হুট-হাট প্ল্যানে কুমিল্লা রাইড ও ক্যাম্পিং

শুক্র শনিবার কোথায় যাওয়া যায় সেটা নিয়ে পরিকল্পণা করছিলাম বুধবার রাতে। Aprilia Riders Club Bangladesh মূলত বাংলাদেশে এপ্রিলিয়া মোটসাইকেল যারা চালায় তাদের একটি অনলাইন প্ল্যাটফর্ম। হাতে গোণা অল্প কিছু মানুষ ইতালিয়ান অরিজিন এ ব্র্যান্ডটির মোটরাইকেল চালায়। ক্লাবের সদস্যদের সাথে কথা বলে ঠিক করলাম শুক্র-শনিবার চলে যাবো কুমিল্লা, সেখানে আশেপাশে ঘোরাঘুরি করে ময়নামতি অ্যাডভেঞ্চার ক্যাম্পে রাতে ক্যাম্পিং করবো।

মোটরাবাইকে হাইওয়েতে চালানোর অভিজ্ঞতা আছে এমন রাইডারদেরকেই শুধু আমন্ত্রণ জানালাম। ক্যাম্পসাইট পর্যন্ত দূরত্ব ১১০ কিলোমিটারের মতো। প্রায় পুরো রাস্তাটাই ঢাকা-চট্টগ্রাম হাইওয়ে (এন ওয়ান)। সাধারণত আমরা খুব সকালে রাইড শুরু করি, কিন্তু এবার যেহেতু ফেরার তাড়া নেই, যারা যাবো তারা কয়েকজন মিলে ঠিক করলাম সকাল ৯ টায় আস্তে ধীর ঢাকা থেকে রওনা দিলেই হবে।

গ্রুপ থেকে মাত্র তিনজন কনফার্ম করলো। আসলে এ ধরণের ক্যাম্পিং ট্রিপের জন্য আগেভাগে ঘোষণা দেয়া দরকার ছিলো। তবে যেটা হয়, ক্যাম্পিং ট্রিপের কথা শুনে দলবল বড় হতে শুরু করলো। বর্তমান সময়ে দেশে ক্যাম্পিং দিন দিন জনপ্রিয় হয়ে উঠছে। কিন্তু অনেকেরই ক্যাম্পিংয়ের জন্য প্রয়োজনীয় গিয়ার্স না থাকার কারণে যেতে পারেনা। এই ট্রিপে এসব নিয়ে চিন্তা করতে হয়নি আমাদের।

ক্যাম্পসাইটে

কারণ কুমিল্লায় গড়ে উঠা এ ক্যাম্পসাইটটিতে সব ব্যবস্থায় আছে। ক্যাম্পসাইটে তাঁবুতে থাকা, চিকেন বার-বি-কিউ, রাতের খাবার, আর সকালের নাস্তা মিলে খরচ ৭০০ টাকা। ফোন করে সাইটে বুকিং দিয়ে রাখলাম। সকালে টিএসসিতে তিন মোটরসাইকেল একত্রিত হয়ে রওনা দিলাম কুমিল্লার উদ্দেশ্যে। হানিফ ফ্লাইওভার দিয়ে যাত্রা করে কিছুক্ষণের মধ্যে সাইনবোর্ডে এসে আগে থেকে অপেক্ষা করা মুসা ও মাসুমকেও দলে পেলাম।

ওদের দুজনেই কাছেই এই হাইওয়ে সকালের নাস্তার মতো ব্যপার, প্রায় প্রতিদিনই ব্যবহার করতে হয়। মুসা অবশ্য আমাদের সাথে পুরো পথ যাবেনা, সে যাচ্ছে চাঁদপুর। আবার শুরু করলাম সবাই। আগের দিন রাতেই আমি তেলের ট্যাংক পরিপূর্ণ করে রেখেছি। কয়েকদিন আগে সার্ভিসিংও করা ছিলো। হাইওয়েতে চমৎকারভাবে চললো এপ্রিলিয়া স্কুটার।

একটা কথা বলতেই হয়, বাংলাদেশে হাইওয়েতে চালানোর জন্য এপ্রিলিয়ার মতো স্কুটারের বিকল্প পাওয়া কঠিন। ঢাকা শহরে কঠিন জ্যামের মধ্য দিয়ে যেভাবে সহজেই চালানো যায়, একই ভাবে হাইওয়েতে এপ্রিলিয়া দারুণ। বিশেষত রেডি পিক আপ, দূর্দান্ত কন্ট্রোল আর ব্রেকিং মিলে যে কোন ধরণের মোটরবাইকের গ্রুপের সাথে সহজেই রাইড দেয়া যায় এ স্কুটার দিয়ে। তবে সাধারণ অন্যান্য স্কুটারের চেয়ে তেলের খরচ একটু বেশিই।

আমি অবশ্য এগুলো জেনেই কিনেছিলাম Aprilia SR 150 মডেলের এই স্কুটারটি। আমার স্ত্রীপুত্র নিয়ে যেভাবে ঢাকা শহরে যেভাবে চালাচ্ছি সেভাবেই আবার লম্বা লম্বা রাইড দিচ্ছি বিভিন্ন জায়গায়। ফিরি আজকের গল্পে। হাইওয়েতে মোটামুটি ৮০ কিমি স্পিড ধরে এগুচ্ছি আমরা, যদিও চাইলেই সহজে ১১০ তোলা যায়, কিন্তু এ গতিতেই সবাই সহজে এগুতে পারছে। শুক্রবারের রাস্তায় তূলনামূলক ভিড়ও কম।

ময়নামতি অ্যাডভেঞ্চার ক্যাম্প

কুমিল্লা ক্যান্টনমেন্ট থেকে আমাদের সাথে যোগ দিলো জুয়েল। আর কুমিল্লা বিশ্বরোডের কাছে এসে যোগ দিলো উষা ভাই, বাকি পথ তিনি আমাদের গাইড করে নিয়ে আসলে শালবেনর মধ্যে অবস্থিত ময়নামতি অ্যাডভেঞ্চার ক্যাম্পে। সবাই একটু ফ্রেশ হয়ে হ্যামক টাংগিয়ে শুয়ে শুয়ে রেস্ট নিলাম। এর মধ্যে আমাদের দুপুরের খাবারের অর্ডার দিয়ে দিলাম। দুপুরে ভাত, মুরগী, সবজি, ভর্তা, ডাল দিয়ে খেয়েই দৌড় দিলাম আমরা।

প্রথমে গেলাম বৌদ্ধ মন্দিরে। ক্যাম্পসাইট থেকে কয়েক মিনিটের দুরত্বে অবস্থিত এ মন্দির থাইল্যান্ডের অর্থায়নে নির্মিত। দেশে এ ধরণের নির্মাণশৈলীর কোন বৌদ্ধ মন্দির আমার চোখে পড়েছে মনে পড়লোনা। ২০ টাকা টিকেট কেটে আমরা সবাই মন্দির ঘুরে দেখে নিলাম। গৌতম বুদ্ধের একটি ভাস্কর্য আছে মন্দিরের সামনে। সিঁড়িগুলোতে রয়েছে কারুকার্য খচিত নাগরাজ। তবে পাথরের বুদ্ধের মূর্তিটাই সবচেয়ে সুন্দর মনে হয়েছে আমার কাছে।

বৌদ্ধ মন্দিরের অন্দরমহল

এদিকে বেলা প্রায় শেষ হয়ে আসছে, অনেকটা দৌড়ে দৌড়েই গেলাম আমরা ময়নামতি বৌদ্ধ বিহারে। বিশালাকার এ বিহার দেখে অবাক না হয়ে পারলামনা। কীভাবে আমি এতদিন ধরে কুমিল্লায় দেখার এত সব সুন্দর জায়গাগুলোতে গেলামনা সেটাই চিন্তা করলিছাম। এর মধ্যে সূর্য ডুবে ডুবে অবস্থা, তাই বেশিক্ষণ সেখানে থাকতে পারলামনা। সেখান থেকে বের হয়ে ম্যাজিক প্যারাডাইজের সামনে থেকে ঘুরে চা খেয়ে আবার ক্যাম্পসাইটে।

ময়নামতি বৌদ্ধ বিহার

ক্যাম্পফায়ার শুরু হবার পর শুরু হলো আড্ডা। এর মধ্যে প্রস্তুত হচ্ছিল রাতের জন্য চিকেন বার-বি-কিউ। পরোটর, সালাদ, আর চিকেন খেয়ে আমরা ছোট একটা রাইড দিলাম কুমিল্লা ক্যান্টনমেন্ট পর্যন্ত। ঘুরে ফিরে চা খেয়ে আবার ফিরে আসলাম ক্যাম্পসাইটে। শুরু হলো আড্ডা আর গান। অভিজিতদাকে ধন্যবাদ দিতেই হয়, একের পর এক দারুণ সব গান গেয়ে আড্ডা জমিয়ে রাখলো সে।

এর মধ্যে আমাদের সবার জন্য তাঁবু প্রস্তুত হয়ে গেছে। যার যার তাঁবুতে শুয়ে পড়লাম সবাই। শীতের সময় তাঁবুতে থাকার মজা হচ্ছে শীতকে নিয়ন্ত্রণ করা সম্ভব কিন্তু গরমকে প্রায় অসম্ভব। চমৎকার ঘুম দিয়ে সকালে উঠে গরম গরম তেহারি খেয়ে ছোটনকে বিদায় জানিয়ে আমরা শুরু করলাম ফিরতি পথ। সাড়ে নটায় যাত্রা করে মাত্র দুঘন্টা সময়ে একেবারে বাসায় চলে আসলামে হেসে খেলে চালিয়ে।

এপ্রিলিয়ার স্কুটার/মোটরবাইক থাকলে বা এগুলো ব্যপারে আপনার আগ্রহ থাকলে যোগ দিতে পারেন এই গ্রুপটিতে

কুমিল্লার ময়নামতি অ্যাডভেঞ্চার ক্যাম্পে ক্যাম্পিং করতে চাইলে তাদের ফেইসবুক পেইজে নক দিতে পারেন: https://www.facebook.com/CSCPBD

ফিচার ছবি লেখক

About Muhammad Hossain Shobuj

Check Also

কোন দিকে যাচ্ছে সেন্টমার্টিনের পর্যটন?

জাপান থেকে আনা বিলাসবহুল জাহাজ পৌঁছে গেছে বাংলাদেশে, এ খবর এখন পুরণোই। বাংলাদেশে এ ধরণের …

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *