বিউটিফুল বাংলাদেশ: নওগাঁ – পতিসর কাছারি বাড়ি

নওঁগায় দাওয়াত পেয়েছিলাম সেই দুর্গাপূজায়। মুশতাকের কলিগ সৌরভদা খুব করে বলেছিলেন। কিন্তু সেবার যেতে পারিনি। এরপর যখন সুযোগ আসলো, আর দেরি করিনি। নওগাঁ আমাদের উত্তরবঙ্গ ট্যুরের অন্যতম অংশ ছিল। সময়মতো উঠে বসলাম আন্তঃনগর লালমনি এক্সপ্রেসে। ঢাকা থেকে নওগাঁ যেতে ট্রেনই সবচেয়ে ভালো। চাইলে বাসেও যেতে পারেন। ট্রেন সকালে নামিয়ে দিবে আহসানগঞ্জ স্টেশনে, যাকে আত্রাই স্টেশন নামেই চেনে সবাই। আত্রাই নদীর জন্যে এই নাম। কবিগুরু রবীন্দ্রনাথ নাকি কোলকাতা থেকে সরাসরি এখানেই নামতেন। হঠাৎ রবিঠাকুরের নাম নেয়ার কারণ হলো, নওগাঁতে আমাদের দেখা প্রথম নিদর্শন ছিল, পতিসরের কাছারিবাড়ি। কবি তাঁর বিখ্যাত পদ্মা বোটে করে নদীপথে চলে যেতেন পতিসর। আমাদের অবশ্য সড়কপথে অটোরিকশাই ভরসা! চাইলে ভ্যানেও যাওয়া যায়। তবে সময় লাগবে বেশি। দূরত্ব কমবেশি পনের কিলো স্টেশন থেকে। ভাড়া হয়েছিল ৫০ টাকার মতো।

কাছারিবাড়ি পরিদর্শনের সময়সূচি। ছবি: তামান্না আজমী

বাঙালি আর রবীন্দ্রনাথ ওতপ্রোতভাবে জড়িত। আমাদের এমন কোন অনুভূতি কি আছে যা রবীন্দ্রনাথ  স্পর্শ করেননি? আপনার জন্মদিন? হে নুতন, দেখা হোক আরবার জন্মের প্রথমও শুভক্ষণ। নতুন বউ এসেছে ঘরে? এসো এসো আমার ঘরে এসো। মন খারাপ? আমার সকল দুঃখের প্রদীপ জ্বেলে দিবস গেলে করবো নিবেদন। মনটা খুব ফুরফুরে? বেড়াতে যাচ্ছেন? কোথাও আমার হারিয়ে যাওয়ার নেই মানা। কোথায় নেই রবীন্দ্রনাথ? ওনার গল্প, গান, কবিতা সবই আমাদের আবেগাপ্লুত করে। মনে আছে, রবি ঠাকুরের ‘হৈমন্তী’ ছিল আমার কাছে মানসিক দৃঢ়তার প্রতীক। এটা তো শুধু একটা উদাহরণ মাত্র! বিশেষভাবে কবিগুরু আমাদের সাথে জড়িয়ে আছেন তাঁর রচিত জাতীয় সঙ্গীতের জন্য, যা আমাদের রন্ধ্রে রন্ধ্রে মিশে আছে। এসব ভাবতে ভাবতেই সিএনজি নামিয়ে দিল কাছারিবাড়ির দোরগোড়ায়। 

পতিসর কাছারি বাড়ি। ছবি: তামান্না আজমী

উইকিপিডিয়া থেকে প্রাপ্ত তথ্যমতে, কোলকাতার জোড়াসাঁকোর ঠাকুর পরিবারের বাংলাদেশে শিলাইদহ, শাহজাদপুর ও কালিগ্রাম পরগনাসহ মোট তিনটি জমিদারি ছিল। রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের পিতামহ ও জোড়াসাঁকোর ঠাকুর পরিবারের অন্যতম সদস্য দ্বারকানাথ ঠাকুর এই অঞ্চলের জমিদারি ১৮৩০ সালে কেনার পর ১৮৯১ সালে রবীন্দ্রনাথ জমিদারি দেখাশোনার জন্য এ অঞ্চলে আসেন। ভাগবাটোয়ারা সূত্রে তাঁর ভাগে পড়ে কালিগ্রাম পরগনা। রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর জমিদারির দায়িত্ব নিয়ে পতিসর আসেন ১৮৯০ সালের ডিসেম্বর মাসে। কালিগ্রাম স্টেটের কাছারিবাড়ি ছিল পতিসরে । কাছারিবাড়িটি নাগর নদীর তীরে অবস্থিত। এই বাড়ি নির্মাণের পর ১৯৯১ সালে সংস্কার করা হয়। এখানে রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের স্মৃতিবিজরিত অনেক নিদর্শন রয়েছে। শিলাইদহ আর শাহজাদপুরের কুঠিবাড়ির মতো এটাও আসলে আরেকটা কুঠিবাড়ি। 

কবিগুরুকে ঘিরে পতিসরের উন্নয়ন কর্মকাণ্ডের তালিকা।
ছবি: তামান্না আজমী

মুশতাক টিকেট কাটতে গেল। বিশ টাকা জনপ্রতি। আমি তখন দেখছি বাড়ির সদর দরজাটা। দুইপাশ থেকে দুই সিংহ আর উঁচু সদর দরজা পুরানো জমিদারবাড়ির কথা মনে করিয়ে দেয়। আর দরজার মাঝ বরাবর দাঁড়িয়ে ভেতরে তাকালে দেখা যায় রবীন্দ্রনাথের ভাস্কর্য। দারুণ একটা ফ্রেম! ছবি তুলে নিলাম চটপট। সদর দরজার পাশেই মার্বেল পাথরে খোদাই করা রবীন্দ্র রচনাবলীর বর্ণনা দেয়া আছে, যা উনি পতিসরে থাকাকালীন লিখেছিলেন। দরজা দিয়ে ভেতরে ঢুকলে প্রথমেই নজর কাড়বে বই হাতে দাঁড়ানো রবিঠাকুরের মূর্তিটি। বড় জীবন্ত! 

পতিসরে লেখা রবীন্দ্র রচনার তালিকা। ছবি: তামান্না আজমী
রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের আবক্ষ মূর্তি। ছবি: মোস্তাক হোসেন

কাছারিবাড়িটি চতুর্ভুজ আকৃতির । মাঝে খোলা লন। লনে সুন্দর ফুলের বাগান। অনেকদিন পর এতো বড় বড় গোলাপ ফুল দেখলাম। আর কি চমৎকার তার ঘ্রাণ! লনের তিনদিক ঘিরে ঘরগুলো। শিলাইদহের মতো এই কুঠিবাড়িটিও বেশ গোছানো। বারান্দায় যেয়ে দেখলাম রবীন্দ্রনাথের জীবনী লেখা আছে। শুধু এটারই ছবি তুলেছি। ভেতরে ছবি তোলা নিষেধ। কোথাও ঘুরতে গেলে সেই জায়গার নিয়মকানুন মেনে চলা উচিত। তাতে নিজেরই সম্মান বজায় থাকবে। 

লনের বাগানের গোলাপ। ছবি: তামান্না আজমী

যাইহোক, আমরা ঘরগুলো ঘুরে ঘুরে দেখলাম। এখানে কবির আরাম কেদারা, সিন্দুক, বাথটাব, বিভিন্ন চিঠিপত্র, পদ্মা বোটের নোঙর, প্রভৃতি বিভিন্ন জিনিস যত্ন করে রাখা আছে। এছাড়া আছে একটা লাঙলের ফলা। ছেলে রথীন্দ্রনাথকে কৃষিবিজ্ঞানে উচ্চশিক্ষা নিতে আমেরিকায় পাঠিয়েছিলেন কবি। রথীন্দ্রনাথ দেশে ফিরে মন দিয়েছিলেন আধুনিক কৃষিকাজে। তারই একটা নমুনা এই লাঙলের ফলা। রবীন্দ্রনাথ কিন্তু তাঁর নোবেল পুরস্কারের অনেকটা অংশ এখানকার মানুষদের কৃষিঋণ হিসেবে দিয়েছিলেন। তিনি এই পরগণার দীঘি-পুকুর খনন করা থেকে শুরু করে রাস্তাঘাট নির্মাণ পর্যন্ত উন্নয়নকাজে অগাধ শ্রম দিয়েছেন। এছাড়াও গ্রামের মানুষেদের শিক্ষাদীক্ষায় উন্নত করার লক্ষ্যে অবৈতনিক শিক্ষাও চালু করেছিলেন। ১৯১৩ সালে তিনি এই পরগণায় তিনটি স্কুল প্রতিষ্ঠা করেন। রবীন্দ্রনাথের নিজ হাতে গড়া কালিগ্রাম রথীন্দ্রনাথ ইন্সটিটিউশন আছে এখনো প্রায় একইরকম টালির নকশা নিয়ে।

রবীন্দ্রনাথের জীবনের একাংশ। ছবি: তামান্না আজমী

জাদুঘর দেখা শেষ করে সামনের পুকুরঘাটে এসে দাঁড়ালাম। এখানেও বই হাতে আরাম কেদারায় বসা রবীন্দ্রনাথের ভাস্কর্য আছে। এটাও বেশ সুন্দর। পুকুরপাড়ের কাছেই আহমদ রফিক গ্রন্থাগার। স্থানীয় কয়েকজন রবীন্দ্র প্রেমিক বছর পাঁচেক আগে গড়ে তুলেছেন এই লাইব্রেরি। রবীন্দ্রনাথের অনেক সংগ্রহ আছে এখানে। রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর নোবেল প্রাপ্তির পর সর্বশেষ ১৯৩৭ সালে পতিসরে আসেন। এখন এই পতিসরে রবীন্দ্রনাথের জন্মদিন ও মৃত্যুবার্ষিকীতে বিভিন্ন অনুষ্ঠানের আয়োজন করা হয়।

পুকুরপাড়ে আরাম কেদারায় রবিঠাকুর। ছবি: তামান্না আজমী

কাছারিবাড়ি থেকে বের হয়ে নাগর নদীর উপর ব্রীজটায় যেয়ে দাঁড়ালাম। এই নদী, রবিঠাকুরের প্রিয় নদী, যেটা নিয়ে উনি এই পতিসরেই বসে লিখেছিলেন,

“আমাদের ছোট নদী চলে বাঁকে বাঁকে
বৈশাখ মাসে তার হাঁটু জল থাকে…”

আমাদের ছোট নদী চলে বাঁকে বাঁকে। ছবি: মোস্তাক হোসেন

পতিসরে রাতে থাকার জন্যে সরকারি একটা ডাকবাংলো আছে। আগে থেকে অনুমতি নিতে হয়। এছাড়া নওগাঁ শহরে বেশ কিছু আবাসিক হোটেল আছে। চাইলে সেগুলোতেও থাকা যেতে পারে। তবে নওগাঁর বাকি স্পটগুলো ঘুরে দেখার জন্য শহরে থাকাটাই সুবিধাজনক।

বিঃদ্রঃ ঘুরতে যেয়ে আমরা জায়গা নোংরা করি না। যেখানে সেখানে ময়লা ফেলি না। দেশটা আমাদের। পরিষ্কার-পরিচ্ছন্ন রাখাও আমাদেরই দায়িত্ব।

ফিচার ছবিঃ তামান্না আজমী

About Tamanna Azmi

Check Also

বিউটিফুল বাংলাদেশ: নওগাঁ – কুসুম্বা মসজিদ

একদিন মোস্তাক খুব সুন্দর একটা ক্যালেন্ডার এনে ঝুলিয়ে দিলো দেয়ালে। বারো মাসে বাংলাদেশের বারোটা মসজিদের …

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *