একদিনে ঢাকা থেকে বিরিশিরি ভ্রমণ

সেপ্টেম্বরে যখন বিরিশিরি যাই, রাস্তা দেখেতো রীতিমতো অবাক হয়ে গেলাম। যখন থেকে বিরিশিরির নাম শুনেছি তখন থেকেই জানি জায়গা সুন্দর, কিন্তু রাস্তা খারাপ। কিন্তু নেত্রকোনা থেকে আমি যখন বিরিশিরি যাই, প্রায় পুরো রাস্তাই ভালো। কয়েক কিলোমিটার খারাপ আছে সত্য তবে সেটা সহ্য করা যায়। মূলত বালিবাহী ট্রাকগুলো থেকে বালি পড়ে শেষের কয়েক কিমি রাস্তা বালির রাস্তা বলা ভালো, এছাড়া বাকি রাস্তা চমৎকার।

ঠিক করলাম একদিন আমার স্কুটার নিয়ে ঘুরে আসবো। বেশ কয়েকজন যাওয়ার কথা থাকলেও যাত্রার দিন দেখা গেলো আমি আর পিলিয়ন জুয়েল ছাড়া আর কেউ নেই। ১২ নভেম্বর শুক্রবার সকাল ৬ টা বাসা থেকে বের হলাম বিরিশিরির উদ্দেশ্যে। আগের রাতেই খবর পেয়েছি টংগী ব্রীজ ভেংগে সেখানে ভয়াবহ যানজট। সকালে সেটা পার হয়ে যাওয়ার জন্যই ভোরে বের হওয়া। এয়ারপোর্টের কাছে এসে মনে পড়লো জুয়েলকে নেয়ার কথা ইসিবি চত্বর থেকে!

আবার ঘুরে এসে ইসিবি চত্বরে পৌছে জুয়েলকে স্কুটারে তুলে নিলাম। উত্তরায় ঢুকেই দেখি জ্যাম শুরু হয়ে গেছে! ভেতরের রাস্তাগুলো ব্যবহার করে আবদুল্লাহপুর পৌছে আর কোন জায়গা খুঁজে পাচ্ছিনা যাওয়ার। তখন এক সিএনজি চালক আমাদের উদ্ধার করলো। ভাংগা ব্রীজটাই মোটরসাইকেলে পার হওয়া সম্ভব, সেটা দেখিয়ে দিলে চিপাচাপা দিয়ে টংগী ইস্টিশন রোড চলে আসতে পারলাম। ভেতরের রাস্তাগুলো ব্যবহার করে একবারে সালনা বাজারে দিয়ে বের হলাম আমরা।

ঢাকা-ময়মনসিংহ হাইওয়েতে চমৎকার গতিতে চলতে লাগলাম আমরা। এর মধ্যে পুষ্পদামে নাস্তা শেষ করে ত্রিশালে চা খেয়ে কখন যে ময়মনসিংহ পৌছে গেলাম টেরই পেলামনা। তবে শম্ভুগঞ্জ মোড় থেকেই শুরু হলো খারাপ রাস্তা। অবশ্য বেশিক্ষণ না, শম্ভুগঞ্জ ব্রীজ পার পাওয়ার পর থেকে আবার ভালো হয়ে গেলো রাস্তা। শম্ভুগঞ্জ মোড় থেকে ১৭ কিমি দূরে শ্যামগঞ্জ আসলে বাম দিকের রাস্তা চলে গেছে দূর্গাপুর। ৩৬ কিমি সে রাস্তায় চালিয়ে সহজেই পৌছে গেলাম দূর্গাপুর।

পাকা ধান কাটার অপেক্ষা

সকাল সাড়ে ১১ টায় পৌছালেও শেষ চার কিলোতে নির্বাচন, বালির রাস্তা আর ট্রাকের ভীড়ের কারণে আরও ৪০ মিনি পর নদীর ঘাটে পৌছে গেলাম। এবার নৌকা দিয়ে সোমেশ্বরী নদী পার হয়ে শিবগঞ্জ বাজারে ঢুকলাম। বিরিশিরিতে যারা বেড়াতে আসে প্রায় সব ট্যুরিস্টই ব্রীজ পার হয়ে শিবগঞ্জ বাজারে আসে। এখান থেকে ইজিবাইক বা মোটরসাইকেল নিয়ে বিজয়পুর লেক বা জিরো পয়েন্টের দিকে যায়। আমাদের এক বাড়ীতে যাওয়ার কথা ছিলো।

সেখান থেকে ঘুরে এসে বিজয়পুর পাহাড় ও লেকের দিকে যাওয়ার সময় পেট মোচড় দিয়ে উঠলো ক্ষুদায়। বেলা যে ২ টার বেশি বাজে। সেখানে রাশ মনি মোড়ে একটা হোটেলে ঢুকে পড়লাম। সাদা ভাতের সাথে দেশি মুরগীর ঝোল দিয়ে রান্নাটা  এতো অসাধারণ লাগলো। খাওয়া-দাওয়া শেষ করে গেলাম বিজয়পুর লেকে।  চিনামাটির এই পাহাড়ের জন্যই বিখ্যাত এই অঞ্চল। শীতের সময় এ লেকটার পানি নীলাভ আকার ধারণ করে যেটা দেখতেই সব পর্যটকরা ছুটে আসে।

বিজয়পুরের চীনামাটির পাহাড় ও লেক

আমার কাছে পুরো দূর্গাপুর অঞ্চলটাই অনেক সুন্দর লাগে। সোমেশ্বরী নদীর স্বচ্ছ পানি, রাস্তার সবদিকে পাকা ধানের গন্ধ, হলদে-সবুজ ধানক্ষেতের পটভূমিতে মেঘালয়ের পাহাড় সব মিলে কী অসাধারণ মায়া জড়িয়ে আছে এ এলাকায়। বিজয়পুর লেকের কাছে ব্যাগ, হেলমেট, মোটরসাইকেল একটা দোকানে রেখে আমরা চীনমাটির লেকে ঘুরে দেখতে গেলাম। প্রথম লেকটার পানি এখনো তামাটে, নীল হয়নি। দ্বীতিয়টাই বরং নীল আর সবুজের মাঝামাঝি রঙ ধারণ করেছে।

সেখানে গাছের ছায়ায় বসে চা খেতে খেতে মনে হচ্ছিলো এখানে থেকে যেতে পারলেই ভালো লাগতো। পাহাড়ের উপর দিয়ে ঘুরে এসে বিজয়পুর লেক দেখে দোকানে ফিরে আসলাম। এখানকার দোকানগুলো ভারতীয় পণ্যে ভর্তি। কিনবোনা করে করে চকলেট, জিরা, হাবিজাবি কিনে ফেললাম। মজার একটা কথাও বললো দোকানদার, সীমান্তের এ পারে ভারতীয় পণ্যের চাহিদা বেশি আর ওপারে বাংলাদেশি পণ্যের! বিজয়পুর লেক থেকে আমরা চলে গেলাম জিরো পয়েন্টে।

সোমেশ্বরী নদীতে নৌকা নিয়ে যাওয়া যায় জিরো পয়েন্টে

সোমেস্বরী নদীর এই ঘাটটা এ দিকে বাংলাদেশের সীমান্ত। বিজিবির চমৎকার একটা গেস্ট হাউজও আছে আছে এখানে, তবে সেটা তাদের জন্যই সংরক্ষিত। ঘাট থেকে নৌকা নিয়ে নদী ধরে বেশ সামনে থেকে ঘুরে আসা যায়, সময়ের অভাবে সেটা আর করতে পারলামনা। এর মধ্যেই বিকেল চারটা বেজে গেছে আমাদের ফিরতে হবে এবেলা। অবশ্য দূর্গাপুরে আরো কয়েকজনের সাথে দেখা করে আমরা যখন রাস্তায় উঠলাম তখন সময় বিকেল ৫ টা। সিদ্ধান্ত নিলাম ঝামেলা দেখলে গাজীপুর বা ময়মনসিংহ থেকে পরের দিন ঢাকা যাবো।

বিজয়পুর লেকের পাড়ে গাছের ছায়ায় বসেই দিন কাটিয়ে দেয়া যায়

তবে ফেরার পথে তেমন কষ্টই হয়নি। শম্ভুগঞ্জের পার হতে বেশ কষ্ট হয়েছে, সময়ও লেগেছে। এছাড়া গাজীপুর চৌরাস্তার পর থেকে সোজাসুজি টঙ্গী আসাতে একটু সময় বেশি লেগেছে। কয়েক জায়গা রাস্তা সরু, আর শেষের ২/৩ কিমি বেশ ভাঙ্গা। শেষ পর্যন্ত রাত ১০:৪৫ এ হাতিরপুলে আমার বাসায় এসে ঢুকতে পারি। পথিমধ্যে ২ জায়গায় চায়ের জন্য বিরতি দিয়েছিলাম, এছাড়া ত্রিশালের কাছেও নাস্তা ও কফির বিরতি ছিলো প্রায় ৩০ মিনিট।

যাওয়ার রাস্তা: আমি আমার এপ্রিলিয়া এস আর ১৫০ স্কুটার নিয়ে গিয়েছি। মোটামুটি ১২ লিটার তেল লেগেছে প্রায় ৪০০ কিমি আসা-যাওয়ায়। ঢাকা থেকে বিরিশিরি বাস চলাচল করে, তবে বাসের অবস্থা খুব ভালো না। এছাড়া শ্যামগঞ্জ পর্যন্ত ট্রেনে যাওয়া যায়, তার পরের ৩৬ কিমি সিএনজি/ইজিবাইক/বাসে যেতে হবে।

আমার রাউট ছিলো হাতিরপুল-টংগী স্টেশন রোড, গাজীপুর সদর হয়ে, গাজীপুর চৌরাস্তা-শম্ভুগঞ্জ-শ্যামগঞ্জ-দূর্গাপুর। এছাড়া নেত্রকোনা সদর হয়েও ভালো রাস্তা আছে তবে আমার কাছে শ্যমাগঞ্জ হয়ে যাওয়াই যুক্তিযুক্ত মনে হয়েছে।

সোমেশ্বরী নদী পার হয়ে ইজিবাইক/মোটরসাইকেল নিয়ে ঘোরা যায়। যেখানে যেখানে যাবেন সেটা বলে দরাদরি করে নিতে হবে, অর্ধেক দিনের জন্য ৩০০-৪০০ টাকায় ইজিবাইক ভাড়া করতে পারবেন। মোটরসাইকেলে আরো কম নিবে। থাকার জন্য ওয়াইএমসিএ গেস্ট হাউজ দেখতে পারেন ৭০০-১,২০০ টাকা ভাড়া পড়বে। রাশমনির মোড়ে বেশ কয়েকটা হোটেল আছে খাবার জন্য সেখানে ১০০-১৫০ টাকায় খেতে পারবেন। আর দূর্গাপুরে আরো ভালো খাবার ব্যবস্থা আছে।

ফিচার ছবি সহ সব ছবি তুলেছেন জুয়েল রানা

 

About Muhammad Hossain Shobuj

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের অর্থনীতি বিভাগ থেকে মাস্টার্স শেষ করে পরবর্তীতে আইবিএ থেকে এক্সিকিউটিভ এমবিএ করেছেন। বর্তমানে যুক্তরাষ্ট্রভিত্তিক একটি উন্নয়ন সংস্থায় কাজ করেন। লেখালেখিটা শখের কাজ, ঘোরাঘুরিও। এ পর্যন্ত দেশের ৬৩ টি জেলা ও ১২ দেশে ঘুরেছেন।

Check Also

বাংলাদেশে পর্বতারোহন প্রতিযোগিতা- বিজয়ীরা যাবে এভারেস্ট বেজ ক্যাম্প

তৃতীয়বারের মতো শুরু হতে যাচ্ছে রোপ ফোর আয়োজিত পর্বতারোহন বিষয়ক প্রতিযোগিতা “মিশন হিমালয়া-২০২২”। সারা দেশে …

Leave a Reply

Your email address will not be published.