বর্ষায় ঘোরার জন্য দেশের দশটি গন্তব্য

বর্ষা দেশের অনেক মানুষের প্রিয় ঋতু। অধিকাংশ মানুষ বৃষ্টি পছন্দ করলেও এই বৃষ্টির সময় কোথাও যেতে চান না। তবে দেশের কিছু জায়গা আছে যেগুলো বৃষ্টির সময় না গেলে যাওয়াটাই বৃথা মনে হতে পারে। আসুন দেখে নেই, আবহাওয়ার চোখ রাঙ্গানি উপেক্ষা করে এই বর্ষায় কোথায় ঘুরতে যেতে পারেন।

১. বান্দরবান:

দেশের মানুষের অন্যতম পছন্দের গন্তব্য বান্দরবান। অনেকেই শুধু অ্যাডভেঞ্চারের গন্তব্য হিসেবে বান্দরবানকে চেনেন। আসলে বান্দরবান শহরে থেকে আশেপাশে ঘুরে দেখার মতোও অনেক কিছু আছে। শহর থেকে প্রায় ৫০ কিলোমিটার দূরে রয়েছে নীলগিরি। প্রায় ২,২০০ ফিট উঁচু এ পাহাড় এ সময়টাতে মেঘে ঢেকে যায়। তাছাড়া যাওয়া আসার সময়ও বৃষ্টিতে ভিজে আরও সবুজ হয়ে ওঠা পাহাড়গুলো মন কাড়বে যে কারও। পথে শৈলপ্রপাতে থেমে দেখে নিতে পারবেন পাহাড়ি ঝর্ণা। সূর্যাস্তের সময়টা কাটাতে পারেন শহরের অদূরে নীলাচলে। এছাড়া মেঘলা পর্যটন কেন্দ্রে যেয়ে চড়তে পারবেন ক্যাবল কারে। শহরের অদূরের স্বর্ণ মন্দিরও পর্যটকদের পছন্দের একটি জায়গা। বিকেল বেলা শহরের সাঙ্গু নদীর উপর নির্মিত ব্রীজে সময় কাটাতে পারবেন। আর আপনার দল যদি লম্বা পথ হাটার মতো শারীরিক ও মানসিকভাবে প্রস্তুত থাকে তবে চলে যেতে পারে রুমা হয়ে বগালেক ও কেউকারাডং কিংবা থানচি হয়ে নাফাকুম ঝর্ণায়।

বান্দরবানের সাথে ঢাকা, চট্টগ্রাম, রাঙ্গামাটি ও কক্সবাজারের সরাসরি বাস চলে। আপনার অবস্থানের উপর নির্ভর করে বাসে করে বান্দরবান যেতে পারেন। আর থাকার জন্য শহরে ও শহরের বাইরে অনেকগুলো রিসোর্ট ও হোটেল রয়েছে। ওয়েবসাইট থেকে ফোন নাম্বার নিয়ে যোগাযোগ করে যেতে পারবেন। রিসোর্টগুলোর মধ্যে সাইরু হিল রিসোর্ট, মিলনছড়ি হিলসাইড রিসোর্ট, গ্রীনউড রিসোর্ট ইত্যাদি অন্যতম। মনে রাখবেন বান্দরবানে ঘোরাঘুরির জন্য জীপ গাড়ির প্রয়োজন পড়ে। তাই দলবদ্ধভাবে গেলে আপনার ভ্রমণ সাশ্রয়ী হবে। একটা জিনিস মনে রাখবেন বান্দরবান শহরে থাকার ব্যবস্থা সীমিত, তাই ইদের বন্ধে আগে থেকে বুকিং দিয়ে যাওয়ায় ভালো।

২. সিলেট:

বাংলাদেশের বর্ষার রাণী বলা হয় সিলেটকে। বছরের এ সময়টায় জেলার আকর্ষণ বেড়ে যায় বহুগুণে। চা বাগান, বন, মেঘালয়ের পাহাড় থেকে বেয়ে বাংলাদেশে প্রবাহিত নদী সব কিছু মিলে সিলেট হতে পারে এ সময়ের অন্যতম সেরা গন্তব্য। অনেক আগে থেকেই সিলেটের জাফলং সবার প্রিয় একটা জায়গা। পিয়াইন নদীর স্বচ্ছ পানি আর দূর থেকে মেঘালয়ের সব ঝর্ণা মিলে জাফলং এখনো সিলেটের অন্যতম সেরা পর্যটন কেন্দ্র। তবে এখন বিছানাকান্দি, পান্থুমাই ও রাতারগুলের জলাবন সিলেটের অন্যতম আকর্ষণ। এছাড়া শহরের কাছেই রয়েছে বেশ কয়েকটি চা বাগান। বনের মধ্যে ট্রেকিং করতে চাইলে বেছে নিতে খাদিমনগর জাতীয় উদ্যানকে। আমি বাংলাদেশের যতগুলো বনে গিয়েছি তারমধ্যে খাদিমনগরটাই সবচেয়ে বেশি ঘন গাছ পালায় পরিপূর্ণ মনে হয়েছে। অনেক প্রজাতির পাখি ছাড়াও অজগর সাপ রয়েছে এ বনে, অবশ্য ভয়ের কিছুই নেই। এদের দেখা পাওয়া সহজ নয়। শহরের মধ্যে রয়েছে সুরমা নদীর পাড়ে ঐতিহাসিক ক্বিন ব্রিজ ও হযরত শাহজালাল (র.) এর মাজার। সারা দেশে গরম পড়লেও সিলেটে বৃষ্টি পড়ে এবং আবহাওয়া গরম থাকে কম। তাই এ ঈদে বেছে নিতে পারেন সিলেটকে।

বর্ষায় অপূর্ব সুন্দর হয়ে যায় সিলেটের প্রকৃতি। ছবি: বাবলি

সিলেটে থাকার জন্য অসংখ্য হোটেল ও রিসোর্ট রয়েছে। নগরীর দরগাহ গেইটের কাছে বাজেট হোটেল বেশি। এছাড়া যোগাযোগ মাধ্যমও ভালো। বাস, বিমান, রেল সব পথেই সিলেট যাওয়া যায়। আর খাওয়ার জন্য রয়েছে চমৎকার সব রেঁস্তোরা। তবে সিলেটে ঘোরাঘুরির জন্য সিএনজি ব্যবহার করাই ভালো। কারণ অনেক রাস্তায় সিএনজি ছাড়া যাওয়া কঠিন, আর গাড়ি ভাড়া করলে অনেক বেশি খরচ পড়ে যায়।

৩. সাজেক

এই সময়ের জনপ্রিয় গন্তব্য সাজেক। রাঙ্গামাটির বাঘাইছড়ি উপজেলায় সাজেক ইউনিয়নের অবস্থান হলেও যোগাযোগের সুবিধা খাগড়াছড়ি জেলা দীঘিনালা উপজেলা হয়ে যাবার কারণে বেশিরভাগ মানুষ সাজেককে খাগড়াছড়ি জেলায় মনে করে। সমুদ্রপৃষ্ট থেকে ১৮০০ ফিট উঁচুতে অবস্থিত সাজেক মেঘ দেখার জন্য চমৎকার একটি জায়গা। সারা বাংলাদেশ থেকে পর্যটকরা ছুটে আসছেন সাজেকের মেঘ দেখতে। অবিশ্বাস্য শোনালেও সত্য, বৃষ্টি পড়লে সাজেকে জুন মাসেও রাতে কম্বল গায়ে দিতে হতে পারে। তাই এ সময়টায় সাজেক চলে যেতে পারেন। বর্তমানে সাজেকের মূল আকর্ষণ কংলাক পাড়া। খাগড়াছড়িকে সাথে নিয়ে সাজেকের পরিকল্পণা করলে চমৎকার একটা ভ্রমণ হতে পারে। সাজেকের পাড়াগুলো ঘোরার পাশাপাশি যেতে পারেন আশেপাশের কয়েকটি ঝর্ণা ও খাগড়াছড়ির আলুটিলা গুহায়।

এ সময়টায় এরকম মেঘেই ঢেকে থাকে সাজেক। ছবি: শাহীন কামাল

সাজেক যেতে হলে সরাসরি দীঘিনালা আসতে পারলে ভালো। অথবা খাগড়াছড়ি এসে সেখান থেকে দীঘিনালা আসতে পারেন। অবশ্যই সকাল দশটার মধ্যে পৌঁছাতে হবে কারণ নিরাপত্তা জনিত কারণে দীঘিনালা থেকে সাজেক পর্যন্ত সেনাবাহিনী এসকর্ট করে নিয়ে যাবে। সাজেকে থাকার জন্য অসংখ্য রিসোর্ট আছে। মেঘ ভালো দেখা যায় এরকম রিসোর্টে থাকতে পারেন।

৪. শ্রীমঙ্গল:

আমার কাছে শ্রীমঙ্গলকে মনে হয় সারাবছর যাওয়া মতো একটি গন্তব্য। বাংলাদেশের চায়ের রাজধানী নামে খ্যাত মৌলভিবাজারের। এ উপজেলা সব ধরণের পর্যটকদের একটি জনপ্রিয় গন্তব্য। চোখজুড়ানো বিশাল বিশাল সব চা বাগান, লাউয়া ছড়া জাতীয় উদ্যান, মাধপুর লেক, জীব বৈচিত্রে ভরপুর বাইক্কা বিল মিলে শ্রীমঙ্গলকে করে তুলেছে বাংলাদেশের অন্যতম সেরা একটি গন্তব্য। আর আপনার দলের যদি ট্রেকিং করার ইচ্ছা থাকে তবে চলে যেতে পারেন কমলগঞ্জ থানার রাজাকান্দি রিজার্ভ ফরেস্টের মধ্যে থাকা হামহাম ঝর্ণায়। বছরের এ সময়টাতে শ্রীমঙ্গলে ভালোই বৃষ্টি পড়ে বলে তাপমাত্রা সহনীয় পর্যায়ে থাকে। কয়েকদিন হাতে নিয়ে তাই ঘুরে আসতে পারেন শ্রীমঙ্গল থেকে।

লাউয়াছড়া জাতীয় উদ্যান। ছবি: আলবাব

জনপ্রিয়তা বাড়ার কারণে শ্রীমঙ্গলে গড়ে উঠেছে বিভিন্ন মানের রিসোর্ট ও হোটেল। শহরের বাজেট হোটেলগুলোর পাশাপাশি শহর থেকে মাত্র কয়েক কিলোমিটার দূরে গড়ে উঠেছে পাঁচতারকা থেকে শুরু করে একেবারে কম বাজেটের রিসোর্ট। গ্র‌্যান্ড সুলতান, সুইস ভ্যালি, নভেম ইকো রিসোর্ট, নিসর্গ, হিমাচলসহ অধিকাংশ রিসোর্টের অবস্থান রাধানগর এলাকায়। মনে রাখবেন শ্রীমঙ্গলে ঘোরাঘুরির জন্য সিএনজিতে যাতায়তই সাশ্রয়ী, গাড়ী ভাড়া করলে অনেক খরচ পড়ে যাবে। আর শহরের পানসী রেঁস্তোরায় খেতে কিন্তু ভুলে যাবেন না, অন্তত এক বেলা হলেও এখানে খাবেন।

৫. চট্রগ্রাম:

বর্ষাকালে চট্টগ্রাম হয়ে উঠে সবার আকর্ষণের কেন্দ্রবিন্দু। এর প্রধান কারণ হচ্ছে মিরসরাই-সীতাকুন্ডে বিস্তৃত বারৈয়াঢালা জাতীয় উদ্যানের ঝর্ণাগুলো। খৈয়াছড়া, নাপিত্তছড়া, কমলদহ, সহস্রধারাসহ অনেকগুলো ঝর্ণা এ অঞ্চলে রয়েছে। ঢাকা-চট্টগ্রাম মহাসড়কের খুব কাছে বলে এসব ঝর্ণায় হেঁটে পৌঁছানো খুব কঠিন কিছু না। কয়েকদিন বৃষ্টি পড়লেই ঝর্ণাগুলোতে পানি থাকে, তাই গরমের সময় এ সমস্ত জায়গায় যেতে বেশ ভালো লাগে। তাছাড়া চট্টগ্রাম শহরের আশেপাশে দেখার মতো আরও অনেক কিছু রয়েছে। নতুন রূপে সেজেছে চট্টগ্রামের পতেঙ্গা সমুদ্র সৈকত। আনোয়ারার পার্কি সৈকতও দেখার মতো। ফটিকছড়িতে রয়েছে হাজারিখিল অভয়ারণ্য যেখানে ঘুরতে ও তাঁবুতে রাত কাটানোর জন্য যেতে পারেন। এছাড়া মহানগরীরর ফয়েজলেকও এ সময়ের জন্য খুব ভালো একটা জায়গা। সব কিছু মিলে এ সময়টার চট্টগ্রাম হতে পারে একটি আকর্ষণীয় গন্তব্য।

বর্ষার ট্রেকিং করতে চলে যান চট্টগ্রাম। ছবি: সবুজ

সারা দেশের সাথেই চট্টগ্রাম সড়ক, আকাশ ও রেলপথে সংযুক্ত। তবে ট্রেনের টিকেট পাওয়াটা মোটামুটি দুঃসাধ্য ব্যপার। থাকার জন্য চট্টগ্রামে অনেক হোটেল রয়েছে। নগরীর জিইসি মোড়ের আশেপাশে বিলাসবহুল হোটেলগুলো আছে, আর স্টেশন রোডে বাজেট হোটেলগুলো পাবেন।

৬. কক্সবাজার:

কক্সবাজারে বাংলাদেশের সবচেয়ে বেশি পর্যটক বেড়াতে যায়। তবে অনেকেই মনে করেন সমুদ্রে শুধু শীতকালেই যাওয়া উচিত। বিষয়টা সেরকম না, কক্সবাজার বর্ষাকালেও অন্তত একবার যাওয়া উচিত। অন্যতম বড় কারণ ঢেউ। সমুদ্রের বড় বড় ঢেউ দেখার জন্য বর্ষার সময়টাই আদর্শ। তবে পানির রঙ একটু ঘোলা থাকে। আরেকটি উল্লেখযোগ্য বিষয় হলো বর্ষায় কক্সবাজারের মেরিন ড্রাইভ খুব সুন্দর দেখায়। বৃষ্টিতে এক পাশেরও পাহাড়গুলো আরও সবুজ হয়ে যায়, এক পাশে পাহাড় আর অন্য পাশের সমুদ্র ধরে এ মেরিন ড্রাইভ ধরে যাওয়াটা সত্যিকার অর্থেই সারা জীবন মনে রাখার মতো অভিজ্ঞতা। এছাড়া চলার পথে হিমছড়ির আশেপাশে কয়েকটি ঝর্ণার দেখাও পেতে পারেন। ছাদখোলা জীপ গাড়ি ভাড়া পাওয়া যায় সুগন্ধা বিচে, সেখান থেকে গাড়ি ভাড়া করে একেবারে ইনানী সৈকত ঘুরে আবার মেরিন ড্রাইভ ধরেই কক্সবাজার ফিরতে পারেন। দলের অ্যাডভেঞ্চার প্রিয়দেরকে পাঠাতে হবে প্যারাসেইলিং করার জন্য দরিয়ানগর সৈকতে।

মেরিন ড্রাইভ কক্সবাজার। ছবি: ইব্রাহিম কাইয়ুম

কক্সবাজারে বর্তমানে থাকার জন্য হোটেল ও রিসোর্টের অভাব নেই। তবুও এ সময়টায় একটু বেশি মানুষ থাকবে বলে আগে থেকে বুকিং দিয়ে যেতে পারেন। ঢাকাসহ দেশের অনেক বড় শহরগুলোর সাথে কক্সবাজারের সরাসরি বাস চলে।  এছাড়া বিমানেও ঢাকা থেকে কক্সবাজার আসা সম্ভব।

৭. সুন্দরবন:

পৃথিবীর সবচেয়ে বড় ম্যানগ্রোভ বন সুন্দরবন। শুধু বাংলাদেশিরাই না, সারা বিশ্ব থেকেই পর্যটকরা বেড়াতে আসে সুন্দরবন দেখতে। আমাদের দেশের অনেক মানুষই বন পছন্দ করেনা, তাই যাওয়ার আগে নিশ্চিত হয়ে নিবেন আপনার দলের সদস্যদের বনাঞ্চলের প্রতি আকর্ষণ আছে কিনা। সুন্দরবনে রয়েছে মাকড়সার জালের মতো অসংখ্য নদী ও খাল। জাহাজে করে এ বনের মধ্যে দিয়ে ঘোরার সময় চোখে পড়বে নানা প্রজাতীর নোনা পানির গাছ। সুন্দরবনে সহজেই বানর, হরিণ, বন্য শুকর, কুমির ও নানা প্রজাতির পাখি চোখে পড়ে। আপনি যদি মারাত্মক সৌভাগ্যবান হয়ে থাকেন দেখা পেতে পারেন বনের রাজা রয়েল বেঙ্গল টাইগারের। এছাড়া সুন্দরবনের মধ্যে নৌকা নিয়ে ছোট ছোট খালে ঘুরতে যাওয়াটাও বড় ধরণের অ্যাডভেঞ্চার।

সুন্দরবনের হরিণ। ছবি: সৈয়দ আব্বাস

সুন্দরবন দেখার জন্য সবচেয়ে ভালো উপায় হচ্ছে খুলনা বা মোংলা থেকে ছোট ছোট জাহাজে করে ২/৩ দিনের জন্য চলে যাওয়া। জাহাজের ধরণ, খাবারের মান, দিনের উপর নির্ভর করে খরচ মোটামুটি জনপ্রতি আট থেকে দশ হাজার টাকা পড়তে পারে। মোংলা বা খুলনা থেকে বুক করতে পারলে এ খরচ কিছুটা কমে যায়। হাতে যদি একেবারেই সময় কম থাকে তাহলে মোংলা থেকে নৌকা ভাড়া করে করমজল যেয়ে কুমির প্রজনন কেন্দ্র ঘুরে আসতে পারেন।

৮. টাংগুয়ার হাওর:

বাংলাদেশেরে একেবারে উত্তর-পূর্ব দিকে অবস্থিত টাংগুয়ার হাওর। সুনামগঞ্জ জেলার ধর্মপাশা ও তাহিরপুর উপজেলায় এর অবস্থান। প্রায় ১০০ বর্গ কিলোমিটার এলাকাজুড়ে বিস্তৃত এই জলাভূমি ভারতের মেঘালয় রাজ্যের অসংখ্য ঝর্ণার অবদানে তৈরি হয়েছে। সবুজ পর্বতের পটভূমিতে নীল জলের এ হাওরে রয়েছে হিজল, করচা সহ কিছু স্বাদুপানির বনভূমি। অনেক জায়গায় পানি এত স্বচ্ছ যে হাওড়ের তলদেশও দেখা যায়। জুনের প্রথম সপ্তাহে ঘুরতে যাওয়ার জন্য রামসার সাইটটিকে বেছে নিতে পারেন। বৃহত্তর সিলেটে বাংলাদেশের অন্য জেলাগুলোর চেয়ে আগে বৃষ্টি পড়া শুরু হয়। তাই এ সময় হাওরে ভালো পানি থাকার সম্ভবনা থাকবে। তাহিরপুর থেকে নৌকা ভাড়া করে কয়েকটা দিন হাওরে কাটিয়ে দিতে পারেন। যাদুকাটা নদী, শহীদ সিরাজ লেক, হিজল-করচের বন, আর অসংখ্য পাখি দেখে সময়টা ভালোই কাটবে।

টাংগুয়ার হাওড়। ছবি: সায়মন

টাংগুয়ার হাওর যেতে হলে আপনাকে বাসে আসতে হবে সুনামগঞ্জ। সেখান থেকে লেগুণায় বা মোটর সাইকেলে চড়ে তাহিরপুর পৌঁছাতে ঘণ্টা দুয়েক লাগবে। তাহিরপুর থেকে নৌকা ভাড়া করে দুদিনের জন্য ঘুরে বেড়াতে পারেন হাওরে। মনে রাখবেন খোলা হাওরে কিন্তু রোদও লাগবে অনেক, তাই রোদের জন্য ছাতা, সানগ্লাস, ক্যাপ নিবেন। এছাড়া লাইফ জ্যাকেট রাখতে হবে, হাওরে যখন তখন ঝড় উঠতে পারে। আর পানি নিরোধক ব্যাগও সংগে রাখবেন।

৯. রাঙ্গামাটি:

বাংলাদেশের পাহাড়ি জেলাগুলোর মধ্যে অন্যতম জনপ্রিয় ভ্রমণ গন্তব্য রাঙ্গামাটি। এ জেলার মূল পর্যটন আকর্ষণ কাপ্তাই লেক। কর্ণফুলী নদীতে বাঁধ দেয়ার ফলে সৃষ্ট এ বিশাল লেক জলপথে সংযুক্ত করেছে এ জেলার অনেকগুলো উপজেলাকে। ইঞ্জিন চালিত নৌকা নিয়ে বেরিয়ে পড়লে প্রায় সবগুলো জনপ্রিয় গন্তব্য ছুয়ে আসতে পারবেন। কাপ্তাই হ্রদের মূল আকর্ষণ শুভলং ঝর্ণা। মে মাসের শেষ দিকে বৃষ্টি পড়া শুরু হয়ে গেলে ঝর্ণায় ভালো পরিমাণ পানি থাকবে এবং দেখতে অনেক বেশি সুন্দর লাগবে। পথিমধ্যে ‍কোন দ্বীপে দুপুরের খাবার খেয়ে সর্বশেষে পর্যটনের ঝুলন্ত ব্রিজ দেখে ফিরতে পারবেন রাঙ্গামাটি শহরে। এছাড়া কাছাকাছি কাপ্তাই উপজেলাতেও ঘুরে আসতে পারেন সেখানে কায়াকিংও করা যায়।

রাঙ্গামাটির সাথে শুধুমাত্র বাসের যোগাযোগ আছে। সরাসরি বাস যদি আপনার এলাকায় না থাকে তবে চট্টগ্রামে এসে নগরীর অক্সিজেন মোড় থেকে রাঙ্গামাটির বাস পাবেন। থাকার জন্য অনেকগুলো হোটেল আছে।

১০. কুয়াকাটা:

দেশের একমাত্র সমুদ্র সৈকত যেখান থেকে সূর্যাস্ত ও সূর্যদোয় দেখা যায় সেটা হচ্ছে কুয়াকাটা। এক সময় কুয়াকাটা যেতে ৬/৭ টা ফেরি পার হতে হতো। এখন বরিশালের পর থেকে একটা মাত্র ফেরি পার হতে হয়। কুয়াকাটায় হতে পারে এ সময়ের একটি চমৎকার গন্তব্য। এর সাথে যদি নদীপথ যোগ করতে পারেন, তাহলে ভ্রমণের মজাটা বেড়ে যাবে কয়েকগুণ। ঢাকা থেকে বরিশাল বা পটুয়াখালী যেয়ে সেখান থেকে বাসে কুয়াকাটা যেতে পারেন। পটুয়াখালী জেলায় অবস্থিত কুয়াকাটায় দর্শণীয় অনেকগুলো জায়গা আছে। প্রায় ১৮ কিলোমিটার লম্বা সমুদ্র সৈকত তো রয়েছেই। এর দুপাশে দুটি ম্যানগ্রোভ বন, যেগুলো দেখতে সুন্দরবনের মতোই। ভোরে সূর্যদয় ও সন্ধ্যায় সূর্যাস্ত উপভোগ করার জন্য এগুলোতে যেতে পারে। এ ছাড়া কুয়াকাটার নাম যে কারণে কুয়াকাটা হয়েছে সে কুয়া, কয়েকটি বৌদ্ধ মন্দির, শুটকি পল্লী, রাখাইন মার্কেট এসব জায়গায় যেতে পারবেন। সৈকত থেকে স্পীডবোটে তিন-চার কিলোমিটার সমুদ্রের দিকে যেয়ে ঘুরে আসাও যায়।

কুয়াকাটা সমুদ্র সৈকত। ছবি: মাহি

কুয়াকাটায় থাকার জন্য এখন অনেক ভালো ভালো হোটেল রিসোর্ট হয়েছে। তবে ঈদের সময় গেলে আগে থেকে বুকিং দিয়ে যাওয়াই ভালো। খাবারের ব্যবস্থার দিক থেকে কুয়াকাটা এখনো পিছিয়ে আছে। জিরো পয়েন্টে কিছু খাবারের হোটেল আছে সেখানে খেতে পারেন। তবে ভালো হয় হোটেলে বলে রান্না করিয়ে খেলে। এছাড়া ভাজা মাছ/কাঁকড়া খাওয়ার আগে দেখে নিবেন এগুলো তাজা কিনা।

কিছু পরামর্শ:

বর্ষায় বের হবার সময়ে ভ্রমণে কিছু জিনিস অবশ্যই খেয়াল রাখবেন:

  • গরম ও বৃষ্টি দুটোর জন্যই প্রস্তুত থাকবেন। ছাতা/রেইনকোট ছাড়াও মোবাইল ও মানিব্যাগের সুরক্ষার জন্য অতিরিক্ত পানি নিরোধক ব্যাগ (জিপলক ব্যাগ হলেও চলবে) সঙ্গে রাখতে পারেন।
  • বহন যোগ্য পানির বোতল রাখতে পারেন। বিশেষত সঙ্গে বাচ্চারা থাকলে অবশ্যই রাখবেন।
  • গরমের জন্য সানগ্লাস/ক্যাপ/হ্যাট ব্যবহার করতে পারেন।
  • হাওর/ঝর্ণা এসমস্ত জায়গার জন্য লাইফজ্যাকেট সঙ্গে নিবেন। এখন অনেক জায়গায় লাইফ জ্যাকেট ভাড়া পাওয়া যাবে।
  • যে সমস্ত জায়গা সীমিত পরিমাণ আবাসন আছে, সেখানে অবশ্যই আগে থেকে বুকিং দিয়ে যাবেন।
  • রাস্তাঘাটে ট্র‌্যাফিক জ্যামের খোঁজ খবর নিয়ে বের হবেন, যাতে জ্যামে পড়লে অন্তত সঙ্গে শুকনো খাবার ও পানি থাকে।

সকলের ভ্রমণ আনন্দদায়ক হোক

ফিচার ছবি: সায়মন হোসেন

About vromonguru

Check Also

মসজিদের শহর খলিফাতাবাদ: খান জাহান আলীর মাজার

ভোর হল দোর খোল খুকুমনি উঠোরে। খুকুমনিরা উঠে গেলেও ঘুম ভাঙ্গে না ওয়াফি মনির। সেই …

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *