শরৎচন্দ্রের “চাঁদের পাহাড়” বইটি কি কখনোও পড়েছিলেন? অথবা জনপ্রিয় এমিনেশ মুভি “মাদাগাস্কার ২: এসকেপ টু আফ্রিকা? সিম্বা কার্টুনটি দেখেছিলেন? সবুজে ঘেরা বনের উপর সাদা পর্বতের চূড়া দেখা যাওয়া পর্বতটির নামই চাঁদের পাহাড় খ্যাত ”মাউন্ট কিলিমানজারো”।
তানজানিয়ার পূর্ব প্রান্তে কিলিমানজারো পর্বতের অবস্থান। মূলত একটি অগ্নেয়গিরি কিলিমানজারো, যার মোট তিনটি কোন রয়েছে। এগুলো হচ্ছে কিবো, শিরা ও মাউনজি। এর মধ্যে কিবো সবচেয়ে বেশি উচু। আরও একটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হচ্ছে একমাত্র কিবোই এখনও বেঁচে আছে, কিন্তু সুপ্ত অবস্থায় আছে। শিরা ও মাউনজি দুটোই মৃত। ধারণা করা হয় এ অঞ্চলে সর্বশেষ অগ্নুৎপাত হয় ১.৫-২ মিলয়ন বছর আগে। শিরার উচ্চতা ৪,০০৫ মিটার (১৩,১৪০ ফুট) আর মাউনজির উচ্চতা ৫,১৪৯ ফুট (১৬,৮৯৩ ফুট)। মাউনজির সাথে কিবোর দূরত্বটা দেখার মত, প্রায় ১১ কিমি। ভূমিক্ষয়ের কারণে এদুটোকে আলাদা পর্বত বলে মনে হয়। মাউনজি পুরোটায় পাথুরে, যার নবীনতম পাথরের বয়সও ৪৫০,০০০ লক্ষ বছরের বেশি। পাথরের এই প্রান্তটায় সাধরণত কেউ উঠেনা। দূর থেকে দেখে আমার কাছে মনে হয়েছে মাউনজি হতে পারে রক ক্লাইম্বারদের স্বপ্নের গন্তব্য। শিরার মাথা ভেংগে এটার উচ্চতা কমার কারণে এখন আর আকর্ষণ নেই। আর দূর্গম পাথুরে মাউনজিতেও আজকাল কেউ আর উঠতে যায়না। তাই সব আকর্ষণের কেন্দ্রবিন্দু কিবো।
কিলিমানজারো পর্বতটি বিভিন্ন কারণে বিখ্যাত ও পর্বতারোহীদের স্বপ্নের গন্তব্য। প্রথমত, কিলিমানজারো আফ্রিকার সর্বোচ্চ পর্বত। কিবোর চূড়া উহুরু পিক এর উচ্চতা ৫,৮৯৫ মিটার বা ১৯,৩৪১ ফিট। এটিকে আফ্রিকার ছাদও বলা হয়ে থাকে। এছাড়া এ পর্বতটি একাকি দাঁড়িয়ে থাকা পর্বতগুলোর মধ্যে সর্বোচ্চ পর্বত। সাত মহাদেশের সাত টি সর্বোচ্চ পর্বতের মধ্যে আফ্রিকা মহাদেশের প্রতিনিধি কিলিমানজারো। যারা ”সেভেন সামিট” সম্পন্ন করেন তাদের জন্য এ পর্বতে না যেয়ে উপায় নেই। সেভেন সামিট মানে সাত মহাদেশের সাত সর্বোচ্চ পর্বতে আরোহণ। একমাত্র বাংলাদেশি হিসেবে এই দু:সাধ্য কাজটি সম্পন্ন করেছেন ওয়াসফিয়া নাজরীন।
সৌন্দর্যও টা অনেক গুরুত্বপূর্ণ বিষয়। প্রথমে বন দিয়ে শুরু এই পর্বতের পরতে পরতে সৌন্দর্য ছড়িয়ে ছিটিয়ে আছে। প্রতি দুই হাজার মিটার পর পর এর প্রকৃতিও অনেক পরিবর্তন হতে থাকে। ম্যাটন বনের পর আসে মুরল্যান্ড, তারপর পার্বত্য মরুভূমি এবং সবশেষে আর্কটিক জোন। সবুজ বনের উপর মাথা উঁচু করে দাঁড়িয়ে থাকা পর্বতের এ চূড়া যে কোন পর্বতপ্রেমীকে চম্বুকের মত টানে। আর সে কারণেই সারা বিশ্ব থেকে ছুটে আসে পর্যটকেরা। প্রতিবছর অন্তত ৩৫,০০০ পর্যটক কিলিমানজারো পর্বতে উঠার জন্য আসে, যার অর্ধেকেই সামিট করতে পারেনা। তাই পর্যাপ্ত প্রস্তুতি নিয়ে তবেই আসবেন। তানজানিয়া সরকারের অন্যতম লাভজনক জাতীয় উদ্যান “কিলিমানজারো ন্যাশনাল পার্ক”, যেটা থেকে আয় হয় ৫০ মিলিয়ন ডলার। টাকার অংকে সেটা ৪০০ কোটি টাকা। তানজানিয়ার মাত্র একটি জাতীয় উদ্যানের আয় এর চেয়ে বেশি।
কিলিমানজারো ট্রেক করা কিন্তু বেশ খরচের ব্যপার। এর প্রধান কারণ হচ্ছে তানজানিয়া সরকারের আরোপিত ন্যাশনাল পার্ক ফি ও গাইড না নিয়ে ঢুকতে না পারা। ৫/৬ দিনের ট্রেকের জন্য ন্যাশনাল পার্ক কর্তৃপক্ষকে ফি দিতে ৮০০ ডলার (প্রায় ৭০,০০০ হাজার টাকা)। গাইড, কুক, পোর্টার সহ এ খরচ চলে যায় ২,০০০ ডলারের কাছাকাছি। এ ছাড়া বাংলাদেশ থেকে গেলে বিমান ভাড়া পরে প্রায় ২,০০০ ডলারের মতই। খরচ কমাতে তাই বিমান ভাড়ার ছাড়ের অপেক্ষা করা ছাড়া সহজ কোন পথ নেই। মোটামুটি বাংলাদেশি টাকায় সব মিলে খরচ পড়বে চার লাখ টাকার মত। বাংলাদেশ থেকে প্রথম এ পর্বত সামিট করতে সক্ষম হন মুসা ইব্রাহিম ও নিয়াজ মোর্শেদ পাটোয়ারি ২০১১ সালে। আমার জানামতে এ পর্যন্ত ৬ জন বাংলাদেশি এ পর্বত সফলভাবে সামিট করতে সক্ষম হয়েছেন। এছাড়া রেশমা নাহার রত্না এ পর্বত জয়ের লক্ষ্যে এ সপ্তাহে বাংলাদেশ ছেড়েছেন। তিনি মাউন্ট কেনিয়া ও মাউন্ট কিলমানজারো সামিট করবেন।
বেশ কয়েকটি রাউট ধরে কিলিমানজারোতে উঠা যায়। তার মধ্যে রয়েছে রংগাই রাউট, মাসামে রাউট, লেমোশো রাউট, শিরা রাউট ও নর্দান সার্কিট রাউট। এছাড়া মেউকা রাউট নামে আরেকটি রাউট আছে যেটা মূলত পর্বত থেকে নামার কাজে ব্যবহার করা হয়। এ রাউটগুলোর মধ্যে সবচেয়ে সহজ হচ্ছে রংগাই রাউট যেটা ৭ বা ৮ দিনে শেষ করা যায়। এজন্য এটাকে কোকাকোলা রাউট বলে। আর সবচেয়ে সুন্দর রাউট বলা হয় মাসামে রাউটকে। তুলনামূলক ভাবে কঠিন হওয়াতে একে হুইস্কি রাউটও বলে। সময় লাগে ৬/৭ দিন। অধিকাংশ পর্বতারোহী বেছে নেন মাসামে রাউটকেই।
অধিকাংশ রাউটে প্রতিদিন নির্ধারিত ১০-১১ কিমি ট্রেক করে পরবর্তী ক্যাম্পে পৌছাতে হয়। এছাড়া এমনভাবে রাউটগুলো তৈরী করা হয়েছে যাতে একজন পর্বতারোহী সঠিক ভাবে এক্লিমাইটাজেশন করে নিজের শরীরকে পর্বতে উচ্চতার সাথে খাপ খাইয়ে নিতে পারে। তবে মনে রাখতে হবে ৩,০০০ মিটারের কোন পর্বতে না যেয়ে এধরণের পর্বতে উঠার ঝুকি নেয়া ঠিক হবেনা। এক্ষেত্রে কিলিমানজারো যাওয়ার আগে অন্তত ভারতের সান্দাকফু ঘুরে এসে দেখতে পারেন পর্বতে আপনার উচ্চতা জনিত কোন সমস্যা দেখা দেয় কিনা। শতকরা ৫০ ভাগেরও বেশি লোক এ পর্বতে কোন না কোন উচ্চতা জনিত অসুস্থতায় ভোগে।
হাই অল্টিচিউড পর্বতের প্রায় সব গিয়ারই এ পর্বতে লাগে। বিশাল লম্বা তালিকা, যার অনেকগুলোই পর্বতারোহীদের থাকে। না থাকলেও কোন সমস্যা নেই, ১৫০ ডলারের বিনিময়ে সবকিছুই সেখানে ভাড়া পাওয়া যায়। তবে তাঁবু নিতে হবেনা, যে এজেন্সীর সাথে যাবেন তাঁবু ও খাবারের ব্যবস্থা তারাই করবে। মোটামুটি দুটো ব্যাগ নিবেন যার একটি ডে প্যাক হতে হবে (২০-২৫ লিটারের)। আর ডাফল ব্যাগের বাকি সরঞ্জাম পোর্টার বহন করবে।
বাংলাদেশে তানজানিয়ার দূতাবাস না থাকায় ভিসা পাওয়াটাই একটি বড় সমস্যা। এক্ষেত্রে ভারতে দিল্লীতে অবস্থিত তানজানিয়ান দূতাবাস থেকে ভিসা সংগ্রহ করতে পারেন। এছাড়া কেনিয়াতে বাংলাদেশি পাসপোর্টে অন এরাইভাল ভিসা পাওয়া যায়, সেখানে নেমে বাইরোডে তানজানিয়ার বর্ডারে আসলে কিলিমানজারো বা সাফারি বুকিং থাকলে তারা অন এরাইভাল ভিসা দিয়ে দেয়।
আমি ট্রেকিং করেছিলাম ট্রেকিং ও সাফারি অ্যাডভেঞ্চার নামের একটা এজেন্সীর সাথে। আর কোন তথ্য জানার দরকার থাকলে বা যেতে চাইলে তাদের সাথে যোগাযোগ করতে পারেন:
Trekking and Safari Adventure
Cell : +255 672 475 320
Email : info@trekkingandsafariadventures.com
Address : Po Box 1884 Moshi, Tanzania.
ভ্রমনগুরু your travel adviser