গত সপ্তাহের কথা। তিনদিনের বন্ধের শুরুতে প্রস্তাবটা পেলাম এক বন্ধুর কাছ থেকে। রাতে নতুন স্টিমারে করে যাবে চাঁদুপর, সেখান থেকে মধ্যরাতের রকেট স্টিমার ধরে খুব ভোরে আবার ঢাকায়। প্রস্তাবটা খুব মনে ধরলো, কিন্তু ১৩ তারিখে ভারতের ভিসা জমা দিতে যেয়ে এত ক্লান্ত হয়ে পড়েছিলাম আর যেতে পারিনি। পরের দিন যেটা শুনলাম সেটার জন্য মোটেও প্রস্তুত ছিলাম না। আর চলছেনা কমলা রকেট খ্যাত শতবর্ষী স্টিমার। আমার বন্ধুরা যেতে না পেরে সদরঘাটেই ইফতার করে ফিরে এসেছে। তবে কি বাংলাদেশে অবসান হলো রকেট স্টিমারের?

চলছেনা বললে আসলে একটু কম বলা হয়, চিরতরেই বন্ধ হয়ে গেছে এ সার্ভিস। অবশ্য অনেকদিন থেকেই এ আশংকাটাই করছিলাম, যে কোন সময় বন্ধ হয়ে যেতে পারে এ সার্ভিস। অনেক দিন ধরেই ধূকছিলো সার্ভিসটি। বাংলাদেশের পর্যটনের অন্যতম পথিকৃত প্রয়াত মাহমুদ ভাই আন্তর্জাতিক ব্লগগুলোতে অনেক লেখালেখি করে বিদেশি পর্যটকদের কাছে বাংলাদেশি পর্যটনের আইকন হিসেবেই প্রতিষ্ঠা করেছিলেন এই প্যাডেল স্টিমারগুলোকে।
সারাবিশ্বে জনপ্রিয় পর্যটকদের গাইড বই “লোনলি প্ল্যানেট” রকেট স্টিমারকে বাংলাদেশের অন্যমত সেরা আকর্ষণ হিসেবে বর্ণনা করেছিলো। সে সময় নিয়মিত বিদেশি পর্যটকদের দেখা যেতো এ জাহাজে। কারণটাও স্বাভাবিক, সারা পৃথিবীতে আর কোথাও যে চলছেনা এ জাহাজগুলো। কিন্তু লাভ তো দূরে থাক অনেক বছর থেকে তেলের খরচটাও টিকেট বিক্রির টাকা থেকে তুলতে পারছিলনা বাংলাদেশ অভ্যন্তরীন নৌ-পরিবহন করপোরেশন।

প্যাডেল স্টিমার বা রকেট সার্ভিস, যে নামেই ডাকেন, এর ইতিহাস জানতে হলে ফিরে যেতে হবে বৃটিশ আমলে। অবিভক্ত ভারত উপমহাদেশে কলকাতা থেকে ঢাকায় জলপথে যোগাযোগের জন্য ১৯২৮ সালে নির্মিত হয় পিএস মাহসুদ। কলকাতার গার্ডেন রিচ ওয়ার্কশপে তৈরী করা এ স্টিমারটি ১৯৯৫ সালে পুণরায় সংস্কার করে নারায়ণগঞ্চের ডকইয়ার্ড ও ইঞ্চিণিয়ারিং ওয়ার্কশপ। পরের বছর ১৯২৯ সালে নির্মাণ করা হয় পি এস অস্ট্রিচ যেটা ১৯৯৬ সালে পুণরায় সংস্কার করা হয়।

এছাড়া পি এস লেপচা (১৯৩৮), পি এস টার্ন (১৯৫০), এম ভি শেলা (১৯৫১) নামের আরো তিনটি স্টিমার ঢাকা খুলনার মধ্যে নদীপথে চলাচল করতো। রকেট সার্ভিস বলতে বুঝাতো ঢাকা থেকে খুলনা এ ধরণের প্যাডেল স্টিমারে যেয়ে তারপর ট্রেনে করে কলকাতা পৌছানো। সেসময় সবচেয়ে দ্রুততম উপায়ে কলকাতা পৌছানোর পদ্ধতি ছিলো এটিই। দ্রুততার জন্যই রকেট সার্ভিস নামে খ্যাত এসময় এসে পরিচিত হয় মন্থর গতির জন্য। ১৯৬৫ সালে ভারত-পাকিস্তান যুদ্ধের সময় বন্ধ হয়ে যায় খুলনা কলকাতার এ সার্ভিস। তবে ৫২ বছর পর, ২০১৭ সালে বন্ধন এক্সপ্রেস নামে আবার চালু হয় খুলনা-কলকাতা ট্রেন।

ঢাকা-খুলনা রুটে নাব্যতার সংকটের জন্য অনেকদিন ধরেই চলছেনা এ জাহাজগুলো। সর্বশেষ খুলনা গিয়েছিলো ২০১৯ সালের ২০ এপ্রিল। সে সময় আমি খুলনা থাকতাম বলে মাঝে মাঝেই আমার বন্ধুর রকেট স্টিমারে চড়ে হাজির হতো আমার বাসায়। এরপর শুধু ঢাকা থেকে বাগেরহাটের মোড়লগঞ্জ পর্যন্ত চলতো এ স্টিমার। তারপর করোনায় সময় বন্ধ হয়ে যায় এ সার্ভিস। বিআইডব্লিউটিসির নতুন দুটি স্টিমার এমভি বাঙালী ও এমভি মধুমতি এ রুটে চলতে শুরু করলেও চলেনি প্যাডেল স্টিমারগুলো। অবশেষে প্রায় ২ বছর পরে এ মাসের শুরুতে সার্ভিসে ফিরে আসে পি এস মাহসুদ।

সন্ধ্যা সাড়ে ৬ টায় লালকুঠি ঘাট থেকে ছেড়ে মোট আটটি জায়গায় থেমে পরের দিন দুপুর নাগাদ মোড়লগঞ্জ পৌছাতো এ জাহাজ। শতবছরের ঐতিহ্যবাহী এ স্টিমারে বেশিরভাগ লোকজন শখ করেই চড়তো। বন্ধ হবার পেছনে বেশি কয়েকটি কারণ রয়েছে বলে সংশ্লিষ্টরা মনে করেন। সদরঘাটে বেসরকারী জাহাজগুলোতে একই রুটে যাত্রীর অভাব হয়না, তাহলে রকেট সার্ভিসে কেন হয়না?
প্রথমত যাত্রার সময় ৬:৩০ এ যাত্রার সময় নির্ধারণ করা হয়েছে, যেখানে অন্য লঞ্চগুলো ছাড়ে আরো পরে, রাত ৮ টা থেকে ৯ টার মধ্যে। অনেকেই কাজ শেষ করে একটু দেরীতে রওনা দিতে চান, সেজন্য এ লঞ্চে যাওয়ার উপায় থাকেনা। আবার মন্থর গতিও একটি কারণ। আশির দশকের আগে কয়লা দিয়ে চললেও এর পরে ডিজেল ইঞ্জিণ সংযোজন করা হয় রকেট স্টিমারগুলোতে। কিন্তু তারপরও ধীর গতির এ জাহাজগুলো মোড়লগঞ্জ পৌছে দুপুর ২ টার দিকে, যেখানে অন্য জাহাজগুলো ভোরেই পৌছে যায়।
রকেট স্টিমারগুলো টিকেট বিক্রি থেকে আয় হয় মাত্র আড়াই লক্ষ টাকা, যেখানে শুধু জ্বালানী তেলের খরচই হয় হয় চার থেকে সোয়া চার লাখ টাকা। ফলে প্রতিটি ট্রিপেই বড় অংকের লোকশান গুনতে হচ্ছে বিআইডব্লিউসিকে। এছাড়া এ জাহাজের কেবিন বুকিং ও টিকেটিং ঝামেলা মনে করে নিয়মিত যাত্রীরা। যার ফলে আশানুরূপ যাত্রী পাওয়া যাচ্ছিলনা অনেকদিন ধরেই। এমভি গাজী ও পি এস অস্ট্রিচ কে ইতিমধ্যেই দীর্ঘমেয়াদী লিজ দিয়ে দেয়া হয়েছে। যার ফলে এগুলোর আর সার্ভিসের ফেরার সম্ভবনা নেই। বাকি চারটিরও মেরামত কাজ চলছে দীর্ঘদিন ধরে।

প্যাডেল স্টিমার বন্ধ হয়ে গেলেও চালু থাকছে বিআইডব্লিউটিসির অন্য দুটি জাহাজ এমভি বাঙালী ও এমভি মধুমতি। রুট হচ্ছে ঢাকা – চাঁদপুর – বরিশাল – ঝালকাঠি – কাউখালী – হুলারহাট – চরখালী – বড় মাছুয়া (মঠবাড়িয়া) – সান্ন্যাসি – মোড়লগঞ্জ। হঠাৎ করেই রকেট সার্ভিস বন্ধ হওয়ার খবরে বাংলাদেশের অনেক ট্রাভেলারই দু:খ পেয়েছেন। অনেকেরই বাকেট লিস্টে রয়েছে ঢাকা থেকে শতবর্ষী এ স্টিমারে একবার অন্তত মোড়লগঞ্জ যাওয়া। দুধের স্বাদ ঘোলে মিটানোর জন্য হয়তো তাদের অনেকেই বেছে নিবেন এমভি বাঙালী বা এমভি মধুমতিকে।
ফিচার ছবি: এম কায়সার হোসেন
ভ্রমনগুরু your travel adviser
বেশ খারাপ লাগছে এ শুনে যে শত ইতিহাসের সাক্ষি স্টিমার গুলোকে আর দেখা যাবেনা বুড়িগংগা নদীর বুকে, কারন হিসেবে শোনা যায় মেইনটেইনেন্স খরচ অনেক বেশি, লোকশান ইত্যাদি, এখন যদি সরকার সংক্লিস্টজনরা সদয় হোন এগুলোকে মেরামত করে পর্যটকদের জন্য উন্মুক্ত করে দিতে পারে বা হতে পারে কোন রেস্তোরাঁ আবাসিক হোটেল বা অফিস বা হতে পারে ফ্লোটিং জাদুঘর।
অন্তত একটা বিদায়ী ট্রিপ চাই আমরা। আলোচনা করবো বিআডব্লিউটিসির সাথে
আপনার তথ্যে অনেকগুলো ভুল রয়েছে। যেমনঃ
১। আপনি উল্লেখ করেছেন ” কিন্তু তারপরও ধীর গতির এ জাহাজগুলো মোড়লগঞ্জ পৌছে দুপুর ২ টার দিকে, যেখানে অন্য জাহাজগুলো ভোরেই পৌছে যায়” এটা আপনার ভুল তথ্য। কারন স্টীমারের সাথে বা ঢাকা থেকে কোন লঞ্চ বা জাহাজ মোড়লগঞ্জ যায় না। জানিনা মোড়লগঞ্জে কোন জাহাজগুলো ভোরে পৌছায়। যেটা আপনার জানার ভুল। মোড়লগঞ্জে শুধুমাত্র স্টীমার যায়।
২। এছাড়া আপনি লিখেছেন ” এমভি গাজী ও পি এস অস্ট্রিচ কে ইতিমধ্যেই দীর্ঘমেয়াদী লিজ দিয়ে দেয়া হয়েছে। ” এটাও আপনার ভুল আছে। পিএস গাজী হবে এমভি গাজী নয়। আর পিএস গাজী স্টীমার ১৯৯৮্/১৯৯৯ সালে নারায়নঞ্জ ডকইয়ার্ডে মেরামত করার সময় আগুনে সম্পূর্ন ভস্মীভূত হয়ে যায়। আর পি এস অস্ট্রিচ ২০১৯ সালে লিজ দেওয়া হয়েছে।