আবহাওয়ার পূর্বাভাসে ১৩ সেপ্টেবর সারাদিন আলীকদম এলাকায়  থেমে থেমে বৃষ্টির সম্ভাবনা দেখাচ্ছে, আরো বিস্তারিত পর্যালোচনা করে দেখা গেলো দুপুর ১২ টার পর থেকে প্রতি এক ঘণ্টা অন্তর বৃষ্টির সম্ভাবনা। কিন্তু সন্ধ্যা ৬ টার পর থেকে বৃষ্টি থাকবেনা পরেরদিন ভোর ৫ টা পর্যন্ত। এরকমভাবে বৃষ্টি আর আবহাওয়া নিয়ে গভীর পর্যালোচনা ও পর্যবেক্ষণের মূল কারণ পূর্নিমা রাতকে ঘিরে আলীকদম থানায় মিরিঞ্জা রেঞ্জের সর্বোচ্চ চূড়া ‘মারায়ন তং জাদি ‘তে ক্যাম্পিংয়ের পরিকল্পনা। প্রায় ১৬৬০ ফুট উচ্চতার এই চূড়া থেকে উপভোগ করা পূর্নিমার ঝলসে দেওয়া আলো আর হিম হিম ঠাণ্ডায় মেঘেদের উড়াউড়ি। সাথে গান গল্প আর পাহাড়কে খুব কাছে থেকে উপভোগ করা কিংবা তার সাথে মিশে যাওয়া 

পাহাড়ের ভাজে ভাজে আদিবাসী বাড়ি। ছবি: লেখক

ক্যাম্পিংয়ের পরিকল্পনা প্রথমেই আমাকে জানায় দুই সপ্তাহ আগে তাহান ভাই। উনি পুরান ঢাকার কাছাকাছি আরসিন গেট এলাকায় থাকে। পরিচয় ঘুরাঘুরি করা মানুষদের মাধ্যমেই। গতবছর মুন্সীগঞ্জ, নরসিংদীর ক্যাম্পিং ট্যুরগুলোতে ছিলেন আমাদের সাথে। সেই থেকে আমার সাথে বেশ খাতির হয়ে গেছে। দুজনে মিলে অনেক অনেক পরিকল্পনা করি, কিন্তু বাস্তবতার মুখ দেখে খুব সামান্য। তো এবারের পরিকল্পনার কথা জানালেন যে, এই পূর্নিমার রাতে কোথাও ক্যাম্পিং করতে চান এবং সেটা অনেক যদি কিন্তুর বেড়াজালে আবদ্ধ রেখে। ওনার ডিপার্টমেন্ট থেকে পরীক্ষার তারিখ ঘোষণা হলে উনি যেতে পারবেন না, যদি তারিখ ঘোষণা না হয় তাহলেই যেতে পারবেন। 

মারায়ন তং চূড়া থেকে। ছবি: রাকিব অপু

ওনার পরিকল্পনা শুনে আমি অবাক, খুব একটা পাত্তাও দিলাম না। ওনার নিজেরই ঠিক নেই আমি আর কি করবো এরকম ভাবলাম। এর সাথে আস্তে আস্তে যুক্ত করা হলো রাকীব অপু, শাহাদাত হোসেন ও রাজন ভাইকে। রাকীব ভাই টিজিবির ট্যুরে হোস্ট হিসেবে সাজেক যাবে তাই উনি আমাদেরকে শুভ কামনা জানিয়ে দিলেন সাথে সাথে কোথায় যাবো এরকম বিভিন্ন পরামর্শও দিলেন। শাহাদাত ভাই চট্টগ্রামে থাকেন, ওনার কাছে মেহমান যাবে তাই উনিও না করে দিলেন। আমরা গেলে রাজন ভাই যেতে রাজী। মূল সমস্যা তাহান ভাইকে নিয়ে, উনি পরিকল্পনাকারী হয়েও নিজেই নিশ্চিত নয় যাবে কিনা। সাথে সাথে এটাও নিশ্চিত নয় আমরা কোথায় যাচ্ছি!

মারায়ন তং চূড়ার গতবছর এর চিত্র। ছবি: রাকিব অপু

সম্ভাব্য স্থানের তালিকায় নাম উঠে আসলো মিরসরাইয়ের কোনো ঝর্ণা, বান্দরবানের কোনো পাহাড় কিংবা ঝর্ণা, কক্সবাজারের মেরিন ড্রাইভ অথবা সোনাদিয়া দ্বীপ। শেষতক আলীকদমের মারায়ন তং চূড়ায় রাত্রিযাপন ও সূর্যোদয় দেখার সিদ্ধান্ত নিতে পারলাম। কিন্তু আবহাওয়ার খোঁজ নিতে গিয়ে পেলাম বৃষ্টির সমুহ সম্ভাবনা। সাথে এটাও আশা জাগানিয়া যে বৃষ্টিতে মেঘের উড়াউড়িও বেড়ে যাবে কয়েক গুন। কিন্তু দিনশেষে কেউ ই প্রচণ্ড বৃষ্টিতে শরনার্থী শিবিরের মতো তাঁবুতে রাত কাটাতে রাজী নই। আবহাওয়ার পূর্বাভাস অনুযায়ী রাতের বৃষ্টি না থাকার সম্ভাবনা আমাদেরকে অনেকটা আশাবাদী করলো এবং আমরা একটু সাহসী সিদ্ধান্ত নিলাম নিশ্চিত বৃষ্টির প্রস্তুতি নিয়েই পরিকল্পনা করলাম। এর মধ্যে তাহান ভাই ও তার যাত্রা নিশ্চিত করে আমাদেরকে এই ট্যুরের বিষয়ে সিরিয়াস হওয়ার সুযোগ করে দিলো।

মেঘে ঢাকা বুদ্ধ জাদি। ছবি: লেখক

এখন পুরোদমে প্রস্তুতি শুরু হয়ে গেলো, বিভিন্ন উৎস থেকে চললো তথ্য সংগ্রহ। মোটামুটি যা জানতে পারলাম, মারায়ন তং আলীকদম থানার অন্তর্ভুক্ত মিরিঞ্জা রেঞ্জের সর্বোচ্চ চূড়া। এই পাহাড় শুধু দর্শনীয় স্থান হিসেবেই নয় ধর্মীয় ভাবেও অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। এখানে বৌদ্ধ ধর্মাবলম্বীদের জন্য একটি উপাসনালয় আছে। এখানে আছে গৌতম বুদ্ধের বিশাল একটি মূর্তি বা জাদি। জাদির নিচে পাকা ফ্লোর, চারপাশে গ্রিল দিয়ে ঘেরা উপরে টিনের চালা দেওয়া। এখানে বছরের একটা নির্দিষ্ট সময়ে বৌদ্ধ ধর্মাবলম্বীদের নিয়মিত ধর্মীয় অনুষ্ঠান হয়।এই পাহাড়ে দাঁড়িয়ে মিরিঞ্জা রেঞ্জের চমৎকার সৌন্দর্য উপভোগ করা যায়। পাশ দিয়ে সাপের মতো বয়ে গেছে আন্তর্জাতিক নদী মাতামুহুরি।

চকোরিয়া থেকেই দেখা মিললো মাতামুহুরির। ছবি: লেখক

আরো জানতে পারলাম এই পাহাড় ও আশেপাশে বাস করা আদিবাসীদের সম্পর্কে। ত্রিপুরা, মারমা ও মুরংদের বসবাস এদিক। পাহাড়ের নিচের দিকে বাস করে মারমা সম্প্রদায়ের লোক। মুরংরা বাস করে পছন্দ করে পাহাড়ের ঢালে ঢালে তৈরি করা টংঘরে। মাটি থেকে সামান্য উপরে তৈরি তাদের টংঘরের নিচে থাকে বিভিন্ন গবাদিপশু গরু, ছাগল, শুকর। এছাড়া শুকনো কাঠা জ্বালানী হিসেবে ব্যবহার করার জন্য মজুদ করে রাখে।

আমাদের জরিনা চুলা। ছবি: লেখক

আমাদের যেতে হবে বান্দরবানের আলীকদম, ঢাকা থেকে সরাসিরি হানিফ পরিবহনের বাস রয়েছে ৮৫০ টাকায়, কিন্তু আমাদের সম্পূর্ণ ট্যুরের বাজেট ২০০০ টাকা। তাই কিছুটা ভিন্ন উপায়ে খরচ কমানোর পরিকল্পনা করতে হলো। মারায়ন তং চূড়ায় পানি, খাবার বা কোনো কিছু পাওয়ার সুযোগ নেই তাই যা কিছু প্রয়োজনীয় সবকিছু পরিকল্পনাম করে গুছিয়ে নিতে হলো। আমরা রান্না করার জন্য জরিনা চুলা বা প্যানি স্টোভ নিয়ে নিলাম সাথে পর্যাপ্ত ফুয়েল। পর্যাপ্ত পরিমাণে খাবার পানি, খেজুর, ড্রাই ফুড, কাপ নুডলস কিনে নেওয়া হলো সবাই দায়িত্ব ভাগাভাগি করে। 

সিডিএম ট্র্যাভেলস। ছবি: ওয়েবসাইট থেকে

যাওয়ার জন্য প্রাথমিক পরিকল্পনা মেইল ট্রেইন হলেও শেষ পর্যন্ত লোকাল বাসে যাওয়ার সিদ্ধান্ত হলো। সেই মাফিক ১২ তারিখ আসার সাথে সাথেই ঢাকা শহরে শুরু হলো বৃষ্টির উন্মাদনা। আগের রাত থেকেই প্রচণ্ড বৃষ্টি। কিছুটা আতঙ্কিত, কিছুটা অনিশ্চয়তা নিয়েই দিন কাটলো। এর মধ্যে প্রস্তুতি গুছিয়ে নেওয়া শেষ। রাত ৮ টায় সায়েদাবাদ মিলিত হবার কথা তিন জনের। রাজন ভাই মিরপুর থেকে অফিস শেষ করে পাঠাও বাইকে রওনা দিয়েছে শোনার পরেই আমি বের হয়ে গেলাম, তাহান ভাইও বের হয়ে ফোন করলেন। অতঃপর সব অনিশ্চয়তা কেটে গেলো আমরা তাহলে যাচ্ছি মারায়ন তংয়ে সূর্যোদয়ের স্বাক্ষী হতে।   

মাঝরাতে কুমিল্লায় যাত্রা বিরতি। ছবি: লেখক

সায়েদাবাদ জনপথ মোড় থেকে চট্টগ্রামগামী লোকাল বাস পাওয়া যায়। সিডিএম নামে অথবা অন্য নামে হলেও একি সার্ভিস। সাধারণত ২৫০ টাকায় চট্টগ্রাম যাওয়া যায়। তবে সেদিন বৃহস্পতিবার এবং যাত্রী চাপ বেশি থাকায় ৩৫০ টাকা হাক দিচ্ছিলো। এক বাসে তিনজন ৮০০ টাকায় নিতেই চাইলো কিন্তু একদম পিছনেরর সিট হওয়াতে আমরা আগ্রহী হলাম না। পরের বাসে ৩০০ টাকায় দফারফা হলো, পছন্দমতো সিট নিয়ে বসে পড়লাম। এইসব বাসে যাতায়াতের জন্য আপনাকে বাসে উঠার আগেই ভাড়া নিয়ে দরদাম করে নিতে হবে নইলে বাসে উঠার পরে ভাড়া দিতে গেলে অনেক বেশি টাকা চাইবে। বাসে উঠে দেখলাম বাসের অবস্থা মোটামুটি ভালো, সিটও আরামদায়ক কিন্তু দুই সিটের মধ্যবর্তী ফাঁকা জায়গা বা লেগস্পেস খুব কম। প্রায় ২০-২৫ মিনিট পরে বাস ছেড়ে দিলো। তখন প্রায় ১০:৩০ বাজে সময়। (চলবে)

দ্বিতীয় পর্বঃ https://www.vromonguru.com/all-divisions/dhaka-division/marayantang-second/

তৃতীয় পর্বঃ https://www.vromonguru.com/all-divisions/chattagram-division/marayantang-third/

ভ্রমণগুরুতে প্রকাশিত আমার সব পোস্ট দেখুন এই লিঙ্কেঃ https://www.vromonguru.com/author/jewel/

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here