Breaking News

সাত দিনে দার্জিলিং সিকিম ভ্রমণ পরিকল্পণা

ভারতের পশ্চিমবঙ্গের পাহাড়ি জেলা দার্জিলিং। নেপাল, ভুটান ও চীন ঘেরা সিকিম রাজ্য দার্জিলিং থেকে তিন ঘন্টার দূরত্বে। পৃথিবীর তৃতীয় সর্বোচ্চ পর্বত কাঞ্চনজঙ্ঘার কোল ঘেষা এ দুটি জায়গা বাংলা সাহিত্যে গুরুত্বপূর্ণ স্থান দখল করে আছে। এর টানে ভারত ও বাংলাদেশের বিভিন্ন জায়গা থেকে ছুটে আসে পর্যটকরা। বাংলাদেশ থেকে কম খরচে একই সাথে দার্জিলিং ও সিকিম ঘুরে আসতে চান অনেকেই। তাদের জন্যই এ খসড়া পরিকল্পণা।

দূর থেকে দার্জিলিং শহর ছবি লেখক

ভিসা ও যাতায়াত: দার্জিলিং-সিকিম ঘোরার জন্য আপনাকে ভারতের ভিসা নিতে হবে ফুলবাড়ি (বাংলাদেশ অংশে বাংলাবান্দা) বা চেংড়াবান্দা (বাংলাদেশ অংশে বুড়িমারী) হয়ে। এছাড়া ভারত-বাংলাদেশের মধ্যে প্রস্তাবিত তৃতীয় ট্রেন ”মিতালী এক্সপ্রেস” চালু হলে ”বাই ট্রেন হলিদাবাড়ী” দিয়ে শিলিগুড়ি যেতে পারবেন। শিলিগুড়ি থেকে দার্জিলিং ও সিকিমের বাস ও জিপ পাওয়া যায়। চেংড়াবান্দা থেকে শিলিগুড়ির দূরত্ব বেশি, কিন্তু গাড়ি সহজেই পাওয়া যায়, ফুলবাড়ি দিয়ে কম, কিন্তু পঞ্চগড়ের গাড়িও কম। বুঝেশুনে আপনাকে ঠিক করতে হবে কোন দিক দিয়ে যাবেন।

শ্যামলী এন আর সরাসরি শিলিগুড়ি যায়, ভাড়া পড়বে ১,৭০০ টাকা। এছাড়া বুড়িমারী পর্যন্ত অন্যান্য বাসের ভাড়া ৮৫০ টাকা। পঞ্চগড় গেলে ট্রেনেও যেতে পারেন, সেক্ষেত্রে শোভনের ভাড়া পড়বে ৫৫০ টাকা, এসি সিট ১,০৫৩ টাকা ও এসি কেবেনি ২,০০০ টাকার মতো পড়বে। এছাড়া বাসে করেও পঞ্চগড় যেতে পারেন সেক্ষেত্রে ভাড়া পড়বে নন এসি ৫৫০ টাকা এবং এসি ১০০০-১৬০০ টাকা।  বাংলাবান্দা বর্ডার পার হলে চাইলে অটো নিয়েও চলে আসতে পারবেন শিলিগুড়ি। আর চেংড়াবান্দা থেকে ৩০ রুপিতে বাইপাস এসে সেখান থেকে শিলিগুড়ির বাস পাবেন ৮০ রুপিতে। এছাড়া গাড়ি রিজার্ভ করলে ১০০০-১৫০০ রুপি পড়বে। সময় লাগবে ২ থেকে ৩ ঘন্টা।

প্রথম রাত: ঢাকা থেকে শিলিগুড়ি যাওয়ার জন্য রাত ৯-১০টার দিকে বেশির ভাগ গাড়ি। সারারাত চালিয়ে সাধারণত ভোরের দিকে বুড়িমারি/বাংলাবান্দা পৌছাবে।

প্রথম দিন: সকালে বর্ডারের সমস্ত ফর্মালিটি সেরে বের হতে সকাল ১০-১১ টা বেজে যেতে পারে। এরপর বর্ডার থেকেই টাকা রুপি করে নিবেন। মনে রাখবেন, টাকার রেইট বর্ডারেই সবচেয়ে বেশি, আর কোথাও এতো রেইট পাবেন না। সীমান্ত থেকে শিলিগুড়ি এসএনটিতে এসে সেখান থেকে দার্জিলিংয়ের জিপ ভাড়া করবেন। শেয়ারড জিপে জনপ্রতি ২৫০ রুপি নিবে। আর রিজার্ভ নিলে পড়বে ২,৫০০ থেকে ৩,৫০০ রুপি (গাড়ীর সাইজের উপরে)। তিন ঘন্টা লাগবে দার্জিলিং পৌছাতে, সেখানে চকবাজারে নামিয়ে দিবে।

গাড়ি থেকে নেমে বিগ বাজারের আশেপাশে খোঁজাখুজি করলে ১,২০০ রুপি-১,৫০০ রুপির মধ্যে হোটেল পাবেন। মল রোডে থাকলে আরেকটু বেশি পড়বে, তবে জায়গাটা বেশি সুন্দর।  দার্জিলিং পৌছাতে সন্ধ্যা বা রাত হয়ে যাবে, তাই সেদিন আর কিছু করতে পারবেন না। পরের দিনের ঘোরাঘুরির জন্য ড্রাইভারের সাথে কথা বলে রাখবেন।

বাতাসিয়া লুপে থেমেছে টয় ট্রেন ছবি লেখক

দ্বিতীয় দিন: এ দিনটা দার্জিলিংয়ের আশেপাশে ঘোরাঘুরি করে কাটাতে পারেন। সাধারণত পর্যটকরা খুব ভোরে (৪টায় উঠে) চলে যায় টাইগার হিলে কাঞ্চনজঙ্ঘার সাথে সূর্যোদয় দেখার জন্য। তারপর জাপানিজ টেম্পল পিচ প্যাগোডা, ঘুম মনেস্ট্রি, চা বাগান, রক গার্ডেন, জু, ক্যাবল কার এসব দেখে নিতে পারেন।  সবশেষে সন্ধ্যায় মল রোডে কেনাকাটা করতে পারেন, বিশেষ করে শীতের কাপড় প্রয়োজন হলে দার্জিলিং থেকেই নিয়ে নিবেন, সিকিমে দাম বেশি।

তৃতীয় দিন: আগের দিন রাতেই সিকিমের জন্য গাড়ি ঠিক রাখবেন। দার্জিলিং থেকে  সিকিম যেতে ঘন্টা তিনেকের মতো সময় লাগবে। খরচ পড়বে ৩,০০০ থেকে ৫,০০০ রুপি। আগে থেকে সিকিমে পারমিশন নেয়া না থাকলে এ কাজটা সহজেই র‌্যাংপো শহরে করে নিতে পারবেন। সবার যাওয়া লাগবেনা, ভিসার ফটোকপি, পাসপোর্টের ফটোকপি, এক কপি ছবি সহ পাসপোর্টগুলো নিয়ে একজন যাবেন। বেশি ভিড় না থাকলে ১০-১৫ মিনিটের মধ্যেই কাজ শেষ হয়ে যাবে। পারমিশন পাওয়া মাত্রই সেটার ১০ কপি করে ফেলবেন, পথে পথে ফটোকপি জমা দেয়া লাগবে। এছাড়া ছবিও ১০ কপি অন্তত সংগে রাখবেন।

গ্যাংটকের প্রাণকেন্দ্র এমজি মার্গ ছবি প্রনেশ দত্ত

পথে কোথাও দুপুরের খাবার সেরে নিতে পারেন। এরপর গ্যাংটক শহরের কাছে দেওর আলী জিপ স্ট্যান্ডে নামিয়ে দেবে। সেখান থেকে ৩০ রুপি করে এমজি মার্গে চলে আসতে পারবেন। এমজি মার্গ এলকায় প্রচুর হোটেল আছে, সেখানে খুঁজে পেতে দরদাম করে ১,২০০-১,৫০০ রুপির মধ্যে হোটেল নিতে পারবেন। দাম বেশি দেখলে এমজি মার্গের শেষ মাথায় যেয়ে একটু দূরের হোটেলগুলোতে খোঁজ নিবেন। রাতেই লাচুং যাওয়ার জন্য ট্রাভেল এজেন্ট খুঁজে বুক দিয়ে নিবেন। বাংলাদেশি পর্যটকদের লাচুংয়ের অনুমতি পেতে একটু সময় লাগে। ভালো হয় আগেই যদি আপনার এজেন্টকে ছবি, পাসপোর্ট ও ভিসার স্ক্যান কপি পাঠিয়ে দিয়ে রাখতে পারেন। রংপোতে পারমিশান পাওয়ার সাথে সাথে পারমিশনের কপিও হোয়াটসঅ্যাপ করে দিলে আপনি গ্যাংটক পৌছানোর আগেই পারমিশনের জন্য জমা দিতে পারবে।

সাধারণত বেশিরভাগ লোকজন এক রাত দুদিনের প্যাকেজ নেয়। প্যাকেজের মূল্য সিজন ভেদে ১২,০০০ রুপি থেকে শুরু করে ২৫,০০০ রুপি পর্যন্ত হতে পারে। দলে ৮ জন থাকলে মাথাপিছু সেভাবে খরচ ভাগ করে নিবেন। এই প্যাকেজে লাচুংয়ের হোটেল ও খাবার অন্তর্ভূক্ত থাকে। প্যাকেজ নেবার জন্য আপনাকে ছবি, পাসপোর্ট ও ভিসার ফটোকপি, র‌্যাংপো থেকে নেয়া পারমিশানের ফটোকপি দিতে হবে।

চতুর্থ ও পঞ্চম দিন: লাচুং প্যাকেজ নিয়ে নেয়া থাকলে সকালে নাস্তা করেই চলে যাবেন ২০-৩০ রুপি করে চলে যেতে পারবেন বাঝড়া ট্যাক্সি স্ট্যান্ডে। সেখান থেকে গাড়িতে করে রওনা দিতে পারবেন লাচুং যাওয়ার উদ্দেশ্যে। যাওয়ার পথে বেশ কিছু ওয়াটার ফলস দেখে লাচুং এসে রাতে থাকবেন। সেখানে কিন্তু অনেক ঠান্ডা, তাই শীতের সর্বোচ্চ প্রস্তুতি নিয়ে যাবেন।

বরফে আচ্ছাদিত কাটাও ছবি প্রনেশ দত্ত

পঞ্চম দিন সকালে নাস্তা করে  ইয়ামথাং ভ্যালী ও জিরো পয়েন্ট ঘুরে চলে আসতে পারবেন গ্যাংটকে। মনে রাখবেন জিরো পয়েন্ট যেতে হলে অতিরিক্ত ৩০০০ রুপি দিতে হবে। ভাগ্য ভালো থাকলে ও সিজন থাকলে তুষারপাতের দেখা পাবেন। সেই সাথে বরফের উপর ইচ্ছেমতো লাফালাফিও করতে পারবেন।

৬ষ্ঠ দিন: গ্যাংটক থেকে চাইলে এদিন ছাংগু লেক ঘুরে আসতে পারেন। তবে এজন্য আগের দিন রাতেই প্যাকেজ বুকিং ও পারমিশন নিয়ে রাখতে হবে। প্যাকেজ যাদের থেকে নিবেন তারাই পারমিশনের ব্যবস্থা করবে। ছাংগু লেকে ক্যবল কার আছে। এছাড়া অতিকায় ইয়াকের পিঠেও পড়তে পারেন, তবে এজন ভালো টাকাই খরচ হবে। ইয়াকের পিঠে উঠে ছবি তুললেই দিতে হবে ১০০ রুপি।

ডিসেম্বরের ছাংগু লেক এভাবেই বরফের নিচে ঢাকা পড়ে ছবি প্রনেশ দত্ত

আর যদি ছাংগু লেক না যান তবে গ্যাংটকের শেষ দিনটা শহরের আশেপাশে ঘুরে কাটাতে পারেন। গ্যাংটক সারাদিন ঘোরাঘুরি করলে তাসি ভিউ পয়েন্ট, বাংঝাক্রি ওয়াটারফলস, অর্কিড গার্ডেন, রোপওয়ে, গনেশ টক, হনুমান টক, চিতেন স্তুপা এসব জায়গায় ঘোরাঘুরি করতে পারবেন। আরেকটা বিষয়, যদি প্রথম দিন গ্যাংটকে পৌছে লাচুংয়ের পারমিশনের জন্য জমা দিতে দেরী হয়ে যায়, তাহলে আগে গ্যাংটকের আশেপাশে ঘুরবেন তারপর লাচুং যাবেন।

রোপওয়ে থেকে দেখা সিকিম শহর ছবি লেখক

৭ দিন: কিছুই করা সম্ভবনা। ভোর বেলা উঠে নাস্তা করেই রওনা দিয়ে দিতে হবে। পথে র‌্যাংপোতে এক্সিট পারমিশন নিয়ে চলে যাবেন সোজা শিলিগুড়ি। ড্রাইভারকে বললে তিস্তা পারের কোন একটি রেঁস্তোরায় দুপুরের খাবারের জন্য থামবে। শ্যামলী এন আর ছাড়ে বেলা দুইটাই। সেটাতে না যাওয়ার ইচ্ছা থাকলে সোজা চেংড়াবান্দা এসে বাংলাদেশে ঢুকে পড়বেন। বুড়িমারী আসলে ঢাকার গাড়ি পাবেন। সারারাত গাড়ি চলে ভোরে পৌছে দিবে ঢাকা।

সিজন ও কতজন দলে আছেন এটার উপর নির্ভর করে খরচ জনপ্রতি ১২,০০০ থেকে শুরু করে ২০,০০০ এর মধ্যে শেষ করতে পারবেন। মনে রাখবেন মে মাস দার্জিলিং সিকিমের পিক সিজন, সেই সাথে যোগ হচ্ছে বাংলাদেশের পর্যটকরা। তাই এসময় আগে থেকে সব বুকিং করে গেলেই ভালো হবে। আর যদি শুধু সিকিম যেতে চান তবে শিলিগুড়ি থেকে সরাসরি চলে যাবেন সিকিমে।  সেক্ষেত্রে লাচুং, ছাংগু লেক, গ্যাংটক ঘোরাঘুরি ছাড়াও পেলিং ঘুরে আসতে পারেন।

ফিচার ছবি: প্রনেশ দত্ত

About Muhammad Hossain Shobuj

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের অর্থনীতি বিভাগ থেকে মাস্টার্স শেষ করে পরবর্তীতে আইবিএ থেকে এক্সিকিউটিভ এমবিএ করেছেন। বর্তমানে যুক্তরাষ্ট্রভিত্তিক একটি উন্নয়ন সংস্থায় কাজ করেন। লেখালেখিটা শখের কাজ, ঘোরাঘুরিও। এ পর্যন্ত দেশের ৬৩ টি জেলা ও ১২ দেশে ঘুরেছেন।

Check Also

সিকিমের জিরো পয়েন্ট যেতে পারবেনা বাংলাদেশি পর্যটকরা

২০১৮ সালে সিকিম বাংলাদেশিদের জন্য পুণরায় খুলে দেবার পর থেকে বাংলাদেশের মানুষের অন্যতম পছন্দের গন্তব্য। …

Leave a Reply

Your email address will not be published.