Breaking News

সীতাকুণ্ড ডায়েরি: চন্দ্রনাথ পাহাড় ও ঝরঝরি ট্রেইল

সীতাকুণ্ডের বেশ কিছু ট্রেইলে যাওয়া হলেও, কেন যেন চন্দ্রনাথ পাহাড়ে যাওয়া হচ্ছিলো না। এর আগে একবার যাওয়ার কথা হলেও, ফণী নামক ঘূর্ণিঝড় এবং তেহজীবের প্রবল জ্বর, এই দুই কারণে ট্রিপটা বাতিল করতে হয়। যাইহোক, সামনে ওর পরীক্ষা, এরপর ঈদ, এই সবকিছু চিন্তা করে দেখলাম, মাস খানেকের জন্যে গৃহবন্দী হতে যাচ্ছি। তার আগে একটা ট্যুর বাধ্যতামূলক। আর ঠিক তখনই এক্সট্রিম ট্র‍্যাকার অব বাংলাদেশ, সংক্ষেপে ইটিবি, চন্দ্রনাথ আর ঝরঝরির ইভেন্ট দিল। ইটিবির ইফতার আয়োজনে যাওয়ার সুবাদে এডমিন সাব্বির ভাইয়ের সাথে পরিচয় ছিল। আরেক অ্যাডমিন সেতুদাকে ফেসবুকে ফলো করি সবসময়। কাউন্টারে যেয়ে সালমা আপা, ফখরুল ভাইয়ের সাথেও দেখা হয়ে গেল। বাকিদের সাথে পরে আলাপ হয়েছিল।  

চন্দ্রনাথের প্রবেশমুখ। ছবি: তামান্না আজমী

সাড়ে বারোটার শ্যামলী পরিবহন আস্তে ধীরে চালিয়ে ভোরের আলো ফুটতে সীতাকুণ্ড বাজারে নামিয়ে দিল। তখনো হোটেলগুলো খোলেনি। আমরা নাস্তার জন্যে অপেক্ষা না করে চন্দ্রনাথে চলে যাওয়ার সিদ্ধান্ত নিলাম। বাজার থেকে সিএনজি নিয়ে কিছুক্ষণের মধ্যেই পৌঁছে গেলাম পাহাড়ের পাদদেশে। এই পথটুকু পুরোটাই ছোট বড় কতো যে মন্দির চোখে পড়লো! একরকম মন্দিরের শহরই বলা যায়। পাহাড়ে ওঠার প্রবেশপথে বাঁশ নিয়ে বসে থাকেন স্থানীয় মানুষজন। সেই বাঁশ পুড়িয়ে খুব সুন্দর নকশা করেছে। দেখতে লাগছিল সাপের চামড়ার মতো। আমাদের বাঁশের সংগ্রহের নয় নম্বর বাঁশটা তাই একটু অন্যরকমই হলো। 

সেই নকশাদার বাঁশটা! ছবি: সাব্বির ভাই
নিচ থেকে চন্দ্রনাথের কিছুটা। ছবি: তামান্না আজমী

কিছুদূর হাঁটার পর বড় একটা মন্দির আছে। মন্দিরের পাশের পথটা ধরেই যেতে হয়। হাঁটতে হাঁটতেই সবার সাথে কথাবার্তা হলো। জিজ্ঞেস করে জানলাম, সালমা আপার ছেলের নাম ফাসকা, যার অর্থ, বাবা-মায়ের নীরব ভালোবাসা। কি সুন্দর! রাশেদ ভাই বলছিলেন, ফাসকা সেইরকম ট্র‍্যাকিং করে। দেখলাম সে সেতুদার সাথে আগে আগে হাঁটছিল। সাব্বির ভাই দেখে রাখছিলেন তেহজীবকে। বাচ্চা নিয়ে আমরা যাই ঠিকই, কষ্ট করেন ওনারা। কৃতজ্ঞতা! আবার বেশ কিছুটা এগুনোর পর একটা ঝর্ণা দেখতে পেলাম। হাতমুখে পানি ছিটিয়ে ঠাণ্ডা হয়ে নিলাম। এখান থেকে পাহাড়ে ওঠার পথ দুই দিকে চলে গিয়েছে। ডানদিকের রাস্তা প্রায় পুরোটাই সিঁড়ি, আর বামদিকে পাহাড়ি পথ। মাঝে মাঝে কিছু ভাঙা সিঁড়ি আছে। একেকটা সিঁড়ি অদ্ভূত রকমের খাড়া। আমরা বামদিকে দিয়ে গিয়েছি এবং ফিরেছি ডানদিক হয়ে। বৃষ্টি হয়ে ভেজা পাতা পড়ে স্যাঁতসেঁতে হয়ে ছিল। খুব সাবধানে পা ফেলতে হচ্ছিলো। কিছু জায়গা ছিল সুড়ঙ্গের মতো দেখতে। সিঁড়ি ওঠা-নামা করছি, মাঝেমাঝে থেমে পা দুটোকে বিশ্রাম দিচ্ছি এবং চারপাশে চোখ বুলিয়ে মনের খোরাক জোগাচ্ছি। সেইদিন পাহাড় জুড়ে ছিল শুধু মেঘ। আমরা মেঘের পথ ধরেই হেঁটে যাচ্ছিলাম যেন। 

পাহাড়ে ওঠার পথ। ছবি: মোস্তাক হোসেন
মেঘমল্লার। ছবি: তামান্না আজমী
এই ঝর্ণা দেখা যাবে পাহাড়ে যাওয়ার পথে। ছবি: সাব্বির ভাই

প্রায় দেড় ঘণ্টা পাহাড়ে ওঠার পর চোখে পড়বে বিরূপাক্ষ মন্দির। এটা শিব দেবতার বাড়ি। প্রতিবছর এই মন্দিরে শিবরাত্রিতে বিশেষ পূজা হয়। এই পূজাকে কেন্দ্র করে সীতাকুণ্ডে প্রতি বছর ফাল্গুন মাসে বিশাল মেলা হয়। সেই সময় বিভিন্ন দেশ থেকে অনেকেই আসেন এখানে প্রার্থনা করতে। আমরা মন্দির চত্বরে বসে বসে মেঘ দেখছিলাম। একটু পরেই উঠে আবার হাঁটা ধরলাম। খুব বেশি হলে আধা ঘন্টা হাঁটলেই দেখা পাওয়া যাবে চন্দ্রনাথের চূড়ার। 

বিরূপাক্ষ মন্দির। ছবি: মোস্তাক হোসেন
মন্দির চত্বরে আমরা। ছবি: মোস্তাক হোসেন

সীতাকুণ্ডের সর্বোচ্চ পাহাড় চন্দ্রনাথ, প্রায় ১০২০ ফুট উচ্চতার রহস্যেঘেরা এই পাহাড়, যার একদিকে উত্তাল সমুদ্র আর অন্যদিকে পাহাড়ের সবুজ। চন্দ্রনাথের চূড়ায় মাথা তুলে দাঁড়িয়ে আছে চন্দ্রনাথ মন্দির। মন্দির প্রাঙ্গনে দোকান আছে, টুকটাক খাবার, পূজার সামগ্রী পাওয়া যায়। মন্দির বন্ধ ছিল যদিও। আমরা মন্দিরের বারান্দায় বসলাম। কলা, বিস্কুট খেলাম। ছবি তুললাম। চারপাশে শুধু মেঘ আর মেঘ। আর সে কি বাতাস! সেদিন সত্যিকার অর্থে আমরা তিন হাত দূরের কিছুও দেখতে পাচ্ছিলাম না, এতোই মেঘ ছিল! সাজেকের পর বহুদিন পরে এভাবে মেঘ দেখছিলাম, ছুঁতে পারছিলাম। 

চন্দ্রনাথের চূড়ার ঠিক নিচে। ছবি: সাব্বির ভাই
চন্দ্রনাথ মন্দিরে গ্রুপ ছবি: সাব্বির ভাই

পাহাড় থেকে নিচে নামার সময় অবস্থা খারাপ হয়ে গেল। খাড়া সিঁড়ি বেয়ে নামার সময় একটু বাঁকা ভাবে এক পা করে আগালে কিছুটা আরাম পাওয়া যায়। তবুও পায়ে খুব চাপ পড়লো। সমতল জায়গায় যখন দাঁড়ালাম, পা রীতিমতো কাঁপছে। আর ঘুরে ঘুরে নেমেছে সিঁড়িগুলো। চট করে ব্যালেন্স হারিয়ে ফেলতে পারে কেউ। সাবধানের মার নেই। তবে যেতে পারবেন সবাই। এবং গেলে মুগ্ধ হবেন নিশ্চিত। 

বৃষ্টিভেজা সিঁড়ি। ছবি: সাব্বির ভাই
পাহাড়ের মাঝে সিঁড়ি। ছবি: সাব্বির ভাই
সিঁড়িগুলো ঠিক এমনই ভাঙাচোরা। ছবি: সাব্বির ভাই

আমরা আবার সীতাকুন্ড বাজারে চলে গেলাম। নাস্তার পর্ব সেরে, ফ্রেশ হয়ে সিএনজি নিয়ে গেলাম পন্থিছিলা বাজার, মিনিট দশেকের দূরত্ব। ওখানে দুপুরের খাবারের কথা বলে দেয়া হলো। তারপর হাঁটা শুরু করলাম, উদ্দেশ্য ঝরঝরি। পূর্বদিকে একটা রেললাইন আছে। সেই রেললাইনের ডান দিকে নেমে গেছে মেঠো পথ। এই পথ দিয়েই ঝিরির দিকে যেতে হয়। পুরোটা রাস্তা কাদা আর কাদা। মানে পা ডুবে যাচ্ছে এমন কাদা। ফাসকা আর তেহজীব যারপরনাই বিরক্ত হচ্ছে কাদাতে। একটু পানি পেলেই পা ডুবিয়ে নিচ্ছে। এইরকম একটু ঝিরি, অনেকটা কাদা রাস্তা মাড়িয়ে একটা খাড়া পাহাড়ের গোড়ায় পৌঁছালাম। পাহাড়ের মাঝে দিয়ে একটা সরু পথ। ঝুরা মাটি, আবার কাদা। দুইপাশে হাত রেখে যে উঠবো, সেই উপায়ও নাই। কারণ পাহাড়ের গায়ে মোটামুটি জোঁকের রাজ্য। ডিগবাজি খেয়ে এগোচ্ছে দেখছি। গা শিরশির করে উঠলো। মুশতাককে ধরেও ছিল জোঁকে। 

সেই রেললাইনের ধারে। ছবি: সাব্বির ভাই
গ্রামের মেঠোপথ। ছবি: সাব্বির ভাই
পা ধুতে নেমে গোসল করে নেয়া। ছবি: সাব্বির ভাই

কোনরকমে পাহাড়টা পার হয়ে নামলেই আবার মূল ঝিরি পথ পাওয়া যাবে। এই পাহাড়টাই যা একটু ঝামেলা। বাকি পুরো ট্রেইলটা তার নামের মতোই ঝরঝরে। খুবই সুন্দর এবং বিপদজনকও বটে। ঝিরিপথ ধরে হাঁটছি, ছবি তুলছি, জলকেলি করছি। তেহজীব তার ফাসকা ভাইয়ার সাথে গল্প করছে, খেলছে। এভাবে একসময় চোখের সামনে চলে আসলো সেই ঝরঝরি প্রপাত। ঝর্ণাটার আকৃতি, চারপাশের ভিউ, সবকিছু মিলে প্রথম দর্শনে মনে হবে কম্পিউটার স্ক্রিনে সেট করা কোন ওয়ালপেপার। চমৎকার এই ঝর্ণার একেবারে নিচে গিয়ে ভিজেছি এইবার। একটা পাথরে আধশোয়া হয়ে ছিলাম। উপর থেকে পানি পড়ছে। আহা! জীবন সুন্দর!

যেখানে ছবিটা তোলা ফেরার সময় এখানে দাঁড়ানোও যাচ্ছিলো না। ছবি: সাব্বির ভাই
ঝরঝরির ঝিরিপথ। ছবি: সাব্বির ভাই
ঐ তো ঝরঝরি! ছবি। সাব্বির ভাই
ঝর্ণার কোলে। ছবি: সাব্বির ভাই

ঝরঝরি প্রপাতের বাম দিক দিয়ে আরেকটা পাহাড়ের উপরে উঠে সামান্য হেঁটে গিয়ে আরেক ঝিরি পথে যাওয়া যায়। এই ঝিরি পথে সুন্দর কিছু ক্যাসকেড আর কয়েকটা খুম আছে। ক্যাসকেড পার হয়ে কিছুদূর হাঁটলেই দেখা যাবে মূর্তিঝর্ণা। সাব্বির ভাই, রাশেদ ভাইসহ কয়েকজন ঘুরে আসছিলেন অনেকদূর পর্যন্ত। আমরা আর যাইনি। আধা ঘন্টা পরেই ফিরে আসেন তাঁরা। বৃষ্টি শুরু হয়েছিল, ফেরার তাড়া ছিল। ভাগ্যিস সময়মতো রওনা হয়েছিলাম। বৃষ্টি বাড়তে লাগলো। সাথে যে ঝিরিপথগুলো মনে হচ্ছিলো নিরীহ, সেগুলোই রূপ পালটে ভয়ঙ্কর হয়ে গেল। পানি বাড়ছে, সাথে পাল্লা দিয়ে স্রোত। ধাক্কা দিয়ে ফেলে দেয় এমন অবস্থা। পানির স্রোতে ভেসে এসে পায়ে বাড়ি দিচ্ছে ছোট বড় পাথর, গাছের ডাল। বুঝলাম, আমরা প্রায় হড়কা বানের কবলে পড়তে যাচ্ছি। সেদিন মিনিট দশেক দেরিতে রওনা হলে আমাদের কপালে খারাবি ছিল বলতে হয়। 

ফুলেফেঁপে উঠছে ঝিরিপথ। ছবি: সাব্বির ভাই
এই স্রোত যে কি ভয়ঙ্কর হতে পারে! ছবি: সাব্বির ভাই

প্রকৃতির সাথে যুদ্ধ করে ক্লান্ত, শ্রান্ত হয়ে যখন পন্থিছিলা বাজারে পৌঁছালাম, তখন বিকাল। খাবার অর্ডার দেয়া ছিল। জামাকাপড় পালটে খেয়ে নিলাম। তারপর চলে গেলাম ফেনী। কাউন্টারে আগেই বলা ছিল। রাত আটটার ঢাকার বাসে যখন উঠে বসি, তখনো টিপটিপ বৃষ্টি পড়ছে। সকালের জমে থাকা মেঘগুলো হালকা হচ্ছে হয়তো! 

আমরা গিয়েছিলাম ইটিবির সাথে, যোগাযোগের বিস্তারিত নিচে দেয়া হলো। 

https://www.facebook.com/groups/extremeTbangladesh/?refid=12

অফিস: +৮৮০১৭২৯১০৩৭০৬/ +৮৮০১৮৮৭৪০৮৯৩৩

সেতু দাস: +৮৮০১৮৮৩৬৯৭৭২৮

সাব্বিরঃ +৮৮০১৭১০২৮৯৯৮৪


ফিচার ছবি: মিরাজুল ইসলাম সাব্বির

বিঃদ্রঃ ঘুরতে গেলে আমরা জায়গা নোংরা করি না। যেখানে সেখানে ময়লা ফেলি না। দেশটা আমাদের। পরিষ্কার-পরিচ্ছন্ন রাখাও আমাদেরই দায়িত্ব।    

About Tamanna Azmi

Check Also

স্কুটারে করে ঢাকা থেকে সাজেক ভ্রমণ

ঈদের বন্ধের পর মাত্র অফিস শুরু করলাম। হঠাৎ মেইল, আগামী ১৫ই মে রবিবার বৌদ্ধ পূর্ণিমার …

3 comments

  1. Wow! Nice pic…. & nice tour….
    Amar Thu Akhon e gurea Ahstea escea korcea….

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *