ট্রেকিং করতে গেলে যে জিনিসগুলো অবশ্যই সঙ্গে নিবেন

শীতের সময় আমাদের দেশে অনেকেই ট্রেকিং করতে বের হয়ে পড়েন। যারা প্রথমবারের মতো বের হচ্ছেন তাদের অবশ্যই জানা জরুরি কোথাও ট্রেকিং করতে গেলে কি কি জিনিসপত্র আপনার সঙ্গে থাকতে হবে। এই তালিকার ছোট্ট কোন একটি বাদ পড়লেও সেটা আপনার ট্রেকিংকে অনেক কঠিন করে তুলতে পারে।

১. পানির বোতল: যেখানেই যাবেন পানির বোতল সঙ্গে থাকা মারাত্মক জরুরি। হাঁটা শুরু করলে কিছুক্ষণের মধ্যে পানির পিপাসা পাবে, তখন পানি খুঁজে বের করতে ঝামেলায় পড়বেন। এ বোতল হতে হবে আপনার ব্যাকপ্যাকের সাথে সহজে আটকে রাখা যায় বা ব্যাগের বাইরের পকেটে রাখা যায় এমন।

প্লাস্টিকের বোতল সব জায়গায় পাবেন না, আর পেলেও সেটা পরিবেশের জন্য ক্ষতিকর। যখনই সুযোগ পাবেন, সাথে সাথে পানির বোতল আবার পরিপূর্ণ করে নিবেন। লম্বা ট্রেকে কিছুক্ষণ পর পর অল্প পরিমাণ পানি আপনাকে সতেজ রাখবে এবং পানি শূণ্যতা থেকে রক্ষা করবে।

২. শুকনো খাবার: প্রতিটি ট্রেইলে আপনি কখন খাওয়ার সুযোগ পাবেন এটা নিশ্চিত করে বলা যায়না। ক্ষুধা বেশি লাগলে আপনি দূর্বল হয়ে পড়বেন, হাঁটতে কষ্ট হবে। এজন্য সঙ্গে কিছু শুকনো খাবার রাখবেন। এগুলো হতে পারে বিস্কিট, চকলেট, বাদাম, কিচমিচ (স্নিকার/কিটক্যাটের মতো), ট্রেইল মিক্স, খেঁজুর ইত্যাদি। চাইলে সঙ্গে ম্যাঙ্গোবারও রাখতে পারেন।

৩. ব্যাকপ্যাক: ভালো একটি ব্যাকপ্যাক আপনার জন্য খুবই জরুরি। কত দিনের ট্রেক আর কত কিছু বহন করতে হবে সেটার উপর নির্ভর করে ব্যাকপ্যাকে কত বড় হবে সেটা নির্ধারণ করা হয়। দেশের ট্রেইলগুলোর জন্য ২৫-৪০ লিটারের ব্যাকপ্যাক ব্যবহার করতে পারেন।

ভালোমানের ব্যাকপ্যাক আপনার ট্রেকিংয়ের ভার কমিয়ে আনতে পারে অনেকগুণ ছবি: শাকিল খান

নিয়মিত ঘোরাঘুরি করলে ভালো মানের ব্যাকপ্যাক কিনে রাখতে পারেন যাতে অনেক বছর সেটা দিয়েই চালাতে পারেন। এছাড়া ব্যাকপ্যাকের সাথে যদি পানি নিরোধক কভার না থাকে সেটা আলাদা করে কিনে নিবেন।

৪. ট্রেকিং শু/স্যান্ডেল: ট্রেকিংয়ের জন্য ভালমানের ট্রেকিং শু ব্যবহার করা উচিত। এতে আপনার পা নিরাপদ থাকবে এবং হাঁটতেও সুবিধা হবে। তবে বাংলাদেশের ক্ষেত্রে ট্রেকিং স্যান্ডেলটাই বেশি ব্যবহার করা হয়। এর কারণ হচ্ছে আমাদের ট্রেইলগুলোতে সাধারণত ঝিরি পথ থাকে, ফলে বার বার পা ভিজে যায়।

ট্রেকিং স্যান্ডেল কিনলে ভালো গ্রিপ দেখে কিনবেন, কিছুদিন আগে পায়ে দিয়ে অভ্যস্ত হয়ে নিবেন। অবশ্যই যাতে পেছনে বেল্ট থাকে সেটা দেখে নিবেন। ঢাকায় মুস্তফা মার্ট, বাটা, এপেক্স, ট্রিপমেটে ভালোমানের এ ধরণের স্যান্ডেল পাবেন। আর যদি মনে করেন একবারই ব্যবহার করবেন, তাহলে প্যাগাসাস স্যান্ডেল কিনতে পারেন।

৫. টর্চ বা হেডল্যাম্প: আমি সব সময় হেডল্যাম্প ব্যবহার করা পছন্দ করি। কারণ হচ্ছে এতে করে হাত পুরোপুরি খালি থাকে, হাঁটতে সুবিধা হয়। ছোট আকারের টর্চলাইটও ব্যবহার করতে পারেন। সঙ্গে একজোড়া অতিরিক্ত ব্যাটারি নিবেন, ইউএসবি টর্চলাইট/হেডল্যাম্প পরিহার করাই ভালো।

রাতের বেলা জরুরি জিনিস হেডল্যাম্প। ছবি peak69.com

৬. স্যানিটাইজার: কিছু এধরণের জিনিসপত্র রাখতে হবে। যেমন টিস্যু, সাবান, হ্যান্ড স্যানিটাইজার। আমি পুরো টিস্যুর রোল না নিয়ে কয়েকদিনে যেরকম লাগতে পারে সেরকম করে ভাজ করে নিয়ে নেই। আর ছোট্ট একটা হ্যান্ড স্যানিটাইজার রাখি। এছাড়া ব্রাশ ও ছোট পেস্ট নিতেও ভুলবেন না।

৭. রোদের জন্য: ক্যাপ বা হ্যাট নিতে পারেন সঙ্গে। আমার কাছে হ্যাটই বেশি ভালো লাগে, মোটামুটি সব দিক থেকে রোদ ঠেকাতে পারে। সানগ্লাসও পরতে পারেন। যাদের অভ্যাস আছে তারা সানস্ক্রীণ ব্যবহার করতে পারেন। এ ছাড়া একটা ছোট সাইজের গামছা রাখতে পারেন, যেটা বিভিন্ন দরকার ব্যবহার করা যায়। পাতলা মাস্ক নিতে পারেন, যেটা রোদ/ধূলো ও ঠাণ্ডা থেকে বাঁচাবে।

৮. জামা-কাপড়: যতটা সম্ভব কম জামা কাপড় নিতে হবে। আমি সাধারণত ফুল স্লিভ টিশার্ট পরি। তাড়াতাড়ি শুকায় ও ব্রেথেবল ফেব্রিকের টিশার্ট ব্যবহার করা উচিত। ট্রাউজারও একই রকম হতে হবে। তবে পানি বেশি থাকলে থ্রি-কোয়ার্টার বা হাফ প্যান্ট পড়তে পারেন। বৃষ্টির সময় হলে রেইনকোট নিতে পারেন।

শীতের জন্যও কিছু পোশাক নিতে হবে। ডাউন জ্যাকেট যেগুলো ভাজ করে ছোট প্যাকেট করে রাখা যায় এরকম হলে সবচেয়ে ভালো হয়। এতে করে যখন লাগবেনা তখন ব্যাগে ঢুকিয়ে রাখলেও তেমন কষ্ট হবে না। আর সেটা না থাকলে সাধারণ জ্যাকেটই নিতে হবে, মাথায় রাখবেন ব্যাগে কোথায় এটাকে জায়গা দিবেন।

৯. ফার্স্ট এইড: ছোট একটা ফার্স্ট এইড বক্স সাথে রাখতে পারেন। ব্যান্ডেজ, তুলো, কাঁচি, হেক্সাজল, অয়েন্টমেন্ট, স্যালাইন, গ্লুকোজ, প্যারাসিটামল/নাপা, গ্যাস্ট্রিকের ঔষধ, এলাট্রল, পভিসেপ ক্রিম এসব রাখতে পারেন। এছাড়া মশা ও অন্যান্য পোকামাকড় থেকে বাঁচার জন্য ওডোমোস রাখবেন।

১০. পাওয়ার ব্যাংক: বর্তমান সময়ের জরুরি একটি জিনিস। ট্রেইলে পুরো সময়ে বিদ্যুৎ পাওয়ার সম্ভাবনা নেই বললেই চলে। তাই অন্তত ১০,০০০ এম্পায়ারের একটি পাওয়ার ব্যাংক সঙ্গে রাখতে হবে। রিজার্জেবল লাইট, একশন ক্যাম, মোবাইল পাওয়ার ব্যাংক দিয়ে চার্জ দিতে পারবেন।

এছাড়া একটি পানি নিরোধক ব্যগ/জিপলক ব্যাগ, কম্পাস/জিপিএস, ট্রেকিং পোল, স্মার্ট ওয়াচ, স্লিপিং ব্যাগ এগুলো সঙ্গে রাখতে পারেন। বাংলাদেশে এ সমস্ত জিনিস খুব কমই পাওয়া যায়। এ ক্ষেত্রে বিশেষজ্ঞ কয়েকটি দোকানের ঠিকানা নিচে দেওয়া হলো:

পিক সিক্টটি নাইন অ্যাডভেঞ্চার শপ: ঢাকার বসুন্ধরা সিটির লেভেল ২ তে তাদের দোকান। প্রায় সব কিছুই এ দোকানে পাওয়া যাবে। তবে গুণগত মান ভালো বলে এখানে দামও কিছুটা বেশি মনে হতে পারে। যোযোগের ঠিকানা:

https://www.peak69.com/

ট্রিপমেট: ফার্মগেটের ক্যাপিটাল সুপার মার্কেটের তিনতলায় এ দোকান। এখানে ভালো মানের ট্রেকিংয়ের কাপড়-চোপড়, জুতো, স্যান্ডেল, ট্রাউজার ও অন্যান্য জিনিসপত্র পাওয়া যায়। যোগাযোগের ঠিকানা: https://www.facebook.com/groups/352373745545199

ডেকাথলন: ফ্রেঞ্চ চেইন ডেকাথলনের বাংলাদেশের স্টোরটি উত্তরায়। অন্যান্য দেশের তুলনায় বাংলাদেশে দাম একটু বেশিই। তবে এখানে ডেকাথলনের অনেক কিছুই পাওয়া যায় যেটা আপনার ট্রেকিংয়ে সহজ করতে পারে: যোগাযোগের ঠিকানা:

https://www.decathlon.com.bd/

আউটডোর ইকুইপমেন্ট: ভ্রমণের টুকিটাটি জিনিসপত্র ফেইসবুক বা দারাজ থেকে কিনতে চাইলে এ অনলাইন ভিত্তিক শপটি দেখেতে পারেন। যোগাযোগ:

https://www.facebook.com/OutdoorEquipment11

সঠিকভাবে গোছালে সহজেই বহন করতে পারবেন ব্যাকপ্যাক ছবি লেখক

মনে রাখবেন এই পোস্ট বাংলাদেশ আবহাওয়ার জন্য উপযোগী করে লেখা, দেশের বাইরে ট্রেক করতে গেলে সেখানকার পরিস্থিতি অনুসারে আপনাকে জিনিসপত্র সঙ্গে নিতে হবে। সবকিছু মিলেই আপনার ব্যাগ ৮ কেজির কম হবে হতে হবে। এছাড়া ক্যাম্পিং করতে গেলে কী কী লাগে তার জন্য আমার লেখা অন্য আর্টিকেলটি পড়তে পারেন।

ফিচার ছবি: লেখক

About Muhammad Hossain Shobuj

Check Also

রত্নদ্বীপ রিসোর্টঃ বাজেট ট্রাভেলারদের থাকার সঙ্গী

আমি দু’পয়সা আয় করা মানুষ৷ মাস শেষে যা আসে তার বেশিরভাগই পরিবারের খরচের খাতায় চলে …

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *