খুব ভোরে উঠার ইচ্ছা থাকলে ক্লান্ত দেহঘড়ি কি সায় দেয় সে কথা। আবার যদি শীতাতপ নিয়ন্ত্রিত কামরা হয় পরিব্রাজক দেহে তো আরও বেশি জং ধরে। তাই বেশ ভাল ঘুমিয়ে কাটিয়ে দিলাম। যখন ঘুম জাগানিয়া পাখি ডেকে গেল ঘড়িতে বাজে ৮টা। হায় সর্বনাশ, অরুনিমা যাওয়া হবে না আজ। ওয়াফি গণ্ডারের মত ঘুমাচ্ছে। ডাক দিলাম কিন্তু উঠলো না। তার ঘুম ভাঙানিয়া পাখি বোধ হয় বলছে আমাকে ঘুমাতে দাও। সেই পাখিকে বাড়ি দিয়ে উঠালাম। কথিত আছে গণ্ডারকে মার দিলে সাত দিন পর টের পায়। তাই ব্যথা পেল কি না সে নিয়ে এত ভাবুলুতা দেখলাম না।

মধুমতির তীরে। ছবি: লেখক

হোটেলে ব্যাগ রেখে গেলাম। চেক আউট করিনি। তবে চাবি দিয়ে গেলাম কেয়ার টেকারের কাছে। যদি ভাড়া পায় আমাদের ব্যাগ অন্য রুম বা অফিস রুমে রাখলেই চলবে বলে বের হয়ে গেলাম সেখান থেকেই। সকালের মিষ্টি শরীরে মাখিয়ে পথিক আমরা রওনা হলাম চা খেয়ে। আবার সেই রূপগঞ্জ বাস টার্মিনাল। সেখান থেকে উঠবো কালিয়া যাবার বাসে। বাস স্ট্যান্ড নেমে দেখলাম ৮:৫০ বাজে।

পেজা তুলার মত মেঘ। ছবি: লেখক

থেমে আছে কালিয়া যাবার বাস। সে থেমে থাকার মাঝেও যেন কি অস্থিরতা। জিজ্ঞেস করলাম ওহে নাস্তা খাওয়া যাবে বাছা, বলিয়া উঠিলো হেল্পার কাজ করিও না কাচা, ঠিক নয়টা গাড়ি ছাড়বে এক মিনিট হবে না লেট, এরপরের কালিয়ার গাড়ি এক ঘণ্টা পরে ওই দেখা যায় হোটেলের গেট। তার সাথে আলাপ করিতে গিয়ে দুইটা মূল্যবান মিনিট গচ্চা গেল। হোটেলে ঢুকে গাপুস গুপুর করে মেরে দিলাম দুইটা ডিম পোচ, ভাজি, রুটি মারবো না কেন ভাই ওয়াফির সাথে বেধেছি যে জুটি। নাক মুখে খাবার পরও দুই মিনিট দেখলাম বাকি আছে। তাড়াতাড়ি বিল দিয়ে ঝড়ের বেগে বাসে উঠলাম। কেউ কথা রাখে না কিন্তু কথা রেখেছে কালিয়ার বাস। এক মিনিটও দেরি করেনি।

যাত্রী। ছবি: লেখক

চিত্রা ব্রিজ পার করে ছুটে চলছে আমাদের বাস। আকাবাকা চিত্রা ব্রিজ বেশ অদ্ভূত সেপ। তবে নড়াইলবাসীর প্রাণ বলতে হবে এই চিত্রা ব্রিজ। আমি কিন্ডেলে বই পড়ায় ব্যস্ত আর ওয়াফি গান শুনতে। প্রতিবার কার মুখ দেখে উঠি জানি না, তবে জগৎ পিতার কৃপায় আজকে আমার সিটে এক হিজাবো সুশ্রী ললনা বসলো। আরাম করে বসার জন্য ওয়াফির পিছে বসা সাপেবর যেন হয়ে গেল। বাস ছুটছে, মনে কি আনন্দ। তবে কথা বলার কোন টপিক খুঁজে পাচ্ছিলাম না। আমাদের অরুনিমা যাবার কথা শুনেই মেয়েই নিজেই টপিক যেন পেয়ে গেল। কিন্নর কণ্ঠে বলে উঠলো ভাইয়া আপনার কোথায় যাবেন।

মধুমতি নদী। ছবি: লেখক

আমাদের অরুনিমা যাবার কথা শুনে বললো আজকে গেলে আর নৌকা বাইচ দেখতে পারবো না। বরং কালিয়ায় উদয় শংকরের বাড়ি ও রথ মন্দির দেখে ফিরতে বললো। বাস আমাদের নামিয়ে দিবে বারুইপারা। সেখান থেকে নৌকা দিয়ে পার হলে কালিয়া উপজেলা শহর। কথার পৃষ্ঠে জানতে পারলাম ললনার কর্মস্থল নড়াইল, পৌর বিদ্যুৎ অফিসে চাকুরি করে বারুইপারা যাচ্ছে অফিসের কাজে। এরপর অনেক সুখ-দুঃখের কথা হলেও নামটি জানা হল না। বারুইপারা নেমে যে যার পথে। ক্ষণিকের মুগ্ধতা যাযাবরের জন্য ভাল, আমার মুগ্ধতায় কোন ক্লেদ নেই।

হইয়ে যাক সেলফি

বারুইপারা থেকে ভ্যানে চলে এলাম কালিয়া যাবার নৌকা ঘাটে। মাঝি নৌকা ছেড়ে দিবে এখনই লাফ দিয়ে উঠে পরলাম আমরা দুজন। শরতের আকাশে পেঁজা তুলার মত মেঘের সন্ধান পেলেও মধুমতি জলে পড়েছে আকাশের বিষণ্নতা। ঘুরতে বের হলে আমাদের সাথে এমন করে কেন জগৎ পিতা। গুনে গুনে কি সেদিন বৃষ্টি হতে হবে। মেঘের লুকোচুরি খেলায় মগ্ন হয়ে মধুমতি পারি দিয়ে এপার আসলাম। কালিয়ার মাটিতে পা দেবার মাত্রই যেন পুরো আকাশ পরিষ্কার হয়ে গেল, আব তেরা কেয়া হোগারে কালিয়া। সকাল ৯টার গাড়িতে উঠে কালিয়া আসতে দুই ঘণ্টা লেগে গেল। অথচ মাত্র ৪০ কিলোমিটার রাস্তা। তাই অরুনিমা যাবার প্ল্যানটা বাদই দিয়ে দিলাম। এখান থেকেও বেশ দূরে আরুনিমা।

এই সেই বরফ গোলা। ছবি: লেখক

শহরের বাজারে নামিয়ে দিল আমাদের ভাড়া করা ভ্যান। এখান থেকে আর এক ভ্যানে আমাদের নিদিষ্ট গন্তব্যে যেতে হবে। এর আগেই ওয়াফির স্বপ্নালু চোখে খুশির ঝিলিক দেখলাম, এর মানে আশেপাশে কোন খাদ্যের সন্ধান পেয়েছে। তবে ওর এই আবিষ্কারের বাহবা দেওয়া যায়। কত বছর পর বরফ গোলা খেলাম তার কোন হিসাব নাই। চলে গেলাম শৈশবে। শরবতয়ালা মামা শরবত, বরফ গোলা দুইটাই বিক্রি করে। প্রথমে শরবতই নিলাম লেবুর। হালকা লাল ফুড কালার মিশালে দেখতে বড় সুন্দর লাগে। এরপর মামা আমাদের বরফ গোলা বানিয়ে দিল। বরফ কুচির সাথে লেবু, তোকমা, সাগু দানা দেবার পর একটা ঘুটা দিয়ে দুই টাকার লিচু জেলি দিয়ে দিল এর ভিতর। সত্যি বলতে আজ সকালে কালিয়া না আসলে দিনটা বৃথা যেত। এই বরফ গোলা খাওয়ার জন্য হলেও কালিয়া আসা উচিত।

রথও দেখলাম, কলাও বেচলাম। ছবি: লেখক

খাদ্যরাজ্যের সকাল বেলা ভাল মত না খেলে আবার দেহে তেল পায় না। পাশের দোকানেই ছোলা আর মুরগীর পা, আলুর চপ, বেগুনী, সিংগারা ভাজছে। সাত পাঁচ না ভেবেই ছোলা বুটের সাথে চপ, মুরগীর পা, সিংগারা নিয়ে নিল। তার খাওয়ার মাঝেও একটা শিল্প আছে। মনে আছে আমাদের সাথে পাবনার ট্যুরে একাই সে এক লিটার কাচা দুধ খেয়ে ফেলেছিল। তবে তার যা ম্যাসল সব হজম করে ফেলে। এত খাওয়ার মাঝেও ক্ষেমা দিলেও হত। সে কি আর হয়।

ও বন্ধু লাল গোলাপি। ছবি: লেখক

এবার মালাই চা খেতে কাচা বাজারের ভিতরের ঢুকে খুঁজতে লাগলাম। ছোটলোক মামুনের দোকান না কি কাচা বাজারের ভিতরে আর অত্র এলাকায় তার দোকানেই শুধু মালাই চা পাওয়া যায়। তবে তার ছোটলোক মামুন নাম কেন হল সেইটার কোন সংজ্ঞা খুঁজে পেলাম না। শিকারি নেকড়ের মত ওয়াফি খুঁজে পেল চায়ের দোকান। তার চায়ের দোকানে পাশেই কাচা শাক সবজি নিয়ে বসেছে বাজারি।

ওয়াফি যখন পোজ মারায়। ছবি: লেখক

তবে বলতে হবে ছোটলোক মামুনের চা বানানোর হাত বেশ ভাল। চায়ের সাথে কালিয়া উপজেলা শহরের বানানো কেক না হলে কি চলে। পুরো গল্পে ওয়াফির খাওয়া নিয়ে যা লিখেছি পুরো একটা উপন্যাস হয়ে যাবার কথা। যাই হক এবার খাওয়া পর্ব শেষ। ভ্যান ঠিক করে রওনা হলাম প্রথম গন্তব্য রথ মন্দিরে। ভ্যান প্রথম নিয়ে গেলে আমাদের রথ মন্দিরের কাছে।

গোলাপের ঐতিহ্য। ছবি: লেখক

গেটের বাহিরে থেকে প্রথমেই একটা পুরান ভবন চোখে পড়লো। ভবনের কোন ইতিহাস বা পাতিহাসের সাইনবোর্ড দেখতে পেলাম না বিধায় বুঝতে পারলাম না এর বয়স, এর কালের বোঝা বয়ে যাওয়ার গ্লানি। তবে ভবনের ডান পাশেই এক সারিতে পাঁচটি মন্দির। প্রথমটি দূর্গা মন্দির এরপর যথাক্রমে ব্রহ্মময়ী মন্দির, লক্ষ্মী নারায়ণ মন্দির, শিব মন্দির এরপর শেষে বিখ্যাত ঐতিহ্যবাহি সেই রথ মন্দির। সেই রথ মন্দিরের ভিতরের আছে পিতলের রথ।

গোলাপিরা মাঠে। ছবি: লেখক

এই রথ মন্দিরটি কালিয়া উপজেলার প্রায় শত বছরের ইতিহাস ও ঐতিহ্যের ধারক ও বাহক। ভামিনীরঞ্জন সেনের রথখোলা দেবত্র মন্দিরটি ১৯০২ সালে প্রতিষ্ঠিত হয়। এরপর কেটে গেল ১১৭ বছর। এখন প্রতি জুলাই মাসে রথকে কেন্দ্রে করে গড়ে উঠে সনাতনীদের মিলন মেলা। সেখানে সোজা রথ উলটা রথ দুইটাই হয়। এখানে বেশ কিছুক্ষণ সময় কাটিয়ে এবার আমরা বের হলাম উদয় শংকরের বাড়ির উদ্দ্যেশে।

আমার পুরানো ভ্রমণ গল্প গুলো পড়তে চাইলে নিচের লিংকে চলে যান:
https://www.vromonguru.com/author/ashik/

আমার গল্প, কবিতা, প্রবন্ধ পড়তে চাইলে ঘুরে আসতে পারেন আমার ফেসবুক পেজ থেকে:
https://www.facebook.com/sarwar.ashik786

এর বাহিরেও আমাদের নিজস্ব ভ্রমণ গ্রুপ শেকড় সন্ধানীর মাধ্যমে নিয়মিত এ রকম বাংলার পথে ভ্রমণের আয়োজন করা হয়। ইচ্ছা থাকলে পাঠক আপনিও হতে পারেন আমাদের পরবর্তী ভ্রমণের সঙ্গী। আমাদের সাথে যোগাযোগের বিস্তারিত নিচে দেয়া হলো।

Roots Finder – শেকড় গ্রুপের সাথে থাকুন:
https://www.facebook.com/groups/459880764416865/

Roots Finder – শেকড় পেজ লিঙ্ক:
https://www.facebook.com/rootsfinder.bd/

শেকড় সন্ধানী দলের এডমিনদের নাম্বার:
ঈসমাইল হোসেন – ০১৭৫৬১৭১৫৭০
আশিক সারওয়ার – ০১৮৬৬৬৬৩৪২৩
শরীফ জামান – ০১৫৩৫৪৫৩৯৭৭

ঘুরেন দেশের পথে, খুঁজে ফিরুন নিজের শেকড়।

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here