বিলাইছড়ির পথে: মুপ্পোছড়া

দুপুরের কাটফাট্টা রোদেই আমাদের যাত্রা শুরু হল। আবার খেয়েছি ভাত, বাংলা মাছ, আলু ভর্তা। সব যেন ঘাম হয়ে ঝরে টুপ টুপ করে পড়ে মৃত্তিকার সাথে মিশে যাচ্ছে। সামনে হেঁটে চলা শ্রীজনের গলায় গুনগুণ করে উঠে কোন পাহাড়ি গান। আমরা হেঁটে যাই কোন পাহাড়ের বুক চিরে চলা রাস্তায়। কাপ্তাই লেকে পানি আসেনি, তাই বাঙ্গালকাঁটা পর্যন্ত পদব্রজই ভরসা। একটু হাঁটার পর দক্ষিণ দিক থেকে একটা শীতল হাওয়া এসে ধাক্কা দিলে। প্রশান্তিতে যেন ভরে গেল দেহ মন। আকাশের পানে তাকলাম, সে যে মন খারাপ করে বসে আছে। এখনই দেখা মিলবে আকাশের মেঘ ভেদ করে কাংখিত বৃষ্টি। পুরা পাহাড় দেখবে আকাশের কান্না। আহা ঝিরি, ঝর্ণায় নবযৌবনের জোয়ার আসবে এই আশায় বুকটা ভরে উঠলো। মানুষ তো আশাতেই বাঁচে। দেখতে দেখতে চলে এলাম বাঙ্গালকাঁটা পর্যন্ত। এই পথে মোটামুটি কাঁচা পাকা পাহাড়ি রাস্তা পার করে হয়ে আসতে হয়েছে। নেই এতটা চড়াই উৎরাই।

সেলফি হবে না! ছবি: লেখক

এখানকার পাড়ায় খানিকটা বিশ্রামের জন্য থামলাম। কারণ পিছেন ১২ জনের গ্রুপের দূর দূর তাক ছায়া দেখা যাচ্ছে না। তাদের সাথে মাত্র একজন আমাদের সাথে তাল মিলিয়ে আসতে পেরেছে। আমাদের সাথে আমুদি কিশোর শ্রীজন চাকমা। তাই পাড়ায় বসে পিছের দলের অপেক্ষায় করতে লাগলাম। পাড়ার মানুষ বাংলাদেশের ক্রিকেট নিয়ে আলাপ আলোচনায় মশগুল। পাহাড়ি জনপথের মানুষের ফুটবল বড় প্রিয় খেলা। প্রতিটা পাড়ার বড় বড় মাঠে পাহাড়ি দেব শিশুদের বল নিয়ে মাঠে দৌড়াতে দেখা যায়। সেই পাহাড়েও হানা দিয়েছে ক্রিকেটের আগ্রাসন। যাক আমাদের পিছের লোকজন এসে পড়লো এবার সামনে এগুনোর পালা।

আহা ঝর্ণার দারুণ স্রোত। ছবি: মুন

রায়হান ফারুক আর আকরাম ভাইয়ের মধ্যে হেভি দহরম মহরম। দুজন মাদ্রাসা লাইনের লোক, দ্বীনি আলাপে মসগুল থেকে পাহাড় থেকে পাহাড়ে হারিয়ে যায়। আর আমার সঙ্গে জুটছে মিচকা শয়তানের। আমার প্রিয় এবং পুরানো পাহাড়ি বন্ধু চান মিয়া। হাঁটার থেকে খোচায় বেশি। তবে এ সব ছোটখাট খুনসুটি শরীরের ক্লান্তি ভুলে থাকতে সাহায্য করে। বাঙ্গালকাঁটা থেকে সামনে একটা ঝিরি দেখলাম। শুকনা খ্যাড়খ্যাড়া ঝিরি দেখে চান্দি জ্বলে উঠলো। এরপরও হেঁটে যাচ্ছি। আশা গুড়ে বালি করে ঝিরি পাড় হয়ে সামনের পাহাড়ি রাস্তা দিয়ে হাঁটতে লাগলাম। খানিকটা দূর আসার পর প্রকৃতি মা যেন আমাদের উপর দয়া বর্ষণ করলেন। বৃষ্টির টুপটাপ ফোটা মুষলধারা হয়ে পড়তে লাগলো। আর আমি খুলে ফেললাম আমার টি শার্ট। আহা সুখ। পাহাড়ি পথে বৃষ্টিতে ভিজে এবং ভুঁড়ি দুলিয়ে হাঁটার আমার অনেক দিনের শখ। আজ পূরণ হল। প্রতিটা বৃষ্টির ফোটা বিধাতার আর্শীবাদ হয়ে যেন নধরকান্তি দেহ বেয়ে টুপটাপ করে ঝিরির পানির সাথে মিশে যাচ্ছে।

একটি হালাল ছবি। ছবি: মুন

আমরা হেঁটে যাচ্ছি। সামনে একটা ঝিরি দেখতে পেলাম।বৃষ্টি আমার জন্য সুখের হলেও পিছের মানুষদের জন্য দুঃখের। আবার তাদের হারিয়ে ফেলেছি। শ্রীজন বললো, ‘দাদা থামো যে, ওরা আসুক।’ বৃষ্টিতে ভিজে ঝিরির পানিতে পা ডুবিয়ে তাদের জন্য অপেক্ষায় রইলাম। তারা এল এক সময় আবার শুরু হল পথ চলার।

শ্রীজন এবার পিছে চলে গেল সামনে এল তার বন্ধু হাফেজ ইকবাল। জিজ্ঞেস করলাম ছোট ভাই এখান থেকে কতদূর। সে বললো এই ধরেন মাইল তিনেকের মত হবে রাস্তা। শুরু হল আবার হাঁটা। কখনও বন জঙ্গলের ভিতর দিয়ে এবড়োখেবড়ো, উঁচু নিচু পথ পারি দিয়ে চলা কখনও বা সামান্য কিছু ঝিরি পথে সংস্পর্শে আসা। বৃষ্টি এখন থেমে গেছে। তবে পিছের মানুষদের পিছলা খেয়ে হুমড়ি খেয়ে পড়ার শব্দ কর্ণকুহরে রাগিনী সংগীতের মত সুর তৈরি করছে।

কস্ট, মনে কস্ট, বুকে কস্ট। ছবি: মুন

পাথর পিছলা, বেশি বোল্ডার নেই তবুও ব্যালেন্স রাখতে পারছে না অনেকেই। বিপদ তো এখানেই। পিছেন ৬-৭ জনের এবার প্রথম পাহাড়ি পথে ট্রেকিং, অভ্যস্ত নয় তারা এই বন্ধুর পথে হাঁটার। পিচ্ছিল পথে বৃষ্টির কারণে আরও পিচ্ছিল হয়ে গেছে। তাই পাথরে পা রাখতে হচ্ছে ব্যালেন্স করে। আমরা আমাদের ব্যাকপ্যাক পাড়ায় রেখে এসেছি বিধায় তেমন কষ্ট হচ্ছে না। তবে হাল্কা ব্যাকপ্যাক পাহাড়ি রাস্তায় বডি ব্যালেন্স ঠিক রাখতে কাজে লাগে এইটা পূর্ব অভিজ্ঞতা থেকে জানি। আমার ন্যাচারহাইকের ১০ লিটার ব্যাকপ্যাক সে জন্য আনা। আমাদের ৪ জনের গ্রুপের সবার মোবাইল, ম্যানিব্যাগ, ঘড়ি, শুকনা খাবার আমার ব্যাকপ্যাকে। ট্রেকিং ভাল গ্রিপের স্যান্ডেল বা জুতা ও অনেক জরুরি। সেইটা পিছের মানুষগুলো হাড়ে হাড়ে টের পাচ্ছে। আমার কি আমি তো এক নধরকান্তি পাণ্ডা।

যাবার পথে বেশ ছোটখাট ক্যাসকেড নজরে পড়লো। আর পাহাড়ি চড়াই উৎরাই তো আছেই। তবে পাহাড়গুলো বেশি খাড়া লাগলো না। অনেক দিনের অভ্যাস নেই বিধায় প্রথম দিকে জ্যা এ জ্যাম খেয়ে গিয়েছিল। এখন আরামবোধ লাগছে। বেশ কয়েকটা ছোট ছোট টিলা সাইজের পাহাড় পার করার পর এসে পড়লাম একটা ক্যাসকেডের সামনে। এইটাকেও গাইড গুষ্টি কেন ঝর্ণা বলে এইটা বড় বিষ্ময়। আমরা এখানে কিছুক্ষণ বসে ছবি তুললাম আবারও পিছিয়ে পড়া বন্ধুদের জন্য অপেক্ষা।

একটি ঝর্ণায় কত লোক, তুমি কার ঝর্ণা। ছবি: লেখক

ইকবালকে বললাম আর কতদূর বাহে। সে বললো এই তো কাছেই। আমাদের গ্রুপ আসার পর আবার রওনা হলাম। পিছে যে সবাই শারীরিক ভাবে টায়ার্ড বুঝা যায়। এবার পাহাড়ি পথ বেয়ে উপরের দিকে উঠা। এর মধ্যে শ্রীজন আমাদের দেখালো নিচের দিকে চলে যাওয়া একটা রাস্তা। এই রাস্তা দিয়েই না কি ন-কাঁটা ঝর্ণায় যাওয়া যায়। এক ভাই নামছে দেখে জিজ্ঞেস করলাম ভাই ঝর্ণায় পানি কেমন? তিনি মৃদু হাসলেন এবং বললেন যান নিজে গিয়ে দেখেন।

প্রায় দেড় ঘণ্টার ট্রেকিংয়ের পর মুপ্পোছরার ঝর্ণার সামনে এসে অবাক বিষ্ময়ে চেয়ে রইলাম। বিস্মইয়ের ভিমড়ি যে কাটে না। ভিমড়ি তো খাওয়ারই কথা। শিশুদের মূত্রেও এর চেয়ে বেশি ফ্লো থাকে। শুকিয়ে যাওয়া ঝর্ণার পানি পাহাড়ে গাঁ বেয়ে চিকন ধারা হয়ে মাটির স্পর্শ পাচ্ছে। সেই মূত্র ফ্লোয়ে পর্যটক দুধের স্বাদ ঘোলে মিটাতে যেন ভিজছে। এইটুকু স্থানে বিশাল মানুষের হাট। এই মূত্রের ফ্লোয়ের কথা তো আর গল্পের শুরুতে বলেনি। ইহা দেখে যে কোন ঠাকুর বলবে যামু না তো ধুপপানি। আমাদের সিদ্ধান্ত ও সেখানে নেওয়া হয়ে গেল।

পাহাড়ি অরণ্যেও খুঁজে পাওয়া যায় টারজান। ছবি: লেখক

তবে পানির ফ্লো যখন থাকে তখন নিশ্চয়ই এই ঝর্ণা যৌবনবতী রাজকন্যার মত তার রূপের ছটায় পাগল করে তার প্রেমিক প্রেমিকাদের। ঝর্ণার উচ্চতা প্রস্থ দেখলেই বুঝা যায় সে বর্ষার রাজকুমারি। প্রেমিক প্রেমিকাদের মুগ্ধ করে মুপ্পোছড়া, ঝর্ণার পানির স্রোতধারা তাদেরকে করে পাগলপাড়া। এ আনন্দ তো প্রকাশে নয় অনুভবে। তাই চোখ বুজে আমার মনোস্কোপে ঝর্ণাকে বর্ষায় নিয়ে গেলাম। অনুভব করতে লাগলাম তার রূপ তার প্রচণ্ডতা। বাস্তবে ফিরলাম গ্রুপের সবার কথায়।

সবার এক কথা এক দাবি যাব না ধুপপানি এখানেই সফরের ইতি টানি, সফরে ইতি অবশ্য এখানে হল না বিষাদের মধ্যে হালকা প্রশান্তি নিয়ে অপেক্ষা করছে ন-কাঁটা ঝর্ণা।

ফিচার ছবি: ঈসমাইল হোসেন।

About Ashik Sarwar

Check Also

রিভিউ: কর্ণফুলী এক্সপ্রেসে সেন্টমার্টিন ভ্রমণ

বেশ কয়েকদিন ধরে শুনছিলাম কথাটা। বড় বড় সব ট্রাভেল গ্রুপেই দেখা যাচ্ছিলো পোস্ট, কিছুতেই কর্ণফুলী …

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *