বের হবার আগে কমপ্লেক্সের সিকিউরিটি গার্ডকে জিজ্ঞেস করলাম বাধাঘাট কিভাবে যাব? সে বললো এভাবে যান। ভাবলাম কাছেই হবে বোধ হয়। চক্কর খেয়ে আবার সেই নিশিনাথ তলার কাছে এসে পড়লাম। খুঁজেছে বাধাঘাট। নৌকা বাইচের জন্য লোকে লোকারণ্য চারদিক আমরাও হারালাম দিক বেদিক। আমি কোথায় খুঁজি তারে, কোথায় তুমি বাধাঘাট। নিশিনাথ তলা পার হয়ে খানিক এগিয়ে এক ভ্যানয়ালাকে জিজ্ঞেস করলাম বাধাঘাটের কথা। সেইটাই যেন আমাদের জন্য কাল বরণ হল। ভ্যানয়ালা ভাবলো আমরা হয়তো নৌকা বাইচ দেখবো তাই বললো আসেন নিয়ে যাই। আমরাও সরল বিশ্বাসে উঠে পড়লাম।

বাধাঘাটের স্তম্ভ। ছবি: আশিকুজ্জামান আশিক

ভ্যান যাচ্ছে আবার উল্টাদিকে। সেই এস এম সুলতান কমপ্লেক্সের কাছাকাছি যখন আসলো তখন খানিকটা সন্দেহ হল কোথায় নিয়ে যাচ্ছে আমাদের। এস এম সুলতান কমপ্লেক্স পার করে আমাদের এক নৌকা ঘাটের সামনে নামিয়ে দিল। সেই ঘাটেও বেশ ভিড়। ভ্যানয়ালাকে ভাড়া দিয়ে দেবার পর এদিক সেদিক তাকালাম কোথাও বাধাঘাট সদৃশ কিছুই দেখলাম না। এর মধ্যে শুরু হয়ে গেছে তুমুল বেগে বৃষ্টি। দৌড় দিয়ে দোকানের ছাউনিতে দাঁড়ালাম দুজন। সময় যেন থমকে গেছে মেঘ বিষাদের গল্পে। এই হঠাৎ বৃষ্টি, আবার রোদ, আবার মেঘ। এভাবেই চক্রাকারে চলছে প্রকৃতির সাইকেল।

বাধাঘাট। ছবি: আশিকুজ্জামান আশিক

আমাদের পাশে দুইটা কম বয়সী ছোড়া দাঁড়িয়ে ছিল। তাদের জিজ্ঞেস করলাম ‘ও ভাই বাধাঘাট কোথায়?’ তারা তৎক্ষণাৎ উত্তর দিল আপনারা ভুল পথে এসেছেন আমরা ভুল ভাঙ্গানিয়া পাখি হয়ে আমাদের গাইড করে বাধাঘাট পর্যন্ত দিয়ে আসতে পারি বৃষ্টি থামুক। আমাদের বাসাও সে জায়গায়। বৃষ্টি শেষ আবার শুরু হলে পথের হাঁটা। সেই নিশিনাথ তলা অতিক্রম করলাম আবার। হেঁটে আর দুই মিনিট পরেই দূর থেকে এক চিলতে বাধা ঘাট দেখতে পেলাম। সেলুকাসের জন্য আধা ঘণ্টা রাস্তায় চক্কর খেলাম। বিচিত্র অভিজ্ঞতা।

আজ ঘাটে প্রচুর ভিড়। ওয়াফি ভিড় দেখে ঘাটের কাছে এসেও নিচে নামতে চাইলো না। এতদূর থেকে এসে ফিরে যাব। ভাল মত তো এক পলক দেখাও হল না। তো যে ভাবা সেই কাজ। আমি ভিড় ঠেলে সিঁড়ি দিয়ে নিচে নামতে লাগলাম। বাঙালির একটা বাজে অভ্যাস সামনে ভিড় করে থাকার অথচ ভিতরে একেবারে ফাঁকা। একবারে নিচের ধাপের সিঁড়িতে আসার পর থামলো আমার পদ যুগল। 

নান্দনিকতা। ছবি: আশিকুজ্জামান আশিক

নেমে আফসোস হল না। কারণ আমার চোখের সামনে দিয়ে একটু পর চলে গেল দুইটা বাইচের নৌকা। এত কাছ থেকে গেলে ভিডিওতে স্পষ্ট ভাবে ফুটে উঠলো। স্মৃতি হিসাবে থাকবে অনেক বছর। যাই হক এবার ভিড় ঠেলে পিছনের দিকে তাকালাম। দেখতে পেলাম সেই আদি ও অকৃত্রিম বাধাঘাট।

রূপগঞ্জের চিত্রা নদীর পাড় আর আমাদের বাধাঘাট। বয়সও তো কম হল না তোমার। সেই জমিদার রতন রায় ২০০ বছর আগে এই বাধাঘাট নির্মাণ করেন। রোমান স্থাপত্যশৈলীর সাথে আধুনিকতা অপূর্ব মিশ্রন এই বাধা ঘাট। দূর থেকে দেখলে যে কেউ ভাববে প্রাচীন রোমান শহরে এসে পড়েছি। চিত্রা নদীর পাড়ে যেন এক গুচ্ছ রোমান সভ্যতা দাঁড়িয়ে আছে। ঘাটের ওপরের অংশে ছাদ আর সেই ছাদকে ধরে রাখার জন্য ২০টি থাম তো আসার পথেই দেখে এসেছি। প্রতিটি থাম প্রায় ২০ ফুট উঁচু। ঐতিহ্য ও নান্দনিকতার অপূর্ব মিশেল এই বাধাঘাট নড়াইল শহরের অন্যতম আর্কষণও বটে। জমিদার বাড়ির রমণীদের স্নান, পূজা পাবনের সময় প্রতিমা বির্সজন ছাড়াও, বৈকালিক হাওয়া পানি পরিবর্তনের জন্যও এই ঘাটে আসতো জমিদারদের আন্দরমহলের রমণিরা।

আকাশে দেখা যায় রংধনু। ছবি: লেখক

সাহিত্য সম্রাট বঙ্কিমচন্দ্র যখন খুলনা কালেক্টর ছিলেন প্রশাসনিক কাজে প্রায়ই নড়াইল মহকুমা শহরে আসতেন। প্রতিবার শহরে আসার সময় চিত্রা নদীর পাড়ের এই বাধাঘাট বিমুগ্ধ নয়নে দেখতেন। চিত্রা নদীতে তার বজরায় ভেসে ভেসে দেখতেন কারুকার্যময় বাধাঘাট। নড়াইল জমিদারদের বিভিন্ন ইতিহাস আর ঘাটটির প্রতি তৈরি হওয়া ভালোবাসার চিহ্ন পাওয়া যায় তাঁর ‘কমলাকান্তের দপ্তর’ আর ‘কৃষ্ণকান্তের উইল’ উপন্যাসে।

নৌকা বাইচের ভিড়। ছবি: লেখক

কোথায় সেই জমিদারি। সবই ভূ-গর্ভে মিশে গেছে। দেশ ভাগের পর ধীরে ধীরে দেশান্তরি হতে থাকে জমিদারদের বংশধর। এখন এপারে কেউ নেই। জমিদারি বিলুপ্ত হলে রয়ে গেছে বিশাল বিশাল কারুকার্যময় প্রাসাদ, চিত্রা নদী তীরের বাধাঘাট, ভিক্টোরিয়া কলেজ, মঠ, মন্দিরসহ জমিদারদের নানা কীর্তি। তাঁরা যাওয়ার পর লুটপাটের শিকার হয় জমিদারবাড়ি।

এরশাদ সরকার যখন ক্ষমতায় এল ১৯৮৩ নিলামে উঠে এই নড়াইল জমিদার এস্টেট। ধীরে ধীরে  সেখানে গড়ে উঠে পুলিশ লাইনসহ সরকারি শিশু সনদ অফিস। বর্তমানে শোনা যাচ্ছে এখানে নাকি প্রজাপতি পার্ক হবে। টিকার মধ্যে টিকে আছে ক্ষয়িষ্ণু লোহার পিলার আর ইট পাথরে অস্থিমজ্জা। একটি কালী মন্দির আর একটি সর্বামঙ্গলা মন্দিরও টিকে আছে এই জমিদারির শেষ স্মৃতি হিসাবে।

আকাশ ফুড়ে বের হয় এক গুচ্ছ মেঘ। ছবি: লেখক

তবে একবারে অক্ষত ভাবে টিকে আছে এই বাধাঘাট। জমিদার বাড়ি থেকে আধা কিলোমিটার দূরে সেই ঘাটে এককালে শোনা যেত জমিদার বাড়ির রমণীদের নূপুরের শব্দ, ফিসফিসানো গল্প, বাতাস ভাসতো সুখময় গুঞ্জন। বাড়ি থেকে ঘাটের পথটুকু পালকি চড়ে আসতো জমিদার বাড়ির বউঠান-কন্যা-জায়া-জননীরা। আর এখন কোথায় গেল সব। এক পুরুষ জমিদার, সাত পুরুষ খায়, অষ্টম পুরুষ পালায়। তবুও কি মোহ ক্ষমতায়। সময় প্রায় ফুরিয়ে এসেছে আর দিনের আলো শেষ হবে হবে করছে। এবার এখান থেকে নতুন গন্তব্যে ছুটে যাওয়ার পালা।

আমার পুরানো ভ্রমণ গল্পগুলো পড়তে চাইলে নিচের লিংকে চলে যান:
https://www.vromonguru.com/author/ashik/

আমার গল্প, কবিতা, প্রবন্ধ পড়তে চাইলে ঘুরে আসতে পারেন আমার ফেসবুক পেজ থেকে:
https://www.facebook.com/sarwar.ashik786

এর বাহিরেও আমাদের নিজস্ব ভ্রমণ গ্রুপ শেকড় সন্ধানীর মাধ্যমে নিয়মিত এ রকম বাংলার পথে ভ্রমণের আয়োজন করা হয়। ইচ্ছা থাকলে পাঠক আপনিও হতে পারেন আমাদের পরবর্তী ভ্রমণের সঙ্গী। আমাদের সাথে যোগাযোগের বিস্তারিত নিচে দেয়া হলো।

Roots Finder – শেকড় গ্রুপের সাথে থাকুন:
https://www.facebook.com/groups/459880764416865/

Roots Finder – শেকড় পেজ লিঙ্ক:
https://www.facebook.com/rootsfinder.bd/

শেকড় সন্ধানী দলের এডমিনদের নাম্বার:
ঈসমাইল হোসেন – ০১৭৫৬১৭১৫৭০
আশিক সারওয়ার – ০১৮৬৬৬৬৩৪২৩
শরীফ জামান – ০১৫৩৫৪৫৩৯৭৭

ঘুরেন দেশের পথে, খুঁজে ফিরুন নিজের শেকড়।

ফিচার ইমেজঃ আশিকুজ্জামান আশিক

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here