পায়ে হেঁটে রংপুর বিভাগ ঘুরে দেখা – ৪র্থ দিন।

ট্যাক্সের হাট (বদরগঞ্জ) – পার্বতীপুর – চিরিরবন্দর – দিনাজপুর – বীরগঞ্জ

( ৪১.৫৪ + ২৭.৩২) = ৬৮.৮৬ কিলোমিটার

গতকাল রাতে কেনো জানি ঘুম ই আসছিলো না। ঘুম আসার যে একটা লক্ষণ থাকবে, সেটাও ছিলো না। ফলাফল সাড়ে ১২টার মধ্যে ঘুমাতে গিয়েও, ঘুমাতে ঘুমাতে প্রায় ৩টা।

প্রথম দুইদিনের মতো এলার্মের আগে ঘুম থেকে উঠতে না পারলেও, আজকে এলার্ম বাজার সাথে সাথেই উঠে গেছি। উঠে ফ্রেশ হয়ে, রেডি হতে না হতেই আন্টি নাস্তা নিয়ে হাজির। আমি নাস্তা করতে করতে শাহনেওয়াজ ভাইও রেডি। আজকে ওনার দৌঁড়ের প্রশিক্ষণ আছে। উনি আমার সাথে হেঁটে আমাকে কিছুদূর এগিয়ে দিয়ে, দৌঁড়ে বাসায় আসবে, এটাই ওনার আজকের প্ল্যান। আমাদের সাথে শাহনেওয়াজ ভাইয়ের একজন ট্রেনিং পার্টনারও যাবেন। ওর নাম ইয়ামিন।

সকাল শুরু।

মেঘমুক্ত পরিষ্কার আকাশ থাকায়, নাস্তা শেষ করে – আন্টিকে বিদায় জানিয়ে শাহনেওয়াজ ভাইকে নিয়ে ওনাদের বাড়ি থেকে বের হলাম। ততক্ষণে ইয়ামিনও চলে এসেছে। ওরসাথে পরিচয় পর্ব শেষ করে বদরগঞ্জ – পার্বতীপুর – দিনাজপুর রোড ধরে তিনজন মিলে হাঁটা শুরু করলাম।

গল্প করতে করতে হাঁটছি, কথা হচ্ছে দৌঁড় আর সাইক্লিং এর অতীত, বর্তমান ও ভবিষ্যত নিয়ে। দুই পাশে সারি সারি আকাশমণি গাছওয়ালা একটা রাস্তা ধরে হাঁটছি। এই রাস্তাটাও বেশ সুন্দর। রাস্তার দু’পাশেই সবুজ ধানক্ষেত। বেশ কয়েকজন পুরুষ – মহিলাকে দেখলাম প্রাতভ্রমণ শেষ করে বাসায় ফিরছে। এদের বেশির ভাগই ডায়াবেটিসের রোগী। আকাশমণি গাছের মাঝে মাঝে অবশ্য খানিকটা দূরে দূরে পুরো রাস্তাজুড়ে বট গাছও দেখা যায়।

হাঁটতে হাঁটতে একটা বিশেষ জাল চোখে পড়লো। ইয়ামিনের কাছে শুনলাম এই জালের নাম হোসক জাল। এ জালের বিশেষত্ব হচ্ছে, ছোট ব্রীজ বা পুলে যেদিক থেকে পানির স্রোত যায় সেদিকে ব্রীজ বা পুলের পুরোটা মুখ জুড়ে জাল ছড়ানো থাকে। তারপর পিছনের দিকে আস্তে আস্তে সরু হতে থাকে। জালের শেষ প্রান্তে বাঁশের তৈরি একটা বিশেষ যন্ত্র থাকে, যেখানে মাছ ঢুকলে আর বের হতে পারে না।

নির্মল প্রকৃতির পথ ধরে এগিয়ে যাচ্ছি।

সারি সারি আকাশমণি গাছ ওয়ালা সুন্দর রাস্তাটা ধরে হাঁটা খুব বেশিক্ষণ স্থায়ী হলো না। রংপুর জেলা ছেড়ে আমরা দিনাজপুর জেলায় প্রবেশ করলাম। এরমানে, হাঁটতে হাঁটতে ইতোমধ্যে বদরগঞ্জ অতিক্রম পার্বতীপুরে প্রবেশ করেছি। পার্বতীপুরে ঢোকার মুখেই রাস্তার দুপাশের দুইটা লিচু বাগান আমাকে স্বাগত জানালো।

আরেকটু সামনে এগিয়েই একটা মাজার পেলাম। রাখাল পীরের মাজার নামেই সবাই জানে। এই মাজারের বিশেষ একটা দিক হচ্ছে, এখানে মাজারের মুসলমান খাদেমও আছেন – আবার হিন্দু পূজারীও আছেন। একদিকে নামাজ বন্দেগী হয়, আরেকদিকে পূজা। এখানে আলাদা আলাদা দানবাক্সও আছে। যার যে বাক্সে ইচ্ছা দান করে, ওনারা পরে একসাথে করে।

দিনাজপুরের লিচু বাগান।

আমরা একসাথে পাঁচ কিলোমিটার হাঁটা শেষ করেছি। এবার শাহনেওয়াজ ভাই আর ইয়ামিন আমাকে বিদায় জানিয়ে দৌঁড়ে চলে গেলো। আমি সামনের দিকে হাঁটা শুরু করলাম। গল্প করতে করতে হাঁটায় বেশ সময় লেগে গেছে। তাই একটু গতি বাড়িয়ে হাঁটার চেষ্টা করলাম। তবে, আমি এই চেষ্টায় ব্যর্থ হলাম। পার্বতীপুর পর্যন্ত এই রাস্তার সংস্কারের কাজ চলছে। পাথর বিছানো রাস্তায় গতি বাড়িয়ে হাঁটতে একটু কষ্ট হচ্ছিলো।

আগের গতিতেই হাঁটলাম। কিছুদূর যাওয়ার পর একটা জায়গায় অনেকগুলো হাঁস দেখলাম। বৃষ্টির নতুন পানিতে হাঁসগুলো খেলছে। একটা আরেকটাকে ডানা ঝাপটায় ভিজিয়ে দিচ্ছে। ওখানে কিছুক্ষণ দাঁড়িয়ে ওদের খেলা দেখে আবার হাঁটা শুরু করলাম। সামনে একটু দূরে একটা ব্রীজ দেখতে পেলাম ব্রীজটা অনেকটা কালকের ডালিয়া ব্রীজটার মতো। ব্রীজের দুই পাশেই চৌরাস্তা।

হাসের ঝাঁক।

এই পাথর বিছানো কষ্টকর রাস্তাটা যেনো শেষ ই হচ্ছিলো না। আস্তে আস্তে হেঁটে যখন পার্বতীপুরে পৌঁছালাম, তখন ঘড়ির কাটা ৮টা ছুই ছুই করছে। পার্বতীপুর বাজারের অধিকাংশ দোকান তখনও বন্ধ।

পার্বতীপুরে দেরি না করে, পার্বতীপুর থেকে দিনাজপুর রোড ধরে হাঁটা শুরু করলাম। এই আগের রাস্তাটার থেকে ভালো, কিন্তু আমি এরথেকেও ভালো রাস্তা আশা করছি। পার্বতীপুর বাজার থেকে বের হয়ে রাস্তাটা সোজা গিয়ে বাম দিকে গিয়েছে। রাস্তাটার এক পাশে সারি সারি আমগাছ,  আরেকপাশে ফাঁকা। আম গাছের সারির মাঝের গ্যাপে গ্যাপে ময়লার স্তুপ। বিষয়টা খুবই বেমানান লাগছিলো।

যাইহোক, সেখান থেকে হাঁটা শুরু করে ক্যালভিন মোড় হয়ে চিরিরবন্দরের দিকে যাচ্ছি। এতক্ষণে মনের মতো রাস্তা পেয়েছি, হাঁটার গতি আপনা-আপনি বেড়ে যাচ্ছে। ক্যালভিন মোড়ের কাছাকাছি যেতে হঠাৎ বৃষ্টি পড়া শুরু হলো। আমি একটা চায়ের দোকানে বসে চা অর্ডার করলাম। ওমা চা খেতে খেতে বৃষ্টি উধাও। চা শেষ করে আবার হাঁটা শুরু করলাম।

ক্যালভিন মোড় থেকে বাকী রাস্তাটা অসম্ভব রকমের সুন্দর। হঠাৎ এক পশলা বৃষ্টি এসে রাস্তাটার সৌন্দর্য্য কয়েকগুণ বাড়িয়ে দিয়ে গেছে। ভেজা নতুন পিচ করা চওড়া রাস্তা, দুপাশে আকাশমণির গাছ, তারপর সবুজ ধানক্ষেত, বাম দিকে কিছু দূরে রেললাইন। সবকিছু মিলিয়ে হাঁটার জন্য পার্ফেক্ট রাস্তা। গতি বাড়িয়ে এই সুন্দর রাস্তা ধরে আরো প্রায় ঘন্টা খানেক হাঁটার পর চিরিরবন্দরে পৌঁছালাম। ঘু্ম ঠিকমতো না হওয়াতে একটু রেস্ট নিতে নিলেই ঘুম পাচ্ছিলো।

রাস্তার পাশে ময়লার স্তুপ।

চিরিরবন্দরে চা খেতে খেতে রুমমেট ছোট ভাই রাকিবকে কল দিই। রাকিবের বাসা দিনাজপুর সার্কিট হাউসের পাশেই। দুপুরে ওর বাসায় গিয়ে গোসল করে নামাজ পড়তে যাবো এটা রাকিবকে জানিয়ে রাখি।

চিরিরবন্দর থেকে দিনাজপুর, ১৬ কিলোমিটার পথ যেতে হবে। হিসাব করে দেখলাম হাতে যে সময় আছে তাতে ১টার মধ্যে রাকিবের বাসায় যেতে হলে মোটামুটি ৫.৬+ কিলোমিটার/ঘন্টা গতিতে হাঁটতে হবে। চিরিরবন্দর থেকে দিনাজপুরের দিকে হাঁটা শুরু করলাম।

শুরুতে রাস্তাটাকে নিরস লাগছিলো, আশেপাশের দালানকোঠা গুলোকে। এটা অবশ্য বেশিক্ষণ স্থায়ী হয়নি। কিছুক্ষণ হাঁটার পরে আবার সেই বৃষ্টির ভেজা রাস্তা, দুপাশে আকাশমণি গাছ, সবুজ ধানক্ষেত৷ হাঁটার গতি কিছুটা বাঁড়িয়ে, প্রকৃতি দেখতে দেখতে হাটছি। খুব ঘুম পাচ্ছিলো, তাই একটু পরপর থেমে চা খাচ্ছিলাম।

হাঁটতে হাঁটতে একটা ব্রীজের কাছে চলে এসেছি, ব্রীজের কোনো নাম নাই – তবে, নদীর নাম কাঁকড়া নদী। কাঁকড়া নদীর উপর ব্রীজ হওয়ায়, ব্রীজের নামও কাঁকড়া রেখে সামনের দিকে হাঁটতে লাগলাম। কাঁকড়া ব্রীজ থেকে নেমে একটু দূরেই একটা বাজার নাম কারেন্ট হাট। নদীতে একটা সময় অনেক কাঁকড়া ছিলো তাই নাকি নাম রাখছে কাঁকড়া নদী, তাহলে এই হাটের মানুষের কি একটা সময় অনেক কারেন্ট ছিলো??

কাকড়া ব্রিজ পার হয়ে হাটছি গাছের ছায়ায়।

যাইহোক, কারেন্ট হাটে কারেন্ট খুঁজে না পেয়ে – কড়া করে এককাপ আদা চা খেয়ে আবার হাঁটা শুরু করলাম। রাস্তাটা ভালোই লাগছে, হাঁটাটাও বেশ উপভোগ করছি। হাঁটতে হাঁটতে আত্রাই নদী পেয়ে গেলাম। কাঁকড়া ব্রীজের মতো এই ব্রীজেরও কোনো নাম নাই, তাই আমিই নাম রাখলাম – আত্রাই ব্রীজ।

আত্রাই ব্রীজটা বেশ উঁচু, ব্রীজের উপর চারিদিকটা ভালো করে দেখে নিলাম। চারপাশে যতদূর চোখ যাচ্ছে, একের পর এক লিচু বাগান দেখা যাচ্ছে। এতোদিন শুধু ছোট ছোট লিচু গাছের বাগান দেখলেও, বড় গাছের লিচু বাগান আজকেই প্রথম দেখলাম।

হাঁটতে হাঁটতে সামনে একটা জায়গায় অনেক ময়লা জমে থাকতে দেখলাম। ময়লার স্তুপ। ময়লার স্তুপ থেকে উচ্ছিষ্ট খাচ্ছে কয়েকটা ছেড়ে দেয়া গরু, পাশে কয়েকটা কাকও ময়লা খাচ্ছে। পাশেই ময়লা বস্তাবন্দি করা হচ্ছে, একটু পর ট্রাকে উঠানো হবে, তারপর এগুলো দিয়ে কি হবে আমার জানা নেই। ময়লার স্তুপের সামনের জায়গাটার নাম মাতাসাগর।

মাতাসাগর থেকে হাঁটতে হাঁটতে যখন দিনাজপুর মহারাজা মোড়ে পৌঁছালাম, তখন ঘড়িতে সময় ১২টা বেজে ৪৫ মিনিট। মহারাজা মোড় থেকে সার্কিট হাউজ প্রায় ২ কিলোমিটার। মহারাজা মোড় থেকে বাকি পথ আমার চেনা ছিলো, তাই যতোটা সম্ভব শর্টকাট মারলাম। কাছাকাছি গিয়ে রাকিবকে কল দিয়ে সার্কিট হাউসের সামনে থাকতে বললাম, তারপর দিনাজপুর বড় মাঠের মধ্য দিয়ে হেঁটে আমিও ১টা বাজার ২ মিনিট আগে সার্কিট হাউসে পৌঁছে গেলাম।

দিনাজপুর সার্কিট হাউজ।

সার্কিট হাউসের গেটে একটা ছবি তুলে, রাকিবের সাথে ওর বাসায় চলে গেলাম। বাসায় গিয়ে আঙ্কেল আন্টির সাথে কথা বলে গোসল করে, রাকিবের সাথে  নামাজে গেলাম। নামাজ থেকে এসে দেখি আন্টি আমার জন্য পোলাও, গরুর মাংস, মুরগির মাংস, ইলিশ মাছ, ডিম রান্না করে রাখছে। কি আর করার – বাধ্য ছেলের মতো খেয়ে নিলাম৷ খাওয়া শেষ করে ২০ মিনিট মতো রেস্ট নিয়ে আঙ্কেল আন্টিকে বিদায় দিয়ে বীরগঞ্জের উদ্দেশ্যে রওনা দিলাম। রাকিব অবশ্য আমাকে রাস্তায় উঠায় দিয়ে গেলো।

বড় মাঠের সামনের এই রাস্তাটায় হাফ ম্যারাথন দৌঁড়িয়েছি, আজকে একই রাস্তায় হাঁটছি। শহরের ভিতরের রাস্তায় হাঁটতে আমার খুব একটা ভালোলাগা কাজ করছে  না। খুব ব্যস্ত একটা রাস্তায় হাঁটছি – দিনরাত দূরপাল্লার বাস আর ট্রাক চলে এই সড়কে। তাই খুব সাবধানে রাস্তা থেকে নেমে একেবারে সাইড দিয়ে দেখেশুনে হাঁটছি।

টানা দুই ঘন্টা হেঁটে হাজী দানেশ কলেজ, বিশ্ববিদ্যালয়, বিকেএসপি পাড় হয়ে দশ মাইল নামক জায়গায় চলে গেলাম। দশ মাইলে ১০ মিনিটের একটা ব্রেক নিয়ে, চা খেয়ে একটু রেস্ট নিয়ে আবার হাঁটা শুরু করলাম।

হাজী মোহাম্মদ দানেশ বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়।

দশ মাইল থেকে হাঁটতে হাঁটতে গড়েয়া বাজার হয়ে, ঢেপা নদী পর্যন্ত যেতেই সন্ধ্যা হয়ে গেলো। তারপরও কিছুক্ষণ হাঁটলাম। এদিকের রাস্তা গুলো নিচের জমি থেকে বেশ খানিকটা উঁচু, উঁচু রাস্তার দুই পাশে আকাশমণি গাছ সন্ধ্যাটাকে কিছুটা বাড়তি সৌন্দর্য্য দিয়েছে। এই রাস্তা ধরে হাঁটতে হাঁটতে বীরগঞ্জ উপজেলায় ঢুকে গেলাম। বীরগঞ্জে ঢোকার মুখেই বীরগঞ্জ জাতীয় উদ্যান, আজকে সময়ের অভাবে ঘুরে দেখার ইচ্ছে থাকলেও দেখা হলো না।

উদ্যানের রাস্তা ধরে হাঁটতে হাঁটতে বীরগঞ্জ চলে আসলাম। বীরগঞ্জের আশপাশটা একটু ঘুরাঘুরি করে,  আজকের মতো হাঁটা শেষ করলাম।

হাঁটা শেষ করে অটো নিয়ে খানসামা চলে আসলাম। নাঈম ভাইয়ের কাছে। আজকে এখানেই থাকছি।

4O0KM WALKING CHALLENGE : RANGPUR DIVISION

About Jewel Rana

Check Also

ভবঘুরে ভ্রমণঃ একা একা পঞ্চগড়।

আকবরিয়া হোটেলের দই খেয়ে সাত মাথা মোড়ের দিকে যখন হেটে হেটে যাচ্ছি আস্তে আস্তে নীরব …

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *