রিভিউ: কর্ণফুলী এক্সপ্রেসে সেন্টমার্টিন ভ্রমণ

বেশ কয়েকদিন ধরে শুনছিলাম কথাটা। বড় বড় সব ট্রাভেল গ্রুপেই দেখা যাচ্ছিলো পোস্ট, কিছুতেই কর্ণফুলী এক্সপ্রেসে যাওয়া যাবেনা। রোলিং হয় খুব, সবাই বমি করে পুরো জাহাজ ভাসিয়ে দেয়, বাথরুমের আশেপাশে যাওয়া যায়না, খাবারের মান খুব খ্রাপ, অনেক সময় লাগে। রোলিংয়ের কথা শুনেই ভাবলাম যাই একবার দেখেই আসি জাহাজটা কেমন রোলিং করে।

যে ভাবা সেই কাজ, পেয়ে গেলাম আরো আমার কয়েকজনকে। ফলাফল রওনা দেবার দিন দেখা গেলো আমরা ৮ জন হয়ে গেছি। ঢাকা থেকে কক্সবাজার যাওয়ার জন্য আমার এখন পছন্দ সেন্টমার্টিন হুন্দাই সার্ভিস। সেটাতে করেই ১৫ অক্টোবর রাতে রওনা দিলাম। জাহাজ ছাড়ে সকাল ৭টায়, তাই ঝুকি না নিয়ে রাত ৮ টায় টিকেট কাটলাম।

ভোর পাঁচটায় পৌছে গেলাম নুনিয়ার ছড়া ঘাটে ছবি লেখক

বাসের ভাড়া ১,৬০০ টাকা, বিজনেস ক্লাস টিকেট। আমাদের অবাক করে দিয়ে ৫ টার আগেই বাস পৌছে গেলো কলাতলী। কক্সবাজারে রাস্তাগুলোর কাজ চলছে, তাই কলাতলী সড়কের অবস্থা ভয়াবহ। একটা অটো ২৫০ টাকা দিয়ে ভাড়া করে আমরা পৌছে গেলাম নুনিয়ার ছড়া বিআইডব্লিউটিসির ঘাটে। রাস্তার অবস্থা ভয়াবহ খারাপ, অটো ড্রাইভারকে ধন্যবাদ দিলাম না উল্টে ঘাট পর্যন্ত আসতে পারায়।

এদিকে জাহাজের আলো জ্বলছে, কিন্তু লোকজন নেই বললেই চলে। জানালো ভোর ৬ টা থেকে বোর্ডিং শুরু হবে, আপাতত বাইরে ঘোরাঘুরি করতে হবে। আস্তে আস্তে লোকজন বাড়তে থাকলো। সকাল ৬টায় তো রীতিমতো ভিড় হয়ে গেলো। ঘাটের বাইরে একটা স্থানীয় হোটেলে নাস্তা সেরে নিলাম আমরা। এর মধ্যে দলের বাকি সদস্যরাও চলে আসলো চট্টগ্রাম ও ঢাকা থেকে।

নাস্তা করে টিকেট দেখিয়ে আমরা জাহাজে উঠে পড়লাম। কক্সবাজার থেকে সেন্টমার্টিন সরাসরি চলা কর্ণফুলী এক্সপ্রেস জাহাজ চালু হয়েছে এবছরের শুরুতে। কিন্তু ১৯ মার্চ থেকে করোনার কারণে দীর্ঘদিন বন্ধ থেকে আবার ১১ সেপ্টেম্বর ২০২০ থেকে চালু হয়েছে জাহাজটি। আমরা টিকেট কাটার সময় আমাদের এজেন্ট বলেছিলো গ্লাডিওলাসে টিকেট করতে।

গ্লাডিওলাসের সিটগুলো এমনই ছবি নিজাম উদ্দিন

জাহাজটির বিভিন্ন টিকেট রয়েছে। সর্বনিন্ম ছিলো মেরীগোল্ড আসা-যাওয়া ২,০০০ টাকা। আর গ্লাডিওলাসের ভাড়া ২,৫০০ টাকা। জাহাজের ২য় তালায় গ্লাডিওলাস ও লিলুক। আর নীচের তলায় রয়েছে মেরীগোল্ড। ৭ টায় যাত্রা করার কথা থাকলে জাহাজ ছাড়তে আরো ১০ মিনিট বেশি সময় লাগে। ছেড়ে দেবার সকালের বাতাসে বাকখালী নদী ধরে আমাদের যাত্রা শুরু হলো।

শান্ত নদী, ধীর লয়ে আমরা এগিয়ে চললাম। আগেই শুনেছিলাম এখন অনেক সময় লাগে সেন্টমার্টিন পৌছাতে, অন্তত ৭ ঘন্টা লাগছে, তাই সেরকম মানসিক প্রস্তুতি ছিলো। এর মধ্যে জোয়ার চলে এসেছে। নদী থেকে বের হবার পর জাহাজ হাল্কা দুলতে থাকলো। তেমন কোন ব্যপার না, কিন্তু তাতেই জাহাজে কয়েকজন বমি করলো। লিলুকে উঁকি দিয়ে দেখলাম অনেকে ফ্লোরেই বিছানা করে শুয়ে পড়েছেন।

বাকখালী নদীর মধ্যে শান্তই ছিলো পানি ছবি লেখক

সমুদ্রে পড়ার পর রোলিং সামান্য বাড়লো। জাহাজের ঘোষণা করা হলো বঙ্গোপোসগরে নিন্মচাপ থাকায় কিছু সময় জাহাজ দুলবে। এমন কিছু না, কিন্তু যারা নতুন জাহাজে চড়েছে তাদের তাদের একটু সমস্যা হচ্ছিল। এর মধ্যে ৯ টার সময় নাস্তা দিয়ে গেলো। নাস্তা মানে একটা ফ্রুট বনরুটি, একটা পেটিস আর ২৫০ এমএলের পানি। তার মধ্যে পেটিসটা সুস্বাদু ছিলো, কিন্তু বনটা খাবার মতো না।

১০ টা বাজার পর মোটামুটি বোর হয়ে গেলাম। দুলুনি আছে, তবে এমন কিছু না। তবে যারা মেরীগোল্ডে, মানে নীচতলায় তাদের অবস্থা বেশি খারাপ ছিলো। এ জাহাজে কোন জায়গায় যাওয়ার ব্যপারে বাধা নিষেধ নেই, বিশেষ করে সামনের অংশে সবাই এসে বসছিলো। দুলুনি বেশিক্ষণ সহ্য করতে না পেরে আবার নিজের জায়গায় ফিরে যাচ্ছিলো।

আমাদের পাশে তিনজনের একটা পরিবার ছিলো। ভদ্রলোক চমৎকার মানুষ। আমাদের সিট পাশাপাশি না থাকাতে উনাকে অনুরোধ করতে হয়েছিলো উনাদের সিট পেছানোর জন্য। সহজেই রাজি হলেন তারা। একটু পরে উনার স্ত্রী সামন্য সী সিকনেসে ভুগছিলো, তখন তাদেরকে আমাদের সাথে থাকা একদম সামনে বসা দম্পতির সাথে সিট বদলে দেই আমরা।

আমার এই তিন ট্রিপমেট বেশ আরাম করে ঘুমিয়েছে বেশির ভাগ পথ ছবি লেখক

কথায় কথায় জানতে পারলাম ভদ্রলোক মেরিনার, অথছ এতক্ষণ তাকেই আমি জাহাজ নিয়ে জ্ঞান দিচ্ছিলাম! মেরিনারকে জাহাজের/সমুদ্রের জ্ঞান দেয়া আর মার কাছে নানার বাড়ির গল্প করাতো একই। অবশ্য এ জাহাজে আমি আগেও অনেকবার উঠেছি ছোটবেলায়। সে হিসেবে একটু হলেও জানতাম কেমন। যাইহোক বেশ গল্পসল্প হলো।

এদিকে ১০ টা বাজার পর আর সময় কাটেনা আমাদের। আর কত সমুদ্র দেখবো? রোলিংও হচ্ছেনা, বিনোদনের অভাবে শেষ পর্যন্ত ঘুমাতে শুরু করলাম সিটে বসে। ঘন্টাখানেক ঘুমিয়ে ১২ টার দিকে উঠে আবার জাহাজের সামনের অংশে গেলাম। এবার দেখি ভিড় কমে গেছে অনেক, রোদ আর একঘেঁয়ে সমুদ্র দেখে সবাই যে যার সিটে চলে গেছে।

মেরিনার ভদ্রলোক আমাকে বললো কেউ যদি একবার এসি একবার জাহাজের খোলাডেকে যাতায়াক করে তার সমস্যা বেশি হবে। যে কোন এক জায়গায় থাকতে পারলে ভালো। তবে সমুদ্র যাত্রায় আপনি অভ্যস্ত হয়ে থাকলে কোনটাই কোন বিষয়না। ১২ টার একটু পর থেকেই সেন্টমার্টিন দেখা যাচ্ছিলো। দুপুর একটার কিছু আগে আমরা সেন্টমার্টিন ঘাটে এসে নামলাম।

যেটা বুঝলাম একমাত্র মেরিগোল্ডে মানে জাহাজের নিচতলায় যারা এসেছে তাদেরই কষ্ট হয়েছে বেশি। এছাড়া জাহাজের সমস্যা তেমন কিছু মনে হয়নি আমার কাছে। আর কারো যদি সী সিকনেসের সমস্যা থাকে তবে তার একটু সমস্যা হতে পারে। এক্ষেত্রে তার জন্য পরামর্শ হচ্ছে চুপচাপ সিটে বসে থেকে/ঘুমিয়ে সময় পার করা। সম্ভব হলে আগেই ডাক্তারের সাথে কথা বলে সী-সিকনেসের পিল সংগে নিয়ে যাওয়া।

দুপুর একটা নাগাদ সেন্টমার্নি জেটিতে পৌছে গেলাম আমরা ছবি লেখক

অক্টোবরেও সমুদ্রে নিন্মচাপ থাকতে পারে। সেক্ষেত্রে সমুদ্র আবার কিছুটা উত্তাল হতে পারে। জাহাজেই আমাদের সাথে থাকা অন্য একজন বললো দুদিন আগেই জাহাজ অনেক বেশি রোলিং করেছিলো, যাত্রীদের অনেকেই বমি করেছিলো। শীতে এ জাহাজ খুব আরামদায়ক হবে এতে কোন সন্দেহ নেই। সেন্টমার্টিনে শীত পড়েনা বললেই চলে, তবে জাহাজে অবশ্যই সঙ্গে জ্যাকেট রাখবেন (শীত পড়তে শুরু করলে)।

আরেকটা বিষয় মনে রাখবেন সমুদ্রপথে শরীর তাড়াতাড়ি ডিহাইড্রেটেড হয়ে যায়, তাই কিছুক্ষণ পরপর পানি খেতে থাকবেন। জাহাজটির সার্ভিসের কয়েকটি জায়গার উন্নয়ন দরকার মনে হয়। বিশেষ করে নাস্তাটা আরেকটু ভলো করা যায়। আর বাথরুম কিছুক্ষণ পরেই ব্যবহারের অনুপোযোগী হয়ে পড়ে। যদিও এতে যাত্রীদের দায়ভারই বেশি।

ফিচার ছবি লেখক

About Muhammad Hossain Shobuj

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের অর্থনীতি বিভাগ থেকে মাস্টার্স শেষ করে পরবর্তীতে আইবিএ থেকে এক্সিকিউটিভ এমবিএ করেছেন। বর্তমানে যুক্তরাষ্ট্রভিত্তিক একটি উন্নয়ন সংস্থায় কাজ করেন। লেখালেখিটা শখের কাজ, ঘোরাঘুরিও। এ পর্যন্ত দেশের ৬৩ টি জেলা ও ১২ দেশে ঘুরেছেন।

Check Also

সেন্ট মার্টিনে স্বল্প বাজেটে রাত্রিযাপন করবেন কোথায়

যদি প্রশ্ন করা হয় বাংলাদেশের সবচেয়ে সুন্দর জায়গা কোনটি? এই প্রশ্নের উত্তরে সেন্ট মার্টিন প্রথম …

2 comments

  1. হাসান মসফিক

    আমি ফেব্রুয়ারিতে আসা-যাওয়া করেছিলাম। আমার কাছে বেশ উপভোগ্য মনে হয়েছিল। সেদিন জাহাজে দিনব্যাপী কনসার্টও ছিল।

    • Muhammad Hossain Shobuj

      শীতকালেই বেশি উপভোগ্য হবার কথা। এসময়ে গরমে নিচতলার লোকজনের কষ্ট হচ্ছে বেশি মনে হয়

Leave a Reply

Your email address will not be published.