Home খুলনা বিভাগ ভূষণার রাজা সীতারামের দেশে: সীতারামের দূর্গ

ভূষণার রাজা সীতারামের দেশে: সীতারামের দূর্গ

245
0

প্রায় এক ঘণ্টার জার্নি শেষে বাস প্রবেশ করলো ভূষণা রাজার রাজধানি মোহাম্মদপুরে। আকাশটা শুনাচ্ছে মেঘের গান। শরতের আকাশ হয় পরিষ্কার, তবে আকাশ পানে চক্ষু মেলিয়া আমি কি দেখ সাই। এবারের বিলম্বিত বর্ষা প্রকৃতিকে আস্তে আস্তে কলুষিত করে তুলছে। শীতে শীত নাই, বর্ষায় বৃষ্টি নাও। বৃষ্টি আসে শরতের আকাশে। বৃষ্টির কাব্য শুনিয়ে ভাবুলতা আসে না। বরং বিরক্ত আসে। পাহাড়ে, সমুদ্রে বৃষ্টি যে রকম আহবান নিয়ে আসে হেসে, পুরাকীর্তির বেলায় সেইটা আসে কেশে। হালকা কাশি দিলাম কারণ আমাদের ডাবল ডিম ওয়াফি খানাপিনার সন্ধানে নেমেছে। হালকা ধমক দেবার পর ওয়াফি আহমেদ কহিলেন, ‘ঠিক আছে দুপুর একটা যেহেতু বাজে চলেন মালাই মারা চা খাই।’

সীতারামের দূর্গে। ছবি: লেখক

এই কাজটি ওয়াফি বেশ উৎসাহের সাথে করে, তাই বলে দিতে হলো না কিছু। বরং ওয়াফির খাদ্য সন্ধানি নাক শিকারি নেকড়ের মত আমায় নিয়ে গেল গ্রাম বাজারের ভিতর মালাই চায়ের দোকানে। চা‘টা বেশ ভাল ছিল বলতে হবে। চায়ের চাপেই কি ওয়াফি বড় সিগন্যালের সংকেত দিল। কি আর করার অপরিচিত জায়গায় আমায় একা ফেলে ওয়াফি গেল ছুটে প্রকৃতির ডাকে। আমি বসে বসে দেখছি গ্রামের বাজারের মানুষ বিচরণ আর এক রাশ গ্রামের জীবন। আহা কি শান্তি ওদের জীবন। চায়ের দোকানে আড্ডায় মেতেছে সবাই। এর মধ্যে ওয়াফি আহমেদ ফিরে এল।

সেই সিংহদ্বার। ছবি: লেখক

এবার আবার ফিরে এলাম বাস স্ট্যান্ড। আমরা এসে পড়েছি একেবারে মাগুরা ফরিদপুরের বর্ডারে। এখান থেকে ফরিদপুরের বোয়ালমারি খুবই কাছে। মধুমতি পার হলেই ফরিদপুর। আমরা আগে মোহাম্মদপুর দূর্গ এরপর নদের চাঁদ ঘাট যাব সে হিসাবে ভ্যান ঠিক করলাম। চলছে ভ্যান সীতারামের রাজধানীর পিচ ঢালা পথে। খুব বেশি সময় লাগলো না। তবে বৃষ্টির হালকা ছটা চোখে মুখে এসে জানান দিচ্ছে আমি আসছি পথিক।

সিংহ দিয়ারে দাঁড়িয়ে লেখক। ছবি: ওয়াফি আহমেদ

ভ্যান আমাদের নিয়ে থামালো একেবারে সীতারামের দূর্গ প্রাসাদে। ওপারে একটা মন্দির দেখা যাচ্ছে। আহা কত দিনের স্বপ্ন আজ পূরণ হল। এই তো আমি দাঁড়িয়ে আছি সীতারামের প্রাসাদ দূর্গে। সামনেই তো দেখা যাচ্ছে সিংহ ফটক। সিংহ ফটক জানান দিচ্ছে এক প্রতাপশালীর রাজার আত্মকাহিনী। সামনে গিয়ে একটা আশাহত হলাম তালা লাগানো দেখে। সদা অস্থির ওয়াফি চলে যেতে চাইলো বাহিরে থেকে দেখেই। তবে আমার এত দূরে এসে না দেখে ফিরে যেতে কেমন জানি লাগছে। পিছন দিকে একটা দরজা দেখতে পেলাম। কিছু না ভেবেই ওয়াফিকে সামনে রেখে পিছনে গেলাম। এবার দেখতে পেলাম এক চাচী পিছনের দরজার সামনে বসে চাল বাছে।

ঐতিহ্যের সান্নিধ্যে উদাসি মানব। ছবি: ওয়াফি আহমেদ

তিনি এই দূর্গের কিউরেটার কাম রক্ষাকর্ত্রী। আচল থেকে চাবি বের করে দরজা যেন খুললো না, সীতারামের ভুবনে আমায় প্রবেশ করালো। আমায় ভিতরে দেখে ওয়াফিও পিছন দিয়ে ভিতরে ঢুকলো। কত শত প্রজা, সৈন্য, মন্ত্রীর পদধূলিতে মুখরিত ছিল এই দূর্গ। এখন সবই মিশে গেছে ইতিহাসে, সাক্ষী হিসাবে রয়ে গেছে দূর্গ।

আহা ঐতিহ্য। ছবি: লেখক

ঘুরে ফিরে দেখছি সীতারামের দূর্গ। ইতিহাস থেকে জানা যায় রাজ্যত্ব রক্ষার পদক্ষেপ হিসাবে সীতারা, এই দুর্ভেদ্য দূর্গ ও চারদিকে পরিখা বিশিষ্ট রাজপ্রাসাদটি গড়ে তুলেন। আরাধনার জন্য দেবালয়, জনহিতার্থে তিনি খনন করেন বেশ কিছু বিশালকার জলাশয়। তিনি প্রজা দরদি রাজা ছিলেন। তবে কেন মোগলদের বিরুদ্ধে যুদ্ধে গেলেন সেইটা ছিল সপ্ত আশ্চর্য। বারো ভূইয়াদের পর মোগলদের বিরুদ্ধে সব থেকে শক্ত প্রতিরোধ গড়ে তুলে রাজা সীতারাম। রাজা নেই পড়ে আছে তার দূর্গ, রাজপ্রাসাদ, কোষাগার, মালখানা তোষাখানা, নহবতখানা, গোলাঘর, কারাগার। তবে এই দূর্গের আদখানা যে দখলে আর আদখান ডেবে গেছে মাটির নিচে। বাকি ছিটেফোঁটা অংশ যা বেচে আছে তা প্রত্মতত্ত্ব অধিদপ্তর বেশ ভালভাবে রক্ষণাবেক্ষণ করছে।

পঞ্চ দুয়ার। ছবি: লেখক

এই বর্গাকারে নির্মিত এই প্রাসাদ দূর্গের প্রত্যেক বাহু এক মাইলের চেয়েও বেশি দীর্ঘ। চারদিকে ঘিড়িয়া রেখেছ মাটির তৈরি উঁচু প্রাচীর। এর বাহিরেই গভীর পরিখা। দক্ষিণ-পূর্ব কোণে দূর্গের প্রধান প্রবেশপথ। পূর্ব-দক্ষিণ কোণের পরিখা মুছে গেলেও দক্ষিণ দিকের পরিখা আজও রয়ে গিয়েছে অতীত গর্বের চিহ্ন হিসাবে। এ পরিখাটা দেখতে অনেকটা নদীর মত। পশ্চিম দিকেও আছে বেশ বড় পরিখা। তবে সে যে মুছে যাওয়া দিনের মতই ফিরে যাচ্ছে কালের গর্ভে। আছে তবুও স্বমহিমায় ভূষণা রাজার গৌরবের শেষ জানান দিতে।

ঐতিহ্য অন্বেষণকারী। ছবি: লেখক

সীতারামের রাজধানী মোহাম্মদপুর পরিণত হয় তৎকালীন বঙ্গদেশের অন্যতম শ্রেষ্ট নগরী।গৌড় বঙ্গের একটি টাকশাল এখানে ছিল বলে জানা যায়৷তাই বণিক, সওদাগর শ্রেণির মানুষদের মোহাম্মদপুরে ব্যবসা প্রতিষ্ঠার জন্য উৎসাহ দিতেন রাজা সীতারাম। ক্রমেই মোহাম্মদপুর উঠতি ব্যবসার কেন্দ্র হিসাবে সুনাম সারা বঙ্গদেশে ছড়িয়ে পড়লো৷ পাশাপাশি সীতারামের গোলান্দাজ বাহিনীর বিখ্যাত দুইটি কামান কালে খান ও ঝুমঝুম খানের সুনাম ছড়িয়ে পড়ে চর্তুদিকে৷

রাজাবিহীন রাজ্যে তারাই রাজা। ছবি: লেখক

যদুনাথ সরকার রাজা সীতারাম কে তুলনা করেন আরেক সিংহ পুরুষ প্রতাপাদিত্যের সাথে৷ সীতারামের রাজ্যত্বের বিস্তার ছিল বিস্তৃত৷ তার বাৎসরিক রাজস্ব আয় ছিল তৎকালীন আমলে ৭৮ লাখ টাকা৷ এত বড় রাজ্যত্ব সীতারাম রায়কে স্বল্প সময়ের মধ্যে প্রবল প্রতাপশালী করে তুলে৷ বাঙ্গালি পরাধিনতা কখনও মেনে নেয়নি৷ তিনি বাংলার সুবাদার কে রাজস্ব দেওয়া বন্ধ করে নিজেকে স্বাধীন রাজা হিসাবে ঘোষনা করেন৷ মোগল শক্তির নিজেদের মধ্যে দ্বন্দ্ব তার স্বাধীনতা লাভের ইচ্ছা কে প্রবল করে তুলে৷ সুবাদান ইব্রাহীম খানের দুর্বল শাসন, মুর্শিদকুলী খান এবং আজিমুশশানের মধ্যকার বিরোধ ক্রমেই বঙ্গদেশে মোগল শক্তির ক্ষয়িষু ভাব দেখা যায়৷ বার ভূইয়াদের রাজা প্রতাপাদিত্যের পর এই প্রথম যশোর অঞ্চল থেকে মোগলদের জন্য আরেক ক্রাস হিসাবে হাজির হল রাজা সীতারাম রায়৷ আকাশে মেঘের গুড়গুড় আওয়াজ শুনা যাচ্ছে৷ আমরা মোহের জগৎ থেকে ফিরে এলাম বাস্তবে৷

আমার পুরানো ভ্রমণ গল্প গুলো পড়তে চাইলে নিচের লিংকে চলে যান:
https://www.vromonguru.com/author/ashik/

আমার গল্প, কবিতা, প্রবন্ধ পড়তে চাইলে ঘুরে আসতে পারেন আমার ফেসবুক পেজ থেকে:
https://www.facebook.com/sarwar.ashik786

এর বাহিরেও আমাদের নিজস্ব ভ্রমণ গ্রুপ শেকড় সন্ধানীর মাধ্যমে নিয়মিত এ রকম বাংলার পথে ভ্রমণের আয়োজন করা হয়। ইচ্ছা থাকলে পাঠক আপনিও হতে পারেন আমাদের পরবর্তী ভ্রমণের সঙ্গী। আমাদের সাথে যোগাযোগের বিস্তারিত নিচে দেয়া হলো।

Roots Finder – শেকড় গ্রুপের সাথে থাকুন:
https://www.facebook.com/groups/459880764416865/

Roots Finder – শেকড় পেজ লিঙ্ক:
https://www.facebook.com/rootsfinder.bd/

শেকড় সন্ধানী দলের এডমিনদের নাম্বার:
ঈসমাইল হোসেন – ০১৭৫৬১৭১৫৭০
আশিক সারওয়ার – ০১৮৬৬৬৬৩৪২৩
শরীফ জামান – ০১৫৩৫৪৫৩৯৭৭

ঘুরেন দেশের পথে, খুঁজে ফিরুন নিজের শেকড়।

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here