Home চট্টগ্রাম বিভাগ বিড়ালের ঝর্ণাগুলো: ধন্দ তাং (গাছকাটা)

বিড়ালের ঝর্ণাগুলো: ধন্দ তাং (গাছকাটা)

191
0

সারারাতের বৃষ্টি আর বিদ্যুৎ বিভ্রাটের পর ভ্যাপসা একটা গরমে সকালেই ঘুমটা ছুটে গেল। আজকে একদম ভোরে যেতে হবে না। সাতটার মধ্যে তৈরি থাকার নির্দেশ দেয়া হলো সবাইকে। আমরা অবশ্য রাতেই সব গুছিয়ে নিয়েছিলাম। শান্ত স্যারের কটেজ ছেড়ে তল্পিতল্পা গুটিয়ে যেতে হবে। একবারে বের হবো। আজকের গন্তব্য গাছকাটা ছড়ার ধন্দ তাং ঝর্ণা দেখা। তারপর রাতের বাসে ঢাকায় ফিরবো। নাস্তা আজকেও প্যাকেট করে নিলাম। মুরগীর হাড়গোড়, কলিজা দিয়ে খিচুড়ি। বেশ একটা জিনিস! শান্ত স্যারের কাছ থেকে বিদায় নিলাম। তেহজীবের সাথে একটা ছবি তুলে নিলাম। মানুষটা এই তিনদিনে তিনবেলা করে আমার মেয়ের জন্যে আলাদা খাবারের ব্যবস্থা করলেও কোন দাম রাখেননি। বরং যে রাতে বারবিকিউ হলো, বারবার বলছিলেন, ‘বাচ্চা খেতে পারবে? নাহলে আমার মেয়েটার সাথে খাইয়ে দেই?!?’ এজন্যই পাহাড়ি মানুষগুলোকে এতো ভালো লাগে। বড় মায়াভরা হয় এরা।    

শান্ত স্যারের সঙ্গে তেহজীব। ছবি: মোস্তাক হোসেন

এদিকে সারারাত তো বটেই, সকালেও বৃষ্টি হয়েই যাচ্ছিলো। সাথে আমাদের অনিশ্চয়তা বাড়ছিল। গাছকাটার ট্রেইল এমনিতেই কিছুটা দূর্গম। বেশ কিছু খাল পার হতে হয়। বৃষ্টি হলে খালগুলো খরস্রোতা হয়ে যায়। আমার মনের ভেতর প্রজাপতি উড়ছিল। পানি ভয় পাই আমি। হালকা স্রোতেই ভয়ে কুপোকাত হয়ে যাই। মনে হয় পানি আমাকে টানে।

গাছকাটা ট্রেইলের সৌন্দর্য। ছবি: তামান্না আজমী
এমন অনেক পানির সোর্স পাওয়া যায় ট্রেইলে। ছবি: মোস্তাক হোসেন

যাইহোক, সাত-পাঁচ ভাবতে ভাবতেই নৌকা গাছকাটা আর্মি ক্যাম্পে এসে ভিড়লো। এটা সেই ক্যাম্প যেখানে প্রথমদিন ঢোকার সময় আমরা গ্রুপ, ফ্যামিলি নানারকম ফটোসেশন করেছিলাম। এবার বিদায় নেয়ার পালা। নিত্যদা নেমে ফর্মালিটি সেরে নিলেন। ক্ষুধা পেয়ে যাচ্ছিলো। খিচুড়ি খাওয়া শুরু করলাম। রান্নায় গোলমরিচের ব্যবহার করা হয়েছিল। পাহাড়ি মসলাগুলো যে এতো ঝাল হয়! কিন্তু খুব মজা হয়েছিল। নৌকা আবার ছাড়লো। পথে এক বাড়ির কাছে থেমে গাইড দাদাকে তুলে নেয়া হলো। বোতলগুলোতে পানি ভরে নেয়া হলো। মিনিট দশেক পরেই নৌকা নিয়ে থামালো গাছকাটা ছড়া গ্রামের মুখে, যেখান থেকে আমরা ট্র‍্যাকিং শুরু করবো।

মেঠো পথ। ছবি: তামান্না আজমী
স্রোতস্বিনী খাল। ছবি: তামান্না আজমী

আমাদের মধ্যে কয়েকজন নৌকাতেই রয়ে গেলেন। আমরা আল্লাহর নাম নিয়ে হাঁটা ধরলাম। ধন্দ তাং যেতে তেমন কোন পাহাড় নেই। ছোটখাটো চড়াই উৎরাই আছে। আর শুরুতেই আছে ধুপপানি ট্রেইলের মতো পা ডুবানো কাদা। এইসব রাস্তায় অনেকটা সময় লেগে যায়। পা তুলে হাঁটাই যায় না! মাঝে মাঝেই ধানি জমি, ছোট ছোট খাল পার হতে হচ্ছিলো। সেগুলোও কাদায় ভরপুর। 

অভিযাত্রী। ছবি: মোস্তাক হোসেন
খাল পার হচ্ছি। ছবি: জিয়া ভাই
কাদার প্রলেপ পড়া পা। ছবি: তামান্না আজমী

এভাবে একসময় কিছুটা উঁচু আর বেশ খাড়া একটা জায়গা পার হতে হলো। আমাদের পেছনেই তখন অনেক বড় একটা গ্রুপ। ওরা রাঙ্গামাটি থেকে এসেছে। পিকনিক করতে যাচ্ছে ধন্দ তাংয়ে। কারো হাতে আলু, কারো হাতে ডেকচি, আবার কারো হাতে মসলাপাতি। আমরা খালি হাতেপায়ে হেঁটেই আছাড় খাচ্ছি আর ওরা এতোকিছু নিয়ে যাচ্ছে! ওরাও আছাড় খাচ্ছে না তা না। তবে দ্রুত হেঁটে যাচ্ছে। ওদের পিছু পিছু যাচ্ছিলাম। বেশ কিছু খাল ছিল। পানি ভালোই বাড়তি ছিল। স্রোত বেশি থাকায় পার হওয়া কিছুটা কষ্টসাধ্য হচ্ছিলো। এভাবে ঘণ্টা দেড়েক ট্র‍্যাকিংয়ের পর আমরা পৌঁছালাম একটা জায়গায়। পৌঁছে দেখি সেই পিকনিক পার্টির রান্নার আয়োজন এখানেই চলছে। কেউ ঝিরিতে গা ভেজাচ্ছে, কেউ লাকড়ি জ্বালাচ্ছে, কেউ গান বাজাচ্ছে। ভালোই লাগছিল দেখতে। সত্যিকারের বনভোজন হয়তো একেই বলে!

অপূর্ব সুন্দর আর ভয়ংকর ট্রেইল। ছবি: মোস্তাক হোসেন
আমার আনন্দিত কন্যা। ছবি: মোস্তাক হোসেন

এখান থেকে এখন ধন্দ তাং দুইভাবে যাওয়া যেতে পারে। এক, ডানদিকের ট্রেইল ধরে হাঁটা দেয়া যায়। কিন্তু এই ট্রেইলটা খুবই ঝুঁকিপূর্ণ এবং পিচ্ছিল। আরেকটা হচ্ছে, হাতের বামের পাহাড়ি পথ ধরে হেঁটে যাওয়া। আমরা পাহাড়ি পথেই এগোলাম। কিছু জায়গা ছিল একেবারে সংকীর্ণ, কোনরকমে এক পা ফেলা যায়। এইসব ক্ষেত্রে গ্রুপ অনেক বড় ব্যাপার। একে অপরের উপর নির্ভরশীল হতে হয়, সাহায্য করতে হয়। এভাবেই হাতে হাত ধরে পৌঁছে গেলাম প্রায় ঝর্ণা পর্যন্ত। হঠাৎই দেখি, অনেক উঁচু থেকে অঝোরে ঝরছে একটা ঝর্ণা। এতো উঁচুতে যে নিচের অংশ চোখেও পড়ছে না। আমরা ভাবছিলাম নিশ্চয়ই সেখানে যাওয়ারও কোন পথ আছে। 

দিক নির্দেশনা। ছবি: মোস্তাক হোসেন
পাহাড়ি পথে চলা। ছবি: তামান্না আজমী
ছোট্ট পায়ে চলে ঠিক পৌঁছে যাবো। ছবি: তামান্না আজমী

যাইহোক, তখন মূল উদ্দেশ্য ধন্দ তাং। পাঁচ মিনিটের ভেতরই চলে গেলাম ঝর্ণার কাছে। উফ! সারারাতের বৃষ্টির পরে ঝর্ণার যে সৌন্দর্য, ভাষায় প্রকাশ করার মতো না। ঝর্ণায় তখন গুটি কয়েক মানুষ। আমরা গেলাম যখন তারাও চলে গিয়েছিল। একেবারে নিজের ঝর্ণা আমাদের। গা এলিয়ে দিলাম। 

‘আমি এই করুণ ধারার কলকলে
নীরবে কান পেতে রই আনমনে
তোমারি ঝরনাতলার নির্জনে’

ফলো মি টু ধন্দতাং। ছবি: তামান্না আজমী
ঝর্ণার কাছে আমরা। ছবি: আশরাফ ভাই
চলে এসো এক বরষায়। ছবি: আশরাফ ভাই

ঠাণ্ডায় কাঁপুনি উঠে যাওয়ায় ফেরার পথ ধরতে হলো। একটু সামনে এগিয়ে বামে চোখ পড়তেই দেখি আরেকটা ঝর্ণা উঁকি দিচ্ছে। ভালোমতো লক্ষ্য করে বুঝলাম সেই ঝর্ণাটাই যেটা অনেক উপর থেকে পড়ছিল। যাওয়ার সময় তাড়াহুড়ো থাকায় খেয়াল করিনি। অনেক সুন্দর, ধাপে ধাপে পানি পড়ছে। সবাই মিলে আরেক দফা এখানে গা ভেজানো হলো। নিত্যদাকে জিজ্ঞেস করলাম পরে উনি বললেন, এই ঝর্ণার কোন নাম নাই আপু। পুরো এলাকাটাকে গাছকাটা ছড়া বলে। আমি চুপিচুপি ঝর্ণাটার নাম রাখলাম ‘গহীন সুন্দরী’। 

ঠাণ্ডায় জুবুথুবু। ছবি: আশরাফ ভাই
গহীন সুন্দরী, আমার দেয়া নাম। ছবি: তামান্না আজমী
সুন্দরীর কোলে অবগাহন। ছবি: তামান্না আজমী

আবার সেই কাদামাখা পথ, খাল, ঝিরি পার হয়ে ফিরতে হবে। এখানে বলে রাখি, ভাগ্য আমাদের সহায় ছিল যে বৃষ্টিটা থেমে গিয়েছিল। রাতের মতো বৃষ্টি হলে এই ট্রেইল সত্যি বিপদজনক হয়ে যেতো। ফেরার সময় আমরা শান্ত ঝিরিপথ পেয়েছি। একটু আগে পৌঁছে যাওয়াতে সেই বনভোজনের জায়গাতে বসে একটু সময় কাটালাম। পিকনিক পার্টির লোকজন আমাদের খাবার অফার করলেন। হানিফ ভাই, হৃদয় ভাই, তেহজীব ওরা বনভোজনের খাবার খেলো। আমার মেয়েটা মজা করে খেয়েছে আলু দিয়ে মুরগী আর ভাত। এই ট্রেইলে অনেকে করে কি, বাচ্চাদের মতো স্লিপারের মতো পিছলে নামে। এরকম আমাদের চোখের সামনে এক ছেলে এই কাজ করতে যেয়ে মারাত্মকভাবে আহত হলো। চোয়ালে বড় ধরনের আঘাত পেয়েছে ছেলেটা। ঘুরতে যেয়ে এই কাজগুলো করা আসলে একেবারে উচিত নয়। ঘোরাঘুরি হোক নিরাপদ। 

বনভোজন চলছিল এখানে। ছবি: মোস্তাক হোসেন
আমরা কিন্তু পিছলে নামিনি। ছবি: কৌশিক ভাই
নাম না জানা সর্পিল ঝিরি। ছবি: তামান্না আজমী
ঘাসের বিছানা। ছবি: মোস্তাক হোসেন

এদিকে নিত্যদা দেখি মোটা এক বাঁশ বহন করে নিচ্ছেন। কি করবেন জিজ্ঞেস করায় বললেন, আপনার বৌদি অনেকদিন ধরে নিতে বলছেন। আমরা এটাতে মুরগী পুড়ে খাবো। বুঝলাম, যেটাকে আমরা শহুরে ভাষায় বলি, ব্যাম্বু চিকেন। নিত্যদা বলছিলেন, ওনার ছোট ছেলের তেহজীবের লাইফ জ্যাকেটটা খুব ভালো লেগেছে। দাম কেমন হবে জানতে চাইছিলেন। মুশতাক ওনাকে বুড়িরটাই দিয়ে দিল। ভালো লাগছিল। মাঝেমাঝে কাপ্তাইয়ের বুকে ভুস করে ভেসে উঠবে একটা ছোট্ট মুখ। ওর গায়ে কমলা একটা জ্যাকেট। সেখানে নাম লেখা থাকবে ‘তেজী’। 

তেজীর সাথে নিত্যদা। ছবি: তামান্না আজমী
নিত্যদার ব্যাম্বু চিকেনের বাঁশ। ছবি: মোস্তাক হোসেন

আমরা একটা দোকানে বসে কলা, চা-বিস্কুট খেলাম। তারপর নৌকা যেখানে রাখা ছিল সেই পর্যন্ত হেঁটে আসলাম। সেখানে সবাই সাঁতার কাটলো, গোসল করলো, কাপড় পাল্টালো। তারপর নিত্যদা আমাদের নামিয়ে দিলেন কাপ্তাই জেটি ঘাটে। সন্ধ্যা হয়ে গিয়েছে। বিদায়ের বেলা নিত্যদা জোর করে এক কাঁদি পাহাড়ি কলা ধরিয়ে দিলেন বুড়ির জন্য। 

লজেন্সের চা। ছবি: তামান্না আজমী
পাহাড়ি সুস্বাদু কলা। ছবি: তামান্না আজমী

আমার খুব প্রিয় একটা গান ছিল একসময় যার ভাবার্থ এরকম, 

মনে করো ঝিলের একটা শহর আছে 
ঢেউয়ের উপর আমাদের একটা ঘর আছে
আমরা যা স্বপ্ন দেখি, সবই সত্যি হোক
ব্যস আর কি!

বিলাইছড়ি মায়াবী রূপেই বিদায় জানাচ্ছে। ছবিঃ হৃদয় ভাই

বিলাইছড়ি এই ভবঘুরে মনে গভীর ছাপ ফেলে দিল। লেকের ঢেউয়ের বাড়িটা যেন আমারই হয়ে গেল! 

ভিডিওচিত্রে গাছকাটা অভিযান দেখতে ক্লিক করুন এই লিংকেঃ https://youtu.be/K-e4zQ3lYBk

আমার পুরানো ভ্রমণ কাহিনীগুলো পড়তে চাইলে ক্লিক করুন নীচের লিঙ্কে:
https://www.vromonguru.com/author/azmi/

বি:দ্র: ঘুরতে গেলে আমরা জায়গা নোংরা করি না। যেখানে সেখানে ময়লা আবর্জনা ফেলি না। দেশটা আমাদের। পরিষ্কার-পরিচ্ছন্ন রাখাও আমাদেরই দায়িত্ব।


ফিচার ছবি: তামান্না আজমী

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here