Breaking News

স্কুটারে করে ঢাকা থেকে সাজেক ভ্রমণ

ঈদের বন্ধের পর মাত্র অফিস শুরু করলাম। হঠাৎ মেইল, আগামী ১৫ই মে রবিবার বৌদ্ধ পূর্ণিমার বন্ধ, তার মানে দাঁড়ালো ১৩-১৪-১৫ই মে দারুণ একটা তিনদিনের বন্ধ। অনেকদিন ধরে ইচ্ছা স্কুটার চালিয়ে সাজেক যাওয়া, কিন্তু সময় সুযোগ হচ্ছিলোনা। এর আগে একবার চার দিনের ছুটি বের করেও অফিসের জরুরী কাজের জন্য বাতিল করতে হয়েছিলো পরিকল্পণা। এবার ভাবলাম যা আছে কপালে, রওনা দিয়ে দেই।

বৃহস্পতিবার রাত ১০টা নাগাদ কাউকে পাওয়া যাচ্ছিলনা সংগে যাবার জন্য। শেষ পর্যন্ত বাপ্পী রাজি হলো যেতে, শর্ত একটাই রওনা দিবে দুপুর ১২ টায়। ওর স্ত্রী সঞ্চার নিয়োগ পরীক্ষা শেষ হলে রওনা। এর মধ্যে বৃহস্পতিবার আমি আমার স্কুটারের কয়েকটা ক্যাবল চেঞ্জ করে ইঞ্চিন ওয়েল পরিবর্তন করে রাখলাম। মূল বিপদ দেখা দিলো বৃষ্টি, আবহাওয়া পূর্বাভাস বলছে অন্তত প্রথম দিন বৃষ্টি ধুয়ে দিবে। ভোরে রওনা হতে পারলে অনেকাংশেই এড়ানো যেতো এই বৃষ্টি, কিন্তু সেটারতো উপায় নেই।

খাগড়াছড়ি সাজেকের রাস্তা ছবি জুয়েল

শেষ পর্যন্ত দুপুর ১২ টার একটু পরে রওনা দিলাম আমরা চারজন, জুয়েল, বাপ্পী ও সঞ্চা। ঢাকা থেকে রওনা দেয়ার পর কিছুক্ষণ ভালোই চললো। কিন্তু কুমিল্লার কাছাকাছি এসে তুমুল বৃষ্টিতে পড়লাম। বৃষ্টির মধ্যেই আস্তে আস্তে চালিয়ে কুমিল্লার ছন্দু হোটেলে খেয়ে আবার রওনা। এর মধ্যে ছোটন এসে তার দোকান Bang Express এর দুটো রেইন কভার গিফট দিয়ে গেলো। কুমিল্লা থেকে ছাড়ার পর বৃষ্টি আমাদের ছাড়েনা। গতিবেগ কমে তাই ৬০ কিমিতে চালাতে হচ্ছে।

বিকেল ৫টার দিকে বারৈয়ার হাট যখন পার হলাম, তখন আমার চেনা পথ শেষ। বাংলাদেশের ৬২ টি জেলা ঘোরা হলেও খাগড়াছড়ি ও মেহেরপুর, এ দুটো জেলায় এখনো যাওয়া হয়নি আমার। আমরা যাত্রা শুরু করলাম রামগড়ে দিকে। কিন্তু এর আগে বাপ্পীর ফগ লাইট ঠিক করতে মহামূল্যবান এক ঘন্টা দিনের আলো শেষ হয়ে গেলো। রামগড় পর্যন্ত রাস্তা সুবিধার না, অনেক জায়গায় কাজ চলছে, তারউপর আমি কোনদিন আসিনি এদিকে।

তাই গতিবেগ কমে গেলো আরো। শেষ পর্যন্ত রাত ৮ টার দিকে রামগড় এসে পৌছালাম, এর মধ্যে নির্মাণাধীন রাস্তায় ভুল করে অন্যদিকেও চলে গিয়েছিলাম একবার। কিছুক্ষণ রামগড়ে বিরতি নিয়ে এবার রওনা হলাম খাগড়াছড়ির দিকে। এতক্ষণ বৃষ্টি ছিলোনা, এবার আবার বৃষ্টি শুরু। আকাঁবাঁকা উঁচু নিচু পাহাড়ি রাস্তা, অন্ধকার, বৃষ্টি, অচেনা পথ সব মিলিয়ে গতি আরো কমে গেলো। তবে রাস্তাটা চমৎকার, দিনের আলোতে হয়তো অনেক সুন্দর লাগতো। রামগড় থেকে আস্তে আস্তে চালিয়ে রাত পৌনে ১০টায় পৌছালাম খাগড়াছড়ি শহরের এফএনএফ রেস্টুরেন্টে।

সেখানে আগে থেকেই খাবারের অর্ডার দিয়ে রাখা হয়েছিলো বিজয়ের হোটেল এফএনএফ রেস্টুরেন্টে। তাই ঝটপট হাতমুখ ধুয়ে বসে পড়লাম খেতে। খাওয়া দাওয়া শেষে হোটেল অবকাশে যেয়ে উঠলাম। ভাড়া চাচ্ছিলো প্রতিরুম ১৫০০ টাকা করে। অনেক দরাদরি করে ৮০০ টাকায় রাজি হলো। বুঝলাম অন্যদিন হলে সম্ভব হতোনা, এখন পর্যটকের চাপ না থাকায় সম্ভব হলো। ‍রুম ভালোই, মূলত ফ্ল্যাট বাড়ি টাইপ। দুই রুমের একটাতে অ্যাটাচ বাথরুম আছে, অন্যটাতে কমন বাথরুম। অবশ্য ওই ফ্লোরে শুধু আমরাই, তাই তেমন কোন সমস্যাও হলোনা।

সকালে ঘুম থেকে উঠে পেট্রোল পাম্প থেকে তেল ভরে রওনা দিলাম বাঘাই হাটের উদ্দেশ্যে। চমৎকার পাহাড়ি রাস্তা, আকাশে মেঘ, তবে বৃষ্টি নেই। দারুন এ আবহাওয়ায় ৯টার দিকেই পৌছে গেলাম বাঘাই হাট। সেখান থেকে সাজেকের দূরত্ব ৩০ কিমি এর মতো। কিন্তু সেখানে আমাদেরকে আর্মির এসকর্টের জন্য অপেক্ষা করতে হবে, যেটা ছাড়বে সকাল সাড়ে ১০টায়। তাই সেখানে নাস্তা করে এদিক সেদিক ঘোরাঘুরি করে সময় কাটাচ্ছি আমরা।

 

গাড়ির সংখ্যা বেশিনা, সব মিলে ১৫-২০ টা হতে পারে। মোটরসাইকেল ৫০-৬০ টা হবে, তার মধ্যে শুধু আমারটাই স্কুটার। অবশ্য বাঘাইহাট পর্যন্ত আসতে খুব বেগ পেতে হয়নি। এপ্রিলিয়া এস আর ১৫০ স্কুটার হলেও চমৎকার এক্সিলারেশন ও ব্রেকিং। তাই অন্যান্যদের সাথে তাল মিলিয়েই আসতে পেরেছি। তবে সাজেকের শেষ পাঁচ কিলো একটু ঝামেলা হতে পারে আগেই আন্দাজ করেছিলাম।

বেলা প্রায় ১১ টার দিকে ছাড়লো এসকর্ট। এর মধ্যে আবার কাচালংয়ের কাছে এসে আবার আটকে দিলো সেনাবাহিনী। সাজেক থেকে সেনাবাহিনীর কয়েকজন উর্ধতন কর্মকর্তা রওনা দিবেন, তারা না যাওয়া পর্যন্ত যাওয়া যাবেনা। শেষ পর্যন্ত সাড়ে ১২ টার দিকে সেই বহর অতিক্রম করার পর আমাদের ছাড়া হলো। এরপর শুরু হলো সত্যিকারের চ্যালেঞ্জিং রাস্তা। এবার রাস্তায় বাঁকের পাশাপাশি যোগ হয়েছে হঠাৎ করে ঢালু হয়ে নেমে যাওয়া তারপরই আবার খাঁড়া উঠা।

বেশি গতিতে নামাও যায়না বাঁকের জন্য, আবার দ্রুত নামতে না পারলে পরের চড়াইতে উঠতে কষ্ট হয়ে যাচ্ছে। অতন্ত্য সতর্কতার সাথে চালাচ্চি আমরা। কিছু মারাত্মক স্কিলড রাইডারও দেখলাম যারা এসব বাঁকেই চমৎকার টার্নিং নিতে পারছে, আবার গতি ধরেই রেখেই উঠে যাচ্ছে। পাঁচ কিলোমিটার বাকি থাকতে দেখতে পেলাম সাজেক। প্রায় ১,৮০০ ফিট উচ্চতার এ জায়গাটা নিচ থেকে পুরো একটা দেয়ালের মতো লাগছে, এখানে উঠতে হবে ভাবতেই গা শিউরে উঠছিলো।

শেষ কয়েক কিলোমিটার শুধুই উঠা। এক সময় গতি কমতে কমতে দশ কিলোমিটারে এসে দাঁড়ালো, মনে হচ্ছিলো আর পারবেনা আমার স্কুটার। তবে শেষ পর্যন্ত ঠিকই উঠে আসলো। সোজা চলে গেলাম আমরা সাজেকের জিরো পয়েন্ট। সেখানে ছবি তুলে ফিরে আসলাম জুমঘরের কাছে। গত রাতেই শাহীন কামালের সাথে আলাপ করে সিন্ধান্ত নিয়েছি আমরা থাকবো সাংগ্রাই হিল রিসোর্টে। জুমঘরের সামনে আমাদের মোটরসাইকেল রাখার জায়গা দেখিয়ে দেয়া হলো।

সাংগ্রাই হিল রিসোর্টের আমাদের কটেজন ছবি জুয়েল

পাঁচ মিনিট সিঁড়ি বেয়ে নিচে নেমে দূর থেকে রিসোর্টটা দেখেই মন ভালো হয়ে গেলো। পাহাড়ের ঢালে নির্মাণ করা হয়েছে এ রিসোর্ট, মাত্র পাঁচটি রুম একটি ব্রীজের সাথে সংযুক্ত। প্রতিটি কটেজ একটি আরেকটি থেকে কিছুটা দূরত্বে নির্মাণ করা হয়েছে। কাঠের ব্রীজ পার হয়ে আমাদের রুমে ঢুকে মুগ্ধ হয়ে গেলাম, এত সুন্দর ইন্টেরিওর। বারান্দাটা বিশাল বড়, আর সেখান থেকে দিগন্ত বৃস্তিত সবুজের পাহাড়ের সারি। দূরে দেখা যাচ্ছে মিজোরামের বড় পাহাড়গুলো। এ রিসোর্টের ভাড়া উইকএন্ড ছাড়া ৩,৫০০ টাকা প্রতি রাত।

রিসোর্টের বারান্দায় বসে খাওয়া দাওয়া ছবি লেখক

রিসোর্টে বাতাসে বসে থাকাই মুশকিল, বারান্দায় যেয়েই শুয়ে পড়লাম আমরা। এর মধ্যে রিসোর্ট ম্যানেজার বললো চাইলে রুমে দিয়ে যেতে পারে খাবার। ভাত-দেশি মুরগী-ডাল-সব্জি-আলুভর্তার প্যাকেজ ২৫০ টাকা করে জনপ্রতি। অর্ডার দিয়ে আমরা ফ্রেশ হতে গিয়ে আরেকবার অবাক হবার পালা, বাথরুমটাও দেখার মতো আসলে। বাথরুমে বসেও চমৎকার দেখা যাচ্ছে পাহাড়ের ভিউ। গোসল শেষ করে আসতেই আসতেই খাবার চলে আসলো আমাদের। বারান্দায় চারজনে বসে ভরপুর খাওয়া-দাওয়া করে সেখানেই শুয়ে পড়ার মতো অবস্থা।

ছবির মতো সুন্দর ও পরিস্কার পরিচ্ছন্ন কংলাক পাড়া

একটু বিশ্রাম নিয়ে বের হলাম সাজেক দেখতে। বাইকে করেই চলে গেলাম কংলাক পাড়ার কাছে। কংলাক পাহাড়ে উঠে  সূর্যাস্ত দেখে ফিরে আসলাম হ্যালিপ্যাডে। ভুলটা তখনই করলাম, ভাজা-পোড়ার সুগন্ধে আকৃষ্ট হয়ে কয়েকটা ভাজি মাছ কিনে বুঝলাম কাজটা ঠিক হয়নি। এরপর গেলাম সাজেকের একেবারে শুরুর দিকে শাওনের ব্যাকপ্যাকার্স ক্লাউডের দিকে। শাওন তার স্ত্রী নিয়ে সত্যিকার অর্থেই হোমস্টে তৈরী করেছে। তাদের বারান্দায় অনেক্ষণ আড্ডা দিয়ে গেলাম ম্যাডভেঞ্চারে। সেখানেও অনেক আড্ডা দিয়ে ফিরলাম আমাদের হোটেলে।

ভেবেছিলাম কেমন বাথরুম থাকে রিসোর্টে, অবাক হতেই হলো ছবি জুয়েল

রাতের খাবার মনটানাতে খেলাম, দুপুরেও আসলে সেখান থেকেই খাবার এসেছিলো। এরপর আবার রিসোর্টে ফিরে চাঁদ দেখার পালা। মেঘ এসে মাঝে মাঝে দৃষ্টি সীমার আড়ালে নিয়ে যাচ্ছে চাঁদকে, আর মাঝে মাঝে চাঁদ মনে হচ্ছে ধরণীতেই নেমে আসবে। অবিশ্বাস্য হলেও সত্য, এ মে মাসের মাঝামাঝিতে কম্বল গায়ে দিতে হলো রাতে! সকালে উঠে অবশ্য মেঘ জমে থাকার দৃশ্য পেলামনা। আফশোস আজকেই মেঘ ডেকে রেখেছে সাজেকের রাস্তাও, আমরা ফিরে আসার মাত্র দুদিন পরেই।

সকালে উঠে ফেরার জন্য এসকর্টের সাথে রওনা দিলাম ১১ টার দিকে। এক টানে ঢাকা ফিরতে হবে, তবে তাড়াহুড়ো করার কোন উপায় নেয়। ঢাল থেকে নামা, ঢালে উঠার চেয়ে বিপজ্জনক। তাই যথাসম্ভব ধীরে ধীরে সতর্কভাবে নিচে নামতে থাকলাম।   প্রথম ১০ কিলোমিটার নামার পরে নামাটা সহজ হয়ে গেলো। তবে বাঘাইহাট এসে বাপ্পীর মোটর সাইকেল পাংচার হয়ে  এক ঘন্টা দেরী করিয়ে দিলো। সৌভাগ্যবশত বাজারের কাছে এ ঘটনা ঘটায় অল্পের উপর দিয়ে গেলো।

খাগড়াছড়ি আসলাম দুপুর দুটোয়। সেখানে দুপুরে খেয়ে রওনা দিতে দিতে তিনটা বাজেলো। খাগড়াছড়ি  থেকে রামগড় পর্যন্ত ভালোই গতিবেগ ধরে রাখতে পারছিলাম। সেই সাথে মজাও লাগছিলো পাহাড়ি এই আঁকাবাকা রাস্তায় চালিয়ে। রামগড়ের পর থেকে সতর্কভাবে চালিয়ে বারৈয়ার হাট পৌছালাম বিকেল সাড়ে পাঁচটায়। তখনো ১৭০ কিলোমিটার ঢাকা। তাই কোন বিরতি না নিয়ে শুধুমাত্র রিফুয়েলিং করেই আবার ছুটলাম।

হাইওয়েতে যতক্ষণ দিনের আলো ছিলো ততক্ষণ চালিয়ে সন্ধ্যা নামার পর চৌদ্দগ্রাম পার হয়ে ব্রেক দিলাম আবার। এরপর  ধীরে সুস্থে চালিয়ে কুমিল্লা ও মেঘনায় ব্রেক দিয়ে শেষ পর্যন্ত রাত সাড়ে দশটায় বাসায় পৌছালাম। সাজেক কেন বাইকারদের এতো পছন্দ, সেটা বুঝতে পারলাম এ ট্রিপে। সাজেকে কতজন আমার দিকে চোখ বড় বড় করে তাকিয়ে জিজ্ঞস করেছিলো ”আপনি এটা নিয়ে আসলেন সাজেকে?” তার হিসেব নেই। যেটা বুঝলাম পাহাড়ে এ ধরণের স্কুটার নিয়ে উঠা সমস্যা না, তবে নামতে  কষ্টই হয়। আর সতর্কভাবে চালানো ও যাবতীয় সেইফটি গিয়ার পড়ার কোন বিকল্প নেই।

আমরা যে রিসোর্টে ছিলাম সাংগ্রাই হিল রিসোর্টের ফেইসবুক লিংক: https://www.facebook.com/sangraihillresort। ফোন:

01886-168877

এপ্রিলিয়া স্কুটার/মোটরসাইকেল নিয়ে আগ্রহ থাকলে যোগ দিতে পারেন এই গ্রুপে: https://www.facebook.com/groups/1565783640194678

আর এট্রিপের অ্যাডঞ্চোর গিয়ার পার্টনার ছিলো আউটডোর্স বিডি

ফিচার ছবি  শাহীন কামাল (ফাইল ফটো)

About Muhammad Hossain Shobuj

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের অর্থনীতি বিভাগ থেকে মাস্টার্স শেষ করে পরবর্তীতে আইবিএ থেকে এক্সিকিউটিভ এমবিএ করেছেন। বর্তমানে যুক্তরাষ্ট্রভিত্তিক একটি উন্নয়ন সংস্থায় কাজ করেন। লেখালেখিটা শখের কাজ, ঘোরাঘুরিও। এ পর্যন্ত দেশের ৬৩ টি জেলা ও ১২ দেশে ঘুরেছেন।

Check Also

সেন্ট মার্টিনে স্বল্প বাজেটে রাত্রিযাপন করবেন কোথায়

যদি প্রশ্ন করা হয় বাংলাদেশের সবচেয়ে সুন্দর জায়গা কোনটি? এই প্রশ্নের উত্তরে সেন্ট মার্টিন প্রথম …

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *