রিজলাইনের স্বপ্নপূরণ

প্রথমবার যেবার পেনাডংপাড়া পার হয়ে দুই নড়বড়ে টুলের পথিক ছাউনী টাতে পৌছেছিলাম সেবারই মেঘহীন নীল আকাশের ক্যানভাসে দূরের পাহাড়ি চুড়া গুলোর প্রেমে পরে গিয়েছিলাম।পাহাড় পাগল মনে ঝড় উঠানোর জন্য জোতলাং, আয়ান ক্লাং, যোগী হাফং, সর্বোচ্চ চূড়া সাকা হাফং আর স্বগর্ভে দাঁড়িয়ে থাকা ইশ্বরমুণির তিন সুন্দরী যেন তৈরীই ছিল।

আমার একটা সেবারের যাত্রা উদ্দেশ্য ছিল বাংলাদেশের দ্বিতীয় সর্বোচ্চ পাহাড়চূড়া জোতলাং আর চতুর্থ সর্বোচ্চ পাহাড়চূড়া যোগী হাফং এ হেটে আসা। এই দুটো পাহাড় বাংলাদেশের ট্রাভেলিং কমিউনিটির কাছে সবসময়ই একটা আবেগের জায়গা। এদের ঘিরে আমাদের ট্রাভেলিং কমিউনিটির অনেক কষ্টের একটা স্মৃতি জড়িয়ে আছে। বাংলাদেশের ইস্টার্ন হরাইজন থেকে সূর্যোদয় দেখার স্বপ্ন দেখানো প্রথম মানুষ মুগ্ধ ভাই ও তার বন্ধু সুজন ভাই উনাদের দীর্ঘদিনের পাহাড়ি অভিযাত্রীদের সাথে এই অভিযান সফল করে ফেরার পথেই দূর্ঘটনায় পড়ে আমাদের কাছ থেকে চিরবিদায় নিয়েছিলেন।

উনাদের দেখানো পথেই আমরা আজ হেটে যোগী হাফং জোতলাং এ যাচ্ছি। প্রথমবারের যাত্রায়ই তিনটা জিনিসের প্রেমে পড়ে গিয়েছিলাম, প্রথম ভালোলাগা টা ছিল আমাদের বেসক্যাম্প দলিয়ান হেডম্যান পাড়া ও সেখানকার বম পরিবারগুলোর আথিতেয়তা। ছবির মত সুন্দর গোছানো এই পাড়াটা এতই সম্মোহিত করেছিল যে পরে বার বার ফিরে গিয়েছি এই পাড়ায় কয়েকটা দিন কাটানোর জন্য।

ছবির মতো সুন্দর দলিয়ান পাড়া

দ্বিতীয় ভালোলাগাটা ছিল জোতলাং আর যোগী হাফং এর অসম্ভব সুন্দর ট্রেইল দুইটা। একদিকে জোতলাং যেমন আপনার ধৈর্য্য আর সহিষ্ণুতার চরম পরীক্ষা নিবে অন্যদিকে যোগী হাফং এ যেতে কিছুক্ষণ পর পর চোখ ধাধানো অসাধারণ ভিউ পয়েন্ট গুলো আপনার মন কেড়ে নেবে।

তবে সব চেয়ে বড় চমকটা ছিল যোগী হাফং এর উপরে উঠে দেখা সরু ফিতের মত রিজলাইনটা,যার বিস্তৃতি ছিল যোগী হাফং এর ফাইনাল পিক থেকে শুরু করে মাঝে আয়াং ক্লাং ছুয়ে একেবারে জোতলাং পর্যন্ত। রিজলাইনটা এমন ভাবে আমাকে সম্মোহিত করেছিল যে চোখ ফেরাতে পারছিলাম না কোনভাবেই। এরপর আরো অনেক বার ফিরে গিয়েছি এই ট্রেইলে হাটতে, দলিয়ান পাড়ার দাদা, দিদি দের সাথে দেখা করতে। নিজের বাসার পর দলিয়ান পাড়া কে একসময় সেকেন্ড হোম মনে হতে লাগলো। তবে বার বার অই রিজলাইনটার দিকে অপলক দৃষ্টি তে তাকিয়ে থাকতাম আর ভাবতাম এটার এমাথা ওমাথা একবার হাটতে না পারলে জীবনের একটা বড় সাধ অপূর্ণ থেকে যাবে।

এই ২০২০ সালে এসে যখন অনেকদিন পাহাড়ে যেতে পারছিলাম না করোনার জন্য তখনি আস্তে আস্তে রিজলাইনে হাটার প্ল্যান টা করতে থাকলাম, যাত্রাসঙ্গী বাছতে গিয়ে চরম কৃপণতা দেখিয়ে শুধু গুটিকয়েক মানুষকে জানালাম। ফাইনালি ভরসা করলাম শুধু দুইজনকে যারা অবিরাম আমার পাহাড়ি পাগলামির আগাগোড়া শুনে আরো উসকে দেয় এগিয়ে যাওয়ার জন্য, আতাউল গণি উপল ভাই আর মুনিরা ইয়াসমিন সেতু আপু।

রেমাক্রির পথে

এরপর ফাইনালি ১৬ই ডিসেম্বরের বন্ধে নিজেদের বিশাল ঢাউস সাইজের ব্যাকপ্যাক গুলা নিয়ে বের হয়েই পড়লাম থানচির উদ্দ্যেশ্যে। একই গন্তব্যে যাত্রা বলে জাহাঙ্গীরনগর এডভেঞ্চার সোসাইটির সাথে আমরা তিনজন এড হয়ে গেলাম। এই টিমের ছোট ভাই গুলা এত আন্তরিক আর অমায়িক ছিল যে তারা থাকাতে আমাদের তেমন কোন ঝামেলাই পোহাতে হয়নি। লিডার সাঈদ ভাই ও বাকিরা বার বার আমাদের উৎসাহিত করেছেন পুরোটা সময়।দুপুরের মধ্যে বিজিবি ক্যাম্প আর থানচি থানায় এন্ট্রি করে রেমাক্রি পৌছে যাই দুপুর ২ঃ৩০ এর দিকে।

অনেকদিনের আড়ষ্ঠ শরীর নিয়ে গুটি গুটিপায়ে সন্ধার আগেই দলিয়ান পাড়ায় পৌছে যাই। পাড়ায় ঢুকার আগে থেকেই পরিচিত মুখ গুলা এমন আন্তরিক হাসি দিয়ে জিজ্ঞেস করছিল, দাদা কেমন আছো? মনে হচ্ছিল অনেকদিন পর নিজের গ্রামে ফিরে আসছি আপন মানুষদের পাশে। পথিমধ্যে সেই দুই ব্যাঞ্চের যাত্রাছাউনী থেকে পুরো রিজলাইনটা দেখার অনেক চেষ্টা করেছিলাম।কিন্তু কুয়াশাচ্ছন্ন আকাশ ফুড়ে সুন্দর চুড়া গুলো সেদিন আর দেখা দেয়নি। পাড়ায় ঢুকার মুখেই হেডম্যান দিদির সাথে দেখা করে এসেছিলাম কিন্তু গল্প তো আর করা হয়নি তাই ব্যাগ টা রেখেই ফিরে আসি দাদা,দিদি আর তাদের ২ মাসের পুচকে,আমার ভাগ্নের সাথে দেখা করতে।

দাদাকে আগেই বলে রেখেছিলাম প্ল্যান এর কথা, সে আমাকে একা ছাড়তে নারাজ তাই ভাই কে বলে দিল যেন পরদিন ভোরে আমাদের সাথে যায়। সে রাতে দলিয়ানপাড়া থেকে দেখা আকাশ টা আমার দেখা পাহাড়ি আকাশগুলোর স্মৃতির মধ্যে সবার উপরে থাকবে।

সেদিন তারা গুণলে এক মিলিয়ন থেকে একটাও কম হত না সে ব্যাপারে আমি নিশ্চিত। মিলিয়ন স্টার হোটেল বুঝি এটাকেই বলে। মনে হচ্ছিল ব্যাঞ্চটায় শুয়ে আকাশের দিকে তাকিয়ে পুরোটা রাত কাটিয়ে দেই কিন্তু পরদিন তো স্বপ্নপূরণের দিন তাই প্রচন্ড অনিচ্ছাসত্ত্বেও গিয়ে ডে প্যাক টা গুছিয়ে স্লিপিং ব্যাগে ঢুকে পড়লাম। কাল কি হবে এই নিয়ে চরম এক্সাইট্মেন্ট কাজ করলে ও পিক৬৯ এর স্লিপিং ব্যাগে সেই একটা ঘুম হয়েছিল সেরাতে।

ভোর তিনটায় এলার্ম বাজার সাথে সাথেই লাফ দিয়ে উঠে বসলাম, পাহাড়ি ঘড়িরাও তখন ঘুমুচ্ছে (পাহাড়ি মোরগগুলোকে আমি পাহাড়ি ঘড়ি বলি কারণ প্রতি ঘন্টা পর পর এরা ডাকতে থাকে কিন্তু এর মাঝে  তেমন একটা ডাকে না।) দাদা সহ আমরা চারজনের টিম ভোর চারটায় বেড়িয়ে পড়লাম দলিয়ান পাড়া থেকে। শুরু করব যোগী হাফং এর শেষ চূড়া থেকে তাই ওয়াই জংশনের বায়ের রাস্তা ধরলাম। পুবের আকাশে আলো তখনো ফুটেনি আমরা পৌছে গেছি লৌহঝিড়ির একেবারে ভেতরে,এই জায়গাটা এখনো এত আদিম হয়ে আছে যে সূর্য উঠলেও বুঝার উপায় নেই তবে পাখীদের টুকটাক শব্দ মনে করিয়ে দিচ্ছে যে পাহাড়ী অরণ্যে আরেকটি অসম্ভব সুন্দর সকাল খুবই সন্নিকটে। শহুরে হাজারো সকাল অকাতরে বিলিয়ে দেয়া যায় এমন একটি পাহাড়ি সকালের তরে, এতই সুন্দর ছিল সকাল টা।

যোগী হাফং এর মাঝ রাস্তার ভিউ পয়েন্টটাতে পৌছতে পৌছতেই সূর্যি মামা ও উকি দিয়ে দিলেন পুবের আকাশে। তারপর আরো উপরে উঠতে উঠতে আমরা পৌছে গেলাম যোগী হাফং এর প্রথম চূড়ায়, যোগী শব্দের অর্থ হাওয়া সেই হাওয়ার পাহাড় নামের মাহাত্ম্য আবারো বুঝলাম প্রথম চূড়টার কাছে গিয়েই। বাতাসের শন শন আওয়াজের সুরেলা একটা গান সবসময়ই বাজতে থাকে এখানে আর উপরি পাওয়া হিসেবে চারপাশে দিগন্ত জোড়া পাহাড়সারির ভাজে ভাজে আটকে থাকা মেঘ তো ছিলই। সূর্য টা পুব আকাশে তখন মাত্র উঠতে শুরু করেছে।

যোগীর চূড়ায়

অল্পকিছুক্ষণ হাওয়া পাহাড়ের সামিটে থেকে রিজলাইন ধরে বহুল প্রতিক্ষিত হাটা শুরু করলাম, মাত্র ১০ মিনিট পর থেকেই আস্তে আস্তে বাঁশঝাড়ের ঘণত্ব বাড়তে শুরু করল, মাত্র ১০ ফুট সামনে হাটতে থাকা সঙ্গী ও তখন দৃষ্টিসীমার বাইরে। মাঝেই মাঝেই দাঁড়িয়ে পড়ে বাঁশবাগানের মধ্যে বাতাসের গান উপভোগ করছিলাম। সামনের সঙ্গীরা তাড়া দিচ্ছিল মাঝে মাঝে কিন্তু আমি তো তাড়িয়ে তাড়িয়ে এই সৌন্দর্য উপভোগ না করে যাবই না তাই একসময় মিথ্যা করে বলেই ফেললাম পায়ে ব্যাথা পাইসি আস্তে আস্তে আগাতে হবে। পথিমধ্যে অনেককিছুই চোখে পড়ল, সেসবের পুরো বর্ণণা আর এখানে দিলাম না তবে বুঝতে পারছিলাম এই প্রাচীন জঙ্গলের আদি অকৃত্তিম নিবাসীরা আমাদের কাছাকাছিই আছেন। আমরা তো সেখানে কয়েক ঘন্টার অতিথি মাত্র।

আরো কিছুদূর আগানোর পর রিজলাইনের বা পাশের খাদে মায়ানমার অংশে একটা শিমুল গাছের উপর বিশাল আকারের বাসাটা দেখেই বুঝলাম এটা আমার প্রিয় পাখী রাজ ধনেশের আবাস। অল্প অপেক্ষার পরই বিমানের মত দুই ডানা ছড়িয়ে রাজার মত ল্যান্ড করলেন উনি। ইনাকে না দেখলে রিজলাইনে হাটাটা অপূর্ণই থেকে যেত। ঝুড় ঝুড়ে মাটির উপর মরা বাঁশপাতা মাড়িয়ে যেতে গিয়ে হঠাৎ হঠাৎই হোচট খাইসি কয়েকবার, তার উপর দৃষ্টিসীমা মাত্র ৩/৪ হাত। এমন করতে করতে একসময় পৌছে গেলাম রিজলাইনের মধ্যমনি আয়াং ক্লাং এর চূড়ায়।

আয়াং ক্লাংয়ের চূড়ায়

ডানপাশে জোতলাং আর বা পাশে একসাড়িতে যোগীর চারটা চূড়া, অপলক নয়নে একবার ডানে তো আরেকবার বামে তাকাই। রিজলাইনটা এই জায়গায় অনেকটা বর্শার ফলার মত, দুই পাশটা পেছন দিকে ঢুকে আছে আর আয়াংক্লাং এর চূড়াটা চোখা হয়ে সামনের দিকে বের হয়ে আছে। একসময় আয়াং ক্লাং কে পেছনে রেখে আরো আগাতে থাকলাম, মাঝে শিকারীদের পাতা ফাদ গুলা দেখে খারাপ লাগলে ও এই বলে নিজেকে শান্তনা দিয়েছিলাম যে তাদের আমিষের চাহিদা মেটানোর আর কোন উপায় নাই দেখেই হয়ত তারা এভাবে সুন্দর প্রাণী গুলোকে হত্যা করতেসে।

বা পাশে মায়ানমার অংশের  খাড়া ঢালে তখন ঝকঝকে রোদ কিন্তু আমাদের মাথার উপর এত ঘণ বাঁশবাগান যে রোদ একেবারে ঢুকছেই না।   ব্যাপারটা একদিক দিয়ে ভালোই হয়েছিল, মাথায় রোদ নিয়ে খুব বেশিক্ষণ হাটা কষ্টকর হত।  পানিও খুব বুঝে খেতে হচ্ছিল,৪০-৪৫ মিনিট পর পর এক দুই সিপ  খাচ্ছিলাম। হঠাৎ করে বা পাশে একটু নড়াচড়া দেখেই আমাদের দাদা বললেন চলেন নীচ দিয়ে নামি সামনের রাস্তা ভালো না।

বলার সাথে সাথে আমরা ঝুরঝুরা মাটির ঢাল ধরে প্রায় ২০০ মিটারের মত খাড়া নেমে গেলাম,  রাস্তার কোন বালাই নাই এতক্ষণ যাও হড়িণ আর পাহাড়ি ছাগলের হাটার পথ ধরে আসছিলাম এখন একেবারেই খাড়া ঢাল বেয়ে নামা। আরো কিছুদূর এমন বন্ধুর পথ মাড়িয়ে রিজলাইনের শেষ পয়েন্ট জোতলাং চূড়ায় পৌছে গেসিলাম।

রিজলাইনের রাস্তাটায় আমরা বাংলাদেশের চতূর্থ সর্বোচ্চ পাহাড় যোগী হাফং,দ্বিতীয় সর্বোচ্চ  জোতলাং আর  আয়াং ক্লাং এর চূড়া ছুয়ে আসছিলাম।এত তৃপ্তি লাগছিল এতদিনের রিজলাইনের স্বপ্ন টা পূরণ করতে পেরে সেই অনুভূতিটা বলে বোঝানো যাবে না। আরো একটু টাইম নিয়ে আস্তে ধীরে করলে হয়ত আরেকটু বেশি উপভোগ করতাম কিন্তু যা হয়েছে তাই আলহামদুলিল্লাহ। রিজলাইনের প্রতি টানটা আরো অনেক বেড়ে গিয়েছিল প্রতিটা স্টেপে স্টেপে।

পাহাড় যে এক্সপ্লোরেশন করার জায়গা, দৌড়াদৌড়ির করার জায়গা না সেটা আবারো নতুন করে উপলব্ধি হল, কোথায় যাচ্ছি,  কেন যাচ্ছি,  অই জায়গার মাহাত্ম্যটাই বা কি?  এই প্রশ্ন গুলোর উত্তর জানা আসলেই খুব প্রয়োজন।

এবারের টিম মেম্বার দুইজনের প্রতি অনেক অনেক ভালোবাসা রইল আমার বাকেটলিস্টের একটা ইচ্ছা পূরণে সঙ্গী হওয়ার জন্য। জাহাঙ্গীরনগর এডভেঞ্চার সোসাইটির ভবিষ্যৎ এডভেঞ্চার গুলোর জন্য শুভ কামনা রইল। দলিয়ান পাড়ার দাদা দিদিরা তো আমাকে তাদের পাড়ার একজনই বানিয়ে ফেলসেন এই কবছরে, আবারো হয়ত অচিরেই ফিরে যাব তাদের সাথে দেখা করতে।

এই লেখাটি পাঠিয়েছেন আশিকুল হক আশিক। সব ছবিও লেখক কর্তৃক প্রদত্ত

About Muhammad Hossain Shobuj

Check Also

রিভিউ: কর্ণফুলী এক্সপ্রেসে সেন্টমার্টিন ভ্রমণ

বেশ কয়েকদিন ধরে শুনছিলাম কথাটা। বড় বড় সব ট্রাভেল গ্রুপেই দেখা যাচ্ছিলো পোস্ট, কিছুতেই কর্ণফুলী …

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *