বিলাইছড়ির অসম্পূর্ন গল্প রেখে আমরা খুব সকালে রওনা হলাম কাপ্তাইয়ের উদ্দ্যেশে। বিলাইছড়ি থেকে কাপ্তাইয়ের এই মায়াময় পথ পারি দেবার জন্য হলেও পথিকের এ পথে একবার হলেও আশা উচিত। কাপ্তাই লেকের সকালের হাওয়া মনে দেয় দোলা। যেখান আকাশ, পানি, সবুজের মিতালী সেথায় যেন পাহাড় গুলো আদিকাল থেকে দাম্ভিকের মত দাঁড়িয়ে আছে। এ জলযাত্রার অবসান ঘটিয়ে সময় কে ছুটি দিয়ে কখন যে কাপ্তাই জেটিঘাট এসে পড়লাম টের পেলাম না। এবার শুধু ছুটে চলার পালা।

কাপ্তাই জেটিঘাট থেকে হেটে হেঁটে আমরা চারজন চলে আসলাম সেনানিবাসের কাছাকাছি। একটা দোকানে হালকা নাস্তা খাবার জন্য বসলাম যদিও বা সকালে খেয়ে এসেছি, এই দীর্ঘ জল যাত্রায় রৌদ্দুর সাথে বোঝাপড়া করতে এসেছে বিধায় শরীর ক্লান্ত। কেক, কোক খাবার ফাঁকে আমাদের প্ল্যান ঠিক করে ফেলছি। এর মধ্যে যতটুকু ইনফো জোগাড় করা সম্ভব টিওবি থেকে জোগাড় করলাম। এই ফেসবুক গ্রুপটা আছে বিধায় বুকে বল পাই। খাওয়া পর্ব শেষে সিএনজি নিয়ে আমরা রওনা হলাম, জিবতলি হয়ে যেতে হবে লেকশোর রিসোর্ট।

পাহাড়ের মাঝে মজে আছি। ছবি: চান মিয়া

আবার সেই আকাবাকা পাহাড়ী পথে চলছে মন পবনের গাড়ি, আজ শহরের জীবনকে দিয়ে আড়ি প্রকৃতির সান্নিধ্যে কিছুটা সময় যেন হারিয়ে গেলাম। আমাদের সিএনজি মামা প্রথমে লেকশোর রিসোর্ট চিনতে পারেনি বিধায় নেভী লেক ভিউ পিকনিক স্পটের সামনে নামিয়ে দিতে চেয়েছিল। নাতী দীর্ঘ প্যাচালের পর তার জ্ঞান চক্ষু খুলে গেল আবার রওনা দিল আমাদের মন পবনের গাড়ি। ফুরফুরে বাতাস, আকাশের মনটা খারাপ। ঝিরিঝিরি বৃষ্টিতে দেখতে পেলাম। খানিকটা পথ পারি দেবার পর এসে পড়লাম কাঙ্খিত গন্তব্যে। বৃষ্টিও যেন আমাদের সাথে সাথে এতটা পথ পারি দিয়ে মুষলধারা গতিতে বইতে লাগলো। আমরা রিসোর্টের গেটের সামনে দাঁড়ালাম।

নীল, সবুজের মাঝে পেঁজা তুলার মত মেঘ। ছবি: লেখক

আমাদের মূল উদ্দ্যেশ্য ছিল লেকসোর রিসোর্টের সুইমিং পুলে ঝাপাঝাপি করা। কিন্তু আজ বোধহয় ঠাকুর আমাদের উপর খানিকটা নারাজ। যেহেতু লেকসোর রিসোর্ট পুরো এরিয়া সেনাবাহিনী দ্বারা নিয়ন্ত্রিত তাঁদের অফিসারদের অগ্ররাধিকার বেশি দেওয়া হবে সেইটাই স্বাভাবিক। হাই অফিসিয়ালরা জলকেলি খেলতে ব্যস্ত কখন উঠবে ঠিক নাই আমাদের এক দুই ঘণ্টা পর আসতে আসতে বললো। গেটের পাশেই পুল সাইডের ইনচার্জের নাম্বার দেওয়া আছে। তার নাম্বার ফোন দিয়ে আমাদের কথা বলে রাখলাম।

আমরা দুজন একই লাইনের। ছবি: লেখক

এতটা সময় কি করা যায়? শুনেছি লেকশোর হেলিপ্যাড এরিয়া থেকে না কি কাপ্তাই লেক এবং আশেপাশের পাহাড়গুলোর দূর্দান্ত ভিউ পাওয়া যায়। তাই দেরি না করে আমরা সে পথেই পা বাড়ালাম। পাহাড়ি রাস্তা বেয়ে উপরের দিকে উঠছি আর দেখছি আশেপাশের ভিউ। এই হেলিপ্যাড এরিয়ার আশেপাশে টিনের ছাউনি দিয়ে পর্যটক বসার ব্যবস্থা দেখে বেশ ভাল লাগলো। উপরে উঠা মাত্রই বিন্ময়ের ভিমড়ি খেলাম। কাপ্তাই তুমি সত্যিই প্রাকৃতিক সৌন্দর্য্যের লীলাভূমি। হেলিপ্যাড ল্যান্ডিং এরিয়া থেকে দেখছি পুরা অন্য রকম কাপ্তাই। ভ্রমণ পিয়াসুদের হাতছানি দিয়ে ডাকছে পাহাড়, নদী আর লেক। সে হাতছানি কি ফিরিয়ে দেওয়া যায়। বিলাইছড়ির গল্পের খেই টেনে যাচ্ছি বিধায় বলা হয়নি আমার সফরসঙ্গী চান মিয়া, আকরাম আর ফারুক ভাই পুরো রাস্তায় অদ্ভূত কারণে নিরব ছিল। প্রকৃতির এই আশ্চর্য দেখে আবার তারা সরব হয়ে গেল।

মেঘ, পাহাড়, লেকে মগ্ন লেখক। ছবি: চান মিয়া

ছবি সেলফি তুলায় ব্যস্ত তারা আর আমি দেখছি আকাশ পাহাড় সবুজের মিতালি। এখান থেকে কাপ্তাই লেকের অসাধারণ রূপ দেখা যায়। জলের মাঝে জেগে উঠা ছোট ছোট চরগুলোকে দূর থেকে দ্বীপের মত মনে হয়। সবুজের অরণ্যে আচ্ছাদিত কাপ্তাইয়ের এই অংশ। এতটাই সবুজ পানিতে দেখা যাচ্ছে প্রতিবিম্ব। পানি কোথাও সবুজ, কোথাও নীল। হারিয়ে যাচ্ছে আকাশ পাহাড়ে হয়ে বিলীন। সাদা পেজা তুলোর মত মেঘ আবার আসে পাহাড়ের ভাজে ভাজে হারিয়ে যেতে। জীবন সুন্দর। এই দৃশ্য দেখার জন্যও হলেও বাঁচতে হবে। দূরের পাহাড়গুলো আমায় হাতছানি দিয়ে ডাকছে, সুখের বীনা বাজছে।  

হেলিপ্যাডে দে লাফ। ছবি: আকরাম

এভাবে কতটা সময় কেটে গেল কেউ জানে না, কেউ ভাবে না। এখানে সময় থমকে গেলেও বোধ হয় আমাদের ভুলানো যেত না। যান্ত্রিক শহর ছেড়ে সপ্ন বেধেছি আজ পাহাড়ের বুকে। তবে এই মুগ্ধতার ঘোর বৃষ্টির দ্বিতীয় দফা হানায় কেটে গেল। দৌড়ে এসে সেই টিনের ছাউনি দেওয়া অস্থায়ী আশ্রয় কেন্দ্রে আসলাম। এখানে যে আবার বাশ দিয়ে বেঞ্চ তৈরি করা হয়েছে। বৃষ্টি উপভোগ করার জন্যই বোধ হয় এত আয়োজন। পাহাড়ের বুকে বেয়ে ঝরে নামছে আকাশের কান্না। রিনিঝিনি বৃষ্টি পড়ছে, টিনের চালে যেন এক অদ্ভূত সুরলয় তৈরি করেছে। পথিক হারিয়ে যাচ্ছে অন্য ভুবনে। বাদলা দিনে পাহাড়ে হারিয়ে গেছে ভুবন পথিক। মায়াবী এই ভুবনের ঘোর কাটলো বৃষ্টির থেমে যাওয়ায়।

আহা প্রকৃতি। ছবি: লেখক

বৃষ্টি থেমে গেলে কি হবে এক প্রকার আশটে বিটকেলে ঘাসের উপদ্রব এতক্ষণ পর টের পেলাম। পার্ট টি-শার্ট সূক্ষ্ম ভাবে গেথে আছে। এই বিটকেলে ঘাস ছুটাতে ছুটাতে অস্থির হয়ে গেলাম। তবুও শেষ হয় না বিটকেলে ঘাস। এর মধ্যে ফারুক ভাই বললো অফিসারদের জলকেলি খেলার হয়তো অবসান হয়েছে। চলেন না আশিক ভাই গিয়ে দেখে আসি কি অবস্থা। নতুন এক আশা বুকে নিয়ে হেলিপ্যাড এরিয়া থেকে আস্তে আস্তে নিচে নামলাম। কে জানতো এই আশা দূরাশা হয়ে যাবে।

দোল দোল দুলুনি। ছবি: আকরাম

উপরে থাকার সময় পুল ইনচার্জকে ফোন দেবার কথা আমাদের খেয়াল ছিল না। নিচে এসে যখন ফোন দিলাম তখন আবার শুনলাম হতাশার সুর। অফিসারদের জলকেলি খেলা শেষ হয়নি। কি আর করার। এখন আবার হেলিপ্যাড এরিয়া যেতে ইচ্ছে করছে না। রিসোর্টের পাশেই পিকনিক স্পটে খানিকটা সময় কাটানোর সিদ্ধান্ত নিলাম।

মাখো মাখো পাহাড়ি প্রেমে খানিকটা হেঁটে এলাম পিকনিক স্পটের কাছে, এখান থেকে দেখা যাচ্ছে কাপ্তাই লেকের অসাধারণ ভিউ। বাচ্চাদের স্লাইড খাওয়ার যন্ত্র থেকে শুরু করে পাশাপাশি দুটি দোলনা। দোলনায় দুলে ভুবন ভুলে সামনে দেখা যায় কাপ্তাই লেক আর সেই দূরের পাহাড়। বসার ব্যবস্থাও আছে এখানে। তাই পার্কের বেঞ্চে বসে ফুরফুরে বাতাসে উপভোগ করতে লাগলাম পাহাড়ের নয়াভিরাম সৌন্দর্য্য।

আসো দুলি দুজনে। ছবি: লেখক

এতক্ষণ সময় কাটানো তো দায়। তাই দোলনা খালি হবার পর বুড়ো শিশুরা মেতেছে আপন খেলায়। এতটা শিশু কবে হয়েছি। বয়স তো সত্যই দেখছি সংখ্যা। দুলে আমরা দোলনা, আহা সামনে দেখা যায় কোন পাহাড়ি কন্যা। যেন দোলে দোলে চলে যাচ্ছি দূরের ওই পাহাড়ে। এ রকম প্রকৃতির মাঝে কবে শেষ দোল খেয়েছি মনে পড়ছে না।

সামনে কায়াক দেখতে পেলাম। কায়াক ক্লাবের বদৌলতে কাপ্তাইয়ের বেশ অনেক জায়গায় এখন কায়াক এর সার্ভিস পাওয়া যায়। আউটডোর অ্যাক্টিভিটিসের জন্য সত্যিই কায়াক এক নতুন সংযোজন। ঘণ্টাখানিক এই পাহাড়ি পরিবেশে সময় কাটানোর পর ফোন এল পুল ইনচার্জের। এবার যে আমাদের ঘণ্টি বেজেছে। মেঘের শব্দে শুনা যায় সেই ছুটির ঘণ্টা।

লেকসোর রিসোর্ট। ছবি: লেখক

লেকসোর আর্মিদের প্রতিষ্ঠান। ভিতরের জাকজমক ও চোখ ধাধানো। রুম ভাড়া শুনে আর বলিতে না হয়। আমাদের ব্যাকপ্যাকারদের জন্য তা নয়। এখানে টাকা দিয়ে এক ঘণ্টা সুখ কেনার মধ্যে আমাদের সব চাওয়া পাওয়া। রিসোর্ট এরিয়া পার হয়ে চলে এলাম সেই বিখ্যাত সুইমিং পুলের কাছে যার বিজ্ঞাপণ ফেসবুকের পাতায় পাতায় ছিল ভাস্যমান।

আমন্ত্রণ জানাচ্ছে লেকসোর। ছবি: লেখক

সুইমিং পুলের সামনেই বিশাল কাপ্তাই লেক, আকাশের সেই সুনীল গল্প জমিয়েছে দূরের ওই পাহাড়গুলোর সাথে। কটন কান্ডির মত মেঘ যেন আহবান জানায় মিষ্টি সুবাসের গন্ধ শুকতে। পুরু মোটা গ্লাস দিয়ে সুইমিং পুলের পানি ধরে রাখা দেখে মনে হতে পারে পানি গড়িয়ে কাপ্তাই লেকে পড়ছে। আসলে কি তাই? পানি যে গড়িয়ে পুলের পাশে রিজার্ভারে জমা হয়, সেখান থেকেই আবার রিসাইক্লিং হয়ে পুলে ফিরে আসে চক্রাকারে। সুইমিং পুলের নিচে সাদা মার্বেল পাথর থাকায় পরিষ্কার পরিচ্ছন্ন পানির ঝিলিক চোখে পড়বে। সুইমিং পুলে নামার আগে কাপড় পরিধান করিয়া নিচের গোসলখানায় একবার ভিজে আসার নিয়ম করেছে লেকসোর কতৃপক্ষ। তাই গোসল করিয়া পা বাড়ালাম সুইমিং পুলের দিকে।

ডুবন্ত স্বপ্নে ডুবে আমার মন। ছবি: চান মিয়া

আহা আমুদি আমেজে ডুবে গেলাম মোহময় এই পরিবেশে লেকসোরের হীম শীতল জলে। গা এলিয়ে দিলাম, জলেই আজ বাসা বেধেছি। জলকেলি খেলার মাঝে বালকের সেই চপলতা যে ফিরে আসে, তবে ফিরে আসে না যে বাল্যকাল। খোঁচা দিয়ে বলে ওহে বুড়ো দেহে আটকা পড়ে গেছে তোমার বাল্যকাল। তোমার মাঝে এক শিশুর বাস। সে যে আশি বছরের গেলেও থেকে যাবে শিশু। এভাবে সময় কেটে যায়। ছবি, সেলফির মাঝে স্মৃতি করে বন্দি তবে ঢোকার সময় সেনাবাহিনীর সেই দেখভাল করা ভাইয়ের সাথে যে হয়েছিল যে সন্ধি। ঠিক কাটায় কাটায় এক ঘণ্টা পর এসে জানান দিল সে কথা। দাত কেলিয়ে যেন বলতে চায় কি বাছা সেনাবাহিনীর ডিসিপ্লিন নিয়ে আছে কোন প্রশ্ন।

জলের উপর উঠে গা মুছে বের হলাম লেকসোর রিসোর্ট থেকে। লেকসোরের আমাদের যাত্রার এখানেই সমাপ্তি হলেও গল্পটা কিন্তু ফুরায়নি।

সেলফিটা অবশ্যই চান মিয়া তুলেছেন

আমার পুরানো ভ্রমণ গল্প গুলো পড়তে চাইলে নিচের লিংকে চলে যান:
https://www.vromonguru.com/author/ashik/

আমার গল্প, কবিতা, প্রবন্ধ পড়তে চাইলে ঘুরে আসতে পারেন আমার ফেসবুক পেজ থেকে:
https://www.facebook.com/sarwar.ashik786

এর বাহিরেও আমাদের নিজস্ব ভ্রমণ গ্রুপ শেকড় সন্ধানীর মাধ্যমে নিয়মিত এ রকম বাংলার পথে ভ্রমণের আয়োজন করা হয়। ইচ্ছা থাকলে পাঠক আপনিও হতে পারেন আমাদের পরবর্তী ভ্রমণের সঙ্গী। আমাদের সাথে যোগাযোগের বিস্তারিত নিচে দেয়া হলো।

Roots Finder – শেকড় গ্রুপের সাথে থাকুন:
https://www.facebook.com/groups/459880764416865/

Roots Finder – শেকড় পেজ লিঙ্ক:
https://www.facebook.com/rootsfinder.bd/

শেকড় সন্ধানী দলের এডমিনদের নাম্বার:
ঈসমাইল হোসেন – ০১৭৫৬১৭১৫৭০
আশিক সারওয়ার – ০১৮৬৬৬৬৩৪২৩
শরীফ জামান – ০১৫৩৫৪৫৩৯৭৭

ঘুরেন দেশের পথে, খুঁজে ফিরুন নিজের শেকড়।

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here