Home ঢাকা বিভাগ স্কুল পালানো ছেলের ডায়েরি: শুরুর গল্প

স্কুল পালানো ছেলের ডায়েরি: শুরুর গল্প

112
0

স্মরণীয় ভ্রমণ বলতে যা বুঝায় সেইটা হয়তো কোন সংজ্ঞায় সংজ্ঞায়িত করতে পারবো না। আমার কাছে সব ভ্রমণই স্মরণীয়৷ কারণ কিছু মানুষ ঘুরে বিশ্বকে দেখতে, জ্ঞান অর্জন করতে৷ তাদের ঘুরার কোন শেষ নেই৷ তারা হয়তো ভোরের ওই ঘাসের ডগায় বিন্দু বিন্দু জমে থাকা শিশির কণার স্থানচ্যুত হয়ে মৃত্তিকার সাথে মিশে যাওয়ার মাঝেও জীবনের মানে খুঁজে পায়। তাই আমার কাছে সব ভ্রমণের স্মৃতি বড় প্রিয়, বড় আপন।

পরিব্রাজকের কোন দেশ নাই। নাই কোন আপন ঠিকানা। সৈয়দ মুজতবা আলী যেমন শবনমের নেশায় ঘুরেছেন কাবুল, যেন কোন আফিমের নেশায় ঘুরে বেড়িয়েছি শবনমের সাথে৷ সৈয়দ সাহেব শবনমের সাথে ঘুরেই না জানতে পেরেছিলাম।

শুরুতেই প্রত্মতত্ত্বের সাইনবোর্ড। ছবি: লেখক

‘জীবনই অভিজ্ঞতা, আর অভিজ্ঞতাই জীবন। অভিজ্ঞতা সমষ্টির নাম জীবন আর জীবনকে খণ্ড খণ্ড করে দেখলে এক-একটি অভিজ্ঞতা। এক -একটি অভিজ্ঞতা যেন এক এক ফোঁটা চোখের জলের রুদ্রাক্ষ। সব কটা গাঁথা হয়ে যে তসবী-মালা হয় তারই নাম জীবন।’ (শবনম)

আমার ভ্রমণ জীবনে সৈয়দ সাহেবের ইনফ্লুয়েন্স প্রবল৷ আর তাঁকে নিয়ে ভাবালুতার কথা শুরু করলে তো শেষ হবে না। তাই ভূমিকা ছেড়ে গল্পে ফিরে যাই৷ আমি আমার স্কুল পালানো দিনগুলোর কথা বললে সেইটা ভ্রমণ হবে না কি ক্লাস ফাঁকি দেওয়া এক ফাঁকিবাজের ডায়েরি সেইটা নিয়ে ভাবার আছে।

পানাম নগরের পুকুর। ছবি: লেখক

তবে স্মৃতির পাতা খুঁড়তে গিয়ে ফিরতে হয় যে সেই নবম শ্রেণিতে। তখন মডেল স্কুলের ত্রাস ছিলেন এক যুগ পুরুষ৷ তখন মতিঝিল মডেল হাই স্কুলে রসায়নের রস না বুঝাতে পারলে পশ্চাৎদেশে শপাং শপাং আওয়াজের ঝংকার শুনা যেত৷ যেহেতু আমার শিক্ষা গুরু নাম প্রকাশ করে অসম্মানিত করবো না৷ যারা বুঝার বুঝে যাবে৷ সেই অস্থির সময়ে একদা আবিষ্কার করলাম আজ রসায়নে ক্লাসে বেদম মার খেতে হবে৷ বোরের পরমাণু মডেল পড়ে আসেনি৷

আহা ঐতিহ্য। ছবি: লেখক

মারের কথা ভেবে এজিবি কলোনির কোন মাঠে আকাশ পানে তাকিয়ে ছিলাম উদাস হয়ে৷ পকেটে ৪১ টাকা৷ হাতে অফুরন্ত সময় সিদ্ধান্ত নেবার৷ তখনই জগৎ পিতা আমার জ্ঞানচক্ষু খুলে দিল আশিক তুই পালিয়ে যা সময় তোর পক্ষে নেই। হ্যাঁ ডায়লগ হয়তো কোথাও শুনে থাকবেন৷ সেই শোনা নিয়েও বা কি কাজ৷ ঈগলের মত আশেপাশে চোখ বুলিয়ে দেখলাম স্কুলের কেউ আশেপাশে আছে কি না৷ এরপর পটাপট স্কুল ড্রেস পরিবর্তন করে ফুল বাবু হয়ে গেলাম। আমাদের স্কুল পালানো একটি গ্রুপ ছিল যাদের স্কুল শার্টের নিচে থাকতো টি-শার্ট৷ তাই স্কুল শার্ট খুলে ফেললেই আমি বিশ্ব নাগরিক। এবার থাকবো না আর বদ্ধ ঘরে, দেখবো এবার জগৎটাকে কেমন করে ঘুরছে মানুষ যুগান্তরের ঘূর্ণিপাকে৷

আহা ঐতিহ্য। ছবি: লেখক

সেই ঘূর্ণিপাকে ঘুরার জন্য চোরের মত তাড়াতাড়ি সেখান থেকে হাঁটা দেওয়া শুরু করলাম। দু কদম এগিয়ে সবাইকে ছাড়িয়ে গ্রীষ্মের উষ্টাগত তাপে হেঁটে যাচ্ছে অদ্ভূত এক যাযাবর৷ কমলাপুর রেল স্টেশনের সামনে দেখতে পেলাম চর মোনাইয়ের পীরের ওয়াজ মাহফিলের বিশাল বড় একটা সাইনবোর্ড৷ সাইনবোর্ডের পাশে ইলেকট্রিকের খামে আনন্দ ভ্রমণ একটা লেখা আমায় চুম্বকের মত আর্কষণ করলো৷ সেই আর্কষণে ছুটে গেলাম সেথায়৷ সোনারগাঁয়ে আনন্দ ভ্রমণের আয়োজন করেছে কোন যুব সংগঠন৷ ২৫০ টাকা চাঁদা। অমুক তারিখে সবার জন্য বাস অপেক্ষা করবে যাত্রা বাড়ির মোড়ে৷

গরমের গীত শীতে শুনালে হুজুর তো ক্ষ্যাতা পাবে না৷ তবে যাযাবরের কাছে সে আসে তার প্রাথমিক গন্তব্যের দিক নির্দেশনা হিসাবে৷ কিভাবে সোনারগাঁ যাব তার ঠিক নাই কিন্তু একতারা বাজায় লালন সাঁই৷ সাঁইয়ের কথা উদ্দেশ্যমূলক ভাবে বলা নয়। সময়ের পরিভ্রমণে সে যে এসেছিল আমার এই ভ্রমণে সে না হয় সামনে আগালে জানা যাবে৷ তাই হাঁটা শুরু করলাম। হেঁটে হেঁটে একেবারে যাত্রাবাড়ি।

পানামের ঐতিহ্য অন্বেষণে পথিক। ছবি: লেখক

যাত্রাবাড়ি গিয়ে পাই না কেন কুল কিনারা। কোথায় যাব কোন বাসে উঠবো, ভাড়াই বা কত৷ পকেটে তো মাত্র ৪১ টাকা। তখন ঘড়িতে বাজে প্রায় ১টার কাছাকাছি৷ এতক্ষণে স্কুলও শুরু হয়ে গেছে ফিরে যাবার উপায় নেই৷ হেঁটে পেটেও ইঁদুর সেনা দৌড়াচ্ছে৷ জীবনানন্দের কবিতা যেন আমায় গান শুনিয়ে যায়৷ চমৎকার! — ধরা যাক দু’-একটা ইঁদুর এবার। স্কুল ব্যাগে টিফিনের জন্য আম্মার দেওয়া ভাত ঝাল করে রান্না করা মুরগির মাংস আর আলু ভাজি ত্রাহি ত্রাহি করে পেটে যাবার জন্য গাহিয়া যাচ্ছে সুকান্তের মত৷ ক্ষুধার রাজ্যে পৃথিবী গদ্যময় হবার অনুভূতি সেই প্রথম পেলাম।

আহা পুরান নগর শুনাও কত কাব্য। ছবি: লেখক

তবে সেও বা কোথায় বসে খাওয়া যায়৷ পাশে দেখতে পেলাম ইটালিয়ান হোটেল বেঞ্চ। সেখানে বসে ভাত সাটাচ্ছে মুটে মজুর শ্রমিকের দল৷ তাহাদের পাশে বসে টিফিনের জাদুর বাক্স খুলতে যে বড় লজ্জা লাগছে৷ তবে সেই লজ্জা কে বির্সজন দিয়ে বসে পড়লাম। বসার সাথেই সাথেই হোটেলের মামা জিজ্ঞেস করলো, ‘বাজান কি খাইবা।’ বাজান ইনিয়ে বিনিয়ে লজ্জার আব্রুতে আজ আচ্ছাদিত তাই লজ্জার আবরণ ভেঙ্গেই বলে ফেললাম মামা আমার কাছে টাকা নেই৷ কিন্তু বাসা থেকে আনা মায়ের দেওয়া ভাত আছে আপনার বেঞ্চে বসে খাই৷ মামা মৃদু হেসে বললেন খান৷ আমি আমার বাক্স খুলে খাওয়া শুরু করবো কোথা থেকে জাদুর চামচ আমায় দিয়ে গেল একটি ডিম আর আলু ভর্তা।

আমি অবাক নয়নে সামনে তাকিয়ে দেখলাম শ্বেত শুভ্র দাঁড়ির এক আদম আমার দিকে তাকিয়ে আছে৷ তার সফেদ মুক্তার মত দাঁত বের করে হেসে বললেন, ‘ছুটু মানুষ তোমার ক্ষুধা লাগে না৷ এইটুকুন খাইয়া পেট ভরবো। তোমার সমান আমার নাতি আছে৷ খাও পয়সা দিতে হবে না।’ সেই মামা যে মামা নয় আমার দাদার বয়সি। অথচ এ বয়সেও কত পেটানো দেহ৷ আমি যদি বলিতাম স্কুল পালিয়ে এসে বসেছি এত খাতির কি করতো৷ সে হয়তো কোন দিন জানা হবে না৷

ছাদ থেকে এক টুকরো পানাম। ছবি: লেখক

শ্রমিকের ঘামের গন্ধ আর যাত্রাবাড়ি ধুলার আস্তরন মিলেমিশে একাকার৷ কোন ক্যাসেটের দোকান থেকে বেজে উঠে জেমসের গান ‘টিফিনের পয়সা বাঁচিয়ে, তোমায় কিনে দেওয়া/ সে রুমাল চেপে, এখনো কেন কাঁদো।’ আমার কোন সাধ্যি আছে টিফিনের পয়সা জমিয়ে তোমায় রুমাল কিনে দিব৷ তিন গোয়েন্দা কিনে কূল পাই না৷ তবে ভেবে দেখলাম রুমাল কিনে দেবার মত কোন প্রেমিকা এখনও হৃদয়ের মনকুঠিরে জায়গা করে নেয়নি৷

প্রেমিকাবিহীন শূণ্যতার মাঝে কোন ভাব আছে৷ আর তখন এই সব গুস্তাফি কথা বলাও পাপ ছিল৷ আর বললেও কানের নিচে শুনা যেত টাস টাস শব্দ৷ আর এখন ক্লাস ফাইভের ছেলের ও গার্লফ্রেন্ড আছে৷ সে জন্যই কি সুনীল লিখে গিয়েছিল সে সময়৷ যেন একটা ক্রিপটিক ম্যাসেজ। আমাদের সবার এই নিজেদের সময় নিয়ে লেখা উচিত যাতে করে পরের প্রজন্ম জানতে পারে৷

নান্দনিক নকশা। ছবি: লেখক

আমার পুরানো ভ্রমণ গল্পগুলো পড়তে চাইলে নিচের লিংকে চলে যান:
https://www.vromonguru.com/author/ashik/

আমার গল্প, কবিতা, প্রবন্ধ পড়তে চাইলে ঘুরে আসতে পারেন আমার ফেসবুক পেজ থেকে:
https://www.facebook.com/sarwar.ashik786

এর বাহিরেও আমাদের নিজস্ব ভ্রমণ গ্রুপ শেকড় সন্ধানীর মাধ্যমে নিয়মিত এ রকম বাংলার পথে ভ্রমণের আয়োজন করা হয়। ইচ্ছা থাকলে পাঠক আপনিও হতে পারেন আমাদের পরবর্তী ভ্রমণের সঙ্গী। আমাদের সাথে যোগাযোগের বিস্তারিত নিচে দেয়া হলো।

Roots Finder – শেকড় গ্রুপের সাথে থাকুন:
https://www.facebook.com/groups/459880764416865/

Roots Finder – শেকড় পেজ লিঙ্ক:
https://www.facebook.com/rootsfinder.bd/

শেকড় সন্ধানী দলের এডমিনদের নাম্বার:
ঈসমাইল হোসেন – ০১৭৫৬১৭১৫৭০
আশিক সারওয়ার – ০১৮৬৬৬৬৩৪২৩
শরীফ জামান – ০১৫৩৫৪৫৩৯৭৭

ঘুরেন দেশের পথে, খুঁজে ফিরুন নিজের শেকড়।

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here