খুলনার যত জিহ্বে জল আনা খাবার

চাকরিসূত্রে আমি অনেকবার খুলনা গেছি, একবার খুলনা পোস্টিং থাকায় বছর দুয়েক থেকেছিও। থাকা-খাওয়া-ঘোরাঘুরি সব মিলে আমার পছন্দের শীর্ষ শহর খুলনা। সে সময় দক্ষিণ-পশ্চিম বঙ্গে আমি প্রচুর ঘোরাঘুরি করছি যার পেছনে খুলনা সাইক্লিস্টসের অনেক অবদান আছে। ঘোরাঘুরি নিয়ে অন্যদিন বলবো, আজকের লেখা শুধু খাওয়া নিয়ে।

দেশের অন্যান্য এলাকার চেয়ে খুলনার খাবার দাবার একটু ভিন্ন রকমের। বিষেশত খাবারে চুইঝাল দেবার কারণেই এ খাবার স্বাদ-গন্ধ অন্যরকম হয়। চুই ঝাল মূলত: গাছের এক প্রকার শেকড় বিশেষ। খুলনার প্রতিটি প্রধান বাজারে এ চুই ঝাল বিক্রির আলাদা দোকান থাকে। দামও কিন্তু কমনা, এক কেজি চুইঝাল ৮০০ থেকে ১,২০০ টাকায় বিক্রি হয়।

চুইঝাল ছাড়াও মজার মজার সব খাবারের জায়গা আছে খুলনায়। বেশির ভাগের দামও খুবই যুক্তিযুক্ত। এক আর্টিকেলে লিখে শেষ করা যাবেনা এতগুলো জায়গার কথা। আমার পছন্দের কয়েকটা নিয়ে এই আর্টিকেল।

কামরুলের হোটেলের মাংস ছবি রাহাত ভাই

জিরো পয়েন্টের কামরুলের খাসি ও গরুর মাংস: খুলনার বিখ্যাত খাবারের কথা বললেই চুইঝালের খাসির মাংসের নাম সবার আগে মনে আসে। তবে আমার দৃষ্টিতে খুলনার সবচে ভালো মাংস পাওয়া যায় জিরো পয়েন্টের কামরুলের হোটেলে। ব্যপারটা সহজেই বুঝবেন ওখানে গেলে। অন্তত ১০-১২ টা হোটেল আছে ওখানে, কিন্তু ভিড়টা এক হোটেলেই।

খাসির মাংসের পাশাপাশি চুইঝালের গরুর মাংসও পাওয়া যায় সেখানে। প্রথমে সাদা ভাত দেয়া হয়, পরে মাংসের বোল নিয়ে আসবে, সেখান থেকে মাংসের যে টুকরো পছন্দ করবেন সেটা পাতে তুলে দিবে। সংগে ১/২ টুকরো চুইঝাল ও গোটা রসুন। যারা ঝাল সহ্য করতে পারেননা তাদের জন্য ব্যপারটা আনন্দায়ক না হতেও পারে, কিন্তু বাকিদের জন্য এ খাবার যেন অমৃত।

চুকনগরের হোটেল আব্বাসের খাসি: খুলনা সাতক্ষীরা সড়কের চুকনগর নামক মোড়ে অবস্থিত আব্বাসের খাসির মাংসের নাম শুনেনি এরকম লোক খুলনা অঞ্চলে পাওয়া কঠিন। মূলত চুইঝালের খাসির মাংস, সাদা ভাত দিয়ে খাওয়ার ব্যপারটা বিখ্যাতই হয়েছে এই হোটেলের কারণে।

সারা দেশে সুনাম ছড়িয়ে পড়েছে আব্বাসের হোটেলের ছবি লেখক

চুকনগর খুলনা থেকে প্রায় ৩০ কিমি দূরে, তাই খুলনা শহরের সোনাডাঙ্গা বাস স্ট্যান্ডের কাছেই আরেকটি শাখা খুলেছে তারা। অবশ্য অনেকেই মনে করেন চুকনগরেরটাই বেশি ভালো। আমার কাছে দুটোর স্বাদই একরকম লাগে। বিখ্যাত এ হোটেলে আমি অনেকবার খেয়েছি, যতবার ওই পথে যাই ততবারই চেষ্টা করি দুপুরে ওখানে খাওয়ার।

বেজের ডাঙ্গার মুসলিমের গরু মাংস: খুলনায় চুইঝালের মাংসের প্রশংসা করলেই সবাই আমাকে বলতো বেজের ডাঙ্গায় অবস্থিত মুসলিম হোটেলে চুই ঝালের গরুর মাংস খেয়েছি কিনা। একদিন সে সুযোগও পেয়ে গেলাম, অফিসের কাজে যশোর থেকে ফিরছিলাম, পথে ড্রাইভার বললো আজ লাঞ্চটা এখানেই করতে চায়, সাথে সাথে রাজি আমি।

বেজের ডাঙ্গার মুসলিম হোটেলের খাবার ছবি মাদিহা মৌ

ছোটখাটো একটা হোটেল, তবে পরিস্কার পরিচ্ছন্ন। গরম সাদা ভাতের সাথে এক বাটি গরুর মাংস দিয়ে গেলো। মাংসের রঙ যেরকম দেখতে খেতে সেরকমই সুস্বাদু। এক বাটি একজনের জন্য একটু বেশিই মনে হলো। খেয়ে দেয়ে বাসার জন্য পার্সেলও নিয়ে নিলাম। এরপর থেকে যতবার যশোর যাওয়া হয়েছে বেজের ডাঙ্গায় লাঞ্চ করতে ভুলিনি।

 আড়ংঘাটার জামিলের ফিশ কাবাব: মাছের দেশ খুলনা, সেই খুলনায় ভালো মানের ফিশ বার বি কিউ খুঁজে পাচ্ছিলামনা, এটা মানতে খুব কষ্ট হচ্ছিলো। এসময় খবর পেলাম আড়ং ঘাটার জামিলের ফিশ বার বি কিউর খবর। ভদ্রলোক দীর্ঘদীন বিদেশে ছিলেন, হংকংয়ে থাকতে শিখেছেন ফিশ কাবাব বানানো।

নিজ হাতেই কাবাব প্রস্তুত করেন আল জামিল ফিশ কাবাবের প্রতিষ্ঠাতা ছবি লেখক

আমি দেশে/দেশের বাইরে কম জায়গা ফিশ কাবাব খেয়েছি, কিন্তু জামিলের কাবাব এর মধ্যে অন্যতম সেরা মনে হয়েছে। তিনি নিজেই মাখানোর কাজটা করেন। আড়ংঘাটা জায়গাটা শহর থেকে ১০ কিমি দূরে বাইপাসে। দুপুর একটা থেকে খোলা থাকলেও জমে উঠে সন্ধ্যার পরে।

সেখানে পৌছে প্রথম কাজ মাছ দেখে কোনটা খেতে চান সেটা বলে দিবেন। ভেটকি (কোরাল) ছাড়াও সেখানে লাল পোয়া, ভোলা মাছ সহ বেশ কয়েক প্রকারের সামুদ্রিক মাছ পাওয়া যায়। সেই মাছ তখনই কেটে পরিস্কার করে মেরিনেট করে চুলায় দিয়ে দিবে। পুরো কাজ শেষ হতে ৩০ মিনিটের মতো লাগবে।

এই ফিশ কাবাবের তূলনা পাওয়া কঠিন ছবি লেখক

পরোটা, অসাধারণ সালাদ আর কাবাব দিয়ে  এখানে খেলে সারা জীবন মনে থাকবে। খরচও খুব বেশি না, সাধারণ ১ কেজির মাছ নিলে চারজনের জন্য ১,৪০০-১,৫০০ টাকায় হয়ে যাবে। দেয়ালে টানানো ছবিগুলো দেখলেই বুঝতে পারবেন দেশের নামকরা সব ক্রিকেটারেরে আসা হয়েছে এখানে।

জজকোর্টের দত্তের হোটেলের বাংলা খাবার:  আমাদের অনেকেই কোথাও গেলে বাংলা খাবার খুঁজি। খুলনায় বাংলা খাবারের এরকম একটি অসাধারণ জায়গা জজকোর্টের দত্তের হোটেল। ভাজি-ভর্তা ছাড়াও দারুন সব আইটেম পাওয়া যায়। যেমন ভেটকি, পারশে, কাচকি, বাইন সহ অনেক প্রকারের মাছ। খাসির মাংস, হাঁসের মাংস সহ দারুণ সব মাংসও পাওয়া যায়।

ভর্তা-মাছ-ভাতের জন্য চমৎকার জায়গা দত্তের হোটেল ছবি লেখক

দত্তের হোটেল মূলত কোর্টে আগত লোকজনের জন্যই করা। একটু চাপা-চাপি হয় বসতে, দুপুরের সময় ভিড়ও হয় খুব। তাই ১টা থেকে ২টা সময়ের আগে পরে আসলে ভালো হয়। খাবারের দামও হাতের নাগালে। চার রকম ভর্তা, ভাত, মাছ দিয়ে ১৫০ টাকার মধ্যেই খাওয়া শেষ হয়ে যাবে। আর খাবার শেষে ওদের মিষ্টিটা খেতে ভুলবেন না কিন্তু।

হোটেল রয়েলের ফালুদা: একসময় খুলনা আসলে আমাদের বাকেট লিস্টে থাকতো দুটো জিনিস। রূপসা ব্রীজের নিচে যাওয়া আর রয়েলে ফালুদা খাওয়া।  খুলনার যে প্রান্তেই থাকতাম আমরা ঠিকই হাজির হতাম রয়েলের ফালুদা খাওয়া যাওয়ার জন্য। এ ফালুদার মতো সুস্বাদু ফালুদা আমি দেশের অন্য কোন প্রান্তে খেয়েছি বলে আমার মনে পড়েনা। তাই খুলনা গেলে হোটেল রয়েলে শুধু ফালুদা খাওয়ার জন্য হলেও একটা ঢু মারতে পারেন।

নিউমার্কেটের মালাই চা: খুলনার নিউ মার্কেট এখানকার মানুষের বৈকালিক/সন্ধ্যার আড্ডাস্থল। এর আড্ডার প্রাণ মালাই চা। ঘন সরযুক্ত দুধ জ্বাল দিয়ে তৈরী করা হয় এই চা। কাপ নয়, কফির মগে দেয়া হয় চা। আবেগে চুমুক দিয়ে ফেলবেন না কিন্তু, প্রচন্ড গরম থাকে। কয়দিন যে আমি এ চা খেতে গিয়ে জিহ্বা পুড়িয়ে ফেলেছি তার ইয়ত্তা নেই।

নিউ মার্কেটের বিখ্যাত মালাই চা ছবি লেখক

তবে স্বাদটা অনেক ভালো। আমি এমনিতেই চা পছন্দ করি, আর খুলনার মধ্যে নিউমার্কেটের কয়েকটা চা বেশি ভালো লাগতো।

আজ এ পর্যন্ত, পরের পর্বে বৃহত্তর খুলনার কিছু খাবারের জায়গা নিয়ে লিখবো। আপনাদের পছন্দের রেঁস্তোরা থাকলে সেটাও কমেন্টে জানাতে পারেন।

ফিচার ছবি: লেখক

 

 

About Muhammad Hossain Shobuj

Check Also

নড়াইলের পথে ঘাটে: নৌকা বাইচ

বাস আমাদের সেই রূপগঞ্জ টার্মিনালে আবার নামিয়ে দিল৷ ঘড়িতে দুইটা বাজে৷ নৌকা বাইচ শুরু হতে …

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *