Home ভ্রমণ তথ্য পায়ে হেঁটে রংপুর বিভাগ ঘুরে দেখা – ২য় দিন

পায়ে হেঁটে রংপুর বিভাগ ঘুরে দেখা – ২য় দিন

160
0

উলিপুর – কুড়িগ্রাম – বড়বাড়ী – লালমনিরহাট – কাউনিয়া

(১৮.১৪ + ৩৭.৭৫ + ১১.৩৪) = ৬৭.২৩ কিলোমিটার

আজকেও এর্লামের আগেই ঘুম থেকে উঠেছি। ভোর ৫টা ৩০ মিনিটে এর মধ্যে ফ্রেশ হয়ে, নাস্তা করে, রেডি হয়ে বসে আছি। বাইরে তখনও অন্ধকার, একা যেতে হবে তাই নিরাপত্তার কথা চিন্তা করে আরো ৩০ মিনিট পর বের হওয়ার সিদ্ধান্ত নিলাম। রাতে ফেসবুকে পোস্ট দিয়ে ঘুমিয়ে গিয়েছিলাম, তাই এই সুযোগে ফেসবুকে নোটিফিকেশন চেক করে নিলাম। ঝটপট কিছু কমেন্টের রিপ্লাইও দিলাম।

৬টার দিকে বের হয়ে, কেসি (কুড়িগ্রাম-চিলমারী) রোড ধরে হাঁটা শুরু করলাম। আমি একা হাঁটছি বললে ভুল হবে, আমার সামনে পিছনে আরো প্রায় ৬০/৭০ জন নারী ও পুরুষ হাঁটছেন। কয়েকজন আবার দৌঁড়াচ্ছেন। একজন আবার দেখলাম নিজে স্ট্রেচিং করছেন, আবার অন্যদেরকেও তারমতো করে স্ট্রেচিং পরামর্শ দিচ্ছেন। উলিপুরের মানুষ এতো স্বাস্থ্য সচেতন, আজকে সকালে বের না হলে হয়তো জানাই হতো না৷

চোখ জুড়ানো শাপলার বিল।

যাইহোক, আমি হাঁটছি। রাস্তার দুধারে শাপলার বিল – একের পর এক শাপলার বিল অতিক্রম করছি। মাঝে মাঝে দাঁড়াচ্ছি, দূরে কাউকে মাছ ধরতে দেখলে মাছ ধরতে পেরেছে কিনা জানতে চাচ্ছি। বেশির ভাগ ক্ষেত্রেই উত্তর পাচ্ছি না, তারপরও আমি জিজ্ঞাসা করেই যাচ্ছি। এভাবেই ঘণ্টা খানেক হাঁটার পর একটা বাজারে পৌঁছাই, বাজারের নাম মিনা বাজার। মিনা বাজারে এককাপ চা খেয়ে দুর্গাপুরের দিকে হাঁটা শুরু করি। এই দুর্গাপুরকে কেউ পঞ্চগড় কিংবা বিরিশিরির দুর্গাপুর মনে করে ভুল করবেন না। বাংলাদেশে যে কতগুলি দুর্গাপুর আছে, আমি জানিনা!

দুর্গাপুর যাওয়ার পথে একটা ক্লাস ফোরে পড়া বাচ্চা মেয়ে দেখলাম ভ্যাঁ ভ্যাঁ করে কান্না করছে। ওর কান্নাটা অনেকটা আমার ছোটবোনটার মতো। বাচ্চাটা একাই ছিলো, এগিয়ে গিয়ে কি হইছে জানতে চাইতেই ভাঙ্গা ভাঙ্গা কণ্ঠে যেটা বললো, সেটা শুনে বুঝলাম সকালে উঠে পড়তে বসে নাই এর জন্য ওর মা ওকে মারছে। তাকে বুঝিয়ে বাসায় পাঠিয়ে দুর্গাপুরের দিকে হাঁটা দিলাম। দুর্গাপুরে আরেক কাপ চা খেয়ে আবার হাঁটা শুরু করলাম।

সাপুড়ের বাড়ি, আকাশ তাদের ছাদ।

কিছুদূর যেয়ে পাঁচপীর বাজারের কাছে রাস্তার পাশে কিছু সাপুড়ের অস্থায়ী নিবাস দেখতে পেলাম। ওনারা রান্নার প্রস্তুতি নিচ্ছিলো, আমি গিয়ে কিছুক্ষণ কথাবার্তা বলে সকালের নাস্তা করানোর প্রস্তাব দিলে ওনারা না করতে পারলেন না। ওনাদের মধ্যে ২ জনকে নিয়ে প্রায় ৪০ জনের গ্রুপের জন্য পাশের বাজারের হোটেলে ৭৫টা পরাটা আর ৪০টা ডিম ভাজির অর্ডার দিয়ে, চা চাইলাম। কিন্তু হোটেল বয় ওনাদের চা দিতে কেমন যেনো ইতস্ততবোধ করলো। অনেকটা বাধ্য হয়ে ওখান থেকে চা না খেয়ে বের হতে হলো। বাইরে এসে অবশ্য অন্য দোকানে চা খেয়েছি।

চা খেয়ে ওনাদেরকে বিদায় দিয়ে, আমি আবার হাঁটা শুরু করি। কিছুক্ষণ হাঁটার পর রাস্তার পাশে একটা ডোবায় কয়েকটা রাজহাঁস দেখে দাঁড়িয়ে পড়ি। কিছুক্ষণ ওদের দুষ্টুমি দেখে আবার হাঁটা শুরু করি। হাঁটতে হাঁটতে পৌঁছে যাই জতিনের হাটে, এ হাটের বিশেষ একটা দিক হচ্ছে এর একটা অংশ উলিপুরের আরেক অংশ কুড়িগ্রামের।

সার্কিট হাউজ কুড়িগ্রাম

এবার সাড়ি সাড়ি মেহগনি গাছের মাঝের রাস্তা ধরে কুড়িগ্রাম সার্কিট হাউজের পথে হাঁটা। সাড়ে নয়টার আগেই পৌঁছে গেলাম সেখানে। তারপর একটা ছবি তুলে সোজা চলে গেলাম ভাতের হোটেলের খোঁজে। ডাল, আলু ভর্তা, ডিম ভাজি দিয়ে ভাত খেয়ে কুড়িগ্রাম শহরটা খানিকটা ঘুরে দেখলাম।

এবার আমি যাবো লালমনিরহাট। আরকে (রংপুর – কুড়িগ্রাম) রোড ধরে প্রথমে হাঁটা শুরু বড়বাড়ি হাটের উদ্দেশে। পথে একজনকে দেখলাম শখানেক শূকর নিয়ে কোথায় যেনো যাচ্ছেন। শূকরের পেছনে পেছনে যাচ্ছে ডজন খানেক ছোট ছেলেমেয়ে। ওই লোকটাকে আমার কেনো জানি,  হ্যামিলনের বাঁশিওয়ালার মতো মনে হচ্ছে।

বিদায় কুড়িগ্রাম জেলা।

ঘণ্টা দুয়েক হাঁটার পর বড়বাড়ির হাঁটে পৌঁছাই। এরমধ্যে আমি অবশ্য কুড়িগ্রাম জেলা পাড় হয়ে লালমনিরহাট জেলায় প্রবেশ করেছি। আজকে হাটবার হওয়ায় দূর দূরান্ত থেকে মানুষ বিভিন্ন জিনিসপত্র কেনা বেচার জন্য হাটে এসেছে। আকাশ খানিকটা মেঘলা থাকায় ঠাণ্ডা ঠাণ্ডা একটা ভাব ছিলো, ভালোই আগাচ্ছিলো। তাই বড়বাড়ির হাটে দেরি না করে লালমনিরহাট সদরের দিকে হাঁটা শুরু করলাম।

লালমনিরহাট – কুড়িগ্রাম বাদে রংপুরের প্রায় সর্বত্রই তুমুল বৃষ্টি হচ্ছিলো। আম্মু, ভাইয়া, রিফাতসহ বেশ কয়েকজন কল দিয়ে বৃষ্টির আগাম হুশিয়ারি বার্তা দিচ্ছিলো। লালমনিরহাট সদর থেকে তখনও প্রায় ৪ কিলোমিটার মতো দূরে আমি, হঠাৎ সবার ভবিষ্যতবাণী মেনে শুরু হলো তুমুল বৃষ্টি। বজ্রপাত অবশ্য ছিলো না, তাই সাহস করে মোজা খুলে মোবাইল ঠিক মতো রেখে ছাতা বের করে হাঁটা শুরু করি। কিছুক্ষণ পর অবশ্য বৃষ্টি থেমে যায়।

সার্কিট হাউজ লালমনিরহাট।

দুপুর ২টা বাজার আগেই লালমনিরহাট সার্কিট হাউজে পৌঁছাই, দুপুরে এখানেই খাওয়া ও রেস্ট করার প্ল্যান ছিলো। কিন্তু আকাশের মতিগতি দেখে আরো কিছু পথে এগিয়ে রাখতে, সেখান থেকে মোস্তফির হাটে যাওয়ার সিদ্ধান্ত নেই। লালমনিরহাট থেকে প্রায় পৌনে দুই ঘণ্টা হাঁটার পর মোস্তফির হাটে পৌঁছালাম। জায়গায় জায়গায় ভাঙ্গা পাথর বিছানো রাস্তা মোটেও হাঁটার উপযোগী ছিলো না। এই পথটুকু হাঁটতে বেশ কষ্ট হয়ে গেছে।

মোস্তফির হাটে যখন পৌঁছাই তখন ঘড়িতে সময় প্রায় বিকেল ৪টা। প্রচুর ক্ষুধা লাগছে, তাই মোস্তফির হাটে পৌঁছে সবার আগে ভাতের হোটেলে সন্ধানে নেমে পড়লাম। হোটেল খুঁজতে খুঁজতে একজন বৃদ্ধ ভিক্ষুককে পেয়ে গেলাম। ওনাকে নিয়ে হোটেলে খেতে গেলাম, উনার কি খেতে ইচ্ছে করে জিজ্ঞেস করায় উনি খাসির মাংসের কথা বললেন। ওনার ইচ্ছা পূরণের জন্য দুইজনের জন্য খাসির মাংস আর ভাত অর্ডার করলাম। খেতে খেতে ওনার সাথে কিছুক্ষণ গল্প করলাম।

ওনার নাম আব্দুল জব্বার, বাসা রাজারহাট। দুই ছেলে, এক মেয়ে। স্ত্রী মারা গেছেন ৫/৬ বছর আগে। জমিজমা যেটুকু ছিলো তিস্তা নদীতে বিলীন হয়ে গেছে। মেয়ের বিয়ে দিয়েছেন বুড়িমারীতে, মেয়ে জামাইসহ ঢাকায় থাকে। ছেলেরাও বিয়ে করে আলাদা থাকে, ওনাকে দেখে না। সারাদিন ভিক্ষা করে, রাত হলে বাঁধের রাস্তার নিচে এক ঘরের একটা বাড়িতে থাকেন। বাইরে টুপটাপ বৃষ্টি তখনও হচ্ছে, তাই খাওয়ার পরও কিছুক্ষণ আড্ডা চলবো। ওনাকে দুইটা খিলি পান এনে দিয়ে, বিদায় নিলাম। উনি অবশ্য বিড়ি চাইছিলেন, না কিনে দেয়ায় মনে হয় কিছুটা মন খারাপ করেছে। আশার সময় দেখলাম করুণ চোখে তাকিয়ে আছে।

আন্তর্জাতিকভাবে বহুল আলোচিত উত্তরের দুঃখ তিস্তা নদী

যাইহোক, মুহূর্তের মধ্যে কেমন একটা মায়া পড়ে গিয়েছিল লোকটার উপর। মোস্তফির হাট থেকে তিস্তার দিকে হাঁটছি আর ভাবছি লোকটার সাথে একটা ছবি তুুললে হয়তো ভালো করতাম। যাইহোক, ছাতা মাথায় ঘণ্টা খানেক হাঁটার পর তিস্তা ব্রিজে পৌঁছালাম। রাস্তার গাড়িগুলো একটার পর একটা রাস্তা পাশে জমে থাকা কাঁদা পানি দিয়ে আমাকে ভিজায় দিয়ে যাচ্ছে, জিনিসটা আমি বেশ উপভোগ করছি।

ছাতা নিয়ে ধীরে ধীরে হাঁটছি তারপরও মনে হচ্ছে রাস্তা ভালোই এগুচ্ছে, নিজের এলাকার পরিচিত রাস্তা তাই হয়তো এমন মনে হচ্ছে। হাঁটতে হাঁটতে একজায়গায় একটা মাইল পোস্টে দেখলাম গাইবান্ধা ১০০ কিলোমিটার দূরে। কালকেই গাইবান্ধাতে ছিলাম, আর কয়েক ঘণ্টায় সেখান থেকে পায়ে হেঁটে ১০০ কিলোমিটার দূরে চলে এসেছি এটা ভাবতেই ভালো লাগছিলো।

গতকালের আবাস আজকেই কতদূর

হাঁটতে হাঁটতে তিস্তা বাসস্ট্যান্ড ক্রস করে, তিস্তা ব্রিজে চলে আসলাম। তখনও টুপটাপ বৃষ্টি পড়েই যাচ্ছে। তিস্তা ব্রিজ তিস্তা নদীর উপর অবস্থিত। এই ব্রিজেই লালমনিরহাট জেলার সীমানা শেষ, আর রংপুর জেলার সীমানা শুরু।

তিস্তা ব্রিজে একটা পিচ্চি কুশার (আঁখ) বিক্রেতার সাথে কিছুক্ষণ থেকে লালমনিরহাট জেলাকে বিদায় জানিয়ে রংপুর জেলায় প্রবেশ করলাম। চিরচেনা এই রাস্তাটা আমার কেনো জানি একটু বেশিই আপন লাগছিলো, গত দুইদিনের কথা চিন্তা করতে করতে তিস্তা ব্রিজ থেকে কাউনিয়ার দিকে যাচ্ছিলাম। কাউনিয়া পৌঁছে কয়েকজন শুভাকাঙ্ক্ষীর সাথে দেখা করে বাড়ির পথে হাঁটা ধরলাম। ততক্ষণে অবশ্য রিফাতও চলে এসেছিলো, দুই ভাই মিলে বাকি পথ গল্প  করতে করতে বাড়িতে আসি।

খোদা হাফেজ লালমনিরহাট

আজকে রাতে নিজের বাড়িতে, নিজের বিছানাতেই থাকছি৷

বৃক্ষরোপণ আপডেট:
উলিপুরের দুর্গাপুরে ২টা অর্জুন গাছ, কুড়িগ্রামে ৪ টা আম গাছ এবং বড়বাড়ীতে ২টি নিম ও ২টি মেহগনি গাছ লাগানো হয়েছে। এখন পর্যন্ত লাগানো মোট গাছের সংখ্যা ৪৬!

লেখক: মোঃ সোহেল রানা সোহান

4O0KM WALKING CHALLENGE : RANGPUR DIVISION

#WalkRangpur

#StopChildAbuse 

#SayNoToChildMarriage

#PlantTreesSaveEnvironment

#AutismWorldWantsYourAttention

#Firefitnessclothing

#RunWithBari

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here