বর্ষা কন্যা সুপ্তধারা

ঝর্ণার জন্য বিখ্যাত মিরসরাই-সীতাকুণ্ড রেঞ্জে বর্ষা আসলে যেন লাগে প্রাণের ছোয়া৷ টানা ঝিরিঝিরি, ঝুপঝুপান্তি বৃষ্টিতে যখন ঢাকার জনজীবন বিপর্যস্ত তখন এই সিদ্ধান্ত নিলাম এক সুপ্ত কন্যাকে দেখতে যাব এই ভরা বর্ষার দিনে৷ চন্দ্রনাথ রিজার্ভ ফরেস্টের সেই চিরসবুজ সীতাকুণ্ড ইকো পার্কের ভিতরে আমার এই দুই কন্যার অবস্থান। এক কন্যা শুধু ভরা বর্ষায় জেগে উঠে। বর্ষা আসলে দেখা যায় তার দানবীয় রূপ। আর সারা বছর ভিসুভিয়াসের মতই থাকে সে সুপ্ত৷ বর্ষা আসলে প্রচণ্ড বেগে ছুটে আসা সেই ঝর্ণাধারা পর্যটকদের করে আনন্দে আত্মহারা। তাই তো তার বাহারী নাম সুপ্তধারা। সে সুপ্তধারা সাথেই তার বোন সহস্রধারার অবস্থান। ঢাকা-চট্টগ্রাম মহাসড়কের সেই মহাজ্যাম ঠেলে সীতাকুণ্ড যাবার কথা চিন্তা করলেই গায়ে ১০৫ ডিগ্রি জ্বর এসে পড়ে৷ চিন্তা করলাম মেইল ট্রেনে যাব সীতাকুণ্ড। কিন্তু সে আশায় যেন গুড়েবালি হল এলাকার মহা জ্যামে। প্ল্যান অনুযায়ী বৃহস্পতিবার রাতে আমার ভ্রমণসংগী চান মিয়া, রুবেল আর ঈসমাইল ভাইয়ের সাথে যাবার কথা ছিল সীতাকুণ্ডের পথে। ঈসমাইল ভাই শেষ মুহূর্তে ব্যক্তিগত কারণে বিয়োগ হলেও যোগ হল নতুন পাহাড়ে যাবার বন্ধু রোমেল ভাই। যার পাহাড়ী রাস্তায় যাবার পূর্ব অভিজ্ঞতা ছিল না। তবে উনি এই ট্যুরেই এক বিরল অভিজ্ঞতা নিয়ে ঢাকা ফেরত এসেছেন যা ক্ষণে ক্ষণে মনে করে আমাদের ১৪ গোষ্টি উদ্ধার করলে অবাক হব না৷ যাই হক যাত্রার শুরুতেই আমার কারণে মেইল ট্রেন মিস করলো সবাই। শেষ ভরসা ফেনীর স্টার লাইন।

সহস্রধারা। ছবি: লেখক

স্টার লাইন ফেনী রুটের কিং এক কথায় মানতে হয়। মেঘনা ব্রিজের জ্যাম ঠেলেও ১১:৩০ মিনিটে ছেড়েও আমাদের ফেনী পৌচ্ছে দিল সেই কাকডাকা ভোরে৷ ইদানিং মিরসরাই-সীতাকুণ্ড রেঞ্জ পপুলার হওয়ায় প্রতি বৃহস্পতিবার এই রুটে বাড়ছে পর্যটকদের চাপ৷ এখানেও ব্যতিক্রম নয়৷ স্টার লাইনের মেইন কাউন্টারে তাই এই কাকডাকা ভোরেও দেখা যাচ্ছে বিশাল বিশাল সব কাফেলা। চট্টগ্রাম থেকে আমাদের সাথে জয়েন করবে সাইফ ভাই। তাকে একখানা ম্যাসেজ দিয়ে হাঁটা ধরলাম মহিপালের মোড়ে। কুল নাই কিনার নাই এত সকালেও সীতাকুণ্ড-মিরসরাই’র যাত্রীর হাই ডিমান্ড। বাসে চড়ে বসলাম৷ তবে ক্ষণে ক্ষণে বৃষ্টির এই হানা বন্ধ হল না। ভোর সাতটার দিকে পৌঁছে গেলাম সীতাকুণ্ডু ইকো পার্কের মেইন রাস্তার সামনে। সেখান থেকে সাইফ ভাইকে সাথে নিয়ে শুরু হল যাত্রার।

ইকো পার্কের গেটের ভিতর থেকে সহস্রধারা যাবার সিএনজি ভাড়া ৩০০ শুনে হাঁটার বেগ বেড়ে গেল। এত সুন্দর বৃষ্টিময় সকালে পাহাড়ী রাস্তায় সবুজ প্রকৃতির মাঝে আমাদের হারিয়ে যেতে নেই মানা। সাথে যদি থাকে ক্ষণে ক্ষণে মনীষিদের বাণী হাঁটার আনন্দটা দ্বিগুণ বাড়িয়ে দেয়৷ বিশাল বিশাল সাইনবোর্ডে ছোটখাট সর্তকবার্তার সাথে ছোট ছোট কবিতাগুলো এই পথের বিশেষ আর্কষণ। এতদিন পর মনে হল না আমি কোন পাহাড়ী রাস্তায় রিলাক্স করতে এসেছি। নেই কোন গ্লানি। মনে হচ্ছে গ্রামের কোন আঁকাবাকা রাস্তা দিয়ে হেঁটে যাচ্ছি।

সহস্রধারার সামনে আমি। ছবি: মুন

বৃষ্টিময় প্রকৃতি যেন তার সব রূপ ঢেলে দিয়েছে এই পাহাড়ের কোলে। সবুজের সঙ্গে স্নান করতে করতে এগিয়ে চলছে পোড় খাওয়া কাফেলার দল। কিছুদূর যাবার পর সুপ্তধারার সাইনবোর্ড দেখতে পেলাম ‘সুপ্তধারা ঘুমিয়ে পড়ি জেগে উঠি বর্ষায়’। সেইটা ক্রস করে ২০ মিনিটের মত হাঁটার পর এসে পড়লাম সহস্রধারা সিড়িপথে। গুনে গুনে ৪৮৬টা সিড়ি বেয়ে নিচে নামতে হবে। জীবনে তো খাড়া পাহাড় কম বাইলাম না৷ আর এখানে তো পর্যটকদের জন্য পুরো পাকা সিড়ি করে দেওয়া। তাই আহা কি আনন্দ আকাশে বাতাসে। হেলেদুলে নিচে নামতে লাগলাম। এক সময় শেষ হল সিঁড়ির পথ। ছোট একটা ঝিরি দেখতে পেলাম। বৃষ্টির কারণে ঝিরিতে স্রোত ছিল৷ তবে মানুষজনকে পথ ঘুরে গাছের শিকড় ধরে পার হতে দেখে সাময়িক বোকা বনে গেলাম৷ কি এমন স্রোত হবে ভেবে পানিতে পা ফেলে সুন্দর তড়তড়িয়ে চলে এলাম সহস্রধারার কোলে। বর্ষার দানবীয় রূপ দেখে অভিভূত হয়ে গেলাম। সহস্রধারা এক পাগলপাড়া রূপে যেন হাজির হল এই প্রকৃতির মাঝে। জানা যায়, আমাদের জাতীয় কবি নজরুল ইসলাম বহু বছর আগে চট্টগ্রাম ও সন্দ্বীপ ঘুরতে এসে সীতাকুণ্ডের এই সহস্রধারা ঝর্ণা দেখতে এসেছিলেন। ঝর্ণার রূপ দেখে কবি অভিভূত হয়ে এই ঝর্ণার নিচে বসেই রচনা করেন তার বিখ্যাত নজরুল গীতি:

আকাশে হেলান দিয়ে পাহাড় ঘুমায় ওই।
ওই পাহাড়ের ঝর্ণা আমি, ঘরে নাহি রই গো
উধাও হ’য়ে বই।।
চিতা বাঘ মিতা আমার গোখ্‌রো খেলার সাথি
সাপের ঝাঁপি বুকে ধ’রে সুখে কাটাই রাতি
ঘূর্ণি হাওয়ার উড়্‌নি ধ’রে নাচি তাথৈ থৈ গো ‘আমি’
নাচি তাথৈ থৈ।।

ওই দেখা যায় সুপ্তধারা। ছবি: মুন

স্বাভাবিকভাবে যে ঝর্ণা দেখে বিদ্রোহী কবি নজরুল মুগ্ধ হন তা দেখে যেকোন প্রকৃতিপ্রেমী মানুষ যে বিমোহিত হবেই তা তো বলার অপেক্ষা রাখে না। সহস্রধারায় কিছুক্ষণ সময় কাটিয়ে আমরা আবার উপরে উঠে আসলাম।

হন হন করে হেঁটে যাচ্ছি আমাদের সেই বর্ষা কন্যার কাছে। এতক্ষণ জোকের কথা মনে না পড়লেও রোমেল আর রুবেল ভাইয়ের পিড়পিড়ানিতে সাময়িক বিরতি দিতে হল। সাইফ ভাই ইতিমধ্যে তার পায়ে জোক আবিষ্কার করলেন। জোক পায়ে কামড় দেওয়া খুবই স্বাভাবিক৷ তবে অস্বাভাবিক ভাবে আবিষ্কার করলাম রুবেল ভাইয়ের তলপেটের কাছে জোক কামড়ে ধরে রেখেছে এবং রোমেল ভাইয়ের মেইন পয়েন্টে জোক কামড় দিয়েছে। বেচারা বলতেও পারে না সইতেও পারে না। ঝোপে গিয়ে চান্সে কোপ মেরে দিল জোককে। এরপর পুরা ট্রেইলেই কম বেশি জোক কামড়ালেও একসন, ক্লাইমেক্স, সাসপেন্সটা শেষ দানের জন্য রেখে দিলাম।

গ্রামের পথে। ছবি: মুন

হাঁটতে হাঁটতে চলে এলাম আবার সেই সুপ্তধারার সাইনবোর্ডের কাছে। দেখতে পেলাম সাইনবোর্ডে লেখা ২,২৯৬ ফুট নিচে আমাদের বর্ষা কন্যা সুপ্তধারা। সুপ্তধারা সিড়িগুলো সহস্রধারা থেকে বেশ এবড়ো খেবড়ো। তবুও তেল পানি এত বের হল না। ততক্ষণে বৃষ্টির বেগ বেড়ে গেল৷ সিড়ি পথে শেষ নামলাম ঝিরিপথে। তীব্র স্রোত অনুভব করলাম ঝিরিপথে। ঝিরির পানি অস্বাভাবিক ভাবে বেড়ে যাচ্ছে তখনই টের পেলাম। ঝিরিপথে সর্বোচ্চ কোমর সমান পানি কিছু জায়গায়, তাছাড়া নরমালি হাঁটু সমান পানি পেলাম। কিছু দূর যাবার পর শুনতে পেলাম জলপতনের শব্দ। প্রায় ১৫-২০ মিনিট হাঁটার পর এসে পড়লাম আর এক ঘুমিয়ে থাকা দানবের কাছে। চোখ দুটো সেটে গেল এই অপার্থিব দৃশ্য দেখে। অন্য সব ঝর্ণার মত এখানে যেতে হয়তো এত বেশি কস্ট করতে হয় না। তবে এর আবেদন কোন অংশে কম নয়। পাহাড়ের উপর থেকে বেয়ে পড়ছে স্রোতস্বিনী জলধারা। নিচে পড়ে তৈরি করছে কুয়াশার এক আস্তর। ডাবল ফলস বাড়িয়েছে এর বাড়তি আর্কষণ। এসে দেখতে পেলাম কচিকাচার মেলা। বিধাতা অনেক সহায় এই বৃষ্টির দিনে বেশি লোকের সমাগম নাই। ঝর্ণার পানিতে ভুড়ি ভাসিয়ে বেশ কিছুক্ষণ বসে রইলাম। ঝিরির পানি অস্বাভাবিক হারে বাড়তে দেখে আর বেশিক্ষণ বসা সমুচীত মনে করলাম। উপরের দিকে উঠা শুরু করলাম।

পাহাড়ে বিপদ বলে কয়ে আসে না। পঁচা শামুকেও পা কাটে। এত দিন পাহাড়ে গিয়ে রগে টান খাবার ব্যাপারটাকে আমি শিল্পের পর্যায়ে নিয়ে গিয়েছিলাম তবে এবার পায়ে ব্যাথ্যা পেল চান ভাই। সিড়িপথে খানিকটা পথ উঠে বসার বেঞ্চে সবাই বসলাম। এবার আবিষ্কার করলাম একের পর এক জোকের আক্রমণ। আমরা উঠার সময় এক ভদ্রলোককে ছাতা মাথায় বিরিয়ানির প্যাকেট হাতে নিচে নামতে দেখেছিলাম। খানিকক্ষণ বাদে তার নূরাণী চেহারা আবার দেখতে পেলাম। ঝিরির পানি বেড়ে যাওয়ায় বিরিয়ানি গ্রুপ সব উপরে উঠে এসেছে৷ আমাদের পুরা গ্রুপটা উপরে উঠে কাপড় চেঞ্জ করার সময় রোমেল ভাই টের পেল অণ্ডকোষে জোকে কামড় দেওয়ায় ফলে অনবরত রক্ত পড়ছে। এতবার পাহাড়ে এসেছি এই রকম বিপদে কখনও পড়তে হয় নাই। প্রথমে সিরিয়াস কিছু না ভাবলেও তাকে নিয়ে আমাদের সীতাকুণ্ড হাসপাতাল পর্যন্ত দৌড়াতে হয়েছে। পাঠক হিসাবে আপনারা নিশ্চয় পরিপক্ক। এখানে অশ্লীলতার কিছু খুঁজে পাবেন না আশা করি। অনেক সময় মনের আনন্দ থেকে সঠিক সিদ্ধান্ত নেওয়াটা গুরত্বপূর্ণ হয়ে দাঁড়ায়। মহামায়া লেক যাবার প্ল্যান ক্যান্সেল করে আমরা ঢাকার পথে রওনা দিলাম৷

ফিচার ছবি: লেখক

About Ashik Sarwar

Check Also

স্কুটারে করে ঢাকা থেকে সাজেক ভ্রমণ

ঈদের বন্ধের পর মাত্র অফিস শুরু করলাম। হঠাৎ মেইল, আগামী ১৫ই মে রবিবার বৌদ্ধ পূর্ণিমার …

Leave a Reply

Your email address will not be published.