স্বাক্ষরের অনুরূপ হতে হবে। আবেদন পত্র প্রিন্ট হয়ে গেলে একটি ২ বাই ২ ইঞ্চি সাইজের ছবি আঠা দিয়ে লাগাবেন, এরপর ভিসার প্রসেসিং ফি জমা দিবেন। আবেদন পত্র অনলাইনে সাবমিট দেবার পর থেকে ৮ দিনের মধ্যে জমা দেয়া লাগবে।
২য় ধাপ: ভিসার প্রসেসিং ফি জমা দেয়া ও এপয়ন্টমেন্ট নেয়া (নতুন নিয়মে):
ভিসার প্রসেসিং ফি ৮০০ টাকা। এর সাথে বিকাশ বা ব্যাংক চার্জ যুক্ত হয়ে ৮২৪ টাকার মতো খরচ হতে পারে। সাধারণত সব আইভ্যাকে বা এর আশেপাশে আপনি ভিসা প্রসেসিং ফি জমা দিতে পারবেন এবং এপয়ন্টমেন্ট প্রিন্ট করে নিতে পারবেন। যেদিন এপয়ন্টমেন্ট খালি আছে শুধু সেদিন সিলেক্ট করতে পারবেন। বর্তমানে এপয়ন্টমেট ডেইট পেতে ঢাকাতে দুমাসেরও বেশি সময় লাগছে! অন্যসব সেন্টারের অবস্থাও প্রায় একই।

ভিসা ফি দেবার জন্য এ সাইটে যেতে হবে। পেমেন্ট দেবার সময় আপনি কোন দিন কোন সময়ে জমা দিবেন সেটা উল্লেখ করতে হবে এবং এপয়ন্টমেন্টসহ ইনভয়েসটি প্রিন্ট করে নিতে হবে। এই ইনভয়েস আইভ্যাকে ঢোকার সময় দেখাতে হবে এবং ভিসা আবেদনপত্রের সাথে জমা দিতে হবে। এর অর্থ হচ্ছে আগের মতো “ওয়াক ইন” ভিসার আবেদন জমা দেবার সুযোগ থাকছেনা এবং এপন্টমেন্ট মিস হয়ে গেলে আবার নতুন করে এপয়ন্টমেন্ট নেয়া লাগবে।
৩য় ধাপ: প্রয়োজনীয় কাগজপত্র প্রস্তুত করা:
ভারতের ভিসার জন্য বেশ কিছু কাগজপত্র দিতে হবে, সেগুলো ঠিক থাকলে আপনার ভিসা না পাওয়ার কোন কারণ নেই। আসুন দেখি আবেদনপত্রের সাথে কী কী কাগজপত্র দিবেন:
১. পাসপোর্ট। অন্তত ৬ মাসের মেয়াদ বাকি থাকবে হবে এবং কমপক্ষে দুটো পৃষ্ঠা খালি থাকতে হবে। পাসপোর্টের যে দুটো পৃষ্ঠায় আপনার তথ্যাদি আছে সেগুলোর ফটোকপি দিবেন (পৃষ্ঠা ৩ ও ৪)। পুরণো যতগুলো পাসপোর্ট আছে সেগুলোও অবশ্যই সঙ্গে দিবেন।
২. সদ্য তোলা ২x২ রঙিন ছবি দিতে হবে। ছবিতে পুরো মুখোমণ্ডল দেখা যেতে হবে এবং ছবির ব্যাকগ্রাউন্ড সাদা হতে হবে। সদ্য তোলা বলতে তিন মাসের মধ্যে তোলা ছবিকে বুঝায়। ছবি অবশ্যই ল্যাব প্রিন্ট হতে হবে।
৩. বর্তমান ঠিকানার স্বপক্ষে একটি প্রমাণপত্র দিতে হবে। কোন ইউটিলিটি বিলের ফটোকপি হলে হবে। যেমন বিদ্যুৎ, ল্যান্ডফোন, পানি বা গ্যাসের বিল। মনে রাখবেন বিলে আপনার ঠিকানা যেভাবে আছে ঠিক সেভাবেই ভিসার আবেদনপত্রে দিবেন।
৪. পেশার প্রমাণ পত্র। চাকুরজীবি হলে অফিস থেকে একটা সনদ দিবেন যেটাতে লেখা থাকবে আপনি কোন অফিসে কি চাকুরী করেন এবং ভারত ভ্রমণে অফিসের কোন আপত্তি নাই। আর ছাত্র হলে স্টুডেন্ট আইডি কার্ডের ফটোকপি দিবেন (মেয়াদ থাকতে হবে)। অবসরপ্রাপ্ত হলে সর্বশেষ চাকুরী রিজইন লেটার/সম্পন্ন করার সনদ দিবেন।
৫. আর্থিক স্বচ্ছলতার প্রমাণ দেখাতে হবে। এক্ষেত্রে আপনার পাসপোর্টে ব্যাংক থেকে ১৫০ ডলার এনডোর্স করা থাকতে হবে। এছাড়া ব্যাংক স্টেটমেন্ট যেখানে সর্বশেষ ব্যালেন্স ২০,০০০ টাকা আছে, দিলে হবে। আর যদি আপনার ক্রেডিট কার্ড এনডোর্স করা থাকে সেক্ষেত্রে পাসপোর্টের যে পৃষ্ঠায় ক্রেডিট কার্ড এনডোর্স করা আছে সে পৃষ্ঠার ফটোকপি ও ক্রেডিট কার্ডের উভয় পিঠের ফটোকপি দিলে চলবে।
৬. জাতীয় পরিচয়পত্রের উভয় পিঠের ফটোকপি। যদি আপনার জাতীয় পরিচয় পত্র না থাকে তবে জন্ম নিবন্ধনের ফটোকপি দিবেন। মনে রাখবেন আপনার পাসপোর্টের তথ্যের সাথে জাতীয় পরিচয়পত্র/জন্ম নিবন্ধনের তথ্যের মিল থাকতে হবে।
৭. নতুন নিয়ম অনুযায়ী পেমেন্ট ইনভয়েসের প্রিন্টআউট যেখানে এপন্টমেন্টের তারিখ ও সময় লেখা আছে।

কাগজগুলো কিভাবে সিরিয়ালি সাজাবেন সেটা এই ছবি থেকে দেখে নিতে পারেন। এভাবে সাজিয়ে নিয়ে আপনি এপয়ন্টমেন্টের তারিখ ও সময়ানুসারে আইভ্যাকে চলে যাবেন।
শেষ ধাপ: আবেদনপত্র জমা ও পাসপোর্ট সংগ্রহ করা:
আগের কাজগুলো করতে পারলে এখনকার কাজটা খুবই সহজ। আপনার এলাকার জন্য নির্ধারিত আইভ্যাকে যেয়ে সিরিয়াল নিবেন। কাগজপত্র আইভ্যাকের কর্মকর্তারা দেখে আপনাকে একটা টোকেন দিয়ে পাসপোর্ট জমা কাগজপত্র সহ জমা রেখে দিবে। টোকেনে উল্লেখিত দিনে যেয়ে আপনি আপনার পাসপোর্ট ফেরত নিয়ে আসবেন। মনে রাখবেন পাসপোর্ট জমা নেয় সকাল ৯ টা থেকে দুপুর ১২: ৩০ পর্যন্ত (যমুনা ফিউচার পার্কে ১:০০ পর্যন্ত নেয়)।
আর পাসপোর্ট সংগ্রহ করতে যাবেন বিকাল তিনটা থেকে পাঁচটার মধ্যে। যদি পাসপোর্ট আপনার অন্য কোন কাজের জন্য প্রয়োজন থাকে, সেক্ষেত্রে আবেদন পত্র জমা দেবার সময় পাসপোর্ট ফেরত নিয়ে আসতে পারবেন। ভিসা টোকেনে উল্লেখিত ডেলিভারির তারিখের সাতদিন পূর্বে আবার পাসপোর্ট নিয়ে আসতে পারবেন। বর্তমানে যারা আবেদন করবেন তাদের সবাইকে যেতে হয় বায়োমেট্রিক ডাটা দেবার জন্য। তবে পরিবারের একজন চাইলে সবার পাসপোর্ট সংগ্রহ করতে পারবেন। ভিসার আবেদন পত্র যে কাউন্টারে জমা দিবেন সে কাউন্টার থেকেই আপনাকে দেখিয়ে দেবে কোন কাউন্টারে বায়োমেট্রিক ডাটা নিবে।
বাংলাদেশে মোট ১৫ টি আইভ্যাক আছে। এগুলো হচ্ছে ঢাকা, চট্টগ্রাম, খুলনা, কুষ্টিয়া, যশোর, রংপুর, কুমিল্লা, ব্রাহ্মণবাড়িয়া, নোয়াখালী, সাতক্ষীরা, বরিশাল, বগুড়া, ময়মনসিংহ, রাজশাহী, ঠাকুরগাঁও ও সিলেটে। পুরো আর্টিকেল পড়েও যদি আপনার কোন সাহায্য দরকার পড়ে আপনি এই লেখার নিচের কমেন্ট করবেন, আমি উত্তর দিবো।
ফিচার ছবি: লেখক
ভ্রমনগুরু your travel adviser
Good
বুঝি নাই
কোনটা বুঝেন নাই?