বাহিরে এসে দাঁড়ালাম আমরা চারজন। খানিকক্ষণ অপেক্ষার পর পেয়ে গেলাম সিএনজি। ছুটছে আমাদের যান্ত্রিক ত্রিচক্র যান নতুন কোন গন্তব্যে। সেই আঁকাবাকা পাহাড়ি পথে নতুন রোমাঞ্চ দিচ্ছে দোলা, আকাশটা যে ছিল খোলা। সেই খোলা আকাশে ভেসে যায় পেঁজা তুলার মত মেঘ। একফালি নীল আকাশ খুঁজে ফিরে চিরহরিৎ বৃক্ষরাজি, সবুজ আর নীল মিলে মিশেছে কাপ্তাইয়ে জলে আয় না প্রকৃতি নতুন করে সাজি। দেখতে দেখতে চলে এলাম কাপ্তাই লেক ভিউ পিকনিক স্পট। এই পিকনিক স্পটটি বাংলাদেশ নৌ-বাহিনী দ্বারা পরিচালিত। টিকেট কেটে ভিতরে ঢুকলাম। সেই আদি ও কৃত্রিম সৌন্দর্য্য। চক্ষু চড়কগাছে উঠে গেল। অসংখ্য বৃক্ষরাজি উকি দেয় ছোট বড় পাহাড়ের মাঝে ভুইফোড়ের মত আর তারই ফাকে ফাকে সচ্ছ জল, বল পথিক কোথায় হারাবে তল।

আহা কাপ্তাই। ছবি: লেখক

বাংলাদেশ নৌ বাহিনীর বানৌজা শহীদ মোয়াজ্জম ঘাঁটির বুকেই গড়ে উঠেছে এই লেক প্যারাডাইস পিকনিক স্পট। আহারে সবুজের ছায়ায় হারালাম কোন মায়ায়। তবে হাতে সময়ের যে বড্ড সল্পতা। এর মধ্যে কি দেখা হবে চক্ষু মেলিয়া। আকাশের বুকে হেলান দিয়ে ঘুমায় প্রকৃতি, জেগে থাকে দাম্ভিক পাহাড়। ছোট হক বা বড়, পাহাড়ের দাম্ভিকতার কাছে পরাজিত মেঘেদের দল। যেন ভালোবাসার চাঁদরে জড়িয়ে রেখেছে ছেড়া ছেড়া মেঘপুঞ্জ। কাপ্তাই লেকের মায়াবী জলধারা মাঝে জেগে উঠে সবুজ পাহাড়ের বেস্টনি।

আমাদের হাতে সময় যে কম। তাই হেঁটে হেঁটে যতটুকু দেখা যায়। দূরে থেকে দেখা যাচ্ছে একটি ভাসমান রেস্তোরা। কাছে গিয়ে দেখতে পেলাম সেখানে যাওয়ার জন্য পারি দিতে হবে সিঁড়ির ধাপ। কাপ্তাই লেকের জলের মাঝেই যেন বাসা বেধেছে জলেশ্বরী। জলেশ্বরী একটি কল্পনার জগৎ। এর জনক সব্যসাচী লেখক শামসুল হক। তবে এ রকম ভাসমান স্থাপনা আপনাকে খানিকক্ষণের জন্য জলেশ্বরীর রাজ্যে নিয়ে গেলে ক্ষতি কি?

নিচে নামার রাস্তা। ছবি: লেখক

রেস্তোরা যাওয়ার জন্য আমরা সিঁড়ির ধাপ বেয়ে নিচে নামতে লাগলা। গভীর থেকে গভীরে নামার পর পেলাম তার সন্ধান। চারদিকের মনোরম পরিবেশ আপনার নামার পথে দিবে সিগ্ধতা। অনুভব হবে না ক্লান্তির। তবে জলেশ্বরীর বাড়িতে যাবার ব্যাপারে যেন সব পর্যটকের মনই আকুপাকু করছে। আমরা নিচে নামার পর দেখতে পেলাম রেস্টুরেন্টটা। প্ল্যাস্টিকের ড্রাম দিয়ে ওপারে যাবার জন্য করেছে একটি কৃত্রিম সেতু। ওপারেও দেখা যাচ্ছে পাহাড়, প্রকৃতি প্রেমীদের চক্ষুর আহার। তবে এই রেস্টুরেন্টে নৌবাহিনীর অনুমতি ছাড়া ঢোকা যায়। বাহিরে থেকে দেখলেই বুঝা যায় বেশ আর্কষণীয়। এর ছাদে উঠলে না জানি আর্কষণ কত গুণ বেড়ে যাবে। আর এর পাশে রয়েছে প্যাডেল বোট। পর্যটকদের যে এখানে হারিয়ে যেতে নেই মানা।

চোখ জুড়ায় যে পথিক। ছবি: লেখক

যাক এবার যে আমাদের ফেরার পালা। তবে পাঠক আপনি চাইলে আরও বেশি সময় নিয়ে এক্সপ্লোর করতে পারেন লেক প্যারাডাইস। এখানে আসলে দেখতে পাবেন যুদ্ধ জাহাজের সম্মুখভাগ। এর পাশেই পাবেন রাত্রি যাপনের জন্য শীতাতাপ নিয়ন্ত্রিত বিশ্রামাগার ‘বনকুটির’। তবে এখানে থাকতে হলে নিতে হবে আগে থেকে অনুমতি। এই পিকনিক স্পটকে আরও আকর্ষণীয় করেছে গাছের উপর কাঠের তৈরি ঘর। যেখানে থেকে উপভোগ করা যাবে কাপ্তাইয়ের অসাধারণ ভিউ। দিন শেষে পড়ন্ত বিকালে পাহাড়ের গা বেয়ে লেকের বুকে সূর্যাস্তের ডুবে যাওয়া দেখবেন না সে কি হয়! সূর্যাস্ত উপভোগের জন্য রয়েছে ‘দিগন্তিকা’। এছাড়া পর্বতিয়া গ্রিন হল নামে একটি পিকনিক স্পট আছে যেখানে এক সাথে ৩০০ জন মানুষের পিকনিকের সুবিধা আছে।

চল যাই ওপাড়ে। ছবি: লেখক

লেকের স্বর্গ থেকে এবার প্রশান্তি পার্ক যাবার পালা। গোধূলি লগনে তাকিয়ে দেখি দিনের আলোর বাকি আছে ছিটেফোঁটা। সেই সবুজ পাহাড়ে আকাবাকা পথে আবার চলছে যান্ত্রিক যান, কাপ্তাই জেগে রয় দিনে শেষে আছে যে এখানে প্রাণ। কাপ্তাই বালুচর এলাকায়, কাপ্তাই-চট্টগ্রামের কোল ঘেষে এই নতুন বিনোদন পার্ক। পথিক এসে এখানে হয়তো প্রশান্তির খোঁজ পেয়েছে। তাই নাম হয়েছে কি প্রশান্তি পার্ক। তবে আমাদের পেটে ক্ষুধায় চো চো করছে। ঘড়িতে প্রায় সাড়ে চারটা। লম্বা দিন। প্রশান্তি পার্কে সিএনজি ভিড়িয়ে প্রথমে ঝাপিয়ে পড়লাম রেস্টুরেন্টে। প্রকৃতি পড়ে আগে ঠাণ্ডা হক ক্ষুধার জ্বালা। দেশী মুরগী, ভাত দিয়ে দিন শেষ বেশ তফা একটা খাবার হল।

সেই ভ্রাম্যমান রেস্টুরেন্ট। ছবি: লেখক

এবার ভ্রমণের পালা। এই প্রশান্তি পার্কে উঠেছে আবার ফারুকের ফারিহা আপু। তাকে আগে থেকে ফোন করেছে সে কায়েকিং বের হয়েছে। জ্বী পাঠক ঠিক ধরেছেন প্রশান্তি পার্কে থাকা, খাওয়াসহ আছে কায়েকিংয়ের সুব্যবস্থা। শহরের কোলাহল ছেড়ে প্রকৃতির মাঝে দুয়েকদিন ডুবে যেতে এখানে নেই মানা। আমরা চলে এলাম গাছের ছায়ার আচ্ছাদিত সেই লেকের পারে। এখানে এসে খানিকক্ষণের জন্য বসে দেখতে লাগলাম কাপ্তাই লেকের ভিউ। সে তো সকাল থেকেই দেখছি তবুও চোখে বাসি হয় না কাপ্তাই।

লেকে কায়াকিংয়ের যেমন সুব্যবস্থা আছে তেমনেই লেকের পাড়ে পা দুলিয়ে বসার জন্য রয়েছে বিভিন্ন ধরনের বাশ, কাঠ ছনের তৈরি ছাউনি দেয়া মাচাং ঘর। এখানে পিকনিকের যেমন সুব্যবস্থা আছে তেমনেই আছে ফ্যামিলি কটেজ। আবার ক্যাম্পিং করার জন্য আছে সুব্যবস্থা। এছাড়া কাপ্তাই লেক ঘোরার জন্য ইঞ্জিত চালিত বোটের ও সুব্যবস্থা আছে। অসংখ্য গাছগাছালির মাঝে পাখপাখালির কুহু কুহু শব্দে মন হারিয়ে যায় সবুজের রাজ্যে। গাছেদের রাজ্যে আবার দোলনা বসিয়েছে। তাই দোল খেতে তো নেই মানা। আবার বসলাম শিশুতোষ মজা নিতে।দুলছি আমি আর গাছের মগডালে দেখছি একজোড়া বানর দম্পতি। বাহ কি সুখের সংসার, গাছে গাছেই তাদের ছুটে চলার মাঝে নেই অবসর।

কায়াক চালায় প্রশান্তি পার্কে। ছবি: লেখক

এখানে আবার কর্ণফুলি নদী আর কাপ্তাই লেকের মেলবন্ধন হয়েছে। দোলনায় বসি দেখি দূরের ওই কায়াকিং করতে যাওয়া রোমাঞ্চপ্রেমীদের। জীবন হোক এরকম। তবে এবার যে যাবার পালা। পার্ক থেকে বের হবার পর ফারিহা আপুর ফোন আসলো তার অপেক্ষায় খানিকক্ষণ বসলাম। এর মাঝে আমরা আলাপ করছি আমরা কাপ্তাই থাকবো না চট্টগ্রাম চলে যাব। যেহেতু প্রশান্তি পার্কের ভিতরের কটেজগুলো ঈদের কারণে ফাকা নাই আর আমরা পরের দিন চট্টগ্রাম শহর ঘুরবো। তাই আলাপ করছি কি করা যায়।

বেলা শেষে। ছবি: লেখক

লোকাল সিএনজিয়ালা মামাকে জিজ্ঞেস করলাম এখানে থাকার জন্য হোটেল আছে। সে ফিচকে হাসি দিয়ে বললো মামা থাকার জন্য নাই তবে নিষিদ্ধ কাজের জন্য হোটেল আছে। পাঠক বুঝে নিন আর বেশি গভীরে না যাই। এ যখন অবস্থা তখন ফারুকের ফারিহা আপু এসে পড়লেন। তার সাথে কথাবার্তা শেষ করে আমরা সিদ্ধান্ত নিলাম কাপ্তাইয়ের সফর আমাদের এখানেই শেষ, এবার চট্টগ্রামে যাব যে ভাবেই হৌক। রাতে ঘুমাতে হবে। সবাই আমরা সিএনজি ঠিক করে ফেললাম লিচু বাগানের উদ্দ্যেশে। গাড়ি চলছে আর কাপ্তাইয়ের গল্পটাও ফুরাচ্ছে। বিদায় কাপ্তাই আবার দেখা হবে। এ দেখা শেষ নয়। 

আমার পুরানো ভ্রমণ গল্প গুলো পড়তে চাইলে নিচের লিংকে চলে যান:
https://www.vromonguru.com/author/ashik/

আমার গল্প, কবিতা, প্রবন্ধ পড়তে চাইলে ঘুরে আসতে পারেন আমার ফেসবুক পেজ থেকে:
https://www.facebook.com/sarwar.ashik786

এর বাহিরেও আমাদের নিজস্ব ভ্রমণ গ্রুপ শেকড় সন্ধানীর মাধ্যমে নিয়মিত এ রকম বাংলার পথে ভ্রমণের আয়োজন করা হয়। ইচ্ছা থাকলে পাঠক আপনিও হতে পারেন আমাদের পরবর্তী ভ্রমণের সঙ্গী। আমাদের সাথে যোগাযোগের বিস্তারিত নিচে দেয়া হলো।

Roots Finder – শেকড় গ্রুপের সাথে থাকুন:
https://www.facebook.com/groups/459880764416865/

Roots Finder – শেকড় পেজ লিঙ্ক:
https://www.facebook.com/rootsfinder.bd/

শেকড় সন্ধানী দলের এডমিনদের নাম্বার:
ঈসমাইল হোসেন – ০১৭৫৬১৭১৫৭০
আশিক সারওয়ার – ০১৮৬৬৬৬৩৪২৩
শরীফ জামান – ০১৫৩৫৪৫৩৯৭৭

ঘুরেন দেশের পথে, খুঁজে ফিরুন নিজের শেকড়।

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here