বেশ কিছুদিন থেকেই চট্টগ্রাম যেতে চাচ্ছিলাম বন্ধুদের সাথে দেখা করতে। কথা হলো ছোট ভাই ফারাবি আর রূপম ভাইয়ের সাথে। এর মধ্যে হঠাৎ আমার জ্বর এসে গেল। প্ল্যান প্রায় ভেস্তে যাওয়ার জোগাড়। কিন্তু ভ্রমণপিপাসু মন, শরীর খারাপ মানবে কেন? জ্বর একটু কমাতে মুশতাককে বললাম প্ল্যান ফাইনাল করো। আমি যাবো। তারপর যথারীতি বৃহস্পতিবার রাতের বাসে উঠে বসলাম। মেঘনা-গোমতী দ্বিতীয় সেতু হওয়ার পর বেশি সময় লাগে না যেতে। কিন্তু সেদিন যে কি হয়েছিল কে জানে! কুমিল্লায় যখন যাত্রাবিরতি করে বাস, মসজিদে তখন ফজরের আজান হচ্ছে। সেতু হওয়ার আগেও এতো দেরি হয় নাই কখনো।


আমাদের মূলত উদ্দেশ্য হচ্ছে সীতাকুণ্ডের হরিণমারা ট্রেইল। হরিণমারা যাওয়ার জন্যে আমাদের নামতে হলো ছোট কমলদহ বাজারে। কিছুক্ষণ অপেক্ষার পর ফারাবি ভাই আর সাইফ ভাই আসলেন। বাজারের একটা হোটেলে ঢুকলাম আমরা নাস্তা করতে। সেখানে তন্দুর রুটি, আর গুলগুলা ছাড়া আর কিছু পাওয়া যায় না। এই গুলগুলা এক অদ্ভুত জিনিস। গোল একটা বলের মতো। খেয়ে মনে হলো সুজি, চিনি আর নারকেল দিয়ে বানানো। গরম গরম খেতে খারাপ না। যাইহোক, হালকা-পাতলা খেয়ে, চা খেয়ে আমরা একটা সিএনজি নিয়ে কিছুটা এগিয়ে গেলাম। তারপর আমাদের হাঁটা শুরু হলো।


কিছুদূর হাঁটার পরই চোখে পড়লো চমৎকার এক লেক। স্থানীয়রা বলেন, বাউয়্যাছড়া লেক। পোষাকি নাম, নীলাম্বর লেক। এখান থেকে যারা বোটে করে যেতে চান তারা বোটে যেতে পারবেন আর যারা পাহাড় দিয়ে যেতে চান তারা পাহাড়ি পথে যেতে পারেন। আমরা পাহাড় দিয়েই রওনা দিলাম। ঠিক করলাম, নৌকায় ফিরবো। দুটা পথই দেখা হয়ে যাবে। ট্রেইলটা সুন্দর। খুব একটা পরিশ্রম করতে হয় না। পাহাড় পেরিয়ে কিছুটা পথ চলার পর ঝিরির দেখা মিললো।




আবার বেশ কিছুক্ষণ হাঁটার পর ঝিরিপথ দুই দিকে ভাগ হয়ে গেল। হাতের বাম দিকে গেলে হরিণমারা ঝর্ণা। খুমে পানি খেতে আসা হরিণদের শিকার করা হতো বলে এমন নাম এই ঝর্ণার। বৃষ্টি কম হওয়ার কারণে পানিও কম ঝর্ণায়। কিন্তু সেখানে তখন শুধু আমরা পাঁচজনই ছিলাম। নীরব, নিরিবিলি, গল্প করছিলাম। পানিতে পা ডুবিয়ে বসে ছিলাম আমি। বাকিরা সাঁতার কাটছিল। ভালোই লাগছিল।



এখান থেকে আবার আগের জায়গায় গেলে ডান দিকে যে ঝিরিপথটা গিয়েছে, সেদিকে কিছুক্ষণ হাঁটার পর আবার দুইভাগে ভাগ হয়ে যায় ঝিরি, যার বামদিকে হাঁটুভাঙ্গা ঝর্ণা আর ডানদিকে সর্পপ্রপাত ঝর্ণা। শুনলাম, হাঁটুভাঙ্গা ঝর্ণার চারপাশটা অনেক পিচ্ছিল, তাই এই নামকরণ করা হয়েছে। নামের মধ্যেই সতর্কবাণী আর কি! সাবধানে চলো, নয়তো হাঁটু ভেঙ্গে যেতে পারে! যথারীতি এখানেও পানি তেমন নেই। তারপরও পাথরগুলো পিছল হয়ে আছে। ভরা বর্ষায় ঝর্ণা তার পূর্ণ যৌবন ফিরে পায়। এই ঝর্ণার উচ্চতা কিন্তু ভালোই। আর জায়গাটা অনেক সুন্দর। চারপাশে একটা অদ্ভুত নীরবতা।




এই পুরো ঝিরিতে প্রচুর চিংড়ি মাছ চোখে পড়লো। সব মরে গিয়েছিল যদিও। পানিতে মনে হয় সমস্যা আছে। তেহজীব একটা চিংড়ি দেখে এমন জোরে চিৎকার দিয়ে উঠলো! মাআআআআআ! চিংড়িইইইইইইইইই! আমি তো বুঝতেই পারছি না কি বলছে। পরে দেখি ওর জুতার উপর চিংড়ি। পায়ের নিচে চিংড়ি। ঝিরি ভরে আছে ছোট ছোট চিংড়ি মাছে। মেয়ে আমার জোকের ভয় পায় না, চিংড়ি দেখে ভয় পেয়ে গিয়েছে।


এর মধ্যে একটা গ্রুপ চলে আসাতে আমরা উঠে পড়লাম। মিনিট পনেরো দূরত্বে আরেকটা ঝর্ণা আছে। নাম, সর্পপ্রপাত ঝর্ণা। হরিণমারা ট্রেইলের সবচেয়ে ভালো দিক হচ্ছে, সবগুলো ঝর্ণা খুব কাছাকাছি। বেশি ট্র্যাকিং করতে হয় না। সর্পপ্রপাত ঝর্ণার পানি সরে যেতে পারেনা বিধায়, জমে থেকে ভারি হয়ে আছে। এর আশপাশটাও সুন্দর। ভালোমতো লক্ষ্য করলে দেখা যাবে, ঝর্ণার গঠনটা ঠিক যেন একটা সাপ এঁকেবেঁকে এগুচ্ছে এমন। পানি বেশি থাকলে নিশ্চয়ই এটা আরো ভালো বোঝা যায়। সবচেয়ে বড় কথা, আমরাই শুধু ছিলাম, তাই হয়তো বেশি ভালো লাগছিল। কোন হৈচৈ নেই, কোলাহল নেই।



আমার কাছে আবার ঝর্ণায় পানি না থাকলেও চলে। যেহেতু আমার পানিভীতি আছে। ট্রেইল সুন্দর হলেই হবে। আর হরিণমারার ট্রেইল আমার খুব সুন্দর লেগেছে। ট্রেইল থেকে বের হয়ে আমরা বাউয়্যাছড়া লেক দিয়ে নৌকায় ফিরলাম। তেহজীব গান শোনালো। মাঝি দুইজন অনেক দোয়া করে দিলেন ওকে।


আবার হেঁটে মেইন রোডে উঠে একটা মাহিন্দ্র নিয়ে আমরা চলে গেলাম ছোট দারোগার হাট। যাবো সহস্রধারা ২। এদিকের লোকজন বলেন, এটাই আসল সহস্রধারা। ইকোপার্কেরটা নকল! শুনে খুব মজা লাগছিল। মাহিন্দ্র থেকে নেমে কিছুদূর হেঁটে গেলেই সহস্রধারা লেক পাওয়া যাবে। সেখান থেকে নৌকায় করে ঝর্ণার একেবারে কাছে নামিয়ে দেয়। লেকের কাছে একটা পুরানো মন্দিরও আছে।


একটাই নৌকা সার্ভিস দিচ্ছিলো। আমাদের আগে একটা গ্রুপকে নামাতে গেল। আমরা ডানদিকে বাঁক নিয়ে হেঁটে পানির বাঁধটা দেখতে গেলাম। বাকিরা নিচে নেমেছিল। আমি ব্রিজের উপর বসে বসেই ঘুমিয়ে গেলাম। মাথা অসম্ভব ব্যথা ছিল। কিন্তু অদ্ভুত ব্যাপার হচ্ছে, ট্র্যাকিংয়ের সময় ব্যথা থাকে না। কোথাও বসলে বা দাঁড়ালেই ব্যথা শুরু হয়। দ্য রিয়াল ট্রেকার! যাইহোক, মিনিট দশেক পরেই নৌকা চলে আসলো। সেই দশ মিনিটের ঘুম খুব কাজে লেগেছিল।


ঝর্ণায় যেতে যেতে লেকের চারপাশটা দেখতে খুব ভালো লাগছিল। এদিকের নৌকাগুলো বৈঠা দিয়েই বাইতে হয়। ইঞ্জিনের ভটভটি নেই। তাই লেকের নীরবতা আর পানিতে বৈঠার একটা ছন্দময় শব্দ খুব উপভোগ করছিলাম। দূর থেকে ঝর্ণাটা দেখলাম, অনেক উঁচু থেকে পড়ছে পানি। যদিও পানি খুব বেশি ছিল না, কিন্তু এতো উপর থেকে পড়াতে খুব জোরে গায়ে লাগছিল। পাথরে বসে ভিজলাম। আর দেখলাম চারপাশে আমাকে ঘিরে আছে রঙধনু! আস্তে আস্তে মনে হলো পানির গতি বাড়ছে। পানি ঠাণ্ডাও হয়ে যাচ্ছে। উঠে পড়লাম।



দুপুরের খাবার খেতে গেলাম আমরা। ইচ্ছা ছিল সীতাকুণ্ডের বিখ্যাত ড্রাইভার হোটেলে খাওয়ার। কিন্তু হলো না। অগত্যা এমনি এক হোটেলে খেতে খেতে পরবর্তী গন্তব্য আলোচনা করছিলাম। ইচ্ছা ছিল সেই রাতে মহামায়া লেকে ক্যাম্পিং করবো। সাইফ ভাই ফোন দিয়ে জানলেন, ক্যাম্পিং আপাতত বন্ধ আছে। কি আর করা! কায়াকিং তো অন্তত করা যাবে। মহামায়ার উদ্দেশে রওনা হলাম। বিকালের ঠাণ্ডা বাতাসে সবাই মিলে আস্তে আস্তে হেঁটেই চলে গেলাম লেকে।
সেখানে দেখা হলো বিন্দাস ট্রাভেল গ্রুপের কর্ণধার রেদোয়ান ভাইয়ের সাথে। ওনার সুপারিশে কায়াকের ব্যবস্থা হয়ে গেল ঝটপট। নাহলে সিরিয়াল পেতে সময় লাগতো। ছুটির দিন ছিল তাই অনেক ভিড় ছিল। তারপর আর কি! লাইফ জ্যাকেট গায়ে দিয়ে আমি, আমার কোলে তেহজীব, পিছনে মুশতাক কায়াক নিয়ে ভেসে পড়লাম লেকের বুকে। বলাই বাহুল্য, মুশতাক একাই চালাচ্ছিল। আমরা শুধু দেখছিলাম। মহামায়ায় আমাদের আরো মায়ায় ভাসাতেই কিনা কে জানে, আকাশ ভেঙে নামলো বৃষ্টি, পাঁচ মিনিটের জন্যে। কিন্তু সেই সময়টাই এতো সুন্দর ছিল!


কায়াকিং শেষ করে লেকের পাড়ে বসলাম আমরা। সন্ধ্যা নামছে। আমরা গল্প করছি। তেহজীব গান শোনাচ্ছে। অনেকক্ষণ ছিলাম আমরা লেকে। তারপর রওনা হলাম চট্টগ্রামের উদ্দেশে। মামার বাসা সেখানে। প্রায় বছর দুয়েক পর যাচ্ছি। সাতপাঁচ ভাবতে ভাবতে পৌঁছে গেলাম। মামা যথারীতি প্রথমেই আমাদের ক্লাস নিয়ে নিলেন, আমরা কেন এতো ঘুরি আর কিভাবে ঘুরি। প্রশ্নোত্তর পর্ব শেষে, রাতের খাবার শেষ করে আর দেরি করলাম না। ঘুমাতে চলে গেলাম। পরদিন অনেক সকালে বের হতে হবে। বাড়বকুণ্ডের অগ্নিকুণ্ডটা আমাদের অপেক্ষায় আছে!
ট্রেইলের ভিডিও দেখতে হলে ক্লিক করুন এই লিংকে:
আমার পুরোনো ভ্রমণ কাহিনীগুলো পড়তে চাইলে ক্লিক করতে পারেন নীচের লিংকে:
https://www.vromonguru.com/author/azmi/
বিঃদ্রঃ ঘুরতে যেয়ে জায়গা নোংরা করবেন না। ময়লা আবর্জনা যেখানে সেখানে ফেলবেন না। দেশটা আমাদের। পরিষ্কার-পরিচ্ছন্ন রাখাও আমাদেরই দায়িত্ব।
ফিচার ছবি: ফারাবি আহমেদ
ভ্রমনগুরু your travel adviser