Home চট্টগ্রাম বিভাগ কক্সবাজার থেকে কুমিরের খামারে একদিন

কক্সবাজার থেকে কুমিরের খামারে একদিন

347
0

কক্সবাজারের কাছে এ কুমিরের খামারে যাওয়ার ইচ্ছা ছিলো আমার। কিন্তু বাকিরা সৈকতেই থাকতে চায়। এর নের্তৃত্ব দিচ্ছে আমার ছেলে। তার বয়স তিন বছর, কিন্তু সে পানিতে অন্তত ৩/৪ ঘন্টা কাটিয়ে দেয়। তারপরও তাকে জোর করে তুলে আনতে হয়। অন্য কোন উৎসাহি দর্শক না পেয়ে একাই যাওয়ার সিদ্ধান্ত নিলাম।

সকাল বেলা আমার দুই ভাতিজা-ভাতিজীও আমার সাথে রওনা দিলো। কলাতলী মোড় থেকে আমরা উখিয়ার একটা সিএনজি নিলাম। লোকেশন বুঝিয়ে বলে আসা-যাওয়া আর ১ ঘন্টা থাকার জন্য ১,২০০ টাকায় চুক্তি করলাম। তখন কী আর জানতাম আমরা ৪ ঘন্টা থাকবো!মেরিন ড্রাইভ ধরে এগিয়ে উখিয়া হয়ে কুতুপালং টিভি টাওয়ারের কাছ থেকে বান্দরবানের রাস্তায় উঠলাম আমরা।

খামারে রয়েছে সব বয়সী কুমির ছবি লেখক

আকিজের রপ্তানীমুখী এ কুমিরের খামার আসলে বান্দরবানের শেষ প্রান্ত নাইক্ষ্যংছড়িতে। তবে যাতায়াত কক্সবাজার থেকেই সুবিধা। দেড় ঘন্টায় পৌছে গেলাম সেখানে।প্রবেশ ফি রাখা হয়েছে ৫০ টাকা করে। তবে সারা বছর খোলা থাকেনা। কুমিরের প্রজনন কালীন সময়ে এপ্রিল থেকে জুলাই মাস বন্ধ থাকে দর্শনার্থীদের জন্য। খোলা থাকে প্রতিদিন সকাল ৯টা থেকে বিকেল ৫ টা পর্যন্ত।

একেবারে বাচ্চা থেকে শুরু করে প্রাপ্ত বয়স্ক প্রায় ১,০০০ কুমির আছে এর মধ্যে। একদিনের বাচ্চাও চাইলে কামড় দিয়ে মানুষের হাতের আংগুল কেটে ফেলতে পারে। প্রাপ্ত বয়স্ক পুরুষ কুমির ১৬ ফিটের বেশি লম্বা আর ওজনে ১,০০০ কেজিরও বেশি হয়। বিভিন্ন বয়সী কুমির বিভিন্ন ব্লকে রাখা হয়েছে। দেখে মনে হয় ম্যানিকুইন চ্যালেঞ্জ খেলছে কুমিরগুলো এমনভাবে স্থির হয়ে থাকে। তবে নড়াচড়া টের পেলেই তেড়ে আসে হা করে, ভয়ংকর দেখতে।

পূর্ণ বয়স্ক কুমির লম্বায় ১৬ ফিট ও ওজনে ১,০০০ কেজির বেশি হতে পারে ছবি লেখক

সবচেয়ে দর্শনীয় জায়গা হচ্ছে খোল একটা জলা জায়গা আছে। সেখানে ৫০ টি প্রাপ্ত বয়স্ক কুমির ছাড়া আছে। দূর্ভাগ্য আমাদের, বৃষ্টির কারণে সব কুমির পানির নিচে যেয়ে বসে আছে। এর মধ্যে আমরা আড্ডা দিচ্ছি এখান দায়িত্বপ্রাপ্ত কর্মকর্তা আদনান ভাইয়ের সাথে। ভদ্রলোক বন্যপ্রাণী বিশেষজ্ঞ ও স্নেক রিসকিউয়ার। আগে থেকেই ফেইসবুকে উনার সাথে পরিচয় ছিলো। তবে বৃষ্টির মধ্যে উনার ডেরায় বসে বন্যপ্রাণী নিয়ে অনেক নতুন কিছু শিখে ফেললাম আমরা। বিশেষ করে বাচ্চার খুব খুশি, ডিসকভারি চ্যানেল লাইভ দেখছে তারা।

হঠাৎ করেই দৃশ্যটা চোখে পড়লো আমার। একটা কুমির অন্যটাকে মাথা দিয়ে প্রচন্ডভাবে সাইড কিক দিলো। তারপর আবার দূরে সরে যেতো লাগলো। আদনান ভাই ব্যখ্যা করলো আধিপত্য বিস্তার নিয়ে লড়াই চলছে। একবার শুরু হলে চলতে পারে তিনদিনও। একজনের মৃত্য বা হাল ছেড়ে দেয়া ছাড়া চলে এ লড়াই। অবশ্য তিনবার মার খেয়ে এক কুমির হাল ছেড়ে দিয়ে দূরে সরে গেলো।

সংগ্রহ করা কুমিরের ডিম হাতে বন্য প্রাণী বিশেষজ্ঞ আদনান আজাদ আসিফ ছবি লেখক

এর মধ্যে অসময়ে ডিম পেড়েছে একটা কুমির। তাই সেই ডিমগুলো এখন উদ্ধার করতে হবে। হ্যাচারী ছাড়া এখানে ডিম ফুটে বাচ্চা বের হবেনা। আমাকেও সঙ্গে নিয়ে গেলেন দেখার জন্য। ভয়ংকর দৃশ্য, সেই মা কুমির পাহারা দিচ্ছে ডিম। একজন কাছে যেতেই তাকে হা করে কামড় দিতে ছুটে আসলো। সামান্য দুটো বাঁশ দিয়েই কুমিরকে অসাধারণ দক্ষতায় সরিয়ে দিয়ে ডিম সংগ্রহ করা হলো। ভিডিও দেখতে পারেন পুরো দৃশ্যের ইউটিউবে: 

সাধারণত কুমির ৬০ টি পর্যন্ত ডিম পাড়ে। তবে এই কুমিরটি থেকে মাত্র ১৬ টা ডিম উদ্ধার করা সম্ভব হয়েছে। ব্যাখ্যা করে বুঝালেন আদনান ভাই। ঢালু জায়গায় ডিম পাড়াতে অধিকাংশ ডিম গড়িয়ে পড়ে গেছে, যেগুলো উদ্ধার করা সম্ভব না, এছাড়া কুমিরে উঠানামা ও ডিম সংগ্রহ করার সময়কার যুদ্ধে আরো কিছু ডিম ভেংগে গেছে।

খামারের পরিবেশে নোনা পানির কুমিরের ডিম ফুটে বাচ্চা বের হবেনা, সেকাজ হ্যাচারিতেই করতে হবে। কুমিরের ডিমের একেকটির দাম ধরা হয় এক লক্ষ টাকা। এর মধ্যে তিনটা ডিম দেখলাম যেগুলো হাল্কা ভেংগেছে আর ফুটবেনা, সেগুলো ভাজি করা শুরু করলো। অবাক হয়ে জানতে পারলাম এ ডিম ভাজি সবাই খেয়ে ফেলবে, আমাকে সাধলো খাবার জন্য।

পানিতে নি:শব্দে চলাফেরায় অভ্যস্ত মৃত্যদূত ছবি লেখক

এর মধ্যে পার হয়ে গেছে পুরো চারঘন্টা। তাই এ বেলা আদনান ভাইয়ের কাছে বিদায় নিয়ে রওনা দিলাম কক্সবাজার। দেড় ঘন্টায় আবার পৌছে গেলাম সুগন্ধা সৈকতে। তিন ঘন্টা বেশি থাকায় সিএনজিকে আরো তিনশ টাকা দিলাম।সতর্কতা: কুমিরের খামারে কুমিরকে কোন ধরণের উত্যক্ত করা যাবেনা। বোতল ছুড়লে বা কোন কিছু দিয়ে আঘাত করলে ১০,০০০ টাকা জরিমানা ধার্য করে রাখা আছে। এতে ভালোই কাজ হচ্ছে মনে হয়, একটা বোতলও দেখলামনা কুমিরের ডেরায়। প্লাস্টিক বোতল নিয়ে প্রবেশেই এ খামারে নিষিদ্ধ।

অনেকে লোকেশন বুঝতে পারছেন না, তাদের জন্য লোকেশন ম্যাপের লিংক দিলাম: https://goo.gl/maps/gzYDf8pHxetuS6CW8

যাতায়াত: কক্সবাজার শহর থেকে গাড়ি ভাড়া করে যেতে পারেন কুমিরের খামার। ঠিকমতো না চিনলে ড্রাইভারকে বলবেন কুতুপালং টিভি টাওয়ার থেকে বাম দিকে কয়েক কিলো যেতে হবে। গাড়ি ভাড়া পড়বে ২,০০০-৩,০০০ টাকা। মানুষ কম হলে সিএনজি রিজার্ভ করে নিতে পারেন, সেক্ষেত্রে খরচ পড়বে ১,২০০-১,৫০০ টাকা। এছাড়া ভেংগে ভেংগে যেতে পারেন। কলাতলী মোড় থেকে সিএনজি জনপ্রতি ১৫০ টাকায় উখিয়া পর্যন্ত যাবে। সেখান থেকে আলাদা সিএনজিতে কুমিরের খামারে আসা-যাওয়া অপেক্ষা সহ ২০০ টাকা নিবে। খামারে প্রবেশ ফি ৫০ টাকা। আশেপাশে কোন দোকান-পাট নেই, তাই দুপুরে খেতে হলে উখিয়া আসতে হবে।

ফিচার ছবি: লেখক

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here