বাংলাদেশের সবচেয়ে কাছে ও সবচেয়ে কম খরচে বরফ দেখার জন্য গন্তব্য ভারতের সিকিম রাজ্য। সড়কপথে সিকিম যাওয়ার জন্য মাত্র দুটি স্থলবন্দর (বাংলাবান্দা ও বুড়িমারী) খোলা থাকায় ছুটির দিনগুলোতে এ বন্দরগুলোতে বেশি চাপ পড়ে। একারণে এ পথে সীমান্ত পার হতেই সারা দিন লেগে যেতে পারে। অপরদিকে ঢাকা থেকে সরাসরি শিলিগুড়ির সম্প্রতি চালু হওয়া ট্রেনে গেলে সীমান্তের ভোগান্তিটা থাকেনা।
এ কারণে অনেকেই মিতালী এক্সপ্রেস ট্রেন দিয়ে সিকিম ভ্রমণের পরিকল্পণা করছেন, তাদের জন্যই এ আর্টিকেল। প্রথমেই আসি মিতালী এক্সপ্রেসের বিষয়ে। গত জুন ২০২২ থেকে চলছে ঢাকা থেকে নিউ জলপাইগুড়ি সরাসরি ট্রেন মিতালী এক্সপ্রেস। সপ্তাহে দুই দিন, সোম ও বৃহস্পতিবার, এ ট্রেন ঢাকা ক্যান্টনমেন্ট থেকে নিউ জলপাইগুড়ি যায় এবং রবি ও বুধবার নিউ জলপাইগুড়ি থেকে ঢাকা ক্যান্টনমেন্ট আসে।

ঢাকা থেকে ছাড়ার সময় রাত ৯:৫০, নিউ জলপাইগুড়ি পৌছাবে সকাল ৭:১৫। আর নিউ জলপাইগুড়ি থেকে ছাড়ে সকাল ১১:৪৫ মিনিটে, ঢাকায় এসে পৌছায় রাত ১০:৩০ মিনিটে। ট্রেনের ভাড়া ৩,৭৮৫ টাকা থেকে শুরু করে ৬,৫৭০ টাকা। এ ট্রেনে ভ্রমণের জন্য “বাই ট্রেন নিউ জলপাইগুড়ি” পোর্ট থাকতে হবে ভিসায়। যদি কারো ভিসায় এ পোর্ট উল্লেখ না করা থাকে, তবে ট্রেনে ভ্রমণের আগে অবশ্যই পোর্ট অ্যাড করে নিতে হবে। ভারতের ভিসা আবেদন প্রক্রিয়া এই পোস্টে আছে।
এই ট্রেনের ইমিগ্রেশন বাংলাদেশ অংশে ঢাকা ক্যান্টনমেন্ট স্টেশনে ও ভারতের অংশে নিউ জলপাইগুড়িতে সম্পন্ন হবে। তাই ট্রেন ছাড়ার অন্তত দুঘন্টা আগে এসে ইমিগ্রেশন শেষ করে রাখতে হবে। ট্রেনের টিকেট ভিসা সহ মূল পাসপোর্ট দেখিয়ে ঢাকার কমলাপুর বা চট্টগ্রাম রেলস্টেশন থেকে সংগ্রহ করতে হবে। যাত্রার ৩০ দিন আগের টিকেট কাটা যাবে। ১-৫ বছরের শিশুদের টিকেট মোট ভাড়ার ৫০ শতাংশ নেয়া হবে।
সিকিমে দেখার মতো অনেক কিছুই আছে। সমস্যা হচ্ছে ট্রেনে যারা সিকিম দেখতে চান, তাদের যদি চেংড়াবান্দা পোর্ট অ্যাড করা না থাকে, তাহলে ট্রেনেই ফিরতে হবে। সেক্ষেত্রে ট্রেনের তারিখের সাথে মিলিয়ে ভ্রমণ পরিকল্পণা তৈরী করতে হবে। আপনি যদি বৃহস্পতিবার রাতের ট্রেনে নিউ জলপাইগুড়ি যান এবং বুধবার সকালের ট্রেনে ফিরে আসেন সেক্ষেত্রে শুক্রবার থেকে মঙ্গলবার পর্যন্ত সিকিম ঘুরে দেখতে পারবেন। ভ্রমণ পরিকল্পণা হতে পারে এমন:
প্রথম দিন (বৃহস্পতিবার): রাত ৮ টার মধ্যে ঢাকা ক্যান্টনমেন্ট স্টেশনে চলে আসা, ইমিগ্রেশন শেষ করে নিউ জলপাইগুড়ির উদ্দেশ্যে রওনা।
২য় দিন (শুক্রবার): নিউ জলপাইগুড়ি পৌছে ফিরতি ট্রেনের টিকেট করে রাখা। ব্রেকফাস্ট শেষ করে গ্যাংটকের উদ্দেশ্যে রওনা দেয়া। নিউ জলপাইগুড়ি স্টেশনে সিকিমের জন্য গাড়ি পাওয়া যায়। পথে রংপোতে ইনার লাইন পারমিট (আইএলপি) নেয়া এবং বিকেলের মধ্যে সিকিমের রাজধানী গ্যাংটক পৌছানো। বিকেলে এমজি মার্গে ঘোরাঘুরি ও ক্যাবল কারে সিকিম শহর দেখে আসতে পারেন। তবে সেদিনই লাচুংয়ের প্যাকেজ ঠিক করে রাখতে হবে।

৩য় দিন (শনিবার): সকালে লাচুংয়ের উদ্দেশ্যে রওনা দিবেন। পথে বেশ কয়েকটা ঝর্ণা ও ভিউ পয়েন্ট দেখে বিকেলে/সন্ধ্যায় লাচুং পৌছাবেন। রাতে লাচুংয়ে থাকা।
৪র্থ দিন (রবিবার): সকালে ব্রেক ফাস্ট করে ইয়ামথাং ভ্যালী চলে যাবেন। অনুমতি পেলে জিরো পয়েন্ট ঘুরে আবার লাচুং এসে দুপুরের খাবার খেয়ে গ্যাংটকের উদ্দেশ্যে রওনা। পথে বেশ কিছু ঝর্ণা দেখে গ্যাংটকে আগের হোটেলে এসে উঠবেন। সাধারণত পর্যটকরা লাচুং যাবার সময় তাদের মূল লাগেজ গ্যাংটকের হোটেলেই রেখে যায়, আর শুধুমাত্র তীব্র শীতের কাপড়-চোপড় নিয়ে লাচুং যায়। রাতের তাপমাত্রা এখানে মাইনাসেও থাকতে পারে।

পঞ্চম দিন (সোমবার): সকালে উঠে চলে যেতে পারেন ছাংগু লেকে। সেখানে ক্যাবল কার দিয়ে উপর থেকে বরফে ঢাকা ছাংগু লেক দেখতে পারবেন। অনেকেই সেখান বিশালদেহী ইয়াকেও চড়েন। দুপুরের মধ্যে ফিরে আসলে গ্যাংটক শহরের আশেপাশের বাংজাখরি ওয়াটারফলস, অর্কিড গার্ডেন, তাশি ভিউ পয়েন্ট দেখে আসতে পারেন।
ষষ্ঠ দিন (মঙ্গলবার): সকালে ব্রেকফাস্ট সেরে সোজা শিলিগুড়ি। ট্রেন যেহেতু পরের দিন সকালে সেহেতু সকাল বেলা গ্যাংটক থেকে রওনা দিয়ে ট্রেন ধরার ঝুকি নেয়া যাবেনা। এছাড়া আপনার সঙ্গের লোকজন কিছু না কিছু শপিং করতে চাইবেই! আর যদি মনে করেন এ দিনটাও সিকিমে থাকবেন, সেক্ষেত্রে পেলিং ঘুরে বিকেলে চলে যেতে পারেন শিলিগুড়ি। রাতে শিলিগুড়ির কোন হোটেলে থাকবেন।

সপ্তম দিন (বুধবার): সকাল ১১:৪৫ এ ট্রেন হলেও দশটার আগেই থাকতে হবে নিউ জলপাইগুড়ি স্টেশনে। তাই সেদিন কোন পরিকল্পণা না রেখে ব্রেকফাস্ট সেরে সোজা নিউ জলপাইগুড়ি স্টেশনে উপস্থিত হবেন।
খরচ: কত জনের দল সেটার উপর খরচ অনেকাংশে নির্ভর করে। সিকিমের জন্য ৬-৭ জন কিংবা এর গুণিতক হলে খরচ কমানো যায় ভালো। সড়কপথের চেয়ে ট্রেনের খরচ বেশি পড়ে, কারণ টিকেটের দামই প্রায় তিনগুণ। বাজেট ট্রিপে জনপ্রতি ২০-২২ হাজার টাকা খরচ হবে। মোটামুটি লাক্সারি ট্রিপ হলে ৩০ হাজার টাকার মতো পড়বে জনপ্রতি। ট্রেনের প্যাকেজ ভ্রমণগুরু থেকে নিতে চাইলে তারিখ ও দলের সংখ্যা উল্লেখ করে পেইজে মেসেজ করুন।
ফিচার ছবি: প্রণেশ দত্ত
ভ্রমনগুরু your travel adviser
One comment
Pingback: মিতালী এক্সপ্রেস: ঢাকা-নিউ জলপাইগুড়ির ট্রেনের বিস্তারিত - ভ্রমনগুরু