নড়াইলের পথে ঘাটে: সুলতান কমপ্লেক্স

সুলতান কমপ্লেক্স ঢোকার আগেই পথরোধ করে দিল ট্রাফিক। এখানে মেলা আর নৌকা বাইচ দেখার জন্য মানুষের ভিড়ের কারণে রাস্তা বন্ধ রেখেছ। তো বাকিটা পথ পদব্রজেই ভরসা। পদ যুগলদ্বয়কে ভরসা রেখে হাঁটা শুরু করলাম। মূলত বাধা ঘাটকে ঘিরেই নড়াইল শহরের বিনোদন। কিন্তু সেই বাধাঘাটা খুঁজতে গিয়ে যে চৌদ্দ ঘাটের পানি খেতে হয়েছে সে কথা না হয় সামনের জন্য জমিয়ে রাখি।

হাঁটা পথেই পেলাম নিশিনাথ তলা। হিন্দুদের একটি পবিত্র ধাম। এখানে এসে রাজা সীতারাম রায় যেন আমাদের পিছু ছাড়ছে না। কারণ তিনশ বছর পুরানো এই ধামটি প্রতিষ্ঠা করেন ভূষণা রাজ সীতারাম রায়। এখানে দূর্গা পূজা বা বিভিন্ন অনুষ্টান উপলক্ষ্যে মেলা বসতো, তখন আলোক সজ্জায় সজ্জিত হয় এই ধাম আর কর্ম চঞ্চলতা দেখা যায় বাধা ঘাটে। সে যাই হক দু একটা টুকটাক ছবি তোলার পর রওনা হলাম আমাদের মূল গন্তব্যে।

সেই নিশিনাথ তলা মন্দির। ছবি: লেখক

নিশিনাথ তলা থেকে একটু সামনে বাড়িয়ে দেখতে পেলাম একটা দিক নির্দেশনা বোর্ড। সেখান থেকে ধারনা পেলাম কোন দিকে যেতে হবে। মূল রাস্তা থেকে বাম দিকে কিছু দূর যেতেই দৃষ্টি সীমানার ভিতর এসে পড়লো সুলতান কমপ্লেক্সের মূল গেট। একটু দূর এগিয়ে ডান দিকে দেখতে পেলাম একটি ভবন। নামটাও খুব সুন্দর শিশুস্বর্গ। এইটা বরেণ্য শিল্পীর শিশুদের জন্য প্রতিষ্টিত আর্ট স্কুল। মানুষ চিরকালের জন্য বিদায় নিতে পারে পৃথিবী থেকে কিন্তু তার কর্ম চিরদিনের জন্য অমর হয়ে থাকে।

বরাবর দেখতে পেলাম কমপ্লেক্সের গেট। আজ বেশ ভিড়। দশ টাকা দিয়ে টিকেট কেটে ভিতরে ঢুকলাম। না ঢুকলেই হয়তো ভাল ছিল। বরাবর গিয়ে প্রথমেই চোখে পড়লো এস এম সুলতানের সমাধি। সেখানে বসে আছে কিছু পাংকু যুবক। কবরে বসে সেলফি তোলা কি নতুন ট্রেন্ড হয়ে গেল! এ রকম দূষিত ট্রেন্ড সমাজের কতটুকু উপকার করছে। এর আগে বীরশ্রেষ্ঠ মোস্তাফা কামালের কবরেও দেখেছি সেলফি তুলতে। সম্মান করতে না পারি অন্তত অসম্মানটা তাঁদের প্রাপ্তি না।

নিশিনাথ তলা। ছবি: লেখক

কবরের পাশেই তার ছবিযুক্ত একট ফলক দেখতে পেলাম। এখানে তো ছবি তুলাই যায়। চিত্রা নদীর পাড়ে মাছিমদিয়া গ্রামেই শিল্পির শেষ ঠিকানা। এখানেই চির নিদ্রায় শায়িত আছেন বাংলাদেশের অন্যতম সেরা চিত্রকর। প্রায় ২৭ একর জমির উপর এই কমপ্লেক্সের অবস্থান। দুর্লভ প্রজাতির বৃক্ষের মাঝে ক্ষণে ক্ষণে ডাক দেয় কোন উদাসি পাখি। চির তরুণ, চির সবুজ শিল্পীর শেষ ঠিকানাও যে সবুজের মাঝে হবে সে তো আর বলতে হয় না। মন ভুলানো পরিবেশ। ছবিয়াল কবির সমাধি সৌধের একটু সামনেই দেখা যাচ্ছে তার আদি বাসস্থানের কিয়ৎ অংশ।

এর পিছনেই লাল সিরামিকে মোড়া দ্বিতল ভবন। এই জাদুঘরেই রাখা হয়েছে এস এম সুলতানের চিত্রকর্ম ও ব্যবহার্য জিনিষপত্র সমূহ। দুর্লভ সব চিত্রকর্মগুলো যেন আমাদের লোভাতুর ভাবে হাতছানি দিয়ে ডাকছে। সে ডাক সারা না দিয়ে কি উপায়। দশ টাকা দিয়ে টিকেট যে কেটে ফেলেছি। তবে মাঝে মাঝে কিছু ডাকে সাড়া না দিলেই বোধ হয় ভাল। কারণ ভিতরে ঢুকে যতটা তার চিত্রকর্ম দেখে বিষ্মিত হয়েছি তত অবাক হয়েছি তথাকথিত শিক্ষিত মানুষের কার্যক্রম দেখে।

সুলতান কমপ্লেক্সের গেটে। ছবি: লেখক

প্রথম তলায় শিল্পির ব্যবহার্য জিনিষের সাথে আছে তার চিত্রকর্ম। জয়নুল যেমন দুর্ভিক্ষের ছবি এঁকেছেন সুলতানের তুলিতে উঠে এসেছে মানব সভ্যতা। আহা রঙতুলির জাদুকর, ছবিয়াল কবি তুমি কি তুলে ধরেছো তোমার তুলিতে মানব সভ্যতার আগ্রাসন। তুমি যে যাযাবর, বোহেমিয়ান, নিভৃতচারি। নিজের খোলসে বন্দি থেকে তুমি কি শুনিয়েছিলে মানব সভ্যতার গান।

তোমার ছবিতে ফুটে উঠে মানব সভ্যতা, উঠে আসে গ্রামীণ জীবনের খুনসুটি। তোমার ছবিতে কথা কয় ওই গ্রামের কৃষাণ, কথা কয় কৃষাণে বধু, আমি যে নিরবে চেয়ে রই শুধু। তুমি কি সেই বহেমিয়ান লাল মিয়া, তুমি কি সেই চিত্র সাধক এস এম সুলতান। সুলতানের আদি ও ডাক নাম লাল মিয়া। আর লালা মিয়ার জীবনের সুর যে গাথা ছিল গ্রামীণ জীবন, কৃষক ও কৃষিকাজের ছন্দে। লাল মিয়া তার জীবনকে এক রঙের ভিতর বন্দী রাখেনি সে তার জগৎতে প্রবেশ করেই বুঝলাম।

টালি পাথরে এস এম সুলতান। ছবি: তামান্না আজমি

প্রথম তলা থেকে দোতলায় গেলাম সে একই সভ্যতা, গ্রামীণ ও কৃষিকাজের প্রতিচ্ছবি পেলাম। তিনি যেন এর মাঝেই খুঁজে পেয়েছেন আমাদের শেকড়ের সন্ধান। তাঁর ছবিতে কৃষক দুর্বলদেহী নয়, নয় জোতদারের শোষণের স্বীকার। তার ছবিতে ফুটে উঠে পেশীবহুল ও বলশালী কৃষক পুরুষ। কৃষক রমণীর কোমলতা, লাবণ্যের মাঝে তার রঙ তুলিতে ফুঁটে উঠেছে সুঠাম ও সুডৌল গড়নে। আদিকালে মানব সভ্যতা তো গড়ে উঠেছিল কৃষিকাজের উপর নির্ভর করে। তাঁর সব ছবিগুলো যেন একটা সাথে আর একটা একই সুতায় গাথা।

কৃষি বিপ্লব দিয়েই তো সভ্যতার শুরু। কৃষি জমি আবাদ করে ভারতবর্ষ, চিন, মেসাপটেমিয়া, ব্যাবিলনের সভ্যতার ঝংকার শুনেছিল বিশ্ব। মানব ইতিহাসের শুরুই যেন লাল মিয়ার তুলিতে ফুটে উঠেছে। ইতিহাসের কালজয়ী নায়ক এই কৃষকরাই সুলতানের জলরঙের তুলিতে মাটি ফুড়ে যেন উঠে এসেছে। সেজন্যই তো এস এম সুলতানের চিত্রকর্ম শুধু বাংলাদেশের সম্পদই নয়, এ যে বিশ্ব সম্পদ।

সুলতানের তুলিতে গ্রামীণ বাংলার চিরাচরিত দৃশ্য। ছবি: তামান্না আজমি

আর সুলতানের সাথে আহমদ ছফার সম্পর্কের কথা তো উঠে এসেছে যদ্যপি আমার গুরু গ্রন্থে। কি আম্লান মধুর সম্পর্ক ছিল লাল মিয়া আর ছফার মধ্যে। তাই তো আহমদ ছফা লেখায় সুলতানের চিত্রকর্ম নিয়ে উঠে এসেছে। সেখান থেকেই উদ্ধৃতি নিয়ে… ‘প্রকৃতি ফুটন্ত ইতিহাসের গভীরতম অঙ্গীকার যারা নিরবধিকাল ধরে বহন করে চলেছে, নতুন ফুটন্ত ইতিহাসের আবেগ-উত্তাপ সবটুকু পান করে ফুটে উঠবার বীর্য এবং বিকাশমান সৃষ্টিশীলতা যাদের আছে। সেই শ্রমজীবী কিষাণ জনগণকে তিনি বাংলার ইতিহাসের নবীন কুশীলব হিসেবে দেখতে পেয়েছিলেন। সুলতানের কৃষক নেহায়েত মাটির করুণার কাঙ্গাল ছিলেন না। সুলতানের কৃষকেরা জীবনের সাধনায় নিমগ্ন। তারা মাটিকে চাষ করে ফসল ফলায় না। পেশীর শক্তি দিয়ে প্রকৃতির সাথে সঙ্গম করে প্রকৃতিতে ফুলে-ফসলে সুন্দরী সন্তানবতী হতে বাধ্য করে। এখানে জীবনের সংগ্রাম এবং সাধনা, আকাঙ্ক্ষা এবং স্বপ্ন, আজ এবং আগামী কালের একটি বিন্দুতে এসে মিশে গিয়েছে।”

সাইনবোর্ড। ছবি: তামান্না আজমি

ওয়াফি আমি ঘুরে ঘুরে দেখছি আর সুলতানের ভুবনে হারিয়ে যাচ্ছি। উনার আকার কনসেপট যেখানে আমরা বুঝার চেষ্টা করছি অন্য দিক দিয়ে ছবি পাগলা, সেলফি ভোলা দর্শক ভুলে গেছে জাদুঘরের নিয়ম। তাদের ঠুসঠাস ছবি তোলা সুখকর হচ্ছে না। কারণ কিছুক্ষন পর পর এসে জাদুঘরের কর্মীরা ঠাটিয়ে গাল পেরে যাচ্ছে। এরপরও কি নিয়মের প্রতি শ্রদ্ধা দেখাবে বাঙালি অবশ্যই নয়। এই বিরল প্রতিভার প্রতি মানুষের এ রকম অসম্মান দৃষ্টিকটু এবং জাদুঘরে আসলেই বুঝা যায় জাতি হিসাবে বাঙালি কতটা শিক্ষিত। শিক্ষার আলো এখন ঘরে ঘরে তবুও আমরা কতটুকু শিক্ষিত হতে পেরেছি।

সুলতান ভালবাসতেন বাংলার খেটে খাওয়া মানুষদের। সেই খেটে খাওয়া মানুষের জীবনের প্রতিফলনই তো দেখিয়েছেন তার ছবিতে। তার ছবিতে কৃষক অভিজাত ব্যক্তি। হয়তো জলরঙের জাদুকর তার দৃষ্টিতে দেখা সমাজের কষাঘাতে ম্রিয়মান, জোতদারের অত্যাচারে দুর্বলদেহী কৃষককে জল রঙের কল্পনায় নির্মাণ করেছেন শক্তিশালী ও স্বাস্থ্যবান কৃষক হিসাবে। এমন বহেমিয়ান সত্তার ছবিতে বৈষম্য, গ্রামীণ জীবণের কঠিন বাস্তবতার চিত্র কেন ফুটে উঠবে না। তাঁর আঁকা চরদখল (১৯৭৬) ও হত্যাযজ্ঞ (১৯৮৭) এরকমই দুটি ছবি।

এস এম সুলতানের বজরা। ছবি: তামান্না আজমি

আবহমান বাংলার চির সবুজ, সতেজ প্রকৃতিকে ভালোবাসতেন এস এম সুলতান। ভালবাসতেন পশু পাখি বনের সাপখোপ। দুর্বার এক বোহেমিয়ান লাল মিয়া ছিলেন শিশুদের অকৃত্রিম বন্ধু। চিত্রা নদীর পাড়ে গড়ে উঠা শিশুস্বর্গ আর তার বাড়ির পাশে নদীর ঘাটে রাখা ভাসমান বজরাটি  এখন স্মৃতি হিসাবে আছে শিশুদের জন্য তার বন্ধুত্ব ও ভালোবাসার। সুলতান শিশুদের ছবি আঁকানো শিখানোর জন্য নদীতে তৈরি করেছিলেন বজরা ‘শিশু স্বর্গ’ । শিল্পীর তৈরি সেই শিশুস্বর্গটি কমপ্লেক্সের পাশেই চিত্রানদীর ধারে সংরক্ষণ করা হয়েছে।

সুলতানের সাথে বড় শিশু ওয়াফি। ছবি: লেখক

দেখতে দেখতে সুলতানের ভুবন থেকে যাবার সময় ঘনিয়ে এল। দিনের আলোর আর ছিটেফোঁটা বাকি। এখন দেখা বাকি বাধাঘাট, পুলিশ লাইনের সাথে ঘেষা সেই জমিদার বাড়ি। তাই সময়ক্ষেপণ না করে বের হয়ে গেলাম আমরা।

আমার পুরানো ভ্রমণ গল্পগুলো পড়তে চাইলে নিচের লিংকে চলে যান:
https://www.vromonguru.com/author/ashik/

আমার গল্প, কবিতা, প্রবন্ধ পড়তে চাইলে ঘুরে আসতে পারেন আমার ফেসবুক পেজ থেকে:
https://www.facebook.com/sarwar.ashik786

এর বাহিরেও আমাদের নিজস্ব ভ্রমণ গ্রুপ শেকড় সন্ধানীর মাধ্যমে নিয়মিত এ রকম বাংলার পথে ভ্রমণের আয়োজন করা হয়। ইচ্ছা থাকলে পাঠক আপনিও হতে পারেন আমাদের পরবর্তী ভ্রমণের সঙ্গী। আমাদের সাথে যোগাযোগের বিস্তারিত নিচে দেয়া হলো।

Roots Finder – শেকড় গ্রুপের সাথে থাকুন:
https://www.facebook.com/groups/459880764416865/

Roots Finder – শেকড় পেজ লিঙ্ক:
https://www.facebook.com/rootsfinder.bd/

শেকড় সন্ধানী দলের এডমিনদের নাম্বার:
ঈসমাইল হোসেন – ০১৭৫৬১৭১৫৭০
আশিক সারওয়ার – ০১৮৬৬৬৬৩৪২৩
শরীফ জামান – ০১৫৩৫৪৫৩৯৭৭

ঘুরেন দেশের পথে, খুঁজে ফিরুন নিজের শেকড়।

ফিচার ইমেজঃ তামান্না আজমি।

About Ashik Sarwar

Check Also

রত্নদ্বীপ রিসোর্টঃ বাজেট ট্রাভেলারদের থাকার সঙ্গী

আমি দু’পয়সা আয় করা মানুষ৷ মাস শেষে যা আসে তার বেশিরভাগই পরিবারের খরচের খাতায় চলে …

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *