Breaking News

বাংলাদেশের সর্বোচ্চ পাঁচ পর্বত

ভ্রমণগুরুর পেইজে সেদিন একটা ছবি পোস্ট করলাম, জোত্লং এর। সংগে ক্যাপশনে লিখলাম দেশের ২য় সর্বোচ্চ পর্বত। সেখানে একজন কমেন্ট করলো ২য় না, জোত্লং ৩য়। আমি তাকে জিজ্ঞাস করলাম ২য় কোনটা, উত্তর তাজিং ডং, এবং সেটার রেফারেন্স উইকিপিডিয়া। আমিও গুগুলে সার্চ করে দেখলাম আসলেই তাই দেখাচ্ছে।

আবার তাজিং ডংয়ের উচ্চতা লেখা আছে ৪,১৯৮ ফিট। কমেন্টকারীকে জিজ্ঞেস করলাম এই উচ্চতা হলে তো সর্বোচ্চ পর্বতই হবার কথা তাজিং ডংয়ের, ২য় কীভাবে হয়? যেখানে সর্বোচ্চ পর্বত সাকা হাফংয়ের উচ্চতা ৩,৪৫৪ ফিট।  এতক্ষণে তার বুঝে আসছে বিষয়টা। আমাকেই জিজ্ঞাসা করলো উইকিপিডিয়া কি তাহলে ভুল?

উইকপিডিয়ার তথ্য যে কোন ব্যবহারকারী কিছু রেফারেন্স যোগ করেই যে কেউ এডিট করে দিতে পারে। তাই পৃথিবী জুড়েই এটাকে কখনো রেফারেন্স হিসেবে মানা হয়না। যারা তথ্যগুলো এখানে যোগ করছে বা পরিবর্তন করছে তাদের অনেকেই বাংলাদেশের পর্বত সম্পর্কে কোন ধারণা রাখেনা।  তাহলে বাংলাদেশের সর্বোচ্চ পাঁচটি পর্বত কোনগুলো?

আগে থেকে জানা লিস্ট ও সাম্প্রতিক সময়ে এগুলো ঘুরে এসে যারা নিজেরা জিপিএস দিয়ে মেপে দেখেছে, তাদের পাওয়া মাপের সাথে আগে বিভিন্ন সময়ে পরিমাপ করা পর্বতের রেকর্ড মিলিয়ে মোটামুটিভাবে যেটা দাঁড় করানো যায়, সে পাঁচটা পর্বতের নাম দিলাম। স্বাভাবিকভাবেই এ তালিকায় তাজিংডং নেই!

১. সাকা হাফং বা মদক টং: ব্রিটিশ পর্বতারোহী ও অ্যাডভেঞ্চারার জিঞ্জ ফুলেন ২০০৬ সালে প্রথমবারের মতো আরোহণ করেন বেসরকারীভাবে বাংলাদেশের সর্বোচ্চ পর্বত সাকা হাফং বা মদক টং। প্রায় সব রেকর্ডে এর উচ্চতা হচ্ছে ১,০৫৩ মিটার বা ৩,৪৫৪ ফিট। বান্দরবানের থানচি উপজেলায় অবস্থিত বাংলাদেশ মিয়ানমারের সীমান্তবর্তী এ পর্বতই যে দেশের সর্বোচ্চ পর্বত এ ব্যপারে মোটামুটি সবাই একমত।

দেশের সর্বোচ্চ বিন্দু (আন-অফিশিয়াল) সাকা হাফংয়ের চূড়া। ছবি তানজিম রহমান

বলে রাখা দরকার, ফুলেন তার প্রথম ভ্রমণে ২০০৫ সালে বাংলাদেশে আসেন কেউকারাডংয়ে আরোহণ করতে। ডিসি অফিসে এসে তিনি জানতে পারেন  এখন বাংলাদেশের তাজিংডং সবচেয়ে উঁচু পর্বত। তিনি দুটো পর্বতই আরোহণের সিদ্ধান্ত নেন। স্বাভাবিকভাবেই কেওকারাডংয়ের চেয়ে তাজিংডংয়ের উচ্চতা অনেক কম পান।

তবে ফুলেন সেই সময় সার্ভেয়ারের কাছে থাকা ম্যাপ দেখে ধারণা করতে পারেন বাংলাদেশে আসলে আরো কয়েকটি উঁচু চূড়া রয়েছে মদক রেঞ্জে। পরের বছর ফিরে এসে তিনি মদক রেঞ্জে অভিযান চালিয়ে নিশ্চিত হন সাকা হাফংই বাংলাদেশের সর্বোচ্চ পর্বত। কিন্তু ফুলেন যথাযথ কর্তৃপক্ষকে অবহিত করলেও গত ১৫ বছরে সার্ভে করে সরকারিভাবে নিশ্চিত করা হয়নি এ তথ্য। ফলে কাগজে কলমে  এখনো বাংলাদেশের সর্বোচ্চ পর্বত কেউকারাডং।

যোগী হাফংয়ের ট্রেইল থেকে তোলা জোত্লাং ছবি লেখক

২. জো ত্লাং বা মদক মুয়াল: মদক রেঞ্জেই অবস্থিত দেশের ২য় সর্বোচ্চ চূড়া জো ত্লা্ং। জো শব্দেটি মিজোরামের মিজো শব্দের সংক্ষিপ্ত রুপ আর ত্লাং শব্দের অর্থ পর্বত। এর উচ্চতা ১,০২২ মিটার বা ৩,৩৫২ ফিট।  জো ত্লাংয়ের ট্রেককে বলা হয় দেশের অন্যতম কঠিন ট্রেইল।  নিকটত জনবসতি দলিয়ান পাড়া থেকে ট্রেকিং করে চূড়ায় পৌছে আবার দলিয়ান পাড়াতেই ফেরত আসা যায়। এ পর্বতটিও বান্দরবানের থানচি উপজেলায় অবস্থিত।

রাঙ্গামাটি জেলার বিলাইছড়িতে অবস্থিত দেশের তৃতীয় সর্বোচ্চ চূড়া দুমলং ছবি ফাহিম হাসান

৩. দুমলং: রাঙ্গামাটি জেলার বিলাইছড়ি উপজেলায় অবস্থিত দুমলং বাংলাদেশের তৃতীয় সর্বোচ্চ পর্বত। এর উচ্চতা ১,০১০ মিটার বা ৩,৩১২ ফিট। দুমলংয়ের সাথে জো ত্লাংয়ের ব্যবধান খুব কম হওয়াতে সঠিকভাবে পরিমাপ করলে ৩য় ও ২য় পর্বতের অবস্থান পরিবর্তনও হয়ে যেতে পারে। তবে অধিকাংশ ব্যক্তি যারা জো ত্লাং ও দুমলং এর উচ্চতা মেপেছেন সবাই সামান্য ব্যবধানে দুমলংকে তৃতীয় সর্বোচ্চ পর্বত বলেছেন।

যোগীর হাফংয়ের চূড়ায় পতাকা হাতে আশিক

 

৪. যোগী হাফং: বাংলাদেশ-মিয়ানমার সীমান্তে মদর রেঞ্জে যোগী হাফংয়ের অবস্থান। ৯৮৩ মিটার বা ৩,২২২ ফিট উচ্চতার এ পর্বতটি বাংলাদেশের পর্বতপ্রেমীদের খুব প্রিয়। বিশেষ করে এর চূড়ায় পৌছানোর জন্য যে সরু রিজ লাইন ধরে যেতে হয়, এই অ্যাডভেঞ্চার অতুলনীয়। বান্দরবানের থানচি উপজেলার দলিয়ান পাড়ায় থেকে যোগী হাফং ও জো ত্লাং দুটোই কাছে হওয়াতে সাধারণত একসাথেই এ দুই পর্বতে যাওয়া হয়।

অফিশিয়ালি দেশের সর্বোচ্চ চূড়া কেউকারাডং ছবি তাসলিমা বাবলি

৫. কেওকারাডং: আনুষ্ঠানিকভাবে এখনো বাংলাদেশের সর্বোচ্চ পর্বত হিসেবে স্বীকৃত কেওকারাডং মূলত পঞ্চম সর্বোচ্চ পর্বত।  অধিকাংশ জরিপে এর উচ্চতা ৯৭৩ মিটার বা ৩,১৯৬ ফিট। যদিও এ পর্বতের চূড়ায় রাখা ফলকে বাংলাদেশের সেনাবাহিনী এ পর্বতের উচ্চতা বলা হয়েছে ৩,১৭২ ফিট।  বান্দরবানের রুমা উপজেলায় এর অবস্থান।

নোট: আজ জানতে পারলাম বাংলাদেশের সর্বোচ্চ পর্বত ও সর্বোচ্চ জলপ্রপাত নির্ধারণ করতে কাজ করবে ট্যুরিস্ট পুলিশ। এই শীতের মধ্যেই এ কাজটি সম্পন্ন করার জন্য তারা বাংলাদেশ ট্যুরিজম বোর্ডের সাহায্য চেয়েছে। উচ্চতা নির্ধারণ হলে সেটা জেলা প্রশাসনের মাধ্যমে মন্ত্রী পরিষদের মাধ্যমে গেজেটের মাধ্যমে প্রকাশ করা হবে।

এতবছর পরে হলেও শেষ পর্যন্ত কোন সরকারী সংস্থা এ কাজে এগিয়ে এসেছে সেটা প্রশংসার দাবীদার। উল্লেখ্য ২০০৬ সালে সাকা হাফং আবিস্কারের পরে সংশ্লিষ্টরা অনেক চেষ্টা করেও সরকারী সংস্থাগুলোর মাধ্যমে এ সঠিক তথ্য সন্নেবেশিত করতে পারেনি। এরপর প্রায় সব লিখিত দলিলে কীভাবে যেন তাজিংডংকে সর্বোচ্চ পর্বত দাবী করা  আছে। অথছ প্রথম তো দূরের কথা সর্বোচ্চ ২০ টি পর্বতের তালিকাতেও পাওয়া যাবেনা তাজিংডংকে।

আরেক কাঠি সরস  “জ্যোতির্ময় ধর” নামের একজন যোগী হাফং ও জোত্লাংয়ের মধ্যবর্তী জায়গায় অবস্থিত “আয়াং ক্লাং” পর্বতকে বাংলাদেশের তৃতীয় সর্বোচ্চ পর্বত বলে দাবী করে মনগড়া উচ্চতা দিয়ে এক কাহিনী ফাঁদে। পর্বত সংক্রান্ত নূন্যতম জ্ঞান না থাকায় দেশের অনেক পত্রিকায় গতবছর তার এ গল্প বেশ রসিয়ে রসিয়ে ছাপা হয়েছে। অথচ আয়াং ক্লাং উচ্চতার দিক থেকে প্রথম দশের মধ্যেই নেই। আশা করি ট্যুরিস্ট পুলিশ তার দেশের পর্বতগুলোর উচ্চতা নির্ণয়ের কাজ শেষ করলে সেটা গেজেট আকারে প্রকাশিত হলে এ ব্যপারে আর কোন দ্বিধা-দন্দ থাকবেনা।

ফিচার ফটো: গোলাম মোস্তফা 

 

About Muhammad Hossain Shobuj

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের অর্থনীতি বিভাগ থেকে মাস্টার্স শেষ করে পরবর্তীতে আইবিএ থেকে এক্সিকিউটিভ এমবিএ করেছেন। বর্তমানে যুক্তরাষ্ট্রভিত্তিক একটি উন্নয়ন সংস্থায় কাজ করেন। লেখালেখিটা শখের কাজ, ঘোরাঘুরিও। এ পর্যন্ত দেশের ৬৩ টি জেলা ও ১২ দেশে ঘুরেছেন।

Check Also

গিনেজ রেকর্ডের জন্য হাত ছেড়ে ১৩০ কিমি সাইকেল চালাবেন তাম্মাত বিল খায়ের

বিশ বছরের তরুণ তাম্মাত বিল খায়ের। দীর্ঘদিন ধরে প্রস্তুতি নিচ্ছিলেন গিনেজ রেকর্ডের জন্য। শারীরিক প্রস্তুতি …

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *