দুরন্ত সাঙ্গু নদীতে দুর্ধর্ষ ১০২ কিলোমিটার কায়াকিং

মূল পরিকল্পণা ছিলো ২২০ কিলোমিটার চালিয়ে বর্ষায় ফুলে ফেঁপে ওঠা খরস্রোতা সাঙ্গু নদীর তিন্দু বাজার থেকে শুরু করে শেষ করা হবে বঙ্গোপসাগরে। নানা প্রতিকূলতায় ১০২ কিলোমিটার চালিয়ে শেষ পর্যন্ত বান্দরবানে ইতি টানতে হয়েছে এবারের The Great Sangu Expedition এর। শেষ করতে না পারলেও দুঃসাহসিক এ অভিযানকে প্রশংসার দৃষ্টিতেই দেখছে দেশের অ্যাডভেঞ্চার প্রিয় মানুষেরা। তাইতো ফেইসবুকে, অভিনন্দন, শুভেচ্ছাবাণী জোয়ারে ভাসছেন অভিযাত্রীরা। ভ্রমণের পুরো গল্প/ছবি/ভিডিও দেখতে মুখিয়ে আছেন সবাই।

তিন্দু থেকে অভিযান শুরুর সময় অভিযাত্রীরা। ছবি: ফজলে রাব্বি

কিছুদিন আগেই ঘোষণা দিয়েছিলো BD Kayakers এর প্রতিষ্ঠাতা দুই সদস্য ফজলে রাব্বি ও ইমরুল খান। কায়াক (হাতে চালিত নৌকা বিশেষ) চালিয়ে ২২০ কিলোমিটার পাড়ি দিয়ে সাঙ্গু নদী ধরে তিন্দু থেকে কায়াক চালিয়ে পৌঁছাতে চান তারা গহিরার কাছে বঙ্গোপসাগর পর্যন্ত। সেই লক্ষ্যে ১৭ই সেপ্টেম্বর ২০২০ মোট ২১ জন সদস্যের এই দল রওনা দেন তিন্দুর পথে। মোট ১১টি কায়াক চালিয়েছেন ১৮ জন অভিযাত্রী। সঙ্গে ছিলো দুটি সাপোর্ট ও রেসকিউ বোটে আরো তিনজন।

তিন্দু থেকে শুরু করার কিছুক্ষণের মধ্যেই প্রথম র‌্যাপিডে (নদীর খরস্রোতা অগভীর অংশ, যেখানে পাথরের উপর দিয়ে তীব্র বেগে পানি ছুটে যাচ্ছে) উল্টে যায় বেশ কয়েকটি কায়াকে। প্রচণ্ড রোদে পানি শেষ হবার পর ঝিরি খুঁজে নিয়ে পানি খেতে হয়েছে অনেককে। থানচি পর্যন্ত অনেকগেুলো র‌্যাপিড পার হয়ে তূলনামূলক শান্ত নদী পাওয়া যায়। প্রতিদিনই নদী মোটমুটি ৩০ কিমি চালিয়ে নদী তীরেই ক্যাম্প করে আস্তে আস্তে লক্ষ্যের দিকে এগুচ্ছিলেন তাঁরা।

রাতের ফ্ল্যাশ ফ্লাড়ে ভেসে যাওয়া ক্যাম্পসােইট। ছবি: ফজলে রাব্বি

তৃতীয় রাতে তাঁদের ক্যাম্পসাইট হড়কাবানে (ফ্ল্যাশ ফ্লাড) ভেসে যায়। বাংলা চ্যানেল সাঁতরে পার হওয়া দলের অভিজ্ঞ সাঁতারু সোহাগ বিশ্বাস জীবনের ঝুকি নিয়ে উদ্ধার করেন ছুটে যাওয়া কায়াক। তুমুল বৃষ্টির মধ্যে ভয়ংকরভাবে বেড়ে যাওয়া নদীর পানির মধ্যেই চলছিলো কায়াকিং। পরের দিন ক্যাম্প স্থাপন করা হয়েছিলো রিজুক ঝর্ণার কাছে। তবে সামরিক বাহীনির অনুরোধে অভিযাত্রীরা রুমা বাজার হোটেলে চলে আসেন। পরের দিন রুমা থেকে আবার শুরু করা হয় অভিযান।

আবহাওয়া পূর্বাভাসে আগে থেকেই জানা গিয়েছিলো তুমুল বৃষ্টি থাকবে এ কয়েকদিন, হয়েছেও তাই। তবে ক্লান্তি, হড়কাবান বা নদীর স্রোত নয়, বরং নদীপথে এ ধরণের অভিযানে পদে পদে বাঁধা হয়ে দাঁড়িয়েছিলো নিরাপত্তা জনিত উদ্বেগ ও প্রাশাসনিক জটিলতা। তাই ১০২ কিলোমিটারেই থামতে হলো পুরো দলকে। বান্দরবানের পৌঁছে শেষ পর্যন্ত অভিযানের এবারের মতো ইতি টানার ঘোষণা দেন দলনেতা ফজলে রাব্বি।

তুমুল বৃষ্টিতে রিজুক ঝর্ণায় । ক্যাম্পিং ছবি: রাকা

অভিযান অসমাপ্ত রেখে বান্দরবন থেকে ফিরে আসেন সবাই গত ২৩ সেপ্টেম্বর। সব ঠিকভাবে চললে ২৫ সেপ্টেম্বর গহিরা পৌঁছে যেতে পারতো দলটি। গতকাল অভিযানের সংক্ষিপ্ত ভিডিও প্রকাশের পর ফেইসবুকে ভাইরাল হয়ে যায় সে ভিডিওটি। ২৪ ঘণ্টায় ৩৫,০০০ এর বেশি লোক এই ভিডিও দেখে। দেশের মধ্যে তীব্র খরস্রোতা নদীতে দূর্দান্ত কায়াকিং দেখে অভিভূত অ্যাডভেঞ্চার প্রিয় ব্যক্তিরা। শেষ করতে না পারার চেয়ে অভিযাত্রীরা হার না মানা মনোভাব আর সাহসিকতার প্রশংসায় পঞ্চমুখ সবাই।

https://www.facebook.com/ourIntrepidjourney/videos/356762378803555
ফেইসবুকে ভাইরাল হওয়া অভিযানের ভিডিও

এ অভিযানে বিডি কায়াকার্সের সাথে আয়োজনে সঙ্গী হয়েছিলো ভ্রমণ বিষয়ক ওয়েবসাই ভ্রমণগুরু.কম, আউটডোর এডুকেশন নিয়ে কাজ করা রোপ ফোর, ঢাকার কেরাণীগঞ্জের ক্যাম্পসাইট ধলেশ্বরী ক্যাম্পিং ও কায়াকিং, অ্যাডভেঞ্চার গিয়ারর শপ “পিক সিক্সটি নাইন অ্যাডভেঞ্চার শপ”, অর্নামেন্টাল ফিশ শপ “নেচার একুয়াটিক্স” সহ বেশ কয়েকটি প্রতিষ্ঠান। এবার বান্দরবানে শেষ হলেও ভবিষ্যতে বড় ধরণের ইভেন্ট আয়োজনের প্রত্যয় ব্যক্ত করেছেন বিডি কায়াকার্স। বাংলাদেশে “ওয়াটার স্পোর্টস” এর প্রসার নিয়ে কাজ করা এ সংগঠনটি অচিরেই আরো কিছু ইভেন্ট আয়োজন করবে বলে জানিয়েছেন।

ফিচার ছবি: ফজলে রাব্বি

About Jewel Rana

Check Also

বিশ্বের ২য় সর্বোচ্চ পর্বতে শীতকালীন সামিটের ইতিহাস রচিত

সারা বিশ্বে ৮,০০০ মিটারের চেয়ে বেশি পর্বতের সংখ্যা মাত্র ১৪ টি। এর মধ্যে বাকি তেরটিতেই …

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *