দ্বিতীয় দিন
সকালে ঘুম উঠলাম সকাল ৫:৩০ মিনিটের দিকে। ফ্রেশ হয়ে চলে গেলাম নিচে সবার জন্য নাস্তা তৈরি করার জন্য। আমাদের লঞ্চ থামল বরিশাল লঞ্চ ঘাটে। লঞ্চ সরাসরি জেটিতে না থামিয়ে থামানো হল বরিশালের লঞ্চ সুন্দরবন-৭ এর সঙ্গে। কারণ কিছুক্ষণ পরেই আবার লঞ্চ ছেড়ে দিবে। রিমন ভাই আর রাহাত ভাই নেমে গেলেন হালকা বাজার-সদাই করার জন্য। এর জন্য এখানে থামা। মশিউর ভাইয়ের কঠিন নির্দেশ অন্য কেউ নামতে পারবে না। রাহাত ভাইরা ফিরে আসলেন কিছুক্ষণ পরেই, তাঁরা লঞ্চে ওঠার সঙ্গে সঙ্গেই আমাদের লঞ্চ আবার চলতে শুরু করল।
ভ্রমণের প্রথম সকালের নাস্তা তৈরি করা হল রুটি, জেলি, ডিম আর কলা। ডিম আর রুটিই আসলে তৈরি করতে হয়েছে। বাকি সব প্যাকেটজাত খাবার বলা যায়। ডিম আগেই ঢাকা থেকে কেনা হয়েছিল, কলাটা বরিশাল শহর থেকে কেনা হল মাত্র। নাস্তার পরেই সবাইকে ডেকে এক জায়গায় করা হল সবার সঙ্গে সবার পরিচয়ের জন্য।
গতকাল ঝামেলার কারণে পরিচয় পর্ব শেষ করা হয়নি। আমাদের দলে কয়েকজন গুনী মানুষ পাওয়া গেল। এঁদের অনেকের সঙ্গেই ব্যক্তিগত পরিচয় নাই। কিন্তু নামে চিনি, আবার কয়েকজনের সঙ্গে পরিচয়ও আছে বলা যায়। তাঁরা হলেন, বাংলাদেশের প্রবীন পর্বতারোহী ধ্রুব জ্যোতি ঘোষ মুকুল, এভারেস্ট ও পর্বতারোহী মোহাম্মদ আবদুল মুহিত ওরফে এম এ মুহিত। আরো আছেন ভারতীয় অ্যাডভেঞ্চার ক্লাবের সচিব রাকেশ। এছাড়াও বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানের প্রতিনিধিরা তো আছেনই। এঁদের সবাইকে পেয়ে ভ্রমণকারীরা বেশ খুশি বলা যায়। সবাইকে পেয়ে যেন একটা তারকার সমাগমে পরিণত হল পুরো লঞ্চটা। পরিচয় পর্ব শেষ হওয়ার পর যে যার মত চলে গেল যার যার কাজে।

কুয়াশার কারণে ঠিকমত কিছু দেখা যাচ্ছিল না। বেলা বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে সবকিছু পরিষ্কার হতে শুরু করল। কখন যে দুপুর হয়ে গেছে কেউ বলতেই পারব না। ঝালকাঠি, কাউখালি হয়ে পৌঁছালাম সন্যাসী নামের এক ঘাটে সেখানে একজন পাইলট উঠলো আমাদের লঞ্চ চালানোর জন্য। স্থানীয়রা লঞ্চ চালককে পাইলট বলে। লঞ্চ চালককে যে স্থানীয়রা পাইলট বলে এটা জানা ছিল না। এই ভ্রমণে এসে এটা জানতে পারলাম। ভ্রমণে এটাই আনন্দ দায়ক। নতুন নতুন অনেক কিছু জানা যায় আর এই জিনিসগুলোই আবার ভ্রমণের প্রতি আকৃষ্ট করে। আমাদের লঞ্চ যে চালাচ্ছিলেন তিনি সুন্দরবনের পথ খুব একটা ভাল চেনেন না, তাই আমাদের নতুন পাইলট নিতে হলো। যদিও নতুন একজন উঠবেন সেটা আগে থেকে ঠিক করাই ছিল।

তিনটার দিকে লঞ্চের একজন বললেন আমরা কিছুক্ষণ পর সুন্দরবনে প্রবেশ করবো। সবাই তো সব কাজ ফেলে ছাদের দিকে ছুটে গেল সুন্দরবন দেখার জন্য। ছাদে যেয়ে সবাই সুন্দরবন দেখার জন্য ব্যস্ত হয়ে গেল। কেউ কেউ বাইনোকুলার চোখে লাগিয়ে দূরের দৃশ্য দেখার চেষ্টায় ব্যস্ত। যাদের ক্যামেরা আছে তারা ছবি তোলায় ব্যস্ত। মনে হচ্ছে আমরা সুন্দরবনের কাছে যাচ্ছিনা সুন্দরবন আমাদের কাছে আসছে নরম পায়ে হেঁটে হেঁটে। সুন্দরবন দেখতে দেখতে আমরা পৌঁছে গেলাম সুপতী ফরেস্ট স্টেশন। পুরা সুন্দরবনে বিভিন্ন প্রবেশ মুখে অথবা বের হওয়ার মুখে কয়েকটি ফরেস্ট সেটশন আছে। সেইসব পথ দিয়ে ঢুকতে হলে ফরেস্ট স্টেশন থেকে অনুমতি নিতে হয় এবং নির্দিষ্ট একটা ফি দিতে হয়। এই নিয়মটা শুধু ভ্রমণকারীদের জন্য। স্থানীয় লোক অথবা মৎসজীবীদের এমন নিয়মের মধ্যে পড়তে হয় না।

সুন্দরবনে ঢুকতে যে আলাদা ফি দিতে হয় সেটাও আমার কাছে নতুন। দেশীয় লোকদের জন্য এক রকম টাকা আর বিদেশিদের জন্য আরেক রকম টাকা। আমাদের সঙ্গে কয়েকজন বিদেশী অতিথীও ছিলেন তাই তাদের জন্য আলাদা খরচ দিতে হল।
এখানে দুইটি জেটি দেখা গেল একটি ফরেস্টের অন্যটি কোস্ট গার্ডের। সুপতি ঘাটে লঞ্চ নোঙ্গর করা হল, মশিউর ভাইসহ কয়েকজন নেমে গেলেন ফরেস্টের কার্যালয়ের দিকে। এর মধ্যে আমাদের লঞ্চের সঙ্গে এক জেলের নৌকা বাঁধা হল। নৌকায় ৩ জনকে দেখা গেল তাঁরা বের হয়েছেন মাছ ধরার জন্য। নৌকায় রান্নার ব্যবস্থাও দেখা গেল জিজ্ঞেস করাতে জানা গেল তাঁরা যখন বের হন চার পাঁচ দিনের জন্য বের হয়ে যান। চার পাঁচ দিন পর মাছ ধরে বাড়ি ফেরেন, এর মধ্যে থাকা-খাওয়া ঘুম সবকিছু নৌকাতেই। তাঁদের সাথে কথা বলতে বলতে সন্ধ্যা হয়ে গেল। সন্ধ্যা হয়ে যাওয়ার কারণে আমারও ভিতরে চলে যেতে হলো রাতের খাবারের সহযোগিতা করার জন্য।
এদিকে মশিউর ভাইরা অনুমতি নিয়ে ফিরে আসতে আসতে রাত হয়ে গেল। তিনি ফেরার সঙ্গে সঙ্গে লঞ্চ আবার চলতে শুরু করল। মশিউর ভাইয়ের সঙ্গে দুইজন গার্ডও আসলেন। আমাদের সঙ্গে তাঁরা আগামী কয়েকদিন থাকবেন। বিশেষ করে বনে ঢুকলে তাঁরা বন্দুক হাতে আমাদের সঙ্গ দিবেন। দুইজনের কাঁধেই দুনলা বন্দুক।
যেতে যেতে বেশ কয়েকটা ছোট বড় লঞ্চও চোখে পড়ল যারা সুন্দরবন দেখার জন্য বের হয়েছেন। মাসুম ভাইয়ের কাছ থেকে জানতে পারলাম তাঁরা কটকার পথে রওনা দিয়েছে। মাসুম ভাই সুন্দরবন এলাকায় প্রায় দুই বছরের মত ছিলেন তাই তিনি এই এলাকা সম্বন্ধে ভালই জানেন বোঝা গেল। আর তাঁর বাড়িও এই খুলনাতেই।

আমাদের জয়মনিরগোল পৌঁছাতে পৌঁছাতে রাত দশটার মত বেজে গেল। জয়মুনিরগোলেই আমাদের টাইগার রান (সুন্দরবন ম্যারাথন) হওয়ার কথা সকালে। সেইফ থেকে বিভিন্ন বিষয়কে লক্ষ্য রেখে বিভিন্ন ম্যারাথন হয়ে থাকে। যেমন সমুদ্র দিবস উপলক্ষ্যে কক্সবাজার মেরিন ড্রাইবে হয়েছিল, ‘রান ফর ওশান’। এবার যেমন হচ্ছে সুন্দরবন ম্যারাথন।
জয়মুনিরগোলে পৌঁছানোর পর আমাদের কয়েকজন লঞ্চে উঠে আসল তাঁরা সবাই আরো আগেই জয়মুনিরগোল চলে এসেছিলেন কয়েকদিন আগে। আগামীকালের করণীয় নিয়ে ছোট একটা মিটিং হলো তারপর রাতের খাওয়া শেষ করে সবাই ঘুমাতে চলে গেলাম।
(চলবে)
ফেসবুকে আমার পেইজ:
https://www.facebook.com/liferiderun/
আমার অন্যান্য লেখা পড়তে চাইলে নিচের লিংকে ক্লিক করতে পারেন:
http://liferiderun.net/
ফিচার ছবি: লেখক
ভ্রমনগুরু your travel adviser