কমলদহ ট্রেইলে হাঁটার ইচ্ছাটা ছিল অনেকদিনের। কিন্তু হচ্ছিলো না। এর মাঝে একদিন ছাগলকান্দা ঝর্ণার সেইরকম একটা ছবি দেখে পরের সপ্তাহেই যাওয়া ঠিক করে ফেললাম মাসুম ভাইদের সাথে। যদিও হিট দ্য ট্রেইলের সাথেই যাচ্ছিলাম, কিন্তু এটা ঠিক কোন ইভেন্ট ছিল না। একসাথে যাচ্ছি, খরচ যার যার তার তার, এরকম ছিল ব্যাপারটা। আমাদের মাথাপিছু খরচ হয়েছিল ১২০০ টাকার মতো। রাত ১২টার বাস, এনা পরিবহন, মিরপুর ১১ থেকে উঠতে হবে। কল্যাণপুর থেকে আমাদের সাথে টুম্পা আর মীমকে নিয়ে রওনা হলাম। ঘণ্টাখানেকের বেশি সময় লাগলো কাউন্টারে যেতেই। বাস মোটামুটি সময় মতোই ছাড়লো। তারপর দেখি সেটা কল্যাণপুর হয়েই যাচ্ছে!

মেঘনা গোমতী দ্বিতীয় সেতু হওয়ার পর ফেনী-সীতাকুণ্ড যাওয়া যায় খুব দ্রুত। তার উপর এনার চালক ভাই চালাচ্ছিলেন পংখীরাজের মতো। ফলাফলস্বরূপ, প্রায় মাঝরাতে আমরা ফেনীতে। এনার কাউন্টারে বসে সবাই ঝিমাচ্ছিলাম। অবশেষে ভোরের আলো ফুটলো। মহিপাল যেয়ে ফ্রেশ হয়ে নাস্তা করে নিলাম। সকালের আলোয় দেখছিলাম মহিপাল। ১৮ বছর পর যখন ফেনী গিয়েছিলাম মুশতাকের সাথে, এই এখানেই নেমেছিলাম। ফেনী বরাবরই আমার মনটা কেমন করে দেয়।
মহিপাল থেকেই আমরা চট্টগ্রামের বাসে চড়ে বসলাম। চট্টগ্রামের যেকোন বাসে উঠে বড়দারোগাহাট নামাতে বললেই নামিয়ে দিবে। বড়দারোগাহাট বাসস্টপে নেমে দাঁড়ালাম। চট্টগ্রাম থেকে আরো কয়েকজন আমাদের সঙ্গ দিলেন। বাসস্ট্যান্ডের কাছেই একটা ইটখোলা আছে, যার পাশ দিয়ে রাস্তা গিয়েছে। সেই রাস্তা ধরে কিছুদূর হাঁটতেই একটা রেললাইন চোখে পড়লো। তেহজীব বলে উঠলো, ‘মা, এটা তো নানাবাড়ির মতো রেললাইন!’ ‘হ্যা মা, এই রেললাইন ফেনীর উপর দিয়ে গিয়েছে’, বললাম আমি।



রেললাইন পার হয়ে কিছুক্ষণ হাঁটার পর ঝিরিপথ শুরু হয়ে গেল। ট্রেইলটা এতোই সুন্দর আর আরামদায়ক যে সারাদিন হাঁটলেও মনে হয় খারাপ লাগবে না। তেহজীব তো রীতিমতো দৌড়াচ্ছিল! ঝিরিপথ দিয়ে হাঁটছি, টুকটাক গল্প করছি, গ্রুপ ছবি তুলছি, এভাবে একসময় পৌঁছে গেলাম কমলদহ ট্রেইলের প্রথম ক্যাসকেডে। কে যেন বললো, ‘এর নাম রূপসী ঝর্ণা।’ আমি ভাবছিলাম, তারপর কি? পরে শুনি, এই ক্যাসকেডের গা বেয়েই উঠতে হবে। সপ্তাহখানেক আগের ছবিতে দেখেছিলাম মোটামুটি ভরাযৌবনা কমলদহ, বৃষ্টি হচ্ছে সীতাকুণ্ডে, যার জন্য যাওয়ার সিদ্ধান্ত নিয়েছিলাম। কিন্তু আমরা যেদিন যাই, সেদিন পানি প্রায় ছিলই না। রোদ অনেক, বৃষ্টির দেখা নেই। ক্যাসকেডের একপাশ থেকে পানি পড়ছে, বাকিটা শুকনো। তারপরও সেই শুকনো পাথরেই আমি প্রায় স্লিপ কাটছিলাম। আর একজন পানির গা বেয়ে উঠতে যেয়ে স্লাইড করে নিচে চলে গেলেন। মারাত্মক কিছু হয়নি, রক্ষা! এতোকিছু বলার কারণ হচ্ছে, বর্ষায় গেলে অবশ্যই সাবধানে থাকতে হবে। চোখ-কান খোলা রাখতে হবে।



কমলদহ ট্রেইলের প্রথম ক্যাসকেডের উপরে উঠেই ছোট আরেকটি ক্যাসকেড পেলাম। এটা বেশি ভালো লেগেছে। এই ছোট্ট ক্যাসকেডে পানি ছিল সুন্দর। গভীরতা অনেক এখানে। এই ক্যাসকেডেরও পাথর বেয়ে বা পাশে পাহাড়ি রাস্তা দিয়ে উপরে ওঠা যায়। উপরে উঠে ঝিরিপথ দিয়ে গেলে দেখা যাবে ঝিরিপথ দুভাগ হয়ে গেছে। হাতের বামে একটি এবং ডানে একটি। হাতের বামের ঝিরিপথে কিছুদূর গেলে সামনে যে ঝর্ণাটা পাওয়া যাবে, সেটাই ছাগলকান্দা ঝর্ণা। কমলদহ ট্রেইলের ছবিতে মূলত এই ছাগলকান্দার ছবিই দেয়া হয়। ঝর্ণা দেখে অনেকেই হতাশ। ছবিতে যেমন দেখা যায় চওড়া পাহাড় ঢেকে যাচ্ছে অঝোর ধারার পানিতে, তেমন কিছুই নেই। একদিক থেকে পানি পড়ছে। কিন্তু এই অল্প পানিতেও আপনি বসে থাকতে পারবেন না বেশিক্ষণ। পানি অনেক ঠাণ্ডা।


তো সেই ঠাণ্ডা পানিতে বসে বসেই শুনছিলাম, এক ভাইয়া আর দুই আপু গল্প করছেন। ট্যুরে যেয়েই আলাপ আর তিনজনই বুয়েটের বিভিন্ন ব্যাচ। এর মাঝে ভাইয়া ওনার এক বন্ধুর কথা বলছিলেন যে কিনা আবার এক আপুর ক্রাশ! আর সেই বন্ধু এমন মানুষ যে সবার বন্ধু হয়ে যায়। রাফি ছিল আবার পুরো ট্রেইলে তাদের পাশে। সেই বন্ধুবৎসল মানুষটার আদ্যোপান্ত রাফির মুখস্থ হয়ে গেল। সেই থেকে রাফি, আর তারপর আমিও আপুকে ক্ষ্যাপানো শুরু করলাম আর আমাদের এই ট্যুরের নাম হয়ে গেল ‘আমার বন্ধু…..’। সঙ্গত কারণেই নাম উল্লেখ করলাম না!
ছাগলকান্দা ঝর্ণা দেখেই আমরা কমলদহ ট্রেইল শেষ করেছি। যেহেতু পানি তেমন ছিল না, তাই আর সামনে যাইনি। ভরা বর্ষায় গেলে কেউ চাইলে একটু কষ্ট করে পরের ঝর্ণাটাও দেখে আসতে পারেন। বেশ কিছু ক্যাসকেড আর ঝিরি এজন্যে পার হতে হবে। অনেকটা নাপিত্তাছড়ার বাঘবিয়ানী ঝর্ণার মতো দেখতে এর নাম পাথরভাঙ্গা ঝর্ণা। পথ কিছুটা কঠিন।


যেভাবে গিয়েছিলাম সেভাবেই ফিরলাম আবার। ফেরার পথে দ্বিতীয় ক্যাসকেডে বসে অনেকটা সময় কাটালাম। কেউ সাঁতার কাটলো, কেউ লাফ দিল, কেউবা আবার ছবি তুললো। এরপর আমরা পাহাড়ি পথে প্রথম ক্যাসকেডটা পার হলাম। কাদায় মাখামাখি হয়ে নাস্তানাবুদ। এরচেয়ে পাথুরে গা বেয়ে ওঠানামা করা ভালো। আমাদের হাতে অফুরন্ত সময়। মাসুম ভাই আর রাসেল ভাই প্রস্তাব দিলেন বোয়ালিয়া ঝর্ণা দেখার। আর কি! হালকা কেক-বিস্কুট খেয়ে আবার রওনা হলাম।

সিএনজি নিয়ে ব্র্যাক পোল্ট্রি ফার্মের কাছে নামতে হলো। এখান থেকেই ট্র্যাকিং শুরু। এই ট্রেইলটাও খুব সুন্দর। পুরো ট্রেইলটা শেষ করতে সারাদিন লাগবে। আমরা শুধু বোয়ালিয়ার উদ্দেশেই গিয়েছিলাম। বোয়ালিয়া ঝর্ণার বিশেষত্ব হলো এর আকৃতি। অনেকটা বোয়াল মাছের মাথার মতো বলে হয়তো নাম হয়েছে বোয়ালিয়া। মূল ঝর্ণার পানি যেখানে পড়ে সেটা অনেকটা গুহা কিংবা গভীর খাদের মতো। ভরা বর্ষায় সাঁতরে এই ঝর্ণায় যেতে হয়। আমরা যখন গেলাম, ঝিরিপথে আমার গলা পানি ছিল। আমি মুশতাকের ঘাড়ে ঝুলে ঝুলে পার হয়েছি।

ছবি: আশরাফ ভাই



ঝর্ণায় পানি তেমন পাইনি। কিন্তু ভালো লাগছিল। বিশেষ করে বিকালের খুব মিষ্টি একটা রোদ ছিল। অপার্থিব লাগছিল জায়গাটা। সেখানে খুব আড্ডাবাজি হলো। ছবি তোলা হলো। তেহজীবের গান হলো। বোয়ালিয়া ট্রেইলের দক্ষিণ-পূর্বে বোয়ালিয়া ঝর্ণা, আমরা যেটা দেখে চলে এসেছি। আর উত্তর দিকের ট্রেইলে বিভিন্ন ছোটবড় ঝর্ণা আছে। আঁকাবাঁকা এই ঝিরিপথে প্রচুর বাঁশঝাড় আছে আর পথে ছোট ছোট ঝর্ণা দেখা যায়। ঝিরিপথ হয়ে এক ঘণ্টা হাঁটার পর উঠান ঢাল। এ ঢালটা অসম্ভব রকমের সুন্দর। পাথুরে ঢালু পথ বেয়ে নিচে গড়িয়ে পড়ছে পানি। তাই এমন নাম। উঠান ঢালের পরের পথটা খুব দূর্গম তবে সুন্দর। বড় বড় পিচ্ছিল বোল্ডার পাড়ি দিতে হয়। প্রায় ১০ মিনিট কঠিন পথ হেঁটে পাওয়া যাবে নহাইত্যেখুম ঝর্ণা। অনেকটা ক্যাসকেডের মতো, উচ্চতা বেশি না, কিন্তু চওড়া।
এসবই গুগল থেকে পাওয়া তথ্য, যদি কেউ পুরো ট্রেইল দেখতে ইচ্ছুক হোন, তাদের জন্যে। আমরা স্বচক্ষে দেখিনি। তবে কোন এক বর্ষায় হয়তো যাবো। আসলে এইসব ট্রেইলের শেষটা দেখা আদৌ সম্ভব কিনা আমি জানিনা।


এই ঝিরি-ঝর্ণার ব্যাপারটা এমন যে পানি কম থাকলেও আমার অন্তত খারাপ লাগে না। চারপাশের সবুজ, ঝিরিপথের পা ছুঁয়ে দেয়া পানি, কাদায় মেখে যাওয়া, একটু রোদ, একটু ছায়া, হঠাৎ বৃষ্টি… সবই ভালো লাগে। আমরা যারা ইটকাঠের শহরে থাকি, তাদের জন্যে এগুলো আশির্বাদ বৈকি!
আমরা গিয়েছিলাম হিট দ্য ট্রেইলের সাথে, তাদের সাথে যোগাযোগের বিস্তারিত নিচে দেয়া হলো।
https:// www.facebook.com/groups/hitthetrailbd/
মাসুম ভাই: ১৬৭২-৯৭০৭১৪
রিফাত ভাই: ০১৯৩১৮০০১৩৯
রাসেল ভাই: ০১৮৭৩৩৪০১২২
ফিচার ছবি: স্বপ্নিল আশরাফ ভাই
বিঃদ্রঃ ঘুরতে গেলে আমরা জায়গা নোংরা করি না। যেখানে সেখানে ময়লা ফেলি না। দেশটা আমাদের পরিষ্কার-পরিচ্ছন্ন রাখাও আমাদেরই দায়িত্ব।
ভ্রমনগুরু your travel adviser