বাস আমাদের সেই রূপগঞ্জ টার্মিনালে আবার নামিয়ে দিল৷ ঘড়িতে দুইটা বাজে৷ নৌকা বাইচ শুরু হতে আর কিছুটা সময় বাকি৷ সেই সময় ক্ষেপণেই বোধহয় পেটে ছুচো দৌড়াচ্ছে। তাই বাস স্ট্যান্ড এত উল্টোদিকে ভাতের হোটেল দেখে ঢুকে পড়লাম সাত পাঁচ না ভেবে৷ সুকান্ত কি শুধু শুধু বলে গেছেন ক্ষুধার রাজ্যে পৃথিবী গদ্যময়।

সেই গদ্যময় ছন্দেই হোটেলে ঢুকলাম৷ হোটেলে হরেক পদের ভাজি, বেগুন, কাতলা মাছসহ ছোট ছোট মাছ আছে। ক্ষুধা লেগেছে জম্পেস তাই ছোট বেগুন ভেজা, মিষ্টি কুমড়োর ভাজি, পটলের ভাজি, কাতলা ও ছোট পুটি মাছ দিয়ে দুপুরের খাবার সারলাম। এক কথায় তোফা স্বাদ।

ওই দেখা যায় নৌকা বাইচ। ছবি: লেখক

এখান থেকে আমরা ছুটে গেলাম ডলফিন হোটেল আমাদের ব্যাগের সন্ধানে৷ হোটেলে গিয়ে কেয়ারটেকার পেয়ে গেলাম। আমাদেরকে দেখে বললো মামা আপনাদের রুম তো ভাড়া হয়ে গেছে। ব্যাগ আমার রুমে নিয়ে যান। তখন তাকে বললাম আমরা একটু জিড়াতে এবং ফ্রেশ হতে চাই। হোটেলের এক কোনায় সিংগেল রুমে আমাদের বিশ্রামের ব্যবস্থা করলো। এর মধ্যে রেস্ট প্রকৃতির ডাক সেরে ঠিক ৩টার মধ্যে রুম থেকে বের হয়ে গেলাম৷

মধুমতির মায়া যে ভুলা যায় না। ছবি: লেখক

এবার ব্যাগ নিয়ে বের হলাম। ব্যাগগুলো হানিফের কাউন্টারে রেখে আমরা চিত্রা ব্রিজের উদ্দেশে অটো নিলাম। ছোট একটা জেলা শহর যেন আজ জেগে উঠেছে৷ চিত্রা ব্রিজের মাঝেই নেমে গেলাম। কানায় কানায় লোকে পরিপূর্ণ৷ সবাই এসেছে নৌকা বাইচ দেখতে৷ চিত্রার পাড়ে বসেছে নৌকা বাইচ। পুরা জেলা শহর উত্তেজিত৷ এদের লাইফ স্টাইল দেখে আমার প্রচণ্ড হিংসা হচ্ছে৷ একটা নৌকা বাইচ নিয়ে পুরা শহর গরম হবে সেইটা কি ভাবা যায়৷ প্রতিটা লোকের মুখে নৌকা বাইচের গল্প। চিত্রা নদীর বুকে বসেছে আজ নৌকার হাট, প্রস্তুত প্রতিযোগি, প্রস্তুত দর্শক। নৌকা বাইচ উপলক্ষে।

জেলেদের জীবন। ছবি: লেখক

নৌকা বাইচে এবার নারীদের চারটি ও পুরুষদের দশটি নৌকা অংশগ্রহণ করেছে৷ চিত্রা নদীর শেখ রাসেল সেতু এলাকা থেকে এসএম সুলতান সেতু পর্যন্ত প্রায় চার কিলোমিটার জুড়ে নৌকা বাইচ প্রতিযোগিতা হবে তিন টানে৷ নদীর দুইপাড়েই কানায় কানায় দর্শক পরিপূর্ণ। সকাল থেকে বিভিন্ন পেশা শ্রেণির মানুষ ভিড় জমাতে থাকে চিত্রা নদীর পারে৷

বাসাবাড়ি ও রূপগঞ্জ বাজারের বিভিন্ন ব্যবসা প্রতিষ্ঠানের ছাদসহ গাছে গাছে লোকে লোকারণ্য হয়ে উঠেছে৷ নদীতে নৌকা, ট্রলার, স্পিডবোট করে রঙিলা মানুষ নৌকা বাইচ প্রতিযোগিতা উপভোগ করার যেন ব্রত নিয়েছে৷ নৌকা বাইচ উপলক্ষে চিত্রা নদীর দুপাড়ে, বাধাঘাট সহ, বিভিন্নস্থানে বসেছে সাময়িক হকার। মিষ্টি, আচার, পাপর, বিভিন্ন জিনিষের পসরা নিয়ে বসেছে তারা। ব্যবসা করার আজই তো সময়।

মধুমতির বাইচের প্রস্তুতি। ছবি: লেখক

ঠিক দুপুর সাড়ে তিনটার দিকে আকাশ পানে গুলি করে খেলার উদ্ধোধন করা হল৷ কালাই আর টালাই নৌকা দিয়ে প্রতিযোগিতার শুরু হল। মহিলাদের দলটা দ্রুতবেগে চলে গেল জলের রাশি কেটে। চারদিকে আনন্দ ধবনির সাথে, মাঝিদের হেইয়া হেইয়া হর্ষধ্বনি মিলেমিশে একাকার হয়ে যাচ্ছে। এরপর চলে গেল পুরুষের দল। এই কালাই আর টালাই নৌকায় বসতে পারে এক সাথে ৭০ থেকে ৮০ জন৷

আমরা শেখ রাসেল চিত্রা ব্রিজের উপর থেকে দূর দিগন্তে মিলিয়ে যেতে দেখছি প্রতিযোগিদের৷ চিত্রার বুকে পড়ছে আজ বৈঠারটান, ছপাত ছপাত শব্দের মাঝে বাজে মাঝির ঢাক-ঢোল, কাঁসা পিতলের ঘণ্টার ঝংকারে চিরচেনা চিত্রা নদীতে আজ যে বড্ড সোরগোল৷

ভলেন্টিয়ার ভাইরা। ছবি: লেখক

আহা চিত্রা নদী প্রথম দর্শনেই তো তোমার প্রেমে পড়ে গেলাম৷ প্রতিটা নৌকায় মাঝখানে আছে বাজনাদার এবং নৌকার একবারে গলুইয়ের সামনে আছে চড়েন্দার। লাঠি হাতে ছন্দের তালে তালে নির্দেশ দিচ্ছে৷ তিনিই নেতা, বাইচের নিয়ন্ত্রক।

বিগত প্রায় তিন যুগ ধরে চিত্রা নদীর এই নৌকা বাইচ এখন শহরবাসির জন্য উৎসবে পরিণত হয়েছে। আমরা দেখছি আজ পুরা শহর কিভাবে জেগে উঠলো এক নৌকা বাইচ নিয়ে৷ ভাবা কি যায় এ সব। এ মেলা উপলক্ষ্যে নড়াইলের প্রত্যন্ত অঞ্চল থেকে শুরু করে লোক আসে সারা খুলনা বিভাগ থেকে। সাতক্ষীরা, যশোর, বাগেরহাট, কুষ্টিয়া বাগেরহাট ছাড়াও সুদূর উত্তরবঙ্গের পাবনা, রাজশাহী, বগুড়া থেকে আসে মানুষ। আমরা না হয় ঢাকা থেকে গিয়ে ঢাকাবাসীর একটু সান বাড়ালাম৷

ছুটে চল কাণ্ডারি। ছবি: লেখক

যাই হক এবার যে আমাদের যেতে হবে৷ নড়াইলের আর ঐতিহ্য দেখা এখনও বাকি আছে৷ যে মানুষটা কে নিয়ে এত উৎসবের আয়োজন তার বসত ভিটায় না গেলে পাপ হয়ে যাবে৷ জয়নুল আবেদীনের পর আর কেউ তার চিত্রকর্মে শ্যামল বাংলাকে এত সুন্দর ভাবে তুলে ধরতে পারেনি৷

শিল্পী সুলতান তাঁর তুলির আচড়ে গ্রামীন জীবন, জনপদ ও সংস্কৃতির চিত্র সুনিপুন ভাবে ফুটিয়ে তুলেছেন। তাই বলতে গেলে একাধারে প্রকৃতিপ্রেমীও ছিলেন৷ আর রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের মতই ছিল তার নিজস্ব বজরা৷ সময় সুযোগ পেলেই এসএম সুলতান বজরা নিয়ে চিত্রার বুকে ছুটে বেড়াতেন। এই রকম ছবিয়াল কবির জন্মদিন্র নড়াইলবাসি মাতবে না তা কি হয়৷ তাই তো তার জন্মদিন ঘিরে এত আয়োজন। আর সেই আয়োজনের প্রয়োজনেই এবার আমরা ছুটে চললাম এসএম সুলতান কমপ্লেক্সের উদ্দেশে।

সবুজের জলচ্ছত্র। ছবি: লেখক

আমার পুরানো ভ্রমণ গল্পগুলো পড়তে চাইলে নিচের লিংকে চলে যান:
https://www.vromonguru.com/author/ashik/

আমার গল্প, কবিতা, প্রবন্ধ পড়তে চাইলে ঘুরে আসতে পারেন আমার ফেসবুক পেজ থেকে:
https://www.facebook.com/sarwar.ashik786

এর বাহিরেও আমাদের নিজস্ব ভ্রমণ গ্রুপ শেকড় সন্ধানীর মাধ্যমে নিয়মিত এ রকম বাংলার পথে ভ্রমণের আয়োজন করা হয়। ইচ্ছা থাকলে পাঠক আপনিও হতে পারেন আমাদের পরবর্তী ভ্রমণের সঙ্গী। আমাদের সাথে যোগাযোগের বিস্তারিত নিচে দেয়া হলো।

Roots Finder – শেকড় গ্রুপের সাথে থাকুন:
https://www.facebook.com/groups/459880764416865/

Roots Finder – শেকড় পেজ লিঙ্ক:
https://www.facebook.com/rootsfinder.bd/

শেকড় সন্ধানী দলের এডমিনদের নাম্বার:
ঈসমাইল হোসেন – ০১৭৫৬১৭১৫৭০
আশিক সারওয়ার – ০১৮৬৬৬৬৩৪২৩
শরীফ জামান – ০১৫৩৫৪৫৩৯৭৭

ঘুরেন দেশের পথে, খুঁজে ফিরুন নিজের শেকড়।

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here