অনেকদিন ধরেই গাজীপুরে অবস্থিত বেইজক্যাম্পে যাওয়ার ইচ্ছা ছিলো। অ্যাডভেঞ্চার একটিভিটি দিয়ে ভরপুর এ রিসোর্টটা বাংলাদেশের বাকি সব রিসোর্টের থেকে আলাদাই বলতে হবে। এখানে যাওয়ার মতো দলবল না পাওয়াতে যাওয়া হচ্ছিলোনা। অবশেষে নিয়াজ ভাই তার শপ ট্রিপমেটের জন্য ওইখানে একটা রিট্রিটের আয়োজন করতে চাইলেন। সেই সাথে ভালো ছাড়ও পাওয়া গেলে। দেরী না করে তাড়াতাড়ি বুকিং দিয়ে ফেললাম।
১১ ফেব্রুয়ারী ২০২২ শুক্রবার রাত প্রায় ১০ টার দিকে বের হলাম গাজীপুরের শফিপুরে অবস্থিত বেইজ ক্যাম্পে যাওয়ার জন্য। দেরী হবার কারণ জনম, সে আমাদের বাসা থেকে নেবার কথা ছিলো রাত ৯ টায়। তবে বিষয়টা সাপে বরই হলো, রাস্তা ফাকা পেয়ে গাবতলী নবীনগর হয়ে দুঘন্টার মধ্যেই আমরা পৌছে গেলাম বেইজ ক্যাম্পে। এর মধ্যে প্রায় সবাই পৌছে গেছে। আমরা রিসোর্টের তাঁবুতে না থেকে নিজেদের তাঁবুটাই পেতে ফেললাম।

অনেক রাত পর্যন্ত ক্যাম্পফায়ারের আগুনের পাশে আড্ডা চললো। সকালে উঠে চমৎকার ব্রেকফাস্ট শেষ করেই সবাই মাঠে সমবেত হলাম। চার দলে ভাগ করে দেবার পর শুরু হবে মূল অ্যাডভেঞ্চার। আমরা ছিলাম প্রায়া ৯০ জনের মতো, যারা অ্যাডভেঞ্চার একটিভিটি করবে তাদেরকে চার দলে ভাগ করে দেয়া হলো। সোনিয়ার নের্তৃত্বে তৈরী হওয়া আমাদের দলের বেশির সদস্য ৪০ উর্ধ। কিন্তু তাতেও আমরা দমে যাইনি, অভিজ্ঞতা দিয়েই সমানতালে লড়ে গেলাম বাকি দলগুলোর সাথে।

প্রথমে মাঠে সবাইকে জড়ো করে স্ট্রেসিং করানো হলো। এরপর চার দলকে দুভাগ করে দুধরণের একটিভিটিতে পাঠানো হলো। আমাদের পড়লো ট্রি অ্যাডভেঞ্চার। বেইজ ক্যাম্পের এই একটিভিটিটা আমার খুব পছন্দের। আমার দল থেকে প্রথমেই ডাক পড়লো আমার। মাত্র সাড়ে তিন মিনিটের মধ্যে যদি শেষ স্টেপে না আসতে পারি তবে নেমে যেতে হবে। এটা শুনে সামান্য একটু নার্ভাস লাগছিলো, প্রথমজন হিসেবে আমি ব্যর্থ হলে দলের বাকি সদস্যদের উপরও সেটার প্রভাব পড়বে।

প্রথম থেকে তাড়াহুড়ো না করে ধীরে সুস্থেই সাড়ে তিন মিনিটের আগে শেষ দুটো স্টেপের আগে আসতে পারলাম। তারমধ্যে গাছের গুড়ির উপর দিয়ে আসতে বেশ কষ্টই হলো। সেটা পার হবার পর বাকি দুটো স্টেপ শেষ করে সাড়ে চার মিনিটের আগেই নামতে পারলাম। অন্য দলের অংশগ্রহণকারীরাও সমান তালে চালিয়ে যাচ্ছিলো। মাঝে একজনকে দেখলাম খুব দ্রুত প্রথম কয়েকটা স্টেপ শেষ করলো, কিন্তু গাছের গুড়ির স্টেপে এসে শক্তি শেষ হয়ে ঝুলে গেলো।

বেইজ ক্যাম্পের ট্রেইনাররা দ্রুততার সাথে রিসকিউ ল্যাডার দিয়ে উদ্ধার করলো তাকে। আমাদের দলের কয়েকজনও একইভাবে আটকা পড়লো, তাদেরও উদ্ধার করা হলো। বেশ জমজমাট একটা সেশন শেষ করে আমরা গেলাম পরের পর্বে। এবারের পর্ব একেবারেই ভিন্ন। দলের সবাইকে প্রথমে লাইনে দাঁড় করানো হলো। এবার দৌড়ে যেয়ে অপর প্রান্তে যেয়ে পাঁচ চক্কর দিয়ে তারপর ফিরতে হবে একদম সোজাভাবে। কিন্তু পাঁচ চক্কর দেবার পর মাথা এমনভাবে চক্কর দেয় যে সোজা দৌড়ানো একেবারে অসম্ভব। সবাই ধুম-ধারাক্কা পড়তে লাগলো এদিক-সেদিক। সে এক দেখার মতো দৃশ্য। তারপরও আমাদের দল মোটামুটি উৎরে গেলো এ পর্বে।

দুপুরের আগের সর্বশেষ পরীক্ষা ছিলো এন্ডুরেন্স টেস্ট। পুরো যেন সামরিক প্রশিক্ষণের জন্য তৈরী করা রণক্ষেত্র। এ পর্বের শুরু হয় মাটিতে রাখা টায়ারের মধ্যে সাবধানে পা দিয়ে দৌড় শুরু করা দিয়ে। এরপর মাঠে তৈরী করা বিভিন্ন বাধা পার হয়ে একেবারের শেষের অংশে প্রায় ১৫ ফিট উঁচুতে টায়ার বেয়ে উঠে অপপ্রান্তে দঁড়ির জাল বেয়ে নামতে হয়। এ জায়গায় এসে টের পেলাম কতটা বুড়ো হয়েছি, যদিও মোটামুটি সম্মানজনক স্কোর নিয়ে শেষ করতে পেরেছি।

এরপর দিনের সবচেয়ে রোমাঞ্চকর অধ্যায়। কাদামাটির মধ্যে রেইস। এর শুরুটা সহজ কিছু বাঁধা ডিঙ্গানো দিয়ে শুরু হলেও মাঝামাঝিতে মাত্র দুই ফিট চওড়া একটা খাঁদের মধ্যে দিয়ে জালের নিচ দিয়ে যাওয়ার সময় মনে হচ্ছিলো আজ মনে হয় আর এখান থেকে বের হতে পারবোনা। পুরো দম শেষ করে কোন মতে ওখান থেকে বের হয়ে আরেকটা বড়ো জালের নিচ দিয়ে কাঁদার মধ্যে মোটামুটি সাঁতার কাটার ভঙিতে পার হয়ে আসলাম। এরকম কষ্টের পরও এক বাক্যে সবাই স্বীকার করে নিলাম, বেইজ ক্যাম্পের সবচেয়ে চ্যালেঞ্জিং এবং সবজেয়ে মজার অংশ ছিলো এ কাঁদামাটির দৌড়।

ভেজা শরীরেই পুকুরে এসে “কুমির তোর জলে নেমেছি” খেলা। তেমন কিছুনা, জিপ লাইনে চড়ে পুকুরের মাঝে ঝাপ দিয়ে পড়ার বিষয়টা দারুণ মজার। এ সুযোগে পুকুরে ছেলেকে নিয়ে কায়াকিংও করে নিলাম কিছুক্ষণ। বাচ্চাদের জন্য তেমন কোন আয়োজন নেই বেইজক্যাম্পে, হয়তো বাচ্চাদের নিয়ে এ ধরণের ট্রিপে কেউ আসেনা বলে। এর মধ্যে দুপুরের খাবারের সময় চলে যাচ্ছে প্রায়। তাড়াতাড়ি গোসল সেরে আসলাম চমৎকার দুপুরের খাবার খেতে।

এত ক্ষুধার্ত ছিলাম তখন, একটা আস্ত গরুও খেয়ে ফেলতে পারতাম মনে হয়। খাবার টেবিলে সুস্বাদু পোলাও, মাছ, মুরগি, বেগুণভাজী, ডাল দিয়ে খেয়ে পেট ফুলিয়ে পরের পর্বে গেলাম। ভাগ্যিস এ পর্বের মানব ফুটসালে মোটামুটি দৌড়ানো কম। ফুটসাল আগে খেলেছি, কিন্তু নিজেই ফুটসালের পুতুল হয়ে খেলবো, এটা কখনো ভাবিনি। তীব্র উত্তেজনাপূর্ণ খেলায় আমরা ৪-৫ গোলে পরাজয় মেনে নিয়ে মাঠ ছাড়লাম।
এবার আরো একটি নতুন পর্ব, সেটা হচ্ছে আর্চারি। তীর-ধনুকের এ খেলাটি অনেকদিন ধরে দেখেছি, কিন্তু কখনো নিজে চেষ্টা করিনি। মাত্র পাঁচ মিনিট প্রশিক্ষণে মোটামুটি বৃত্তের মধ্যে রেখেই শেষ করতে পারলাম। তার মধ্যে ৮ পয়েন্টের একটা হিটও ছিলো, সেটা ২য় বৃত্তের মধ্যে ছিলো। বাকিরাও মোটামুটি ভালোই করলো। দিনের সর্বশেষ আকর্ষণ তখনও বাকি, সেটা হচ্ছে জিপলাইন।

তখনই বাঁধলো বিপত্তি, আমার সাড়ে চার বয়সী বাচ্চা জেদ ধরলো সেও জিপ লাইনে উঠবে। তাকে সেখান থেকে সরিয়ে নিয়ে কুকুরের কাছে নিয়ে গেলাম ভুলাতে। তখন বাচ্চাকে কাঁদতে দেখে এগিয়ে আসলো বেইজক্যাম্পের অপারেশন ম্যানেজার ইতু আপু। সব শুনে বললো বাচ্চা যদি জিপলাইন ধরে ঝুলে থাকতে পারে, তাহলে তিনি ব্যবস্থা করতে পারবেন। তারপর তিনিই আমাদেরকে নিয়ে গেলেন জিপলাইনের কাছে।

ছেলেকে সবচেয়ে ছোট হার্নেস পরিয়ে দিয়ে আমার সাথে অতিরিক্ত একটি ক্যারিবাইনার দিয়ে বেঁধে দিলো। কারণ জিপলাইনে চড়তে হলে আগে গাছের উপর স্টার্টিং পয়েন্টে উঠতে হবে, সেটা প্রায় ৫০ ফিট উঁচু মনে হলো। মইয়ের মতো সিঁড়ি দিয়ে ছেলে নিজে না উঠতে পারলে তাকে উঠানো সম্ভব হবেনা আমার পক্ষে। অল্প সময়ের জন্য আমার মনে হলো বেশি ঝুঁকি নিয়ে ফেললাম নাতো? কিন্তু আরিয়ান ঠান্ডা মাথায় সুন্দর করে উঠে আসলো উপরে। সেখানে জিপলাইনে তাকে বাঁধার পর হাসিমুখেই চলে গেলো।
পুকুরের উপর দিয়ে জিপলাইন পার হয়ে যখন যাচ্ছিলো, তার আনন্দ দেখে কে? শেষ প্রান্তে উদ্বেগ নিয়ে অপেক্ষা করছিলো সবাই, ধরে জিপলাইন থেকে ছাড়িয়ে নামিয়ে আনার পরই আরিয়ানের প্রথম কথা “আমি আবার যাবো!”। এরপর আমিও পার হয়ে আসলাম জিপলাইন। মাত্র ১০-১৫ সেকেন্ডের ব্যপার, কিন্তু বেশ মজার। এর মধ্যেই আমরা ক্লান্তির চূড়ান্ত সীমানায় পৌছে গেছি। বিকেলে নাস্তা কর অলস সময় পার করছি, এর মধ্যে দেখি কয়েকজন ফুটবল নিয়েও নেমে গেছে।
জিপলাইনটা ছিলো দূর্দান্ত। ভিডিও রিয়াদ
সন্ধ্যায় ডিনার করে আমরা ফিরতি পথ ধরলাম আমরা। গাবতলীতে ঘন্টাখানেক জ্যামে ভুগে রাত ১২টার আগেই বাসায় ঢুকলাম। মাত্র ২৪ ঘন্টায় কী অসাধারণ অ্যাডভেঞ্চার হয়ে গেলো। আসার পর পরের দিন দেখি সর্বাঙ্গে ব্যথা। কয়েকদিন সারা শরীর ব্যথা থাকলেও মনে হলো ঘোরের মধ্যে ছিলাম এই ট্রিপ নিয়ে।
বেইজক্যাম্প গাজীপুরের যাওয়ার পরিকল্পণা করলে অন্তত ৮-১০ জনের দল হয়ে যাওয়া দরকার, না হলে মজা পাবেন না। খরচটা নির্ভর করে গ্রুপ সাইজের উপর, মোটামুটি ক্যাম্পিংসহ এক রাতের ট্রিপের খরচ জনপ্রতি ৫,০০০ টাকা। আর সকালে যেয়ে সন্ধ্যায় চলে আসলে খরচ পড়বে ২,৫০০ টাকা। বিস্তারিত জানতে বেইজক্যাম্পের পেইজ দেখতে পারেন:
https://www.facebook.com/thebasecampbd
Website: https://www.thebasecampbd.com/
Phone: 01952777999, 01942777999, 01995333111
ফিচার ছবি: লেখক
ভ্রমনগুরু your travel adviser