হুট-হাট করে নারায়ণগঞ্জে ক্যাম্পিং

শীতকালটা শেষ হয়ে যাচ্ছে। লম্বা-চওড়া যতগুলো ক্যাম্পিংয়ের চিন্তা করেছিলাম সেগুলো বাস্তবায়নের কোন সম্ভাবনাই দেখছিনা। এর মধ্যে জুয়েল প্রস্তাব দিলো নারায়ণগঞ্জের লাঙ্গলবন্ধে একটা ক্যাম্পিং করা যায়। ঢাকা থেকে খুব কাছে, সেখানে মাসুদ রানা ভাই একটা ক্যাম্পিং সাইট বানানোর চিন্তা করছে। আপাতত জায়গাটা খালি পড়ে আছে, আমাদেরকে ওপেন দাওয়াত দিয়ে রেখেছেন। যাবো যাবো করেও যাওয়া হচ্ছিলোনা।

নদীর পাড়টা খুবই সুন্দর ছবি জুয়েল

জুয়েলের প্রস্তাব শুনে লুফে নিলাম। বৃহস্পতিবার অফিস শেষ হবার পর বিকেল পাঁচটার পরে স্কুটার নিয়ে রওনা দিলাম লাঙ্গলবন্ধের উদ্দেশ্যে। বাসা বের হয়ে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ভেতর দিয়ে যেয়ে হানিফ ফ্লাইওভারে উঠলাম। তেমন কোন ভিড় নেই, মাঝামাঝি স্পিডে চালিয়েই সাইনবোর্ড পার হয়ে তেল নিলাম। এরপর ঢাকা-চট্টগ্রাম হাইওয়ে ধরে ছুটলাম লাঙ্গলবন্ধের দিকে। সোঁনারগাঁওয়ে সামান্য যানজট ছাড়া বাকি রাস্তা সহজেই পার হয়ে আসলাম।

নতুন কেনা তাঁবুর নিয়ে প্রথম ক্যাম্পিং

লাঙ্গলবন্ধ বাজারে এসে মাসুদ রানা ভাইয়ের দেখা মিললো। সে বাজার থেকে মুরগি, বার বি কিউ মশলা সহ বাকি জিনিসপত্র কিনে আর ২ কিমি চালিয়ে হাজির হলাম ক্যাম্পসাইটে। হিন্দু ধর্মালম্বীদের কাছে লাঙ্গলবন্ধ ধর্মীয়  গুরত্ব বহন করে। এখানে পূণ্যস্নানের জন্য অনেকেই হাজির হন। কিছুক্ষণ পর পরই দেখা মিলছিলো ঘাটের। আমরা যেখানে ক্যাম্প করেছি তার ঠিক পাশেই কালী মন্দির। দেখতে অনেকটাই বছরখানেক আগে ঘুরে আসা মুন্সীগঞ্জের জোড়া মঠের মতো।

তৈরী হচ্ছে বার-বি-কিউ

নদীর পাড়ে গাছ-পালা ঘেরা জায়গায় আমরা তাঁবুটা সবার আগে পাতিয়ে ফেললাম। বৃষ্টির আশংকা ছিলো, তাই ওয়াটারপ্রুফ তাঁবুটাই এনেছি সংগে। গাছেও হ্যামক ঝুলিয়ে দিলাম, যাতে বার-বি-কিউ করার ফাঁকে কিছুক্ষণ বিশ্রামও নেয়া যায়। জুয়েল রানা ও মাসুদ রানা লেগে পড়লো বার-বি-কিউ তৈরীতে। রাধুনীর মশলা নিয়ে এসেছিলাম, কিন্তু মাসুদ হাতে বাটা মসলা দিতে বললো। সেটা দিলেই নাকি বেশি মজা হবো। দুজনে মিলে মেরিনেট করার পর আমরা প্রস্তুতি নিলাম আগুন জ্বালানোর।

হাত লাগালাম সবাই। আমার সাথে মাসুদ রানা

সাইটেই কয়লা রাখা আছে আর আমি সংগে করে আমার বার-বি-কিউ চুলার শুধু উপরের জালিটা ব্যাগে করে নিয়ে এসেছি। কয়লায় আগুন ধরাণোর পর নেমে পড়লাম বার-বি-কিউ করার কাজে। ধারণাই করতে পারিনি এতো অল্প কয়লা এরকম তাপ দিতে পারে। ফলাফল মুরগীর টুকরো দেয়া মাত্র পুড়ে যাচ্ছিলো। এরপর কিছু কয়লা কমিয়ে তাপমাত্রা কিছুটা নিয়ন্ত্রণে আনা গেলো। রাত সাড়ে নটার মধ্যে দারুণ বার-বি-কিউ প্রস্তুত হয়ে গেলো। এবার বাজার থেকে কিনে আনা পরোটাও চাপিয়ে দিলাম কয়লার আগুনে, সেগুলো গরম হয়ে গেলে দারুণ রাতের খাবার তৈরী হয়ে গেলো।

ক্ষুধা বেশি লাগলো না মাসুদের মশলার কারসাজি, নাকি জুয়েলের মেরিনেট ঠিক নিশ্চিত না, তবে দারুণ একটা বার-বি-কিউ হলো। খেয়েদেয়ে মাসুদের সাথে অনেক্ষণ আড্ডা দিলাম। মাসুদ রানার পরিচয়টাও দেয়া দরকার। শ্রবণ প্রতিবন্ধী মাসুদ রানা দারুণ একজন প্রতিভাবান ব্যক্তি। এ সাইটটি তৈরীতে নামকরণ থেকে টেকনিক্যাল ব্যাকস্টপিংয়ের কাজটা তাঁর করা। কথা না শুনলেও আমাদের ঠোঁট নাড়ানো দেখেই বুঝে ফেলে আমরা কী বলেতে চাচ্ছি। ফলে আলাপ চালিয়ে যাওয়াটা সম্ভব হয়।

রাত ১১ টার দিকে মাসুদ রানার বিদায়ের পর আমি আর জুয়েল ভালোমতো সাইটটা ঘুরে দেখলাম। নদীটা এখানে এসে সাইটের পাশে একটি পুকুরও তৈরী করেছে। বর্ষার সময় প্রাকৃতিকভাবে পুকুরের সাথে নদীর সংযোগ তৈরী হয়ে যায়। ফলে এখানে প্রচুর দেশী মাছও পাওয়া যায়। একটা নৌকাও আছে, তবে এখনো উদ্বোধন করা হয়নি। আমার দৃষ্টিতে কায়াকিংয়ের জন্য চমৎকার জায়গা হতে পারে শান্ত এ নদীটা। আশেপাশে বেশ কয়েকটি মন্দির আছে। এছাড়া হাজীগঞ্জ দূর্গও বেশি দূরে নয়। সব মিলে দারুণ একটা ক্যাম্পসাইট হিসেবে গড়ে তোলা সম্ভব।

ঝটপট তৈরী হয়ে গেলো কফিও ছবি জুয়েল

রাতে তাঁবুতে ঘুমিয়ে সকাল ৮টার দিকে ঘুম ভাংগলো আমার। পাখির ডাকে ঘুম ভাংগার পর কতক্ষণ সময় লাগলে বুঝতে কোথায় আছি আমি। বাইরে বের হয়ে মুগ্ধ হয়ে গেলাম। গত সন্ধ্যায় নদীর রূপ প্রায় কিছুই বোঝা যায়নি, যেটা এখন বোঝা যাচ্ছে। এত চমৎকার সুন্দর নদীর পাড়ের জায়গা। এছাড়া জোড়া মঠটাও দেখতে অনেক সুন্দর। এ বেলা প্রথম কাজ নাস্তা যোগাড় করা। আমি হাত-মুখ ধুয়ে মূল সড়কে যেয়ে ডিম, পাউরুটি আর সবজি নিয়ে আসলাম নাস্তার জন্য। এর মধ্যে জুয়েল উঠে আগুনের ব্যবস্থা করলো। শুরু হলো ব্রেকফাস্টের আয়োজন। এর মধ্যে মাসুদও আমাদের জন্য ডিম ও রুটি নিয়ে হাজির।

দারুণ ব্রেকফাস্ট রেডি

আগুনের ধরানোর পর কেতলিতে কফি চড়িয়ে দিয়ে জুয়েল লেগে পড়লো ডিম ভাজি করার জন্য। এর মধ্যে কয়লার আগুনে কিছু সবজি কেটে বিছিয়ে দেয়া হলো। এবার টমেটোর সাথে কাঁচা মরিচ কুঁচি করে কেটে তৈরী কার হলো ডিমের মামলেট। কিছুক্ষণের মধ্যে টোস্ট করা পাউরুটি, ডিম মামলেট আর পোড়া সবজি দিয়ে দারুণ ব্রেকফাস্ট তৈরি হয়ে গেলো। পেট পুরে খেয়ে হ্যামকে বসে কফিতে চুমুক দিয়ে মনে হচ্ছিলো এমন জীবনইতো চেয়েছিলাম।

পরের সপ্তাহের অন্য ট্রিপের ছবি, কিন্তু সেটাতে আমি ছিলামনা ছবি জুয়েল

ব্রেকফাস্ট শেষ করে এবার বিদায়ের পালা। সবারই অনেক কাজ আছে, তাই দেরী না করে আবার সব গুছানো শুরু করলাম। জুয়েল নদীতে নেমে ক্রোকারিজগুলো ধুয়ে নিয়ে আসলো। আমি তাঁবু খুলে ভাজ করে ব্যাগের মধ্যে ঢুকিয়ে নিলাম। আর মাসুদ রানা আগুন নেভাতে সাহায্য করলো। সব কিছু আবার স্কুটারে তোলা হলে এবার ফেরার পালা। সাইট থেকে রওনা দিয়ে মাত্র এক ঘন্টার মধ্যেই আবার বাসার ফিরে আসলাম। ঢাকা শহরের আশেপাশে এরকম কিছু ক্যাম্পসাইট দরকার, যেখানে আমরা হঠাৎ প্ল্যান করেই ক্যাম্পিং করতে পারবো।

এই সাইটে কেউ ক্যাম্পিং করতে চাইলে যোগাযোগ করতে হবে মাসুদ রানার সাথে। যেহেতু ফোনে তাকে পাওয়া সম্ভব নয়, ফেইসবুক প্রোফাইল লিংক দিলাম: https://www.facebook.com/acimasud

আর রান্নার আয়োজনে ব্যবহৃত জিনিপত্র (ক্রোকারিজ, কেতলি, চুলা ও গ্যাসের ক্যান নেয়া হয়েছে Outdoors Bd থেকে।

ফিচার ছবি সহ সব ছবি জুয়েল রানা

About Muhammad Hossain Shobuj

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের অর্থনীতি বিভাগ থেকে মাস্টার্স শেষ করে পরবর্তীতে আইবিএ থেকে এক্সিকিউটিভ এমবিএ করেছেন। বর্তমানে যুক্তরাষ্ট্রভিত্তিক একটি উন্নয়ন সংস্থায় কাজ করেন। লেখালেখিটা শখের কাজ, ঘোরাঘুরিও। এ পর্যন্ত দেশের ৬৩ টি জেলা ও ১২ দেশে ঘুরেছেন।

Check Also

গাজীপুরের বেইজ ক্যাম্পে অ্যাডভেঞ্চার ক্যাম্পিং

অনেকদিন ধরেই গাজীপুরে অবস্থিত বেইজক্যাম্পে যাওয়ার ইচ্ছা ছিলো। অ্যাডভেঞ্চার একটিভিটি দিয়ে ভরপুর এ রিসোর্টটা বাংলাদেশের …

Leave a Reply

Your email address will not be published.