সাতছড়ির গেট থেকে বের হয়ে আমরা সবাই একটু জিড়িয়ে নিলাম। বনের বুন্যতা ছুয়ে গিয়েছিল সবার। এবার তো বনের রাজা হবার পালা। আমি নব্বই দশকের মানুষ। ছোটবেলায় অধীর আগ্রহে বসে থাকতাম কখন ইত্তেফাক পত্রিকা আসবে। আর আমি আমার প্রিয় কার্টুন টারজানের পাতায় ডুবে যাব। টারজানকে গাছে গাছে ঝুলতে দেখেই পেয়েছিলা, বনে বাদরে বাঁদর ঝোলার অনুপ্রেরণা। কি রোমাঞ্চ। এতদিন সেই রোমাঞ্চ স্বপ্নই থেকে গিয়েছিল। ট্রি অ্যাক্টিভিটির কল্যানে তা পরিণত হল বাস্তবে। তেমনেই এক ট্রি অ্যাক্টিভিটির পাঠশালা খুলেছে সাতছড়ি জাতীয় উদ্যানে।

অবাক নয়নে তাকিয়ে রুবেল আর ফয়সাল। ছবি: লেখক

১১ জনের দলের ভিতর আমরা ৮ জনই অ্যাক্টিভিটি করতে রাজি হলাম বাকি ৩ জন উচ্চতা আর ওজন জনিত কারণে বিরত থাকলো। আমরা এপারে এসে ট্রি এক্টিভিটির গাইড মশাইকে খুঁজতে লাগলাম। কোথাও কেউ নেই। তার সন্ধানে বাজারে লোক পাঠানো হল। কিছুক্ষণ পর দেখতে পেলাম গাইড মশাই হেলেদুলে আসছেন।

ম্যান ইন অ্যাকসন। ছবি: নাদিম

আসার পর সংখ্যাটা গুণে বললেন সব্বোর্চ চারজন যেতে পারবে। ট্রি এক্টিভিটি সে তো অ্যাডভেঞ্চার প্রিয় মানুষদের জন্য নতুন এক অভিজ্ঞতা। যেন সাতছড়িতে সংযোজন করেছে নতুন এক রোমাঞ্চ। মাটি থেকে প্রায় ৩০ ফুট উপরে এক গাছ থেকে আর এক গাছে যেতে হবে সহজ থেকে কঠিনতম ধাপ অতিক্রম করে। একেই বলে ট্রি অ্যাক্টিভিটি। অনেকেই হাই রোপ অ্যাক্টিভিটিও বলে থাকেন। গাইড আমাদেরকে টিম লিডারের নাম লিখে জনপ্রতি ১০০ টাকা করে দিতে বললো।

এই বাঁদর ঝোলা এক গাছ থেকে আরেক গাছে সাতছড়ির এই বনে এনেছে নতুন রোমাঞ্চ। তাই তো দূর-দূরান্ত থেকে এখানে ছুটে আসে পর্যটক। ঝুকি এড়াতে বেশ কিছু নিরাপত্তা সরঞ্জাম এখানে ব্যবহার করা হয়। এর মধ্যে সেফটি হার্নেস, গ্লাভস, হ্যালমেট অন্যতম।

এসে পড়েছি শেষ প্রান্তে। ছবি: নাদিম

আস্তে আস্তে প্রথম দফায় ফয়সাল, নাদিম, রুবেল আর আমি যাবার জন্য প্রস্তুতি নিলাম। সেফটি টুলস পড়ার পর মই দিয়ে উপরে উঠছি। উত্তেজনার পারদ আজ তুঙ্গে। কুল কুল করে ঘাম ঝড়ছে, দেহমনে শিহরন, রক্ত ছলাত করে উঠে। গাছের উপরে উঠার পর চারপাশে তাকালাম। চারপাশে বড় বড় বৃক্ষরাজি যেন এখন আমাদের দানবের মত ঘিরে রেখেছে। মৃদু হেসে জানাচ্ছে চ্যালেঞ্জ। আমার ওজন যে ৯০ কেজির এর প্যারামিটার কোন ক্রমে পার করেছে। তাই নিয়েই যে ভয় এবার ভয়কে করতে হবে জয়।

রুবেল’দা ইন একন। ছবি: লেখক

ট্রি এক্টিভিটির প্রথম দুই ধাপ বেশ কঠিন যাদের ওজন একটু বেশি। আবার যদি দুই তিন স্টেপের কাঠ ভাঙ্গা থাকে তাহলে তো কথাই নেই। উপরে রশিতে দুই হাত দিয়ে ধরে ভাল মত ব্যালেন্স করে ভাসিয়ে দিলাম নধরকান্তি দেহ নতুন এক চ্যালেঞ্জে। এ যে বড় মজার খেলা। আমার আজ গাছে থাকা প্রাণিদের নিয়ে বড্ড হিংসে হচ্ছে। তবে সে যে সাময়িক জানে থাকলেও আটকাতে পারছি না। প্রতি ধাপের শেষে অর্জনের গর্জনে সেলফি ছবি তোলা তো আছেই। তবে শেষ ধাপে গিয়ে পেলাম চিকন তারের মত রশি। এই ধাপটা খুবই ট্রিকি এবং সহজ যদি ঘটায় থাকে একটু বুদ্ধি।

আসো আজকে খেলবো। ছবি: লেখক

সে তারের মত রশিতে পা দিয়ে সামান্য ঘুরে গিয়ে বাসে স্ট্যান্ড বাই দাড়ানোর মত পজিসন নিলাম, এরপর আস্তে আস্তে এগিয়ে যাচ্ছি বিজয়ের দিকে। প্রথমে আমি পৌঁছানোর পর নাদিম ভাইকে পিছে পেলাম। ক্যামেরা ক্লিক ক্লিকে তুলে ফেললাম তার গোটা কয়েক ছবি। পিছে ফয়সাল আর রুবেল ভাই ও ব্যস্ত ছবি আর সেলফির অর্জনে। আর আমার এখন সেফটি টুলস বর্জনের মাধ্যমেই যেন সব সুখ খুঁজে পেলাম। উপরে একটু সময় কাটিয়ে এবার নিচে নেমে এলাম। বাকিরা উপরে উঠবে এবার।

কোথায় এলেম তবে। ছবি: লেখক

আমাদের তানিম ভাই ব্যস্ত আমাদের ছবি তোলায়। জিয়াদ ভাই তার সাথে আসা বন্ধুর সাথে উপরে অবাক নয়নে তাকিয়ে অ্যাক্টিভিটি দেখছেন। আর এর মাঝেই প্রথম দল নামার পর উঠে গেল দ্বিতীয় দল। এবার চান মিয়া, মনা, রাজার পালা। তারা সেফটি টুলস পরে উপরে উঠছে। হাতে খানিকটা সময় পাবার দরুণ গাইডের সাথে খোশ গল্প শুরু করলাম।

ওই দেখা যায় ইন্ডিয়ান বর্ডার। ছবি: লেখক

গল্পে গল্পে জানতে পারলাম তিনি সাতছড়ি জাতীয় উদ্যানের ভিতরেও গাইডিং করেন বিভিন্ন ট্রেইলে। তবে এই সিজনের এসে বন্ধ রেখেছেন। এখন চলছে ভাল্লুকের প্রজনন সিজন। এ সময় শান্তশিষ্ট নাদুসনুদুস স্বভাবের প্রাণিটাও হয়ে উঠে অ্যাগ্রেসিভ। বনের ভিতর এ কয়দিন বেশ কয়েক জায়গায় হরিণের মৃত দেহ দেখা গেছে। ধারণা করছেন তিনি বুনো কুকুরের হামলায় এরা মারা গেছে। তাই সাহস করে তিনি গাইডিং ঢুকছেন না। আপাতত দৃষ্টিতে শান্তশিষ্ট একটা বনের ভিতরেও আছে কত রহস্য কত ভয়।

আহা সবুজ। ছবি: লেখক

ট্রি অ্যাক্টিভিটি পর্ব শেষেও দেখলাম হাতে আছে অফুরন্ত সময়। তবে আর কেন দেরি সবাই মিলে দুপুরের খাবার সেরে চলে গেলাম ইন্ডিয়ান বর্ডারের কাছে। বর্ডারের যাবার রাস্তাটা বেশ ভাঙ্গা। আমাদের হায়েসের বর্ডারের কাছে যেতে বেশ বেগ পেতে হল। ধীর গতিতে এক সময় পৌঁছে গেলাম ইন্ডিয়ান বর্ডারের একেবারে কাছে। আহা আবার সেই দুর্বার সুনসান নিরবতা। বয়ে যায় দক্ষিণা হাওয়ায় কোন নতুন গান। এ পারে কেউ নেই আর ওপারে দেখা যাচ্ছে ত্রিপুরা। মাঝে সেই নো ম্যান্স ল্যান্ড আর হৃদয়ে কাটাবিধা সেই তার। কত কাছে থেকে কত দূরে। দুটি দেশে দুটি মানচিত্র একে কাটাতার হয়েছে ব্যবচ্ছেদ।

সবুজের অরণ্য ফুড়ে ভুইফোড় লেখক। ছবি: তানিম হোসেন

চারদিকে ধু ধু বালুচরের মাঝে এক চিলতে সবুজের শস্য তার মাঝেই প্রকৃতি লালন করেছে বৃক্ষ। কাটাতার শুনায় কোন নিখোজ কাব্য। সে হেয়ালিতে ডুবে গিয়ে সময়কে যে ভুলে গেছি সবাই। শেষ বিকালের সূর্যের আগমন মনে করিয়ে দেয় যেতে হবে চা বাগানে।

আবার সেখান থেকে গাড়ি ছুটিয়ে চলে এলাম চা বাগানে। দিনের শেষ ঘণ্টায় জাকিয়ে বসেছে সবার মাঝে সবুজের রোমান্টিসিজম। সবাই যেন সবুজের মাঝে আছে, সবুজের মাঝে বাঁচে। আর আমি সবুজের অরণ্য ভেদ করে যেন ভুইফোড় ভাবে উঠে এলাম তানিম ভাই এই মুহূর্তের ছবি নিতে ভুললেন না। চা বাগানের ছায়া গাছগুলো কথা কয় ফিসফিসিয়ে, পথিক তোমার প্রস্থানের সময় যে এল এগিয়ে। এবার যে প্রস্থানের পালা। এই মায়া ভরা সবুজের ভুবন ছেড়ে আমাদের গাড়ি রওনা হল এবার আমাদের যান্ত্রিক শহরের পথে।

এখানেই বাধতে চাই আমার ঘর, শহরের মানুষ হল যে পর। ছবি: চান মিয়া

আমার পুরানো ভ্রমণ গল্পগুলো পড়তে চাইলে নিচের লিংকে চলে যান:
https://www.vromonguru.com/author/ashik/

আমার গল্প, কবিতা, প্রবন্ধ পড়তে চাইলে ঘুরে আসতে পারেন আমার ফেসবুক পেজ থেকে:
https://www.facebook.com/sarwar.ashik786

Roots Finders – শেকড় সন্ধানী তিনজন সপ্নবিলাসী মানুষের ভ্রমণ গ্রুপ। ইচ্ছা থাকলে পাঠক আপনিও হতে পারেন আমাদের পরবর্তী ভ্রমণের সঙ্গী। আমাদের সাথে যোগাযোগের বিস্তারিত নিচে দেয়া হলো।

Roots Finder – শেকড় গ্রুপের সাথে থাকুন:
https://www.facebook.com/groups/459880764416865/

Roots Finder – শেকড় পেজ লিঙ্ক:
https://www.facebook.com/rootsfinder.bd/

শেকড় সন্ধানী দলের এডমিনদের নাম্বার:
ঈসমাইল হোসেন – ০১৭৫৬১৭১৫৭০
আশিক সারওয়ার – ০১৮৬৬৬৬৩৪২৩
শরীফ জামান – ০১৫৩৫৪৫৩৯৭৭

ঘুরেন দেশের পথে, খুঁজে ফিরুন নিজের শেকড়।

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here