মাত্র গতকালই বাংলাদেশ সরকারের মাননীয় প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা পদ্মা সেতুর উদ্বোধন করেছেন। ২৬ জুন ভোর ৬ টা থেকে জনসাধারণের জন্য খুলে দেয়া হয় স্বপ্নের পদ্মা সেতু। দক্ষিণ-পশ্চিমতো বটেই, সারা দেশের মানুষের উচ্ছাস এ সেতু নিয়ে। আমিও এর ব্যতিক্রম না। উদ্বোধনী অনুষ্ঠানে যেতে পারিনি গতকাল, আজ তাই উদ্বোধনের প্রথম প্রহরেই ছুটে যেতে ইচ্ছে করছিলো। হিসাব করে দেখলাম, অসম্ভবনা ব্যপারটা।
আগের দিন রাতেই অনুজসম হিমাদ্রীর পদ্মা সেতুর পোস্ট নিয়ে কমেন্টে কমেন্টে বলে ফেলেছিলাম ভোর বেলাতেই তাহলেই হয়ে যাক প্রথম পদ্মা সেতু ট্রিপ। সব ঠিকঠাক হবার পর ঘুমাতে গেলাম। কি আশ্চর্য, যে আমি সকাল সাড়ে সাতটায় অনেক কষ্টে এলার্ম দিয়ে উঠি, সে আমি ভোর সাড়ে চারটায় ঘুম থেকে উঠে বসে আছি। সামান্য প্রস্তুতি শেষ করে পাঁচটার একটু পরে নিচে নেমে দেখি জনম আসেনি। আরও বিশ মিনিট অপেক্ষা করার পর হাজির হলো সে।
এছাড়া পারভেজও দেরী করে আসলো। সব মিলে চার মোটরসাইকেল (দুইটা স্কুটার, একটা ভেসপা আর একটা বাইক) একত্রিত হয়ে রওনা হলাম তখন ৬টার কাছাকাছি বাজে। ভোরের প্রথম আলোয় ফাঁকা মাওয়া এক্সপ্রেসে নির্ধারিত গতিসীমা (সর্বোচ্চ ৮০ কিমি) মেনে সকাল সাড়ে ৬ টায় পৌছে গেলাম পদ্মা সেতুতে। এতদিন মাওয়া ঘাট থেকেই ফিরে আসতাম, আজ সুযোগ হচ্ছে প্রথমবার স্বপ্নসেতুর উপর দিয়ে পদ্মা পাড়ি দেবার।

দেখা গেলো শুধু আমরাই নই, হাজার হাজার মানুষ খুব ভোরে হাজির হয়েছে সেতুর টোল প্লাজায়। ফলাফল প্রায় তিন কিলোমিটার লম্বা ট্রাফিক জ্যাম! বাইক নিয়ে যাওয়ার সুবিধা পেয়েছি আমরা, সার্ভিস রোড ধরে জ্যাম এড়িয়ে একেবারে টোলপ্লাজায় হাজির হলাম। মোটর সাইকেলের জন্য একটি মাত্র লেইন। সেটার সামনে অন্তত দু’শ মোটরসাইকেল দাঁড়িয়ে আছে। ধীর গতিতে এগুচ্ছে লাইন।
আসলে কিন্তু পুলিশ আর টোল প্লাজার কর্মকর্তারা সর্বোচ্চ চেষ্টা করছেন দ্রুত গতিতে টোল দিয়েই গাড়িগুলোকে পার করে দিতে। আজ উদ্বোধনী দিনের অস্বাভাবিক ভিড়ের জন্য বিষয়টা সহজ হচ্ছেনা। অবশেষে প্রায় ৩০ মিনিট অপেক্ষা করে পার হতে পারলাম টোল প্লাজা। উঠে গেলাম স্বপ্নের পদ্মা সেতুতে। তিন বছর চাকুরী করেছি দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলে, কত রাত কেটেছে ফেরী ঘাটে তার ইয়ত্তা নেই।

লঞ্চ পারাপারের ভোগান্তিু কম ছিলোনা। হঠাৎ ঝড় উঠলে প্রমত্তা পদ্মার বুকে লঞ্চকে একটা কাগজের নৌকা মনে হতো। আজ এ প্রমত্তা পদ্মার বুকে বিস্ময়কর ৬.১৫ কিমি লম্বা সেতু পার হয়ে যাবে ৬ মিনিটে, এটা ভাবতেই শিহরিত হচ্ছিলাম। টোল প্লাজা পার হয়ে সেতুতে উঠার আগে কয়েক মিনিট দাঁড়িয়েছিলাম, বাকিদের জন্য। সবাই আসলে রওনা হলাম সেতু ধরে। এ অনুভূতি ভাষায় প্রকাশের মতো না।

শুধু আমি নই, সেতুতে থাকা প্রতিটি যানবাহন থেকে মানুষের উচ্ছাস দেখছিলাম। প্রায় সবাই স্মৃতিটুকু নিয়ে রাখছেন নিজেদের মোবাইলে। সকালের রোদ পড়ছে প্রমত্তা পদ্মার বুকে, মাঝে মাঝে দেখা মিলছে চরগুলোর, দূরের আকাশে মেঘের ঘনঘটা। তবে আজ আর মেঘ দেখে ভয় হচ্ছিলোনা, কারণ আমরা যে সেতুর উপর দিয়ে যাচ্ছি। প্রশস্ত দুই লেইনের পাশে বেশ বড় একটা সার্ভিস লেইনও আছে পদ্মা সেতুর।

আগেই ঘোষণা করা হয়েছিলো সেতুর উপর দাঁড়ানো যাবেনা, আমরাও সেভাবে চলে যাচ্ছিলাম। কিন্তু সেতুতে উঠে দেখলাম বলতে গেলে সব গাড়ি, মোটরসাইকেল দাঁড়াচ্ছে সার্ভিস লেইনে। আজ আবেগ-উচ্ছাসে অন্তত একটা ছবি তোলার জন্য হলেও সবাই দাঁড়াচ্ছে। আমরাও থামলাম, দ্রুত কয়েকটা ছবি তুলে আবার রওনা হলাম। নির্ধারিত গতিসীমা মেনেই সেতুতে চালাচ্ছি, বেশিরভাগ যানবাহনই খুব আস্তে চালাচ্ছে, এত দ্রুত পার হয়ে যেতে চাচ্ছেনা।
এদিকে দেখলাম পেট্রোল পুলিশ এসে সেতুর উপর দাঁড়ানো সবাইকে চলে যেতে অনুরোধ করলো। আস্তে আস্তে ফাঁকা হতে শুরু করলো সেতু। এর মধ্যে সেতুর বাঁকানো অংশে এসে পৌছেছি আমরা। সুদূর বিস্তৃত সেতুর শেষ প্রান্ত তখনো দেখা যাচ্ছেনা। গতি বাড়ালাম হিমুর তাড়ায়, দ্রুততার সাথে বাকি অংশ শেষ করে জাজিরা প্রাস্তে পৌছে গেলাম। দাঁড়িয়ে থাকা সময় বাদ দিলে মাত্র ৬ মিনিটেই পদ্মা পার, নিজের চোখকেও বিশ্বাস হচ্ছেনা।

এরপর ঘটলো আসল ঘটনা। হিমু আর তার বৌ চন্দ্রিমা জানালো তারা তাদের বাড়ি গোপালগঞ্জ চলে যাবে! বাড়ির এত কাছে এসে এখন না যেয়ে পারছেনা!! দলের অন্য সদস্য পারভেজও যোগ দিলো তাদের সাথে। আমি, জনম আর রানা অফিসে ফিরতে হবে, তাই কালক্ষেপণ না করে ফিরতি পথ ধরলাম। ঘড়ির কাটায় তখনো সাড়ে সাতটা বাজেনি। জাজিরা প্রান্ত থেকে ঘুরে আবার নতুন করে টোল দিয়ে সেতুতে উঠলাম।
এর মধ্যে রানা আবার পিলিয়ন হিসেবে আরেকজন যাত্রীকে তুলে নিলো, কত টাকা দিবে সেটা ঠিক না করেই! পার হবার পর দেখা গেলো রানাকে সেই ভদ্রলোক ২০০ টাকা দিলো। আমি বললাম তোমার তো টোলের টাকা উঠে গেলো। ফিরে আসার সময় পদ্মা সেতুর উপর একবারের জন্য থামিনি। কিন্তু দেখলাম এমন কেউ নেই যে থামছেনা। পদ্মা সেতু তীর বেগে পার হয়ে মাওয়া এক্সপ্রেস ধরে বাসায় চলে আসলাম ৮:৪৫ এ, যাক অফিসের দেরী হলোনা।
অবশ্য হানিফ ফ্লাইওভারে হঠাৎ চাকা ভয়াবহ শব্দ করে উঠলো। থামিয়ে কোন সমস্যা দেখতে পাচ্ছিলামনা, কিন্তু জনম প্রায় চার ইঞ্চি লম্বা একটা তারকাটা খুঁজে বের করলো। এটার কারণেই এই আওয়াজ, তবে সৌভাগ্যবশ্যত টিউবলেস টায়ার হবার কারণে পাংচার হয়নি। অবশেষে বহাল তবিয়তে বাসায় আসলাম, তবে সেই সাথে এটাও শিক্ষা নিলাম যাদের বাড়ি গোপালগঞ্জ, তাদের সাথে পদ্মা সেতু দেখতে যাওয়া যাবেনা। সেতু পার হয়ে বলবে আর এক ঘন্টা দূরত্বে আমার বাড়ি, সেখান থেকে ঘুরে আসি!
ফিচার ছবি: Sahadat Parvez
ভ্রমনগুরু your travel adviser