নড়াইলের পথে ঘাটে: শংকরদের অদ্ভূত বাড়ি

চলছে ভ্যান কালিয়ার পথে। এবারের গন্তব্য নৃত্যশিল্পী উদয় শংকরের বাড়ি। কালিয়া নিজেও এক জীবন্ত কিংবদন্তি। এর এক পাশে নবগঙ্গা নদী আরেক পাশে মধুমতি। তবে জানো কি পথিক আজ থেকে তিনশত বছর পূর্বে এই জেলা দিয়েই যে বইতো কালীগঙ্গা নদী। এখন তারই অপভংশ হিসাবে রয়ে গেছে নবগঙ্গা।

এই কালিয়া জেলার নামকরণে যে কালীগঙ্গা নদীর ছিল বিশেষ ভূমিকা। কালীগঙ্গা বা কালীগাঙ্গ নদীর নামের প্রথমাংশ কালি এবং গঙ্গা শব্দের আ বর্ণের সমন্বয়ে কালিয়া উপজেলার নামকরণ করা হয়। কালীগঙ্গা নদীর সেই ভরাট তীরে এ জনপদ গড়ে উঠেই বলে তো এর নাম ছিল কালিয়া গ্রাম। আর তার নাম অনুসারেই উপজেলার নাম। শহর ও গ্রামের অদ্ভূত মিশ্রন এই কালিয়া।

পুরানকে ভালোবাসি। ছবি: ওয়াফি

বর্তমান কালিয়া উপজেলার ডাক বাংলোই নৃত্য শিল্পী উদয় শংকরের আদি বাড়ি। তো সেই বাড়ি খুঁজে পেতে আমাদের বেশি বেগ পেতে হল না। ডাক বাংলোর সামনেই ভ্যান রাখলো। তবে আজকে ডাক বাংলোতে ভিড় দেখে অবাক হলাম, ভাবলাম ডাক বাংলোতে কোন নতুন অতিথির আগমন ঘটলো নাকি।

ভিতরে ঢুকে অবাক জেলা পরিষদের ডাক বাংলোর ভিতরে ছোটখাট গ্রাম্য হাট বসেছে। মূলত পানের বরজ, পান, পাটের খড়ি, পাটের খড়ি দিয়ে বানানো ঝাড়ুর পসরা দিয়েই সাজানো হয়েছে এই হাট। আশেপাশের ইউনিয়ন, গ্রাম, উপজেলা, জেলা শহর থেকে এখানে পান কিনতে ভিড় জমিয়েছে দোকানি, ব্যাপারি ও সৌখিন মানুষ। অপর দিকে পাটের খড়ির ও দরদস্তুর হচ্ছে বেশ। আমি ফাকতালে কিছু ছবি তুলে নিলাম।

ডাক বাংলোর ভিতরে পানের বাজার। ছবি: লেখক

এবার ডাকবাংলোর দিকে আমাদের দু কদম বাড়ালাম। আহামরি কিছু নয়। সবুজ রঙের দোতলা একটি বিল্ডিং। এরপরও শংকর ভ্রাতার কারণে এই ভবনের দাম একটু বেশিই নড়াইলবাসির কাছে। কালিয়া উপজেলার দর্শনীয় স্থানের মধ্যে অন্যতম বলতে হবে এই বাড়িটি। উদয় শঙ্কর, অমলা শঙ্কর, রবিশঙ্কর হয়ে আনন্দ শঙ্কর-মমতা শঙ্কর পর্যন্ত এক ঝাঁক উজ্জ্বলতম নাম নড়াইলের গৌরব গাঁথায় রত্নখচিত এবং আপন মহিমায় সমুজ্জ্বল। আর এই রবি, উদয় শংকরের পৈত্রিক নিবাসের সামনেই আমরা দাঁড়িয়ে আছি।

পাটখড়ি। ছবি: লেখক

যে উদয় শংকরকে দিয়ে এই প্রভাবশালী পরিবারের উত্থান তার নারিপোতা যে এই কালিয়া উপজেলায়। যদিও তিনি নড়াইলে খুব কম সময় থেকেছেন তবুও মাগুরার মেয়ে অমলা শংকরকে বিবাহের সূত্রে বাংলাদেশের জামাই হিসাবে চিরদিন স্মরণে থাকবেন উদয় শংকর। রবি শংকর উদয়ের অনুজ। আমাদের বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধে কনসার্ট ফর বাংলাদেশের অনুষ্ঠানের মাধ্যমে প্রবাস থেকে বেশ কিছু টাকা অনুদান হিসাবে আসে। সেই কনসার্ট ফর বাংলাদেশের শিল্পী তালিকায় সেতার বাদক রবি শংকরের নাম আছে।

ব্যস্ত ক্রেতা বিক্রেতা। ছবি: লেখক

উদয় শংকর প্রাচ্য নৃত্যকলায় যেন নিজে একাই একটা প্রতিষ্টান। নৃত্যকলার কর্মমঞ্চটি তার বৈচিত্র্যময় জীবনের শ্রেষ্ঠতম অবদান। তাই পুরো বিশ্বেই উদয় শংকর এক কিংবদন্তি হিসাবেই পরিচিত। নৃত্যে তার বিশেষ অবদানের জন্য ভারত সরকারের কাছ থেকে পদ্মভূষণ উপাধি পান। আর তার ভাই রবি শংকরের ব্যাপারে তো নতুন করে কিছু বলার নাই। সেতারের ইন্দ্রজালে এক মোহিনী সুরের মায়ায় পুরো বিশ্বকে জড়িয়ে রেখেছিলেন এই কিংবদন্তি। সেই ১৯৫৬ সাল থেকে শুরু হয়েছে মৃত্যুর আগ আজ পর্যন্ত শাস্ত্রীও সংগীতে তাকে টক্কর দেবার মত খুব কম পণ্ডিতই ছিল। তিনি সুরের আগুন ছড়িয়ে দিয়েছেম প্যারিস, বার্লিন, লন্ডন, শিকাগো সহ বিশ্বের বড় বড় শহরে। লক্ষ লক্ষ শ্রোতাকুলের অন্তরে যে আজও অমর হয়ে থাকবেন কিংবদন্তি এই শিল্পী।

ভাই উদয়ের থেকে রবি শংকরের বাংলাদেশের মানুষ তার বড় আপন ছিল। আমাদের মুক্তিযুদ্ধে তার ছিল ক্ষুদ্র অবদান। পহেলা আগস্ট ১৯৭১ সেদিন ম্যাডিসন স্কোয়ার গার্ডেনে রবি শংকরের সেতার অগ্নি বিনার মত আগুন ছড়িয়েছিল, গেয়েছিল রবি শংকরের বন্ধু জর্জ হ্যারিসন। সেদিন হ্যারিসনের গিটার যেন বন্দুকের গুলির মত ছুটেছল।

ব্যস্ত বাজার। ছবি: লেখক

Bangladesh, Bangladesh
Where so many people are dying fast
And it sure looks like a mess
I've never seen such distress

কনসার্ট ফর বাংলাদেশ এই অনুষ্ঠানে বিশ্ববিখ্যাত সঙ্গীতশিল্পীদের এক বিশাল দল অংশ নিয়েছিলেন, যাঁদের মধ্যে বব ডিলান, এরিক ক্ল্যাপটন, জর্জ হ্যারিসন, বিলি প্রিস্টন, লিয়ন রাসেল, ব্যাড ফিঙ্গার এবং রিঙ্গো রকস্টার ছিলেন উল্লেখযোগ্য। এত লোকদের এককাট্টা করেছিলেন রবি শংকর।

ভাবুলুতার জগৎ থেকে এবার বাস্তবে ফেরার পালা। রবি শংকরের সেতারের রাগ যেন এই বঙ্গদেশে বসেই শুনতে পাচ্ছি। ওয়াফি আমি বাড়ির কিছু ছবি তুলে নিলাম। এবার কালিয়া থেকে বিদায়ের পালা। ঘড়ির কাটা টিক টিক করে বারটার কথা জানান দিচ্ছে। এবার আর দেরি নয়। শহরে যে ফিরতে হবে। আজকে নৌকা বাইচ তিনটা বাজে শুরু হবে তিন টান দিয়ে শেষ হবে মাগরিবের আগে।

ফিরে যাই কালিয়া। ছবি: লেখক

ভ্যান আবার তার মাথা ঘুরিয়ে সো সো বেগে নৌকা ঘাটের দিকে যাচ্ছে। নৌকা ঘাটে বেশিক্ষণ দেরি হল না। ঘাটেই নৌকা ভিড়ানো ছিল। ওপারে গিয়ে বাসটাও পেয়ে গেলাম। আজকে সারাদিন হয়তো মেঘ আমাদের সাথে লুকোচুরি খেলায় নেমেছে। এই আসছে এই যাচ্ছে, তারই মাঝে চলছে আমাদের দক্ষিণের পথে পথে যাত্রার। পিছে কালিয়া উপজেলাকে পিছে ফেলে নড়াইল সদরের উদ্দ্যেশে ছুটে চলছে আমাদের বাস, বিদায় কালিয়া আবার হয়তো হবে দেখা পথিকের পথে।

আমার পুরানো ভ্রমণ গল্প গুলো পড়তে চাইলে নিচের লিংকে চলে যান:
https://www.vromonguru.com/author/ashik/

আমার গল্প, কবিতা, প্রবন্ধ পড়তে চাইলে ঘুরে আসতে পারেন আমার ফেসবুক পেজ থেকে:
https://www.facebook.com/sarwar.ashik786

এর বাহিরেও আমাদের নিজস্ব ভ্রমণ গ্রুপ শেকড় সন্ধানীর মাধ্যমে নিয়মিত এ রকম বাংলার পথে ভ্রমণের আয়োজন করা হয়। ইচ্ছা থাকলে পাঠক আপনিও হতে পারেন আমাদের পরবর্তী ভ্রমণের সঙ্গী। আমাদের সাথে যোগাযোগের বিস্তারিত নিচে দেয়া হলো।

Roots Finder – শেকড় গ্রুপের সাথে থাকুন:
https://www.facebook.com/groups/459880764416865/

Roots Finder – শেকড় পেজ লিঙ্ক:
https://www.facebook.com/rootsfinder.bd/

শেকড় সন্ধানী দলের এডমিনদের নাম্বার:
ঈসমাইল হোসেন – ০১৭৫৬১৭১৫৭০
আশিক সারওয়ার – ০১৮৬৬৬৬৩৪২৩
শরীফ জামান – ০১৫৩৫৪৫৩৯৭৭

ঘুরেন দেশের পথে, খুঁজে ফিরুন নিজের শেকড়।

About Ashik Sarwar

Check Also

রত্নদ্বীপ রিসোর্টঃ বাজেট ট্রাভেলারদের থাকার সঙ্গী

আমি দু’পয়সা আয় করা মানুষ৷ মাস শেষে যা আসে তার বেশিরভাগই পরিবারের খরচের খাতায় চলে …

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *