শুক্রবার, ছুটির দিন। তবে ছুটির দিন বলে বেলা করে ঘুমানোর উপায় নেই ! গতকাল রাতেই ক্যাম্পিং এর জন্য ব্যাকপ্যাক গুছিয়ে রেখেছিলাম। সকাল সকাল বাইকের চেইন লিউব করে রেডি হয়ে গেলাম। গন্তব্য গাজিপুর জেলার শ্রীপুর উপজেলার টেংরা নামক গ্রামের বৃন্দাবনে। ভাওয়াল গড়ের উদ্যানের মত সবুজের সমারোহে আবিষ্ট বৃন্দাবনে। তবে হয়ত প্রশ্ন জাগতে পারে সেপ্টম্বরের এই গরমে কেন ক্যাম্পিং ?
উত্তর খুবই সরল, কারণ আজকে পূর্ণিমা। আর অন্যান্য পূর্ণিমার মত এবারও আমাদের উদ্দেশ্য ফুল মুন ক্যাম্পিং। ক্যাম্পমেটরা সবাই ১০টায় উত্তরা বিএনএস সেন্টারে একত্রীত হই। সকালের প্রাতরাশ আর আড্ডা সেরে ১১টায় ৪টা বাইকে ৬জন যাত্রা শুরু করি। সহজ রাউট, উত্তরা থেকে গাজিপুর মাওনা ফ্লাইওভার পেরিয়ে প্রথম ইউটার্ন নিয়ে এম সি বাজার থেকে বামের রাস্তা ধরে আগাতে হবে।

শিশুপল্লির কাছে এসে ডানদিকের রাস্তায় গেলে পৌছে যাব বৃন্দাবনে। উত্তরা থেকে প্রায় ৫৫ কিমির জার্নি। সবাইর ধীরে সুস্থে কমিউনিকেটরে দিক নির্দেশনা দিতে দিতে নামাজের আগেই পৌছে গেলাম বৃন্দাবনে। শিশুপল্লি থেকে ডানদিকের বৃন্দাবনে যাওয়ার রাস্তা মন ভাল করে দেয়ার মত একটা রাস্তা। ঘন গাছপালার জালে পরে সূর্যের আলো ঠিকমত রাস্তায় পৌছাতে পারে না।
বৃন্দাবনে পৌছেই বাইক / ব্যাগ সব কিছু একটা মাচায় রেখে চলে গেলাম নামাজ পড়তে। ইচ্ছে করেই হেটে গেলাম গাছপালায় ভর্তি রাস্তা দিয়ে। সবকিছুতেই একটা শান্ত শান্ত ভাব। নামাজ শেষে ফেরার পথে কিছু ছবি তুলতে ভুল করলাম না। বৃন্দাবনে এসে প্রথমেই আমারা আমাদের পছন্দমত ক্যাম্পসাইট ঠিক করলাম। ২ একরের মত বিশাল জায়গা।

যেকোন জায়গায় ক্যাম্পিং করা গেলেও আমরা রাতে চাঁদের অবস্থান, ছবির ভাল ফ্রেমিং, পানির সোর্স, টেন্ট পিচের আর হ্যামক ঝুলানোর সুবিধাজনক জায়গা ইত্যাদি বিবেচনা করে বৃন্দাবনের একদম শেষের দিকে ক্যাম্পসাইট নির্ধারণ করলাম। দুপুরের খাবারের আয়োজন ছিল বৃন্দাবনে। খাওয়া দাওয়া শেষ করে আশেপাশে ঘুরাঘুরি করতে বের হলাম।
পাশেই একটা লেক আছে। সেখানে যাওয়ার পথে গরুর পালের মাঝে আটকা পরলাম। ঘুরাঘুরি আর ছবি তোলা শেষ করে ক্যাম্পসাইটে ফিরে এলাম। বিকেল প্রায় শেষের দিকে। সারাদিন একটা ভাপসা গরম থাকলেও এখন চারপাশ ঠাণ্ডা হয়ে আসছে। অন্ধকার হওয়ার আগেই টেন্ট পিচ করে ফেললাম। এরমধ্যেই আমাদের পোস্ট করা ছবি দেখে আর থাকতে না পেরে ঢাকা থেকে আরেকজন আমাদের সাথে যোগ দিয়েছে।

সন্ধ্যায় হ্যামকে শুয়ে গল্প করতে করতে আকাশে মেঘের ফাঁকে চাঁদ উকি দিলো। গাছপালার ফাঁক দিয়ে চাঁদের আলোয় পুরো ক্যাম্পসাইট আলোকিত। এর মধ্যেই মেঘ এসে হানা দিলো। চাঁদ আর মেঘের লুকোচুরি শুরু হয়ে গেলো। গল্প আর ছবি তোলার মাঝে সময় পেরিয়ে গেলো। রাতের খাবারের ডাক পড়লো।এবার ক্যাম্পিং এ আমরা চুলা নিয়ে আসলেও তা ছিল শুধু চা কফির জন্য।
খাবারের সকল দায়িত্ব আমরা বৃন্দাবনের হাতে সপে দিয়েছিলাম। রাতে বৃন্দাবনে ছিল লাইভ সঙ্গীতের আয়োজন। সপ্তাহের কিছু নির্দিষ্ট দিনে এই লাইভ সঙ্গীত হয়। আমরা আমাদের ক্যাম্পসাইট থেকেই গান শুনতে পারছিলাম। রাত ১১ টার দিকে গানের অনুষ্ঠান শেষ হওয়ার পর অন্য রকম এক বৃন্দাবনের দেখা পেলাম আমরা। ঝিঝি পোকার সাথে বাতাসে গাছের পাতার মর্মর শব্দ। চাঁদের আলোয় গাছের ছায়া পরে এক অন্যরকম আবাহ।

রাত গভীর হওয়ার সাথে সাথে শিয়ালের ডাক। আশেপাশে আর কোন বসতবাড়ি নেই। বৃন্দাবনের সীমানা শেষ হলেই জংগলের শুরু। আর সেই জঙ্গলে রয়েছে শেয়ালের আস্তানা। শেয়ালের ডাকে কান ঝালাপালা। আর এক এক বার এক এক দিক থেকে শেয়ালের ডাক। শব্দ শুনেই বোঝা যাচ্ছিল শেয়ালের সংখ্যা অনেক। যদিও বৃন্দাবনের সীমানায় কাঁটাতারের বেড়া দেয়া, কিন্তু সীমানা ঘেঁষা জঙ্গলে শেয়ালের চলাচলের আওয়াজ পাওয়া যাচ্ছে।
এর মধ্যে আমি আর সবুজ ভাই রাত প্রায় ৩টা পর্যন্ত টর্চ আর লাঠি হাতে ঘোরাঘুরি করলাম। বেশ কয়েকবার শেয়ালের সাথে সাক্ষাৎ হল। আমাদের দেখে ভয় পাওয়া তো দুরে থাক উল্টা সরাসরি চোখের দিকে তাকিয়ে থাকলো। টর্চের আলোয় তাদের চোখ জ্বলজ্বল করছে। ১/২ বার মোবাইলে সেই দৃশ্য ধারণ করতে সমর্থ হওয়ার পর আমরা ক্ষান্ত দেই। ক্যাম্পসাইট গাছপালায় ঘেরা থাকায় সকালে সূর্য মামা খুব একটা ডিস্টার্ব করতে পারে নাই।

সকালে আমি লেট করে ঘুম থেকে উঠে দেখি কফির পর্ব চলছে আর আঙ্কেল বাকি ক্যাম্প মেটদের সাথে গল্প করছেন। হাতমুখ ধুয়ে সকালের নাস্তা শেষে করলাম। রাতের শেয়াল আভিজান নিয়ে সকালেও গল্প চললো। মাচায় বসে গল্পে গল্পে সময় পার করে দুপুরের মধ্যেই আমরা ক্যাম্পসাইট থেকে আমাদের সবকিছু গুছিয়ে নিলাম। ফেরার পথে বৃষ্টি হানা দিলেও দুপুরের টাইমে রাস্তায় গাড়ির সংখ্যা তুলুনামুলকভাবে কম ছিল।
৩টায় রওয়ানা দিয়ে সাড়ে ৪টায় উত্তরা পৌছে গেলাম। বৃন্দাবনে ক্যাম্পিং এর পাশাপাশি সীমিত সংখ্যক এসি রুমসহ মাটির ঘর রয়েছে। শীতকালীন ক্যাম্পিং এর জন্যে ঢাকার কাছে আদর্শ একটা ক্যাম্পসাইট বৃন্দাবন। যেখানেই ঘুরতে যাই না কেন, পরিবেশ, স্থানীয় মানুষদের ক্ষতি করে এমন কিছু করব না বা অন্যদের করতে নিরুৎসাহিত করবো। যেখানে সেখানে ময়লা ফেলবো না।

আমাদের ক্যাম্পিং চলাকালে ব্যবহৃত সকল প্লাস্টিক/নন ডিসপোজেবল / পরিবেশের ক্ষতি করে এমন কোন কিছুই আমরা ক্যাম্পসাইটে ফেলে আসি নি। আমরা আসার পূর্বে ক্যাম্পগ্রাউন্ড যেরকম ছিল, আমরা আসার সময় ঠিক সেরকম করেই পরিষ্কার করে রেখে এসেছি। সব কিছুইতো বলা হলো, এবার খরচের হিসাব। বৃন্দাবনে নিজের তাঁবু নিয়ে ক্যাম্পিংয়ের জন্য খরচ জনপ্রতি ১০০ টাকা, নিজের তাঁবুতে থাকলে।
আর তাঁবু ভাড়া নিলে দুজনের জন্য ৫০০ টাকা। খাবার খরচ সকালের নাস্তা ১২০ টাকা, রাত ও দুপুরের খাবার ২৫০ টাকা থেকে ৪০০ টাকা। বুকিংয়ের জন্য তাদের ফেইসবুক পেইজে যোগাযোগ করতে পারেন https://www.facebook.com/BRIINADABON। ফোন নাম্বার 01935-084692। ক্যাম্পসাইট ছাড়াও সেখানে বেশ কয়েক ধরণের রুম আছে যার ভাড়া ১,৫০০ থেকে ২,৫০০ টাকার মধ্যে।
ফিচার ছবি: লেখক
ভ্রমনগুরু your travel adviser