স্মরণ: অ্যাডভেঞ্চার গুরু কাজী হামিদুল হক

কাজী হামিদুল হককে চিনে এমন লোকের সংখ্যা খুব কম। কিন্তু তাঁর দেয়া ”বাংলা চ্যানেল” নাম জানেনা এমন লোক কম আছে। এদেশের তরুণ প্রজন্মের অ্যাডভেঞ্জারের ‍গুরু ছিলেন হামিদুল হক। ২০১৩ সালের ১৯ ফেব্রুয়ারী শেরপুরে থেকে ঢাকা ফেরার পথে বাসেই মারা যান তিনি। আজ তাঁর মৃত্যুবার্ষিকীতে জেনে নেই উনার সম্পর্কে।

বাংলাদেশের অ্যাডভেঞ্চার প্রিয় মানুষের পথপ্রদর্শক ছিলেন হামিদুল হক। ১৯৪৭ সালের ১৭ই সেপ্টেম্বর জন্মগ্রহণ করেন তিনি। ভুতত্ববিদ মসির উদ্দিন কাজী ও কাজী রাবেয়া খাতুনের চার ছেলে ও দুই মেয়ের মধ্যে তিনি ছিলেন চতুর্থ। হামিদুল হক ঢাকার জগন্নাথ কলেজ থেকে উচ্চমাধ্যমিক ও পাঞ্জাব বিশ্ববিদ্যালয় থেকে মনোবিজ্ঞানে স্নাতক ডিগ্রি অর্জন করে। এরপর ১৯৬৭ সালে চলে যান যুক্তারাষ্ট্র।

১৯৭৪ সালে সেখানকার আর্ট ইনস্টিটিউট অব বোস্টন থেকে আলোকচিত্রে স্নাতক ডিগ্রী অর্জন করেন। স্নাতক শেষ করার পর চলচিত্র নির্মাণ বিষয়ে কোর্স করে নিউইয়ার্ক থেকে। ১৯৭৪ সাল থেকে যুক্তরাষ্ট্রে তিনি কমার্শিয়াল ফটোগ্রাফীতে কর্মজীবন শুরু করেন। সত্তরের দশরেক মাঝামাঝিতে ডুবসাঁতারে আগ্রহ তৈরী হয় তাঁর, আর এভাবেই শিখে নেন পানির নিচের জগতের ছবি তোলার নানা কলা কৌশল। সাগরের ২০০ ফিট নিচ পর্যন্ত ডুব দেওয়ার লাইসেন্সধারী ডাইভার ছিলেন তিনি।

১৯৯১ সালে তিনি বাংলাদেশে ফিরে আসেন এবং ১০৭ নং আজিমপুর রোডস্থ পুরনো পৈত্রিক বাড়িতে বসবাস শুরু করেন। পরবর্তীতে তিনি গড়ে তুলেছিলেন ‘এক্সট্রিম বাংলা’ নামের একটি সংগঠন। এক্সট্রিম বাংলা থেকে সাঁতারের আয়োজন ও নানা রকম অভিযান পরিচালনা করতেন, তুলতেন দেশের উপর বৈচিত্র্যময় ছবি।

মীর শামসুল আলম বাবু ভাইয়ের সাথে কাজী হামিদুল হক। ছবি হামিদা আক্তার।
পানির নিচের ছবি তোলায় বাংলাদেশে তাঁকে পথিকৃৎ বলা যায়। অ্যাডভেঞ্চার প্রিয় তরুণদের সাঁতার ও আন্ডারওয়াটার ফটোগ্রাফিতে নিয়মিত প্রশিক্ষণ দিয়েছিলেন। সেন্টমার্টিনে সাগরতলে তিনি প্রবালের ছবি তুলেছেন। প্যানারোমিক ছবির ব্যাপারেও ছিল তাঁর ব্যাপক আগ্রহ। ঘুড়িতে ক্যামেরা বসিয়ে ওপর থেকে ঢাকা শহরের ছবি তোলার পরিকল্পনা করেছিলেন কাজী হামিদুল হক। ভালোবাসতেন প্রজাপতি, পাখি ও প্রকৃতি।
প্রজাপতির জীবনচক্র নিয়েও কাজ শুরু করেছিলেন তিনি। ২০০০ সালে তিনি আধুনিক প্রযুক্তির সাহায্যে বাংলাদেশের সর্ব উচ্চতায় অবস্থিত বান্দরবানের প্রাকৃতিক হ্রদ বগালেক এর গভীরতা নির্ণয় করেন ১৫১ ফুট। ২০০৪ সালের ডিসেম্বরের শেষ সপ্তাহে বুড়িগঙ্গা নদী থেকে তাঁর নেতৃত্বে একটি দল নিয়ে তিনি নৌকায় পাড়ি দেন বঙ্গোপসাগরের উদ্দেশে। ১৩ জন অভিযাত্রী নিয়ে হামিদুল হকের এমন অভিযান এই দেশে এই কালে এক অভূতপূর্ব অ্যাডভেঞ্চার অভিজ্ঞতা।
তিনি ছুটে বেড়িয়েছেন কক্সবাজার, টেকনাফ, সেন্টমার্টিন এলাকায়, চষে বেড়িয়েছেন বঙ্গোপসাগরের অতল জগৎ। এক সময় টেকনাফের শাহপরীর দ্বীপ থেকে সেন্টমার্টিনস পর্যন্ত একটি সাঁতারের রুট তিনি খুঁজে বের করেন। ২০০৬ সালের জানুয়ারির মাঝামাঝি একটি দল তাঁর প্রশিক্ষণ ও উৎসাহে শাহপরীর দ্বীপ থেকে বঙ্গোপসাগরে ১৬.১ কিলোমিটার সাঁতার কেটে পৌঁছায় সেন্টমার্টিন দ্বীপে। তিনি সাঁতারের এপথের নামকরণ করেন ‘বাংলা চ্যানেল’।
সেন্টমার্টিনে স্কুবা ডাইভিংয়ের সময় ২০০০ সালে ছবিটি তুলেছেন মীর শামসুল আলম বাবু
এরই ধারাবাহিকতায় তাঁর নেতৃত্বে আরও কয়েকবার এ সাঁতার অভিযান সফলভাবে পরিচালিত হয়। এরপর কয়েকবার বাংলা চ্যানেল পাড়ি দিয়েছেন দেশি-বিদেশি অনেকেই। বাংলা চ্যানেল প্রতিষ্ঠা ও নামকরনের জন্য তাঁকে স্মরণ করবো আগামী দিনেও। তিনি শিখিয়েছিলেন আমাদের তরুণদের যে, তাদের ইচ্ছার পূর্ণতা ও অসাধ্য স্বাধন এ দেশেও সম্ভব।
তিনি ছিলেন আপাদমস্তক একজন রোমাঞ্চপ্রেমী। একজন প্রকৃত অভিযাত্রীর মতো নিজের জীবনকে নানা খাতে বইয়ে দিয়েছেন কাজী হামিদুল হক। তারুণ্যের পুরো শক্তি ও উদ্যম ছিল তাঁর মধ্যে আমৃত্যু। নানান স্বপ্নের দ্রষ্টা এই মহান উদ্যমী চিরসবুজ অনুকরণীয় সত্ত্বা তাঁর অনেক স্বপ্ন বাস্তবায়নের পূর্বেই ২০১৩ সালের ১৯ ফেব্রুয়ারি ৬৪ বছর বয়সে ইহলোক ত্যাগ করেন। তাঁর সম্পর্কে আরো জানতে এই ফেইসবুক পেইজ ফলো করতে পারেন।
ছবি ও তথ্য: কাজী হামিদুল হকে পেইজ থেকে

About Mohammad Shariful Islam

Check Also

কিলিমানজারো ট্রেকিং তথ্য

শরৎচন্দ্রের “চাঁদের পাহাড়” বইটি কি কখনোও পড়েছিলেন? অথবা জনপ্রিয় এমিনেশ মুভি “মাদাগাস্কার ২: এসকেপ টু …

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *