Breaking News

নড়াইলের পথে ঘাটে: গল্পের হল শেষ

পড়ন্ত বিকালের সোনাঝরা আকাশ সে তো পার হয়েছে কবে। দিনের আলো প্রায় শেষের পথে। আকাশ জুড়ে শুনা যায় সন্ধ্যার আহ্বান। আর একটি নির্ঘুম রাত্রি শেষের গান শুনাবে বলে কি আকাশের এত আয়োজন। আজকে আবার পূর্ণ চন্দ্রিমা। চন্দ্র স্নান না হয় পড়ে করা যাবে। দেরি না করে ভ্যানে চড়ে বসলাম। আমাদের নামিয়ে দিল একেবারে পুলিশ লাইন্স জমিদার বাড়ির গেটের সামনে।

আমাদের গল্পও প্রায় শেষের পথে। সেই গল্পগুলো বাড়ি যাবার আগেই না হয় জেনে নেই নড়াইল জমিদার বাড়ির ইতিহাস। নড়াইল জমিদার বংশের পথের চলা শুরু সেই ১৭৯১ সালে রুপম রায়ের হাত ধরে। তখন নড়াইলের এই অংশ ছিল নাটোরের রাণী ভবানীর রাজত্বে আওতায় একটি তালুক। তবে রুপম রায়ের হাত ধরে এই তালুক আসলেও জমিদারি জুটেনি তার কপালে। রায় সাহেবের ছেলে কালী শংকর রায় মূলত তালুকদার থেকে সতন্ত্র জমিদার হিসাবে নিজেকে আত্মপ্রকাশ করেন। তাই তো তাকে এই জমিদারির মূল প্রতিষ্ঠাতা ভাবা হয়।

ঠাণ্ডা শরবত। ছবি: লেখক

কালী শংকর ও রুপম রায় দুজনেই নাটোরের রানী ভবানীর রাজ কর্মচারি ছিলেন। ১৭৯৩ সালে কর্নওয়ালিস প্রশাসন কর্তৃক ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানি চিরস্থায়ী বন্দোবস্ত প্রথা চালু করলে এর পরিপ্রেক্ষিতে নাটোরের রানী ভবানি জমিদারির অনেক খাজনা বকেয়া থাকায় তার জমিদারির কিছু অংশ নিলামে উঠে। সুযোগ সন্ধানী কালি শংকর রায় এই সুযোগ হেলায় হারাবে কেন। সে নিলামে কিনে নিল ভবানীর জমিদারির কিছু অংশ। আর এরই ধারাবাহিকতায় তিনি নড়াইল এলাকায় তার জমিদারির গোড়া পত্তন করেন।

অর্ধ নির্মিত প্রতিমা। ছবি: লেখক

কিছু যুগ পর কালী শংকরের নাতীপুতিরা নীল চাষ করে বেশ নগদ অর্থ কড়ির মালিক হয়। এর পর শুরু হয় তাদের একের পর এক উন্নয়নমূলক কর্মকাণ্ড। শিক্ষা প্রতিষ্ঠান থেকে শুরু করে মন্দির, এলাকার রাস্তাঘাট কোন কিছুই বাদ যায়নি তাদের উন্নয়নের ধারায়। তবে সব ভালোর এক সময় শেষ হয়। ১৯৪৭ সালে দেশভাগের পর পাকিস্তান সরকার জমিদারি প্রথা বিলুপ্ত করে। তারাও একে একে পারি জমাতে থাকে কলকাতা।

জমিদারদের শেষ স্মৃতি এই সেই কালী মন্দির। ছবি: লেখক

অবশ্য জমিদারি প্রথা বিলুপ্ত হবার আগে ১৯৫০ ও ১৯৫২ সালে এই বংশের কয়েকজন এসেছিল শেষ ধ্বংস দেখে যেতে। মনে তখনই বোধ হয় কুডাক দিয়েছিল। এরপর একেবারেই চলে যায় রায় বংশের জমিদাররা। সে সময় থেকে জমিদারদের শেষ বংশের ইতি ঘটে আর জমিদার বাড়িটা পরিত্যক্ত পরে থাকে বছরের পর বছর এরশাদ সরকার নিলামের ডাক না দেয়া পর্যন্ত।

ইতিহাসের পাতায় ভ্রমণের শেষপ্রান্তে এসেও যেন শেষ হতে চাচ্ছে না। আমরা এখন জমিদারি কমপ্লেক্সের ভিতরে প্রবেশ করেছি। আকাশেরও কি মন খারাপ হয়ে গেল। গুড়ি গুড়ি বৃষ্টি পড়ছে। প্রথমে নজরে পড়লো জমিদারদের সেই কালী মন্দির। তবে ঢোকার রাস্তা খুঁজে না পেয়ে গোল গোল চক্কর দেওয়ার প্রাক্কালে একটি মসজিদ দেখতে পেলাম। সেই মসজিদের সিড়িতে বসে আছেন ঈমাম সাহেব। বাউণ্ডারি ওয়ালে ওপারে মন্দির আবার এপারে মসজিদ। আহা কি চমৎকার অসাম্প্রদায়িকতার আয়োজন।

নান্দনিক নকশা। ছবি: লেখক

ঈমাম সাহেবকে সালাম দিয়ে ভিতরে ঢোকার রাস্তার কথা জিজ্ঞেস করলাম। তিনি হেসে জিজ্ঞেস করলেন মন্দির দেখতে আসছেন উলটা রাস্তায় তো আসছেন ভাই। এই যে বরাবর রাস্তা দেখছেন এখান দিয়ে যান সামনেই গেট পাবেন। আমি সত্যিই অভিভূত হলাম, পুরাটা সময় ঈমাম সাহেবের মুখে কোন বিরক্তির বলিরেখা দেখেনি, আমাদের জিজ্ঞেসও করেনি আমরা কোন ধর্মের লোক।

আহ নান্দনিক। ছবি: লেখক

যাই হোক কালী মন্দিরের কমপ্লেক্সে ঢুকে চারপাশটা দেখলাম, এক পাশে দূর্গাপূজার মূর্তি বানানোর প্রস্তুতি চলছে। মন্দিরটি অন্য দশটি মন্দিরের মত হল গোলাপি রং সম্মুখ অংশে বিদ্যমান। তাও ভাল পুরাটা স্থাপনা গোলাপি রং মারেনি। পাথরের মন্দিরের টেরাকোটা গুটি কয়েক থাকলেও বেশ দৃষ্টি নন্দন। ফুল, পশুপাখি, দেবীর টেরকোটা পরিলক্ষিত করলাম। ওয়াফির ছবি তোলার প্যারা উঠেনি, উঠবে উঠবে ভাব। এর মাঝে মন্দিরে কালী মাতার ভক্তের আগমন ঘটলো। তারা পূজায় ব্যস্ত আর আমরা ছবি তোলায়।

সর্বামঙ্গলা কালী মন্দির। ছবি: লেখক

এবার কমপ্লেক্স থেকে বের হয়ে যাব। সামনে দৃষ্টিনন্দন একটি বটগাছের নিচে কালি মাতার ভক্তকূলের সন্ধান পেলাম। ছবি তুলে নিলাম এবার মূল জমিদার বাড়ির দিকে আগ্রসর হলাম। ভিতরে ঢোকার আগে সংরক্ষিত এলাকার সাইনবোর্ড দৃষ্টি কাড়লো। কিন্তু গেট কোন সিকিউরিটি গার্ড নেই। কার কাছ থেকে অনুমতি নিয়ে ঢুকবো।

জমিদার বাড়ির ধ্বংসস্তূপ। ছবি: লেখক

ভিতরে ঢুকে বেশি দূর যেতে হল না। কিছুদূর যাবার পরই চোখে পড়লাম জমিদার বাড়ির ধ্বংসস্তূপ। তবে এই ধ্বংসস্তূপের মাঝে ফিনিক্স পাখির মত নতুন করে জেগে উঠেছে যেন সর্বামঙ্গলা কালী মন্দির। ১৮৯০ সালে জমিদার রতন রায়ের ভাই কালী প্রসন্ন বাবু এই মন্দিরটি নির্মাণ করেন। মন্দিরটি এখনও টিকে আছে। ভক্তরা নিয়মিত এখানে পূজা দেয়। আমাদের নড়াইলের শেষ স্থাপনা দেখার সাথে সাথেই যেন পৃথিবীর বুকে সন্ধ্যার বার্তা নেমে এল। আজকে পুর্ণিমা। তাই তো চাঁদটা বড় থালার মত গোল হয়ে উঠছে।

আকাশে পূর্ণিমার চাঁদ। ছবি: লেখক

আমাদের বাস নয়টা বাজে। এত সময় কি করি। চা, আড্ডা, রাতের খাবার শেষেও যে সময়ের লেনদেন শেষ হয় না। আকাশে ভরা পূর্ণিমা। তাই তো চাঁদের মত মুগ্ধকর জিনিস আর হতে পারে না। তাই দিন শেষে চিত্রা ব্রিজের মাথায় দুই যুবক অদ্ভূত ভাবে তাকিয়ে আছে চাঁদের দিকে। চাঁদ তার সম্পূর্ণ আলো ছড়িয়ে মিটিমিটি হাসছে। চাঁদের স্নিগ্ধ আলোয় স্নান করে আত্মার বিশুদ্ধিতে ব্যস্ত দুই যুবকের শেষ হয়নি জীবনের লেনদেন, তাদের গল্পে আসে না নাটোরের বনলতা সেন।

আমার পুরানো ভ্রমণ গল্পগুলো পড়তে চাইলে নিচের লিংকে চলে যান:
https://www.vromonguru.com/author/ashik/

আমার গল্প, কবিতা, প্রবন্ধ পড়তে চাইলে ঘুরে আসতে পারেন আমার ফেসবুক পেজ থেকে:
https://www.facebook.com/sarwar.ashik786

এর বাহিরেও আমাদের নিজস্ব ভ্রমণ গ্রুপ শেকড় সন্ধানীর মাধ্যমে নিয়মিত এ রকম বাংলার পথে ভ্রমণের আয়োজন করা হয়। ইচ্ছা থাকলে পাঠক আপনিও হতে পারেন আমাদের পরবর্তী ভ্রমণের সঙ্গী। আমাদের সাথে যোগাযোগের বিস্তারিত নিচে দেয়া হলো।

Roots Finder – শেকড় গ্রুপের সাথে থাকুন:
https://www.facebook.com/groups/459880764416865/

Roots Finder – শেকড় পেজ লিঙ্ক:
https://www.facebook.com/rootsfinder.bd/

শেকড় সন্ধানী দলের এডমিনদের নাম্বার:
ঈসমাইল হোসেন – ০১৭৫৬১৭১৫৭০
আশিক সারওয়ার – ০১৮৬৬৬৬৩৪২৩
শরীফ জামান – ০১৫৩৫৪৫৩৯৭৭

ঘুরেন দেশের পথে, খুঁজে ফিরুন নিজের শেকড়।

About Ashik Sarwar

Check Also

ট্রেকিং করতে গেলে যে জিনিসগুলো অবশ্যই সঙ্গে নিবেন

শীতের সময় আমাদের দেশে অনেকেই ট্রেকিং করতে বের হয়ে পড়েন। যারা প্রথমবারের মতো বের হচ্ছেন …

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *