Home চট্টগ্রাম বিভাগ সৈকতের কাছের রিসোর্ট কক্সবাজার সার্ফ ক্লাব

সৈকতের কাছের রিসোর্ট কক্সবাজার সার্ফ ক্লাব

254
0

সাধারণত কক্সবাজার গেলে সবাই সি ভিউ রিসোর্টে থাকতে চায়। কিন্তু এসব রিসোর্টের থাকার খরচও কম নয়। বিভিন্ন কারণে কক্সবাজার আমার যাওয়া হয়। এবারের ভ্রমণের উদ্দেশ্য ছিলো ছেলেকে প্রথমবারের মতো সমুদ্র সৈকত দেখানো। ছোট বাচ্চা নিয়ে বেশি ঘোরাগুরি করবোনা বলেই সৈকতের কাছের একটা হোটেল খুঁজছিলাম।

কক্সবাজার সার্ফিং ক্লাব ছবি তাদের ফেইসবুক পেইজ

দেখা গেলো ভাল সি ভিউ আছে এরকম হোটেলের ভাড়া ৬-৭ হাজার টাকার মতো। তাই কক্সবাজার বিশেষজ্ঞ সাজু ভাইকে ফোন দিলাম, তিনি পরামর্শ দিলে কক্সবাজার সার্ফ ক্লাবে থাকার জন্য। নামের কারণেই বোধহয় এটার কথা মানুষ খুব কমই জানে। আমি নাম শুনেছি, কিন্তু থাকা হয়নি। সাজু ভাই বললো এসি রুম ৪,০০০ টাকার মধ্যেই পাওয়া যাবে, ব্রেকফাস্ট কম্প্লিমেন্টারি।

ছেলের প্রথম সমুদ্র দর্শন। ছবি: লেখক

হাতে একেবারেই সময় ছিলোনা, আমি বাস স্ট্যান্ডে চলে এসেছি, তাই দেরি না করে রুম বুকিং দিয়ে দিলাম। সকাল সাতটায় তুমুল বৃষ্টির মধ্যে কলাতলী রোডের সুগন্ধা পয়েন্টের কাছে আমরা বাস থেকে নেমে একটা অটো ভাড়া করে রওনা দিলাম রিসোর্টের দিকে। ১০ মিনিটেই পৌঁছে গেলাম। অবশ্য সুগন্ধা বিচের কয়লা রেঁস্তোরার কাছে আসার পর বাকি রাস্তাটার কাজ হয়নি এখনো। এটুকু একটু কষ্ট হলো।

হোটেলের বারান্দা থেকে দেখা যাচ্ছে অস্তমিত সূর্য। ছবি: লেখক

মারমেইড রেঁস্তোরা, হোটেল সি প্রিন্সেস, লাজিজ ব্রিস্তোকে পাশ কাটিয়ে সার্ফ ক্লাবে পৌঁছে গেলাম। রিসিপশনে বসার পর একজন এসে জানিয়ে গেলো রুম পেতে সকাল ১০ টা বাজবে, কারণ গত রাতে সব রুমই বুকিং ছিলো। মাত্র ৮ টা রুম এই হোটেলে। নিচতলায় রিসিপশন আর রেঁস্তোরা, সার্ফিংয়ের বোর্ডগুলোও এখানে। দোতলায় সবগুলো রুম, ছোটখাটো একটা রিসোর্ট।

আমরা হাল্কা ফ্রেশ হয়ে নাস্তা খেয়ে লাগেজ রেখে চলে গেলাম বিচে। এই রিসোর্টের বারান্দা থেকেই আসলে সমুদ্র দেখা যায়, তবে সেটার জন্য দোতলায় উঠতে হয়। আমরা রিসোর্ট থেকে বের হয়েই আসলে সৈকতে পা রাখতে পারলাম। কয়েক মিনিট হাঁটলেই পানির দেখা মিলে। কিছুক্ষণ ঘোরাঘুরি করে বিচ থেকে আবার রিসোর্টে ফিরে আসলাম। ইতিমধ্যেই আমাদের রুম রেডি হয়ে আছে।

সব আসবাব বেতের। ছবি: কক্সবাজার সার্ফিং ক্লাব

তবে যে জিনিসটা এ রিসোর্টের অনবদ্য সেটা হচ্ছে এর বারান্দা। দুটো বড়ো বেতের আরাম কেদারা পাতা আছে। সেখানে বসলেই রিসোর্টের কয়েকটা গাছের ফাঁক দিয়ে দেখা যায় সমুদ্র। আমরা এতো ক্লান্ত ছিলাম, খেতে বাইরে না যেয়ে সার্ফ ক্লাবের রেঁস্তোরায় বলে দিলাম দুপুরের খাবারের কথা। ঘুম দিয়ে উঠে খেতে বসলাম, রান্না মোটামুটি মানের। কোরাল মাছ আর মুরগীর অর্ডার দেয়া ছিলো, বেশ ঝালই মনে হলো রান্না।

আমাদের রুমের নাম শাপলাপুর। বাকিগুলোর নামও এরকম, লামা, আলীকদম, খুরুসকুল, সোনারপার। মোটামুটি বড় রুম। পরিষ্কার পরিচ্ছন্নও আছে, সব আসবাব বেতের তৈরি। বাথরুমটা একটু ছোট, তবে ফিটিংস ভালোই। খাট বেশ আরামদায়ক, আর এসিও জেনারেলের। বৃষ্টির কারণে এমনিতেই ঠাণ্ডা থাকায় প্রথমদিন এসি চালানোর প্রয়োজন পড়েনি।

সাজানো গোছানে রুম। ছবি: কক্সবাজার সার্ফিং ক্লাব

ঠিক করলাম খাবার বাইরেই খাবো। রিসোর্টে থেকে নেমে সৈকতে হেঁটে যেয়ে বসলেই হয়। সুগন্ধা পয়েন্টে বেশ ভালোই ভিড়। পুজার ছুটি মিলেয়ে নিয়ে অনেক লোকই এসেছে দেখলাম। আমাদের পরিচিত বন্ধু-বান্ধবও কিছু এসেছ। তাদের সাথে সৈকতে আড্ডা দিয়ে সূর্যাস্তের পর রুমে ফিরে আসলাম। বৃষ্টি থেমে গিয়েছিলো সকাল বেলাতেই। প্রবারণা পূর্ণিমার বিশাল চাঁদ উঠেছে আকাশে।

সকালে ঘুম থেকে উঠলাম পাখির কিচির মিচির শব্দে। এতো পাখি এই রিসোর্টে, অবাক না হয়ে পারলামনা। এ জায়গাটা কোলাহলের শহর কক্সবাজারের অংশই না। সৈকত, সমুদ্রের গর্জন আর পাখিদের কলতানে মুখর কোন এক ভিন্ন দেশের নিরিবিলি একটা দ্বীপ। সময়টা চমৎকারভাবে উপভোগ করলাম।

সকাল হলেই শুরু হয় পাখিদের কলতান। ছবি: লেখক

সেই চাঁদের আলোয় সমুদ্র সৈকত পুরোটাই দেখা যাচ্ছে বারান্দা থেকে। আর সমুদ্রের বাতাস ও গর্জন তো আছেই। দুদিনের জন্য রুম বুক করা ছিলো, ভাবলাম আর কোথাও না যেয়ে এবার সমুদ্রতীরটাই উপভোগ করি। চারদিন থাকবো সেটা জানিয়ে দিয়ে এসে আবার বারান্দায়। খেয়াল করে দেখলাম বারান্দায় আসলে ফ্যানও লাগানো আছে, বাতাস যদি অন্যদিকে সরে যায় তাহলে ফ্যান চালানো যাবে।

সকালের নাস্তা বারান্দায় দিয়ে যেতে বললাম, সমুদ্র দেখতে দেখতেই নাস্তাটা সেরে ফেললাম। জোয়ারের পানিতে রিসোর্টের সামনে দিয়ে একটা অগভীর নালার মতো হয়েছে। পরিষ্কার পানির সেই নালায় হেঁটে বেড়াচ্ছে কালেম পাখি। একটা না, ৪-৫ টা। কাছে যাওয়ার পরও যখন পালিয়ে গেলোনা বুঝলাম কেউ পালে এগুলো। নাহলে মানুষকে দেখে পালানোর কথা।

শরতের সুগন্ধা বিচ। ছবি: লেখক

ছেলেকে নিয়ে সমুদ্র সৈকতে অনেক্ষণ কাটিয়ে ফিরতে গেলে দেখা গেলো বিপত্তি, সে কিছুতেই আসবেনা। তারপর নালাটার কথা মনে পড়লো, ছেলেকে বললাম চলো ওখানে মাছ তাড়ায়। এভাবে মাছ তাড়াতে তাড়াতেই রিসোর্টের সামনে চলে আসলাম। তারপর যেই নালা থেকে নামিয়ে রিসোর্টের দিকে নিলাম, শুরু হলো ভয়াবহ কান্নাকাটি, কিছুতেই যাবেনা সে। অনেক কষ্টে রুমে আনতে পারলাম।

খাওয়া-দাওয়াটা এরপর থেকে বাইরে বাইরেই করেছি। পৌষী, সল্ট, প্রাসাদ প্যারাডাইজ, একেকবার একেক জায়গায়। রিসোর্ট থেকে বের হয়ে একটু সামনে আসলেই অটো পাওয়া যাচ্ছিলো, যেতে আসতে তাই সমস্যা হয়নি কোন। তবে রিসোর্টের ব্রেকফাস্টও খুব ভালো কিছু না, খুবই সাধারণ মানের।

ভোর হবার অপেক্ষা, চাঁদের আলোয় তোলা। ছবি: লেখক

পরের দিন আমার ঘুম ভেঙ্গেছিলো ভোর পাঁচটায়, চাঁদটা তখন আস্তে আস্তে পশ্চিম আকাশে নেমে এসে দিনের আলোতে বিলীন হবার জন্য অপেক্ষা করছিলো। অপার্থিব একটি দৃশ্য, ভালো একটা ক্যামেরা আনিনি বলে হাত কামড়াতে ইচ্ছা করছিলো। চাঁদের আলোয় পুরো সৈকত চিক চিক করছে, আশ্চর্যজনক ব্যপার হচ্ছে এই সময়েও সৈকতে অনেক মানুষ যারা অপেক্ষা করছে সূর্যদয়ের।

একসময় বিপরীত দিক থেকে সূর্য উঠার আভাস দেখা দিয়ে ঝাপসা হতে শুরু করলো চাঁদ। আর জেগে উঠলো পাখির দল, আবার সেই কলতানে মুখোরিত রিসোর্টটা। সেদিন সকালে আমাদের লক্ষ্য ছিলো রেডিয়েন্ট সি ওয়ার্ল্ড থেকে ঘুরে আসা, সেই গল্প আরেকদিন বলবো। ফিরে এসে বারান্দায় বসেই সূর্যাস্ত দেখে রাতের গাড়ীতে ঢাকা ফিরে আসলাম।

কালেম পাখি। ছবি: লেখক

কক্সবাজার সার্ফ ক্লাবের ফেইসবুক পেইজ: https://www.facebook.com/coxsbazarsurfclub/

Website address:
www.surfclubbd.com

যোগাযোগের নাম্বার:
01777-786274

মনে রাখবেন, কক্সবাজারের হোটেলের ভাড়া বন্ধ, মৌসুম, এসবের উপর উঠানামা করে। যেতে চাইলে ফোন করে দরাদরি করে বুকিং করে যাবেন। কখনোও কোন রিক্সা/অটো/সিএনজি নিয়ে হোটেল খুঁজবেননা, এরা আপনাকে নানাভাবে বিভ্রান্ত করবে।

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here