তৃতীয় দিন
খুব ভোরে ঘুম থেকে উঠলাম। উঠেই আমি আর নূর ভাই চলে গেলাম ম্যারাথনের ক্যাম্প গোছানোর জন্য। ক্যাম্প গুছানো বলতে কোন ক্যাম্পে কি পরিমাণ পানি থাকবে তা ঠিক করা। একটা সাইন্ডবোর্ড বসানো যাতে দৌড়বিদরা দেখে বুঝতে পারেন কত কিলোমিটার এসেছেন আর কত কিলোমিটার বাকি আছে। আগের রাতেই ঠিক করে রাখা হয়ে ছিল কে কোন ক্যাম্পে থাকবে। সব মিলিয়ে মোট চারটি ক্যাম্প করা হল। আমার ভাগ্যে পড়লো চার নম্বর ক্যাম্প যা প্রায় শুরু থেকে দশ কিলোমিটার পর। ম্যারাথন শুরু হওয়ার কথা ছিল দশটায় কিন্তু নানা রকম জটিলতার কারণে তা শুরু হতে হতে বারোটা বেজে গেল। বারোটার দিকে ফোনে জানতে পারলাম দৌড় শুরু হয়ে গেছে। অতিথিদের দেরি করে আসাসহ আরো কিছু সমস্যার কারণে এই দেরি। কোন বড় ধরনের ঝামেলা ছাড়াই দৌড় শেষ হল।

দৌড়ে অভিজ্ঞ ৩০ জন দৌড়বিদ পাওয়া গেল। অভিজ্ঞ বলতে তাঁরা খুলনা অ্যাথলেটিক ফেডারেশনের। এছাড়াও পাওয়া গেল স্থানীয় প্রায় ১০০ জনের মত। এদের মধ্যে স্কুলের ছাত্র-ছাত্রী, স্কুলের শিক্ষক এমনকি প্রধান শিক্ষকও এই দৌড়ে অংশ নিলেন। কয়েকজন আবার লুঙ্গী পরেও দৌড়াতে চলে এলেন, সব মিলিয়ে পুরোপুরি উৎসবমুখর এক পরিবেশ। অভিজ্ঞ দৌড়বিদদের জন্য রাখা হয়েছিল ২১.১ কিলোমিটার যা হাফ ম্যারাথন নামে পৃথিবীতে পরিচিত। আর সাধারণ জনগণের জন্য ১০ কিলোমিটার রাখা হয়েছে। আর বাচ্চাদের জন্য ৫ কিলোমিটার।

দৌড়ের পরেই সবার জন্য দুপুরের খাবার ব্যবস্থা। খাওয়া দাওয়া শেষ হওয়ার পর বিকালে শুরু হল সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান ও পুরস্কার বিতরনী। পুরস্কার বিতরনীর পর গান। গানের পর পরই শুরু হল সুন্দরবন নিয়ে একটি নাটক। নাটক যাই হোক না কেন নাটকের মধ্যে একজন বাঘের সাজে সেজেছে সেটা দেখে দর্শক বেশ আনন্দ পেয়েছে বোঝা গেল। শুধু যে দর্শক আনন্দ পেয়েছে তাই না আমরাও সবাই বেশ মজা পেয়েছি। কেউ কেউ যে বাঘ সেজেছিল তার সঙ্গে ছবিও তুললেন। তবে এখানে যে অনুষ্ঠান হয়েছে পুরো অনুষ্ঠানটিই হলো একদম স্থানীয় সাংস্কৃতিক কর্মীদের দ্বারা। 

জয়মুনিরগোল। ছবি: লেখক

সবরকম অনুষ্ঠান শেষ হওয়ার পর সবাই লঞ্চে ফিরে আসলাম। ফিরে আসার পরেই লঞ্চ ছেড়ে দিল, তখন সন্ধ্যা। আমাদের উদ্দেশ্য মংলা, সেখান থেকে খাবার পানি নিতে হবে। এমভি জামাল-১ মংলা পৌঁছালো রাত আটটার দিকে। খাবার পানি নেওয়ার পর লঞ্চ আবার চলতে শুরু করল এবার উদ্দেশ্য কটকা।

চতুর্থ দিন
আমাদের লঞ্চ রাতেই কটকা এসে নোঙ্গর করে রেখেছে, আমরা তখন সবাই ঘুমে। ঘুম থেকে উঠে দেখা গেল দুই পাশে সুন্দরবন। এক পাড়ে কিছু হরিণ পানি খাওয়ার জন্য এসেছে। আমাদের দিকে অবাক হয়ে তাকিয়ে আছে।

মশিউর ভাই বললেন এরা মানুষ দেখতে দেখতে অভ্যস্থ। হরিণগুলোর কয়েকটি ছবি তুললাম যদিও আমার ছোট ক্যামেরায় খুব একটা ভাল আসেনি। তবে সনি ভাই আর সামির ভাইয়ের ক্যামেরায় ভালই আসলো। কিছুক্ষণের মধ্যেই নাস্তার ডাক পড়ল। নাস্তা শেষ করে ছোট নৌকায় করে রওনা দিলাম তীরের দিকে, তীর মানে বন।

বনে নেমে উঠে গেলাম চার তলা সমান ওয়াচ টাউয়ারে। টাউয়ারে উঠে দেখা গেল আসে-পাশের বনের দৃশ্য, শুধু সবুজ আর সবুজ। কিছু কিছু গাছ আবার টাউয়ারের চাইতেও উঁচু। টাউয়ার থেকে ছুটলাম বিচের দিকে, এরই মধ্যে সবাই যার যার মত ছোট ছোট গ্রুপে ভাগ হয়ে গেছে যদিও সবাই রাস্তার মধ্যেই ছিল। আমি আর ইশতিয়াক ভাই আলাদা হয়ে গেলাম। দুইজন ঘুরতে ঘুরতে একটু বনের ভিতরের দিকে ঢুকে গেলাম।

বনের ভিতরে। ছবি: ইশতিয়াক আরেফিন

ভেতরের দিকে কিছুটা অন্ধকার, ঘন গাছ, কেমন যেন গা ছমছম করা পরিবেশ। দুইজনে কিছুক্ষণ হাঁটাহাঁটি করলাম বনের ভেতরে। তারপর চললাম বিচের দিকে, আমাদের আগে সবাই চলে গেছে সেখানে। আমরা পৌঁছে দেখি সবাই যার যার মত বিচে হাঁটাহাঁটি করছে, কেউবা আবার সমুদ্রের পানিতে পা ভিজিয়ে নিচ্ছেন। প্রকৃতি বিশেষজ্ঞ ড. আনিসুজ্জামান খান বিশাল সাইজের লেন্সের ক্যামেরা নিয়ে ঢুকে গেলেন বনের ভিতরে। তিনি আবার কোলাহল পছন্দ করেন না। যেখানে অনেক লোকজন সেখানে তিনি নেই। একান্তে নীরবে একা একা প্রকৃতি উপভোগ করেন।

ইশতিয়াক ভাইয়ের হ্যামকে বিশ্রাম। ছবি: লেখক

আমি আর ইশতিয়াক ভাই ভাল একটা জায়গা খুঁজে হ্যামক ঝুলিয়ে দিলাম দুই গাছের সঙ্গে। হ্যামকটা রাব্বি ভাই ইশতিয়াক ভাইকে দিয়ে দিয়েছিলেন। সঙ্গে শর্ত দিয়েছিলেন হ্যামকে ছবি তুলে তারপর উনাকে পাঠাতে হবে। তিনি পিক৬৯ এর ফেসবুক পেইজে প্রচারণা চাালাবেন। তাই আমরাও রাব্বি ভাইয়ের কথামতো দুইজনে কিছু ছবি তুলে নিলাম। আমাদে হ্যামকে দুয়েকটা বাচ্চাকে শুইয়ে দিয়েও মডেল বানালাম। আর বাচ্চারা দেখা গেল হ্যামক পেলে বেশ আনন্দিতই হয়।

যে কোন বাচ্চাদেরই হ্যামক পছন্দ। ছবি: লেখক

ফটোসেশন শেষে আমি হ্যামকেই ছোটখাট একটা ঘুম দিয়ে দিলাম। রিমন ভাই ঘুম থেকে ডেকে তুললেন, উঠেই রওনা দিলাম ফেরার জন্য। ফিরতে ফিরতে শুরু করলাম পরিস্কার অভিযান। এটাও সেইফের একটা কমন ব্যাপার। যে কোন প্রোগ্রামেই একটা পরিষ্কার অভিযান রাখা হয়ই।  বিচে এবং রাস্তায় যত রকম ময়লা সম্ভব তুলে নিতে শুরু করলাম সবাই মিলে। বিশেষ করে চিপসের প্যাকেট, জুসের প্যাকেট, ক্যান, চানাচুরের প্যাকেট, পলিথিনসহ অনেক কিছু। অনেক ভ্রমণকারী এসে এইসব খাওয়ার পর ফেলে রেখে গেছে আমরা সেগুলি কুড়িয়ে নিয়ে আসলাম আমাদের সঙ্গে। এই কাজটা করে ভ্রমণকারীরা কি আনন্দ পান সেটা তাঁরাই জানেন।

ময়লা কুরানো। ছবি: লেখক
ময়লা নিয়ে। ছবি: লেখক

কটকা বিচ থেকে ফিরে আসলাম লঞ্চে, খাওয়া শেষ করে সাবাই ছাদে বসে আড্ডায় মেতে রইলাম। বিকেলে পৌঁছালাম কচিখালী। সেখানে ঘোরাফেরা করলাম, গাছ আর পাখি ছাড়া কিছু চোখে পড়লো না। তবে কয়েকটা বানরের দেখা পেয়েছিলাম। আমাদের দেখে ভেংচি কেটে আমাদের কোন ছবি তোলার সুযোগ না দিয়েই বনের ভেতর কোথায় যে হারিয়ে গেল সেটা ওরাই ভাল বলতে পারবে। কচিখালী ঘুরে দেখার পর আমাদের লঞ্চ ঢাকার উদ্দেশে রওনা দিল। আর এভাবেই আমাদের সুন্দরবন দেখা শেষ হলো।

(শেষ)

প্রথম কিস্তি
দ্বিতীয় কিস্তি

ফেসবুকে আমার পেইজ:
https://www.facebook.com/liferiderun/

আমার অন্যান্য লেখা পড়তে চাইলে নিচের লিংকে ক্লিক করতে পারেন:
http://liferiderun.net/

ফিচার ছবি: লেখক

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here