Home ঢাকা বিভাগ ঐতিহ্যের সন্ধানে নরসিংদীতে একদিন: লক্ষণ সাহার জমিদার বাড়ি

ঐতিহ্যের সন্ধানে নরসিংদীতে একদিন: লক্ষণ সাহার জমিদার বাড়ি

113
0

ভৈরব-সিলেটগামী হাইওয়ের পাশ ঘেষের ডাঙ্গা রাস্তা দিয়ে হেলেদুলে চলছে আমাদের সিএনজি ডাঙ্গা বাজারের উদ্দ্যেশে। ডাঙ্গা বাজার থেকে খুব কাছেই লক্ষণ সাহার জমিদার বাড়ি। আমরা এখন আছি নরসিংদীর পলাশ উপজেলায়। প্রাচীন ইতিহাস ও ঐতিহ্যের টানে এসে পড়েছি আমরা কতটা দূর এই যান্ত্রিক শহর ছেড়ে। তৎকালীন সময়ে এই এলাকাটি ছিল দেবোত্তর হিসাবে। সনাতন ধর্মের লোকজন মন্দিরের দেবতার উদ্দ্যেশে পূর্ণ অর্জনের লক্ষ্যে সম্পত্তি উৎসর্গ করলে তাকে দেবোত্তর সম্পত্তি বলে। শব্দগত অর্থে দেবোত্তর সম্পদ দেবতার অধিনে চলে যায়। কিন্তু শাব্দিক অর্থ কি আর দুনিয়া চলে এইটা কে চিরস্থায়ী দান ধরে ট্রাস্ট তৈরি করা হয়। তাই আধুনিক সমাজ ব্যবস্থায় বেশির ভাগ দেবোত্তর সম্পদ রাষ্ট্রীয় সম্পদের পরিনত হয়।

লক্ষণ সাহার বাড়ি। ছবি: লেখক

ওই সময় দেবোত্তর জমি হলে জমির খাজনা দিতে হত না। আর এই ডাঙ্গা বাজার অঞ্চলে জমিদার বাড়ি গড়ে তুলেন লক্ষণ সাহা। তার ছিল তিন পুত্র (নিকুঞ্জ সাহা, পেরিমোহন সাহা ও বঙ্কু সাহা) ভারত ভাগের সময় বঙ্কু সাহা ওপারে চলে গেলেও থেকে যায় দুই ভাই। পাকিস্তান থেকে স্বাধীন বাংলাদেশ নামক রাষ্ট্রের জন্মের আগেই আর এক ভাই নিকুঞ্জ সাহাও চলে যায় ভারতে। থেকে যায় হারাধনের একটি ছেলে পেরিমোহন সাহা।

পুরান দিনের নান্দনিকতা। ছবি: লেখক

তবে তার ভাগ্যেও বোধ হয় এ দেশের হাওয়া পানি স্থায়ী ছিল না। তার মৃত্যুর পর তার এক ছেলে বৌদ্ধ নারায়ন সাহা বাড়ির একাংশ বিক্রি করে দেয় আহমেদ আলীর কাছে, তিনি পেশায় উকিল ছিলেন বিধায় বর্তমানে এই বাড়িটিকে উকিল বাড়ি হিসাবে বলা হয়। তবে দেবোত্তর সম্পত্তি বিক্রির অধিকার কোথা থেকে পেল সে এও এক সপ্ত আশ্চর্য।

বেঁচে থাকা মঠ। ছবি: লেখক

মিনিট পনেরো এভাবে চলার পর সেই ভাঙ্গা রাস্তা ছেড়ে সিএনজি মোড় নিলো ডানের একটা রাস্তায়। খুব সরু পিচ ঢালা রাস্তা ছিল, পাশাপাশি দুটি যান ক্রস করতে বড্ড অনীহা এই রাস্তার। দুই পাশে ধান ক্ষেতের সারি। বোরো ধান হবে। শীতে রোপন হয় এই বোরো ধান। বসন্ত আসলে তাকে ঘরে তোলার সময় হয়।

জমিদার বাড়ির অন্দর মহল। ছবি: লেখক

শীতল হাওয়ার সাথে মৃদু উষ্ণতার পরশ শোনায় বসন্তের গান। মাতাল সমীরণে ব্যস্ত আশেপাশে প্রকৃতি। প্রকৃতির এই রূপ দেখা কি যায় ইট পাথরের শহরে। তার সন্ধানে তো বের হতে হয় বাংলার পথে। বাংলার এই মায়া ভরা পথে যদি সহস্র বছর ধরে হাঁটতে হয় আমার যেন কোন গ্লানি নেই, নেই কোন ক্লান্তি। তবে সময়ের প্রয়োজনে বার বার যে ফিরে যেতে হয় আমাদের ওই আধুনিকতার মাঝে। এই সব ভালোবাসাগুলো নগর জীবনের মত সাময়িক এবং কৃত্রিম। দেখতে দেখতে চলে এলাম লক্ষণ সাহার জমিদার বাড়ির কাছে।

সেই মন্দির। ছবি: লেখক

দূরে থেকে এক চিলতে ঐতিহ্যের উকিঝুকি যেন আমাদের পদযুগলের বেগ বাড়িয়ে দিল। সামনে গিয়ে কিছুক্ষণ অবাক নয়নে তাকিয়ে রইলাম জমিদার বাড়িটির দিকে। কি মোহনীয় সৌন্দর্য্য দিয়ে অমোঘ আর্কষণে চুম্বকের মত তার পানে টেনে নিয়ে যাচ্ছে জমিদার বাড়িটি। বিলাসি মানুষের সৃষ্টিশীল কারুকার্যের অপূর্ব মিশ্রনে যেন তার রুচিশীলতার পরিচয় জানান দিচ্ছে পথিকের কাছে।  নিপুণ কারুকাজ বেষ্টিত এই বাড়িটি মুঘল আমলে নির্মাণ করেন যুগ পুরুষ লক্ষণ সাহা। দুই তলা বাড়িটিতে আছে মোট ২৪টি কক্ষ।

ঐতিহ্য। ছবি: লেখক

বাড়ির পাশেই অপূর্ব নির্মাণশৈলীর মন্দির দেখতে পেলাম। কি নিখুত হাতের কাজ, যেন প্রতিটা পড়তে পড়তে ঢেলে দিয়েছে শিল্পের নিপুনতা। মন্দিরের দরজার ঠিক উপরে ফুলের নকশার ঝালর। যেন ঝুলে আছে ঐতিহ্য শূণ্যে। অবাক লাগলো এত যুগ পেরিয়ে মন্দিরটি বিবর্ণ হয়ে পড়লে চুন সুরকির নকশাটা সেই আগের জায়গায় রয়ে গেছে। একেই বলে কারিগরের হাতের জাদু।

সুধান সাহার বাড়ি। ছবি: লেখক

মন্দিরের গেটে দেখতে পেলাম বসে আছে বউ ঠাকুরানী। উদাসি নয়নে বসে ছিলেন। আমাদের দেখে জিজ্ঞেস করলেন, ‘আপনারা কারা।’

জুয়েল ভাই বললো, ‘আমরা ঢাকা থেকে এসেছি এই জমিদার বাড়ি দেখতে।’

বউদির মুখে উদাসি হাসি। সেই হাসি মুখে নিয়ে বললেন এক দুঃখের কাব্যগাথা। এক কালে এই উঠান মুখরিত ছিল কচিকাচা খিলখালানো হাসিতে, প্রবীণের গাম্ভীর্যে, তরূণের রক্ত ছলাত করা সাহসে। এখন এ পারে কেউ নেই। বৌদ্ধ নারায়ন সাহা যখন বাড়ির একাংশ বিক্রি করে চলে গেলেন কলকাতায় এই বংশের বাকি সসদ্যদের উপর যেন নেমে এল কালো মেঘের ছায়া। উকিল সাহেব একাংশ ক্রয় করে বাকিদের বিতাড়িত করেছেন। তাই এপারে কেউ নেই, ওপারে চলে যায় বংশের বাকি বংশধর।

পুরানে মাঝে চির তরুণের বাস। ছবি: জুয়েল রানা

উকিল সাহেব জাকিয়া বসেন অন্দর মহলে এবং বাড়ির নাম ফলকে আসে জমিনা মহলের থাবা। পরবর্তীতে ভিতরে কিছু সংস্কার করে উকিল সাহেব থাকতে শুরু করেন। তবে উনার কপালে হয়তো সুখ ছিল না। দেবোত্তর সম্পদের একক মালিকানা কেউ থাকে না। ট্রাস্টি বোর্ডের মাধ্যমে পরিচালিত হয়। ফলে থেকে যাওয়া কিছু বংশধর উকিল সাহেবের বিরুদ্ধে মামলা করে দেয়। যে মামলা এখনও চলমান। তারিখ পিছায় কোন নিষ্পত্তি হয় না। ফলে পরিত্যক্ত হয়ে পড়ে আছে এই জমিদার বাড়ি। শুধু মন্দিরের দেখাশুনার জন্য নিয়োগ দেওয়া হয়েছে এক পুরোহিত পরিবার। বর্তমানে এ বাড়ি মদখোর, জুয়াখোরদের আড্ডাখানা। রাত হলেই নিষিদ্ধ ভুবনে প্রবেশ করে জমিদার বাড়ির দোতলা। এ নিয়ে আতংকে থাকে এই পুরোহিত পরিবার।

কুণ্ডু সাহার বাড়ি। ছবি: লেখক

এক বুক হতাশা নিয়ে জমিদার বাড়ির দোতলা আমরা প্রবেশ করলাম। রুমের পর রুম পরিত্যক্ত হয়ে পড়ে আছে, কিছু কিছু কক্ষে আবার খাটও আছে। মাদক নেবার পদচিহ্ন রেখে গেছে কিছু কিছু রুমে। দুই তলা থেকে ছাদে উঠলাম। ছাদটা বেশ বড় ছুটাছুটি করার জন্য। ছাদেও বেশ কিছু রুম আছে। জমিদার বাড়ি দেখা শেষে দুজন নিচে নামলাম। জমিদার পিছনে চলে এলাম এবার। পিছন দিকটা গাছাগাছালির  ফাকে ফাকে পাখপাখালির বাস ভাল মত লক্ষ করা যায়। জমিদার বাড়ির এই বাগানের চার দিকটা উচু প্রাচীর দিয়ে বেষ্টিত। আর সান বাধানো পুকুরঘাট ফিরিয়ে নিয়ে যায় সে সময়ে। মনে হয় টাইম মেশিন করে ফিরে গেছি ১০০ বছর পিছে। পুকুরের সবুজের ছায়ার মাঝে দুই পথিকের কায়া যেন জল তরঙ্গ সৃষ্টি করেছে।

১৩১৭ ফাগুন। ছবি: লেখক

জনশ্রুতিতে থেকে জানা যায় এই পুকুরঘাটে চারটার মত মঠ ছিল। কালের বির্বতনে সব মাটির গর্ভে চলে গেলেও একটি মঠ দাঁড়িয়ে আছে কালের সাক্ষী হিসাবে।  লক্ষণ সাহার জমিদার বাড়ির সামনেই কুণ্ডু সাহার বাড়ি। দেখতে চলে এলাম। তবে হলাম আশাহত। আয়তনে লক্ষণ সাহার বাড়ি থেকে বড় হলেও এখন টিকে আছে ধুকে ধুকে। ইট পাথরের কংকাল সার অস্থিমজ্জাটুকু সাক্ষী দেয় সোনালি অতীতের। এখানে থেকে একটু সামনের পেলাম সুধান সাহার বাড়ি।

শীতলক্ষ্যার পার। ছবি: লেখক

বলতে হবে সুধার সাহার বাড়ি এখনও তার রুচি ধরে রেখেছে। কালের কড়াল গ্রাসে মলিন বদনেও শোভা পাচ্ছে দৃষ্টি নন্দন সব কারুকার্য। মুগ্ধ নয়নে ঐতিহ্যের সুধা পান করেও যেন তৃষ্ণা মিটে না। এই বাড়ির কাছেও আছে পুকুরঘাট ও বাগান বাড়ি। দেখতে দেখতে সময় হয়ে এল জমিদারি আলিসানকে বিদায় জানাবার। এবার গন্তব্য ঢাকা। তবে পথে শীতলক্ষা নদীর সুশীতল বাতাস আর ডাঙ্গা বাজারে ঝাল ঝাল মুরগীর সাথে ভাতের স্বাদটা এখনও মুখে লেগে আছে। 

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here