বোয়ালিয়া ট্রেইল ও একটি টাইগার জোঁক

বর্ষায় অনেকের প্রিয় গন্তব্য ঝর্ণা। বিশেষ করে চট্টগ্রামের মিরসরাই-সীতাকুন্ড অঞ্চলের বারৈয়াঢালা জাতীয় উদ্যানের ঝর্ণাগুলোর জন্য বর্ষাকালই উপযুক্ত সময়। আর এ সময় ঝর্ণায় গেলে জোঁকে ধরবে এটাতো আসলে তেমন কোন ব্যপারই না। কিন্তু মাঝে মাঝে ব্যপারটা ভয়ংকরও হতে পারে। ট্রেইলের শেষ মাথায় আছেন আপনি, আর তখন আপনাকে কামড় দিলো টাইগার জোঁক বলে একটা বিশালাকারের জোঁক, আবার কোনমতেই রক্ত বন্ধ করা যাচ্ছেনা, এমন পরিস্থিতিতে পড়লে সাধারণ জোঁকের কামড়ের ঘটনাও হতে পারে ভয়ংকর ব্যপার। সে গল্পই বলবো আজকে।

গতবছরের আগস্ট মাসের কথা, ঝর্ণার সময় প্রায় শেষ হতে চলেছে। হুট করে একদিন আমরা চলে গেলাম মিরসরাই, উদ্দেশ্য বোয়াইলিয়া (বোয়াইল্যা) ট্রেইল ঘুরে কয়েকটা ঝর্ণা দেখা রাতে মিরসরাইয়ে ক্যাম্পিং করে আরো কয়েকটা ঝর্ণা দেখে পরের দিন চলে আসা। রাতের ঢাকা-চট্টগ্রামের বাসে রওনা দিলাম আমরা। আমার সাথে ছিলো জুনায়েদ, ‍ভিউ, রিয়াদ, বাপ্পী, অরিন ও আনোয়ার ভাই। ভিউ ফোন করে নিজাম ভাইকে বলে রেখেছে আমাদের কথা।

অপূর্ব সুন্দর প্রকৃতি এ ট্রেইলে

ভোর পাঁচটার একটু আগে আমরা নামলাম মিরসরাই বাজারে, তখনো আলো ফুটেনি। অন্ধকারেই সিএনজি ভাড়া করে চলে গেলাম ব্র‌্যাক পোলট্রি ফার্মের সামনে। ট্রেইলটার মাথা ওখানেই। নিজাম ভাই এসে হোটেল খুলে আমাদের নাস্তা করার ব্যবস্থা করলো। খাওয়া দাওয়া শেষ করতে করতে আলো ফোটা শুরু হলো, মানুষও বাড়ছিলো। তাই দেরী না করে রওনা দিয়ে দিলাম আমরা। গাইড আসতে একটু দেরী করাতে আরেকটু দেরী হলো, না হলে ট্রেইল ফাকাই পাওয়া যেতো।

চমৎকার ট্রেইল, বর্ষার শেষ দিক। প্রকৃতি যেন তার সবুজ রুপ ছড়িয়ে দিচ্ছে চারদিকে, এর মধ্যেই আমদের পথচলা। বাউশ্যায় পরে আসবো সিদ্ধান্ত নিয়ে প্রথমে চলে গেলাম ভিতরের দিকে। এর মধ্যে ঝিরিপথ শুরু হয়ে গেছে, খুব বেশি বৃষ্টি হয়নি কিছুদিন, তাই পানি কম। তবে তাতেও সৌন্দর্য ম্লান হয়নি এর ট্রেইলের। একসময় এসে পৌছালাম ন হাইত্যের কুমে। বেশ কয়েকদিক থেকে পানির প্রবাহ এসে মিলেছে এই কুমে, তাই দেখতেও অনেক বেশি সুন্দর। কিছুক্ষণ সবাই সে কুমে কাটিয়ে রওনা দিলাম বোয়াইল্যার উদ্দেশ্য।

ন হাইত্যের কুম ছবি অরিন

দেখা গেলো ভিতরের বেশিরভগা ঝর্ণায় শুকিয়ে গেছে, এখন আর পানি নেই। ট্রেইলের শেষ প্রান্তে ঝর্ণা না পেয়ে আমরা একটা শুকনো ঝর্ণার নিচে একটা পাথরে বসলাম। আমি ব্যাগ থেকে মিনি স্টোভ বের করে বাপ্পীকে আগুন জালতে দিলাম। আর কেটলিতে পানি ভরে ফিরে এসে চা বানানোর জন্য দিলাম। সেই সময় অরিন খেয়াল করলো সবার আগে, আমার পা থেকে রক্ত ঝরছে। অরিনের ডাক শুনে আমি রক্ত দেখে বুঝলাম নিশ্চয়ই জোঁকের কাজ।

ট্রেইল জোঁকে ধরেনি এরকম ঘটনায় কম হয়েছে আমার। তার উপর আমার রক্ত ও পজেটিভ, যেটা মনে হয় জোঁককে বেশি আকৃষ্ট করে। মনে পড়লো বারৈয়াঢালা থেকে হাজারিখিল যাওয়ার পথে মাত্র ১৪ কিলোমিটার রাস্তায় না হলেও শ-খানেক জোঁকে ধরেছিলো আমাদের। রীতিমতো ছুরি দিয়ে টেনে টেনে আমার পা থেকে জোঁক ছাড়িয়েছিলো মাহী ভাই। জোঁকের ধরেছে শুনেও আমি খুব বেশি প্রতিক্রিয়া দেখালামনা।

কামড়ের স্থান থেকে শুরু করে রক্তে ভেসে যাচ্ছে পুরো পা ছবি জুনায়েদ

এর মধ্যে বাপ্পী আর আনোয়ার ভাই আমার দুপাশে এসে দাঁড়িয়েছে। এদের দুজনেরই ফার্স্ট এইডের উপর রীতিমতো প্রাতিষ্ঠানিক কোর্স করা আছে। বাপ্পী আমাকে বললো ভাই রক্ত কিন্তু সুবিধার লাগছেনা, আমি প্যান্ট পুরোটাই খুলে ফেলেন। আমার পরনে ট্রেকিংয়ের প্যান্ট, সেটা খুলতেই হা হয়ে গেলো সবাই। রক্তে ভেসে যাচ্ছে আমার রানের মাঝামাঝি থেকে হাটু পর্যন্ত। এত রক্ত দেখে আমরা ভেবেছিলাম অসংখ্য জোঁকে ধরেছিলো মনে হয় আমাকে।

প্যান্টের অবস্থা ছবি জুনায়েদ

বাস্তবে দেখা গেলো মাত্র একটি ছিদ্র, জোঁকের সন্ধানও পাওয়া গেলোনা। সবার আগে তৎপর হলো আনোয়ার ভাই। প্রাথমিক চমক কাটিয়ে উঠে উনার ব্যাগ থেকে দ্রুত ফার্স্ট এইড বক্স বের করলেন। পটাশিয়াম পারম্যাঙ্গানেট বের করে ছোট্ট ক্ষতটা পরিস্কার করে ফেললেন। আরেকটা গামছা ছিড়ে ব্যান্ডেজ করে দিলেন। রক্ত থেমেছে কিনা আমরা বুঝতে পারছিলামনা, এর মধ্যে কিছুক্ষণ বিরতি নিয়ে আবার রওনা দিয়ে ফিরে আসার সিন্ধান্ত নিলাম।

সমস্যা একটাই রক্তে ভেসে যাওয়া এই প্যান্ট আর পরার মতো অবস্থায় নেই, বাধ্য হয়ে গামছাকেই লুঙ্গির মতো করে পরে রওনা দিলাম। হাটার গতি হয়ে গেলো অর্ধেক, এ গতিতে মূল রাস্তায় যেতে সময় লাগবে অন্তত তিন ঘন্টা। কিছুক্ষণ পর পেছন থেকে জানালো আমার পায়ের তালু পর্যন্ত রক্তে ভেসে যাচ্ছে। থেমে ব্যান্ডেজ চেক করে দেখলাম, রক্তপাত থামেনি। আবার নতুন করে শক্ত করে বেঁধে রওনা দিলাম।

বাউশ্যা ঝর্ণায় সবাই, আমি নামতে নে পেরে উপর থেকে ছবি তুলছি

বাউশ্যা ঝর্ণার কাছে পৌছানোর পর সবাই নেমে পড়লো ঝর্ণায়। আমি উপর থেকে বসে বসে দেখছি, নামারতো প্রশ্নই আসেনা, বরং এই এক ঘন্টা বসলে যদি রক্তপাত থামে। তাই যতটা সম্ভব নড়াচড়া না করে কাটিয়ে দিলাম এক ঘন্টা। তারপর সবাই মিলে যখন রওনা দিলাম, তখন আবার আগের মতোই রক্ত পড়তে শুরু করলো। কোন উপায় না দেখে রক্তপাতের বিষয়টা ইগনোর করেই হাঁটতে থাকলাম।

পাহাড় থেকে নামতে একটু কষ্টই হচ্ছে, এটা ছাড়া গুরুতর কোন সমস্যা দেখছিনা। আনোয়ার ভাই টেনশন করছিলো, আমি যদি জ্ঞান হারাই তাহলে এ ট্রেইল থেকে কীভাবে উদ্ধার করবে আমাকে। সবাই আমাকে উৎসাহ দিচ্ছে আজ, যে কাজটা অন্য ট্রিপগুলোতে সাধারণত আমি করে থাকি। অবশেষে নিরাপদেই ট্রেইল থেকে বের হয়ে আসতে পারলাম। নিজাম ভাইয়ের দেখিয়ে দেয়া জায়গায় তাঁবু ফেলে ঘুমিয়ে নিলাম কয়েক ঘন্টা। উঠে আবার বের হয়ে দেখি আবারো রক্তপাত হচ্ছে।

পা থেকে রক্ত ঝরছেই ছবি আনোয়ার ভাই

এদিকে সন্ধ্যা হয়ে এসেছে প্রায়, ঢাকা বা চট্টগ্রাম চলে যাবো কিনা সিদ্ধান্ত নিতে পারছিলামনা। স্থানীয়রা বললো এটা বড়ধরণের একটা জোঁকের কামড়, ওরা বলে টাইগার জোঁক। সমাধান একটাই, বুটের ডালের অর্ধেক লাগিয়ে রাখতে হবে। ওদের কথায় ভরসা না পেয়ে গেলাম হাসপাতালে, সেখানে ডাক্তারকে পেলামনা। বাকিরা কোন ঝুকি নিতে নারাজ, সকালে আসতে বলে। তাই ক্যাম্প সাইটে ফিরে এসে স্থানীয় টোটকা চিকিৎসার শরণাপন্ন হলাম।

স্থানীয় চিকিৎসারয় শেষ পর্যন্ত থামলো রক্ত

অবিশ্বাস্য ব্যপার, সেই বুটের ডালের অর্ধেক লাগানোর সাথে সাথেই থেমে গেলো রক্তপাত। এরপর বিশ্রাম নিয়ে, রাতে তাঁবুতে ঘুমিয়ে সকালে বেলা করে উঠে ঢাকা ফিরলাম। সন্ধ্যায় আবার যখন ডাক্তারের কাছে গেলাম, তখনো বুটের ডাল লেগে আছে ক্ষতস্থানে। ডাক্তার অবশ্য আমাকে সেটা ফেলতে বললো আগে, ফেলার পর আর কোন রক্তপাত না হওয়ায় বাসায় ফিরে যেতে বললো। যদি কোন কারণে আবার রক্তপাত হয় তবে ছোট্ট একটা ইলেক্টোকটারি অপারেশন করে লাগিয়ে দিবে ক্ষতস্থান সেটা জানালো। অবশ্য দরকার পড়লোনা আর, স্থানীয় টোটকা চিকিৎসাই ভালো হলাম শেষ পর্যন্ত।

এ ঘটনার পর গত প্রায় এক বছরে বিভিন্ন ট্রেইলে যাওয়া হয়েছে। যথারীতি কাউকে না ধরলে জোঁকে আমাকে ঠিকই ধরেছে। তবে সেই টাইগার জোঁকের ধারে কাছেও যাবেনা এ সব ঘটনা। ট্রেইল থেকে বের হবার পর স্থানীয় এক ছেলে আমাকে বলেছিলো, প্রথমবার ট্রেইল আসলে এরক জোঁকে ধরে। আপনি কি প্রথমবার আসলেন? উত্তর দিয়েছিলাম: হ্যা, প্রথমবারই!

ফিচার ছবি জুনায়েদ

About Muhammad Hossain Shobuj

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের অর্থনীতি বিভাগ থেকে মাস্টার্স শেষ করে পরবর্তীতে আইবিএ থেকে এক্সিকিউটিভ এমবিএ করেছেন। বর্তমানে যুক্তরাষ্ট্রভিত্তিক একটি উন্নয়ন সংস্থায় কাজ করেন। লেখালেখিটা শখের কাজ, ঘোরাঘুরিও। এ পর্যন্ত দেশের ৬৩ টি জেলা ও ১২ দেশে ঘুরেছেন।

Check Also

সেন্ট মার্টিনে স্বল্প বাজেটে রাত্রিযাপন করবেন কোথায়

যদি প্রশ্ন করা হয় বাংলাদেশের সবচেয়ে সুন্দর জায়গা কোনটি? এই প্রশ্নের উত্তরে সেন্ট মার্টিন প্রথম …

Leave a Reply

Your email address will not be published.