Home চট্টগ্রাম বিভাগ মারায়ন তং চূড়ায় অতৃপ্ত সূর্যোদয়: পাহাড়ের ভাজে ভাজে

মারায়ন তং চূড়ায় অতৃপ্ত সূর্যোদয়: পাহাড়ের ভাজে ভাজে

142
0

লাইনঝিরিতে প্রায় ৩০ মিনিট পার হয়ে গেলো চালক-পুলিশের লুকোচুরিতে। শেষ পর্যন্ত জিপ সমিতির লোকজনকে ফোন করে পুলিশের কাছে ক্ষমা চেয়ে চাবি উদ্ধার হলো। জিপ চলা শুরু করলো আবারো, দুইপাশে সবুজের আচ্ছাদন। এই রাস্তাটাতে ব্যাপকভাবে সামাজিক বনায়ন চোখে পড়লো। দুইপাশে বনায়ন করা হয়েছে যার ফলে সারি সারি গাছের উর্ধ্বমুখী চাহনি। আমরা আলী কদমের আগেই আবাসিক বাজারে নেমে যাবো চালকের সহকারীকে কয়েকবার বলার পরেও শেষ পর্যন্ত তারা ভুলে গেলো। যখন দেখলাম আবাসিক ছেড়ে চলে যাচ্ছে তখন অনেকটা পথ সামনে চলে গেছে, নেমে আবার পিছনে হেঁটে আসলাম।

পাহাড়কে সামনে রেখে যাত্রা শুরু। ছবি: লেখক

আবাসিক একটা ছোট্ট বাজার, কয়েকটা মুদি দোকান, ৪-৫ টা রেস্টুরেন্ট, একটা ফার্মেসি আর কিছু টং দোকান মিলিয়ে বাজার। এখানে আমরা একটা রেস্টুরেন্টে ঢুকে ব্যাগপত্র রেখে টিউবওয়েল থেকে হাত মুখ ধুয়ে ফ্রেস হয়ে নিলাম। আমাদেরকে দেখেই ছোট বাচ্চা, বড় বাচ্চা মিলিয়ে কয়েকজন এসে জিজ্ঞেস করলো আমরা মারায়ন তং যাবো কিনা এবং আমাদের গাইড লাগবে কিনা। আমরা সবাইকেই সুন্দর ভাবে বুঝিয়ে বললাম যে আমাদের গাইড লাগবে না। কিন্তু এরপর অনেকেই বিভিন্নভাবে গাইড নেওয়ার জন্য উৎসাহিত করতে লাগলো এমনকি এটাও জানিয়ে দিলো গাইড না নিলে নাকি কারবারি উপরে উঠতে দিবেনা। যদিও আমরা এই কথার সত্যতা পাইনি। 

এখান থেকেই শুরু ট্রেকিং। ছবি: লেখক

এখান থেকে অনেকেই গাইড নিয়ে যায়, কারণ মারায়নতং প্রায় ৭০ ডিগ্রি খাড়া পাহাড়। গাইড মূলত পোর্টার হিসেবে কাজ করে। রান্না করে দেয়, আমরা যেহেতু স্বনির্ভরভাবে ট্যুর শেষ করতে চাচ্ছিলাম  তাই গাইড পোর্টার না নেওয়ার সিদ্ধান্ত ছিলো। আবাসিকে নামলাম সকাল ১১ টার দিকে, এরকম এক সময় যখন দুপুরের খাবারের সময় ও হয়নি আবার খাবার না খেয়ে গেলে উপরে কিছু পাওয়া যাবেনা তাই রান্না করার জন্য প্রয়োজনীয় জিনিসপত্র নিতে হবে, আমরা রাতের খাবার তৈরি করার প্রস্তুতি নিয়ে এসেছি। শেষ পর্যন্ত দুপুরের খাবার পার্সেল নিয়ে আর কিছু টুকিটাকি কেনাকাটা করে রওনা দিলাম পাহাড়ের দিকে। 

সেলফি শিকারীদের কবলে পড়ে আমরাও সেলফি তুললাম।

আবাসিক বাজার থেকে বাম দিকে কাচা-পাকা রাস্তা ধরে যাত্রা শুরু। এখান থেকেই মারায়ন তং পাহাড় দেখা যায়, দেখলেই মনে হয় এইতো হাত ছোয়া দূরত্বে। পাহাড়ের মনে হয় বৈশিষ্ট্যই এটা যতদূর থেকেই দেখা যাক না কেনো, দেখে মনে হবে এইতো! কিছুদূর যাওয়ার পর একটা কালভার্ট, এই রাস্তা পর্যন্ত অটোরিকশা চলাচল করে। কালভার্টের পরে শুধুই পায়ে হাঁটা। কালভার্টের নিচ দিয়ে অজানা কোনো ঝর্ণা থেকে কলকল শব্দে গড়িয়ে পরা জলের অবিরাম বয়ে চলা। ঝিরির পাশ দিয়ে পাহাড়ের সুন্দর একটা দৃশ্য চোখে অনেকটা প্রশান্তি দিলো। কালভার্টের উপরে সেলফি শিকারীদের কবলে পড়লাম আমরা। চকোরিয়া থেকে বেড়াতে আসা কয়েকজন আমাদের সাথে এতো জিনিসপত্র দেখে কৌতুহলী হয়ে কথা বলা শুরু করলো। তারাও পাহাড় দেখতে এসেছে তবে পাহাড়ের নিচ থেকেই দেখে চলে যাবে সাথে ক্যামেরায় বিভিন্ন পোজে ছবি তোলা। তাদের আবদারে আমরাও পোজ দিলাম তাদের সাথে, সেলফিও তুলে নিলাম। তারা অনেক অনেক কৌতুহলী আমাদের কে নিয়ে, আমরা কিভাবে এই পাহাড়ে থাকবো, কোথায় খাবো, প্রাকৃতিক কাজকর্মই বা কোথায় সারবো! তাদের বিদায় দিয়ে আমরা হাঁটা শুরু করলাম। 

কলকল ধ্বনিতে বয়ে চলা ঝিরি। ছবি: লেখক

আমরা তিনজনের জন্য দুইটা তাঁবু, তিনটা স্লিপিং ব্যাগ নিয়েছি। পান করার জন্য প্রত্যেকে তিন লিটার করে পানি। বেশ কিছু কুকিজ, বাদাম, খেজুর। রাতে রান্না করার জন্য কুকিং সেট। সব মিলিয়ে সবার ব্যাগ প্যাকই পরিপূর্ণ, এতোটা ওজন নিয়ে হাঁটার জন্য সবাই আগে থেকেই অভ্যস্ত কিন্তু এরপরেও এই পাহাড়ে কাজটা বেশ কঠিন মনে হচ্ছিলো দুইটি কারণে। মারায়ন তং পাহাড় প্রায় ৭০ ডিগ্রি খাড়া ও উঠার রাস্তায় ইট বিছানো। আমরা সাধারণ প্রাকৃতিক পাহাড়ে উঠার সময় যে স্বাচ্ছন্দ পাই ইট বিছানো রাস্তার ফলে সেটা পাওয়া যাচ্ছিলো না, পায়ে গ্রীপ ধরার জন্যও সমস্যা হচ্ছিলো তবে আশার কথা তখন বৃষ্টি ছিলোনা। আমরা দ্রুত উঠে যেতে চাচ্ছিলাম কারন দুপুর থেকে বৃষ্টির সম্ভাবনা ছিলো। বৃষ্টি হলে এই রাস্তা নিঃসন্দেহে মারাত্মক রূপ ধারণ করবে। 

ইট বিছানো বন্ধুর পথ। ছবি: লেখক

রাজন ভাই প্রথম থেকেই আগে আগে উঠে যাচ্ছে, ওনার এই পাহাড়ে আসার অভিজ্ঞতা ছিলো সেটা নিঃসন্দেহে কাজে লেগেছে। আমি আর তাহান ভাই একসাথে যাচ্ছি। দুই-তিনটা বাক উঠতেই ঘেমে নেয়ে একাকার, আকাশে সূয্যিমামার তাপটাও ভীষণ প্রখর হয়েছে, পাহাড়ের ভাজে ভাজে ফাক-ফোকর দিয়েও দেখা মিলছে না বাতাসের। একটা বাক পাড় হতে গিয়েই মারাত্বক এক দৃশ্য, ভূমিধসে রাস্তার প্রায় ৯০ ভাগ ভেঙ্গে গেছে। দুই থেকে তিন ফিট রাস্তা বাকী আছে। যে খাদের সৃষ্টি হয়েছে সেটা প্রায় ৮-১০ তলার সমান হবে। তাহান ভাই আগে পার হলো, আমিও বেশ সাবধানে পার হলাম। বেশ কিছুক্ষণ বিশ্রাম নিলাম, পানি পান করলাম। রাজন ভাই আমাদের ছেড়ে বেশ এগিয়ে গেছে ইতিমধ্যে। আবারো হাঁটা শুরু, রাস্তায় কোনো লোকজনের দেখা নেই, হঠাৎ করে দেখলাম উপর থেকে এক লোক নেমে আসছেন, তার কাধে ভার দুয়ে দুইপাশে ঝুরি বহন করে চলছেন।ঝুরি উপছে পড়ছে পাহাড়ি জাম্বুরাতে (বাতাবীলেবু), এমনিতেই জাম্বুরা আমার খুব পছন্দের তার উপর এরকম সময়ে নিশ্চয়ই কয়েকগুণ আনন্দের। আমি কিনে খেতে চাইলাম কিন্তু তাহান ভাই বৃষ্টির দোহাই দিয়ে আমাকে নিরুৎসাহিত করলেন।

যেখানেই পাশে একটু জায়গা সেখানেই ইটের রাস্তা এড়ানোর চেষ্টা। ছবি: লেখক

আমরা অনেকটা পথ উঠে চলে এসেছি, এরমধ্যে আরো দুইবার বিশ্রাম নিয়েছি।একটি ঢালুতে উঠতে গিয়েই যেনো আগের সবগুলো ঢালু পথের কষ্ট একসাথে পেতে হলো, অসম্ভব রকমের খাড়া এই ঢালটা পেরিয়ে দুইজনেই বসে পড়লাম। ব্যাগ রেখে টিশার্ট খুলে চিপরিয়ে ঘাম বের করলাম, কাপড় ধুয়ে চিপরানোর সময় যেরকম পানি বের হয় ঠিক সেরকমভাবে পরলো।একটা গাছের গুড়িতে বসতেই রাজন ভাইর ডাক কানে এলো, উপরে তাকিয়ে দেখি উনিও বিশ্রাম নিচ্ছেন সাথে সাথেই চোখে পড়লো আমরা পাড়ায় চলে এসেছি। আরেকটু উপরে গিয়ে রাজন ভাইসহ একসাথে বিশ্রাম নিলাম আর যেটা দেখলাম মোটেও প্রস্তুত ছিলাম না। রাজন ভাই এক আঁটি কাঠার লাকড়ি কিনে নিয়েছেন ক্যাম্প-ফায়ারের জন্য। আমি তাহান ভাই দুজনেই নিরুৎসাহিত করলাম,  ব্যাগ নিয়ে উঠতেই যেখানে জিহবা বের হয়ে যাচ্ছে সেখানে লাকড়ির আঁটি! 

সবুজের মাঝে আকাশের চিহ্ন। ছবি: লেখক

অবাক করে দিয়ে বললো, আপনাদের ধরতে হবে না, আমি একাই নিবো।

প্রথম পর্ব:
https://www.vromonguru.com/all-divisions/dhaka-division/mayatogh-1/

দ্বিতীয় পর্ব:
https://www.vromonguru.com/all-divisions/dhaka-division/marayantang-second/

ভ্রমণগুরুতে প্রকাশিত আমার সব পোস্ট পড়ুন এই লিঙ্কে: https://www.vromonguru.com/author/jewel/

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here